| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
অনিয়ম দুর্নীতি লোক ঠকানো মিথ্যাচারের যে সাগরে ডুবে আছে দেশ তা কি হঠাৎ করে হওয়া কোন অধঃপতন। বাংলাতে প্রায় ২০০ বছর রাজত্ব করা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তারা আজ থেকে প্রায় ২৫০ বছর আগে বাঙালির চরিত্র সম্পর্কে যে গোপন প্রতিবেদন পাঠিয়েছিলেন তা থেকে বলা যায়, এগুলোই আসলে বাঙালির মজাগত অভ্যাস এসব প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলায় যথার্থ সৎ এবং সত্যবাদী মানুষের অস্তিত্ব বিরল। সর্বত্র জুড়ে আছে অবিশ্বাস। উভয়পক্ষ বিশ্বাস ভঙ্গ করতে পারে এমন আশঙ্কা নিয়ে সব চুক্তি বা দলিল করা হয়। জনসাধারণের মধ্যে দেশপ্রেমের বালাই নেই।
ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল এবং রাজস্ব বিশেষজ্ঞ স্যার জন সোর ১৭৮৪ সালে তার প্রতিবেদনে লিখেন বাঙালিরা ভীরু এবং দাসুলভ। তবে অধস্তনের প্রতি আবার ব্যাপক চোটপাট নেয়। ব্যক্তি হিসেবে মানসম্মানবোধ কম। জাতি হিসেবে এদের মধ্যে জনকল্যাণমূলক মনোভাব একেবারে নেই। যেখানে মিথ্যা কথা বললে কিছু সুবিধা হতে পারে, সেখানে অনর্গল মিথ্যা বলতে এদের একটুও বাঁধে না। যেখানে শাস্তির ভয় নেই সেখানে মনিবের কথাও শুনতে এরা গিরিমশি করে। তনসুর আরো লেখেন বাঙালি মনে করে চালাকি এবং কূটকৌশলী জ্ঞানের পরিচয়ক। লোক ঠকানো এবং ফাঁকি দেওয়াও গুণ।
এর প্রায় এক দশক পর ১৭৯২ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চেয়ারম্যান চার্লস গ্রান্ড তার ২০ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে লিখেন, বাঙালিদের মধ্যে সততা সত্যবাদিতা এবং বিশ্বস্ততার বড়ই অভাব স্বার্থসিদ্ধির জন্য মিথ্যা বলা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। সাধারণ কাজেও লোক ঠকানো, ফাঁকি দেওয়া, ধোঁকা দেওয়া, চুরি করা একটা সাধারণ ঘটনা। তিনি আরো জানিয়েছিলেন জীবনের সর্বক্ষেত্রেই চলছে প্রবঞ্চনা, প্রতারণা, ফাঁকিবাজি। সেই সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘশত্রতা। জাল, জুয়া, চুরি চলে নির্দ্বিধায়। চার্লস গ্র্যান্ড আরো লিখেন অন্যের ক্ষতি করার প্রবৃত্তি বাঙালি চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। এমন পরিবার খুব কম আছে যেখানে বিষয় সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ নেই। এরা অশ্রাব্য গালাগাল করে মনের ঝাল মেটায়। তার ভাষায় আইন প্রয়োগ করেও বাঙালির চরিত্রগত দুর্নীতি নির্মূল করা দূর হয়। নীতