| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
জর্জ অরওয়েল যখন তার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাসটা লিখতে বসেছেন তখন তিনি বেশ অসুস্থ। তিনি Tuberculosis রোগে আক্রান্ত হয়ে আছেন। পকেটের অবস্থাও শোচনীয়। আবার এমন একটি বিষয় নিয়ে লিখছেন এই বই, কেউ প্রকাশ করবে কিনা তা নিয়ে আছে যথেষ্ট সন্দেহ। তবে এই উপন্যাসটা লিখতে তার প্রচণ্ড ভালোলাগা কাজ করছে। এই একটা কারণেই সব বিপত্তি উপেক্ষা করে তিনি তার নির্জন কটেজে বৃষ্টি জলের মধ্যে বসে বুনতে লাগলেন ভবিষ্যৎ দুনিয়া কাঁপানো এক উপন্যাসে জাল।
এক সময় তার বই লেখা শেষ হলো। তার সন্দেহকে সত্যি প্রমাণ করে কেউ এ বইটি প্রকাশ করতে চাইলো না। অরওয়েলের প্রায় সব বইয়ের পাবলিশার ফেবার এন্ড ফেবারও জানিয়ে দিল এই বই তারা পাবলিশ করতে পারবেনা। জর্জ অরওয়েল যখন বইটি প্রকাশ করতে চাচ্ছিলেন ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৪৪ সালের মাঝে, ততদিনে মানুষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখেছে। বইটি অতিমাত্রায় পলিটিক্যাল সেনসিটিভ। ঠিক তখনই ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যাচ্ছিল এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন হিটলারের নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে মিত্রশক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। পশ্চিমা বিশ্বের অনেকেই তখন সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্টালিনকে একজন মহান ও নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে দেখছিল। যদিও তার শাসন ব্যবস্থার ভেতরে ছিল ভয়ঙ্কর একনায়ক তন্ত্র। যেখানে গণহত্যা, রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান, ভিন্নমতের দমন এবং ইতিহাস বিকৃতি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।
অরওয়েল একজন সমাজতন্ত্রী হলেও তিনি স্টালিনের এই স্বৈরাচারী আচরণের বিরুদ্ধে ছিলেন এবং বুঝতে পারছিলেন রুশ বিপ্লবের নামে যে পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে তা ছিল ক্ষমতার আরেক রূপ। যেখানে সমতার নামে শোষণ আবারও ফিরে এসেছে। যার ফলে প্রকাশকরা নারাজ এই উপন্যাস পাবলিশ করতে। কিন্তু অরওয়েল তো হাল ছাড়ার পাত্র নন। বইটি তিনি প্রকাশ করবেনই। কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন প্রকাশনীর কাছে ধরনা দিয়ে এক সময়ে এসে তিনি বইটির প্রকাশ করে ফেললেন “সিকার এবং ওয়ার্নার্ক“ নামের একটি প্রকাশনা সংস্থা থেকে। বলাই বাহুল্য বইটা ছাপা হওয়ার পর উঠল বিতর্কের ঝড়। কেউ কেউ পছন্দ করলো উপন্যাসটিকে। কেউ কেউ এক বাক্যে করে দিল নাকোচ। আমেরিকা, রাশিয়া, কেনিয়া, ব্রিটেনসহ বেশ কিছু দেশে সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয় বইটিকে।
কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, সিআইএ এই বইয়ের রাইট নিয়ে তাদের প্রথম এনিমেটেড ফিল্ম বানায়। এরপর পিনক ফ্লয়েড থেকে দি সিমনস। বোজাক হোসসম্যানেও বারবার আসে এই বইয়ের রেফারেন্স। কোল্ডওয়ার প্রোপাগান্ডাতেও বারবার ব্যবহার করা হতে থাকে বইটিকে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত বইটির প্রাসঙ্গিকতা ৭০ বছর পরে এসে এখনো প্রাসঙ্গিক। ঠিক প্রথম দিনের মতোই। বইটির নাম “Animal Farm” যে বইয়ে জর্জ অরওয়েল লিখেছিলেন বিখ্যাত সেই লাইন “All animals are equal but some some animals are more equal than others” । কি এমন আছে অ্যানিমেল ফার্মে? যে বই নিয়ে কথা হয় আজও। হয় তর্ক-বিতর্ক। কি লেখা আছে এই উপন্যাসে? যা এখনো মানুষের চিন্তা ভাবনাকে করেছে আচ্ছন্ন। কেন এই বইকে রাখা হয় পৃথিবীর প্রভাবশালী বইয়ের তালিকায় শীর্ষের দিকে? আর কেন শাসকদের কাছে এই বই এখনও বিরাট অস্বস্তির কারণ? অরওয়েলর এই বই লেখার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত কমিউনিজম কে কটাক্ষ করা। বিশেষ করে স্টালিন যেভাবে রাশিয়ান বিপ্লবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, সেটাকে কেন্দ্রে রেখেই শুরু হয়েছিল এই উপন্যাস। কিন্তু যদি এটা ধরে নেওয়া হয় এই উপন্যাস শুধু এতটুকেই সীমাবদ্ধ সেটা ভাবলে ভুল হবে। এই বইতে মেটাফরের আড়ালে উঠে এসেছে হিউম্যান নেচার, বেহাত বিপ্লব, সাইকোলজি অফ পাওয়ার, সোশ্যাল মেকানিজম আর ডিক্টেটরশিপের নানাবিধ আখ্যান। যে কারণে এই বই সময়ের সাথে সাথে হয়েছে পোক্ত, টাইমলেস এবং ক্লাসিক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন- “সহজ কথা কইতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায়না বলা সহজে”। এই কথারই আশ্চর্য ব্যতিক্রম এনিমেল ফার্ম।
বইয়ের টাইটেল মেনে যে উপন্যাসের শুরুটা একটা ফর্মে। ফার্মের নাম “ম্যানর ফর্ম”। এই ফার্মের মালিক মিস্টার জোন্স তার ফার্মের পশুদের উপর দিনের পর দিন ভয়ানক অবিচার করে আসছিলেন। তীব্র অত্যাচারে যখন ফার্মের পশুদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, তখন তাদের সামনে আশার বাতিঘর হয়ে দাঁড়ায় মেজর নামে এক জ্ঞানী বৃদ্ধ শূকর। সে এই ফার্মের পশুদের বলে প্রতিবাদ করতে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মানুষ অর্থাৎ মিঃ জোন্সের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলে। বলাই বাহুল্য তার কথায় সবাই মিলেমিশে মিস্টার জোন্সকে আক্রমণ করে। একটা অতর্কিত বিপ্লবের মুখোমুখি হয়ে জোন্স ফার্ম ছেড়ে পালায়। পরবর্তীতে ফার্মের নাম পাল্টিয়ে নতুন নাম রাখা হয় “Animal Farm”।
বিপ্লবের পরে কিছুদিন বেশ ভালই কাটে। ফার্মে প্রাণীদের অধিকারের কথা ভেবে নতুন নতুন নীতিমালা আর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য কিছু কাজও শুরু হয়। কিন্তু সেসব মাত্র অল্প কিছুদিনের কথা। হুট করে একদিন সবাই আবিষ্কার করল ধীরে ধীরে নেপোলিয়ান নামে এক তাগড়া শুকরের কাছে ফার্মের নেতৃত্ব চলে গিয়েছে। এবং তার নেতৃত্ব অনেকটা আগের মালিক মিস্টার জোন্সের মতোই। একই রকম আগ্রাসী আচরণ। অনেকটা “যে যায় লঙ্কায়, সে হয় রাবণ” প্রবাদের মতোই। নেপোলিয়ান ভিন্নমত সহ্য করতে পারেনা। কেউ ভিন্ন মত দিতে চাইলে সে তার প্রশিক্ষিত পোষা কুকুর বাহিনী লেলিয়ে দেয় তাদের পেছনে। এই হিংস্র কুকুর বাহিনী আক্রমণ করে, ছিঁড়েখুরে ভিন্নমত দমন করে নিয়মিত। এদিকে নেপোলিয়নের সাথে সঙ্গপাঙ্গ হিসেবে জুটে যায় আরো কিছু শুকর। যাদের সারাদিনের অন্যতম কাজ সবাইকে হুমকি ধমকি দিয়ে রাখা। এরা সারাদিন শুয়ে বসে থাকে, প্রচুর খায় আর সাধারণ পশুদের কে নির্যাতন করে। আর যারা আসলেই কাজ করে তারা খাবার না পেয়ে অনাহারে দিন কাটাতে থাকে। তাদের জীবন যাপন বিপ্লবের আগে যেমন ছিল, তার থেকে ভালো না হয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে হতে থাকে আগের চেয়েও আরও বেশি খারাপ। এদিকে শাসক নেপোলিয়নাকে এসব বলে কোন লাভ নেই। কোন এক অদ্ভুত কারণে সে তার নিজের লোকজন ছাড়া আর কারো কথা শোনে না, কাউকে দেখেও না, কারো সাথে কথাও বলেনা।
এই উপন্যাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলো ঘোড়া, বক্সার ও ক্লোভার। এরা বেশ পরিশ্রমি।তারা দিনরাত খাটে এবং বিশ্বাস করে বিপ্লব মিথ্যা হতে পারে না। তারা বিশ্বাস করে যে ঝামেলা হচ্ছে তা সাময়িক। অবস্থা অবশ্যই পাল্টাবে। কিন্তু অবস্থা পাল্টায় না। নেপোলিয়ানের নেতৃত্বে শুকর বাহিনী ক্রমাগত চরাও হতে থাকে সাধারণ পশুদের উপর। পাশাপাশি তারা একসময় আঁতাত করে মানুষের সাথেও। সাধারণ পশুরা অবাক হয়ে আবিষ্কার করে যাদের বিরুদ্ধে বিপ্লব হয়েছিল, তারাই আবার নতুনভাবে ফিরে আসছে ফার্মে। এনিমেল ফার্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক বোধহয় এটাই।
পৃথিবীর মানচিত্রে এমন কোন দেশ নেই যে, দেশের মানুষ এই উপন্যাসের সাথে নিজের আশেপাশের মিল খুঁজে পাবে না। Dictatorship, Misleading Narrative এবং Mass Surveillance’র এই সময়ে এসে অ্যানিমেল ফার্ম ঠিক উপন্যাস না হয়ে, দাঁড়ায় সময়ের একখন্ড রূপকে। অ্যানিমেল ফার্মের এই যে জগৎ, এই জগৎ একটা জিনিস খুব স্পষ্ট করেই বোঝায় কিভাবে “বিপ্লব বেহাৎ হতে পারে”। যে আদর্শে একত্রিত হয়ে মিস্টার জোন্সেকে তাড়িয়েছিল ফার্মের সমস্ত পশু, বিপ্লবের পর যখন সেই আদর্শ ক্রমশ মুছে যেতে থাকে তাদের জীবন থেকে, তখন তাদের যে দীর্ঘশ্বাস সেই দীর্ঘশ্বাসের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যাবে অনেক ব্যর্থ বিপ্লবের। বিপ্লবের পরে বিপ্লবীদেরও ক্রমশ স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার এই যে উদাহরণ, এই উদাহরণ আমাদের চারপাশে কিন্তু কম নেই মোটেও।
অ্যানিমেল ফার্ম থেকে উঠে আসে বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা ইনসাইড। সেটি হচ্ছে কিভাবে ভাষা হয়ে উঠতে পারে ম্যানুপুলেশনের টুল। অ্যানিমেল ফার্মের ডিক্টেটর নেপোলিয়নের সঙ্গী স্কুইলার ছিল একজন প্রোপাগান্ডানিস্ট। কথাবার্তাকে টুইস্ট করে, টেকনিক্যাল জার্নাল ব্যবহার করে ও মিসলিডিং নেরেটিভ ছড়িয়ে প্রতিপক্ষকে ফাঁদে ফেলার কাজ বেশ দক্ষভাবেই করত স্কুইলার। যে কারণে আমরা দেখি বিপ্লব পরবর্তী এনিমেল ফার্মের স্লোগান- “All animals are equal” থেকে পাল্টে “All animals are equal, but some animals are more equal than others” হয়ে যেতে। খেয়াল করলে দেখবেন সাম্প্রতিক সময়ে এসেও প্রোপাগান্ডা, মিডিয়া স্ক্রীনিং, ফেক নিউজ কিংবা গ্রীন ওয়াশিং আছে বহাল তবিয়তে। পাবলিক ডিসকোর্সে এসে ক্যালকুলেটিভ মিথ্যা বলা, ইমোশনালি চার্জ, মিসলিডিং নেরেটিভ ছড়ানোর যে কালচার, এসবের সাথে অ্যানিমেল ফার্মের মিল পাওয়া যায় ক্ষণে ক্ষণে। স্কুইলাররা যে ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে বহাল তবিয়াতে থাকে, সেটাও যেন প্রমাণ হয়ে যায় এখান থেকেই। এসব বাদ দিয়েও অ্যানিমেল ফার্ম যে ভয়ংকর কাজটি করে তা হচ্ছে, এই উপন্যাস শোষিত বা অপ্রেসদের সাইকোলজিকে এক্সপোজ করে খুব ব্রুটাল ভাবে।
অ্যানিমেল ফার্মের সেই কঠোর পরিশ্রমি ঘোড়া বক্সারের কথা একটু আগে কিন্তু বলেছি। এই বক্সার মূলত আমরাই, যে বারবার নির্যাতিত হয় এবং বারবার নিপীড়নের পরেও সে আশা করে পরিস্থিতি একদিন পাল্টাবে। সে মনে করে শাসক যা করছে সেটিই ঠিক। সাধারণ মানুষ যে অসহায়, ভীত এবং রাজনীতি অসচেতন এবং গড়পড়তা মানুষ যে আসলে নিরিবিলি একটু বাঁচতে চায় এবং বাঁচার এই প্রক্রিয়ায় সে ক্রমশই হতে থাকে শাসকের শোষণের বস্তু। এই বিষয়টি এত স্পষ্ট হয়ে উঠে আসে এই উপন্যাসে, কিছু ক্ষেত্রে সাফোকেটিং লাগে। আর এভাবেই বক্সার হয়ে ওঠে পৃথিবীর সমস্ত সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি। অ্যানিমেল ফার্ম বক্সারের পরিণতি দেখিয়ে আলগোছে বোঝায়, স্বৈরাচাররা শুধুমাত্র ভায়োলেন্স করে টিকে থাকে না। তারা টিকে থাকে মানুষের ভয়, অজ্ঞতা ও প্রশ্ন না করার মধ্য দিয়ে।
অ্যানিমেল ফার্মের শেষটা মূলত এই উপন্যাসকে নিয়ে যায় এক অন্য উচ্চতায়। যেখানে দেখা যায় স্বৈরাচার শুকরেরা মানুষের সাথে একসাথে বসে কার্ড খেলছে, উল্লাস করছে। ফার্মের সাধারণ প্রাণীরা তখন আর শুকরদের সাথে মানুষের পার্থক্য খুঁজে পায় না। তাদের কাছে এই দুই প্রাণীকে একই মনে হয়। উপন্যাসের এই শেষ পরিণতি মূলত বলতে চায়, “ক্ষমতা যার হাতে থাকুক না কেন, সব শাসকের শোষণ মূলত একই রকম বীভৎস”।
এবার যাওয়া যাক একটু গভীরে। যদিও মোটা দাগে এনিমেল ফার্ম একটা Political Allegory, যেখানে Authoritarianism, Stalinism এবং Revolution নিয়ে বিশ্বাসঘাতকতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এসব ছাপিয়ে এই বই কথা বলে সোশ্যাল মেকানিজম, দলভুক্ত মানুষের আচরণের কমন প্যাটার্ন এবং পাওয়ার কিভাবে হিউম্যান সাইকোলজিকে ডমিনেট করে তাই নিয়ে। এনিমেল ফার্ম যারা পড়েছেন তারা নিশ্চিতভাবে খেয়াল করেছেন এই উপন্যাসের প্রাণীরা কখনোই অথরিটিকে প্রশ্ন করেনি। তারা স্লোগানে গলা মিলিয়েছে। শূকররা যা সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেই সিদ্ধান্তে সহমত জানিয়েছে এবং নিজের অধিকার ভুলে শাসকরা যা চাপিয়েছে সেটাই মেনে নিয়েছে। একেই মূলত সাইকোলজির ভাষায় বলা হয় “Herd Mentality”। যে মেন্টালিটির মানুষজন ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং বাদ দিয়ে সবাই যা সিদ্ধান্ত নেয় সে সিদ্ধান্তেই গা ভাসায়। আমাদের আশপাশের মানুষজন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সেসব দলের নেতাকর্মীদের আচরণ দেখলেই আমরা খুঁজে পাবো এর সত্যতা। এবং শুধু এখানেই শেষ নয় মানুষ আজকাল সেসব আন্দোলনেই গা ভাষায় যে, আন্দোলন ভাইরাল হয়। যে আন্দোলনে সে গলা মেলালে তাকে আলাদা করে চেনা যাবে না, মানুষ শুধু সে সব আন্দোলনের কণ্ঠস্বর হয়। সজ্ঞানে অথবা অজ্ঞানে।
Animal Farm এর প্রানীরা যেমন অর্থ না বুঝেই বলে যেত Four legs good, two legs bad। তেমনটা লক্ষ্য করলে আমরা খুঁজে পাবো এখনো এবং এখানেই সমস্যা। জনস্রোতের সাথে গা ভাসানো মানুষজন ভুলে যায় সঠিক প্রশ্ন করতে। তারা ভুলে যায় তাদের অধিকারও। আবার অন্যায় দেখলে চুপ করে থাকার যে মানসিকতা আমাদের, সেই মানসিকতাকেও এক হাত নিয়েছিলেন অরওয়েল। মিউরিল দি গোট, ভোটার দি হস, বেঞ্জামিন দি ডংকি এরা আচ করতে পেরেছিলো এনিমেল ফার্মে বিপদ ঘনিয়ে আসছে। বুঝতে পেরেছিলো বিপ্লব চলে যাচ্ছে ভিন্ন দিকে। কিন্তু তারা না করেছে প্রতিবাদ না করেছে বাকিদের সাবধান। তারা চুপচাপ সহ্য করে গিয়েছে বহুকিছু এবং যখন পরিস্থিতি চলে গিয়েছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে তখন তারা পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। খানিকটা কি রিলেটেবল মনে হচ্ছে না ব্যাপারটাকে।
নেপোলিয়নের সবচেয়ে কাছের সহচর স্কুইলার ফার্মের পশুদের ডিল করত ভিন্নভাবে। সে স্বার্থ হাসিলের জন্য বলা মিথ্যার সাথে মিশাতো নানা রকম ইমোশন। কখনো সে প্রাণীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতো ভয়, কখনো আশা আর কখনো অনুতাপ। খামারের পশুধের যুক্তি থেকে দূরে রেখে এভাবেই ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করত স্কুইলার। যে কালচার এখনো ছড়ি ঘুরিয়ে যাচ্ছে আমাদের আশেপাশে। একটু লক্ষ্য করলে দেখবেন আমাদের আশেপাশে যেসব পলিটিক্যাল এজেন্ডা জনপ্রিয় তার অধিকাংশই Emotionally Manipulated। এই ম্যানুপুলেশন গ্রাস করে সবকিছু। Consumer Behaviour, Voting Patterns থেকে শুরু করে Ideological Extremism এর দিকেও নিয়ে যায় এই ইমোশনাল ম্যানুপুলেশন। যার খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষেদের। দিতে হয় আমাদের। ফরাসি দার্শনিক ও লেখক Albert Camis লিখেছিলেন- Every revolutionary ends up either by becoming an oppressor or a heretic.
অরওয়েল যদি শুধু একটা উপন্যাস লিখতেন যে, উপন্যাসে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসক কে মক করেছে তাহলে সেই উপন্যাস নিশ্চিতভাবেই টাইমলেস ক্লাসিকে ট্রান্সফর্ম হত না। কিন্তু হয়েছে কারণ এই উপন্যাস খুব সোজাসাপ্টা ভাবে দেখিয়ে দিয়েছে ঠিকঠাক ভাবে নিয়ন্ত্রণে না রাখলে, খুব আদর্শিক বিপ্লবও কিভাবে চলে যেতে পারে আরেক স্বৈরাচারের কবলে। দেখিয়েছে রাজনীতি এবং নিজের অধিকার বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না রেখে মানুষ কিভাবে মূলত নিজের ক্ষতি নিজেই করে। সেজন্যই রাজনীতির বই না হয়ে, এই বই হয়ে থাকে সাইকোলজি আর সোশিয়লজি এক অমোঘ পাঠ।
ইতিহাস যে ফিরে ফিরে আসে এবং স্বৈরাচার যে কখনোই শেষ হয় না বরং নতুন অবতারে জন্ম নেয় সেই রিয়েলিটি চেক দেয় এই বই। এবং বলে সবকিছুই সহজ ভাবে মেনে না নিতে। যত ভারী হোক মিছিলের শ্লোগান কিংবা যতই আবেগ থাকুক বক্তৃতায় রাজনীতিকদের অভিসন্ধি নিয়ে প্রশ্ন করতে হয়। প্রশ্ন করতে হয় নিজের অধিকার নিয়ে। প্রশ্ন করতে হয়, নিজের রাজনীতির জ্ঞান পোক্ত করতে। এগুলো না করলে শক্তির রূপান্তরিত হয় অপশক্তিতে, দুর্নীতিতে। সেখান থেকেই আসে অত্যাচার, শোষণ এবং এই চক্র চলতে থাকে নিরন্তর, আমাদের বোধহয় হওয়ার আগ পর্যন্ত। এবং এভাবেই এই বই শেষে এসে এটাই বোঝায় এনিমেল ফার্ম আমাদেরই গল্প। যে গল্পের শেষটা আমরা পাল্টাতে পারি। যদি আমরা চাই। যদি আমরা মনেপ্রাণে চাই।
আশরাফুল মাহমুদ তাইফ ।

©somewhere in net ltd.
১|
১৯ শে নভেম্বর, ২০২৫ রাত ১২:০৩
আহমেদ রেহান বলেছেন: ভালো লাগলো।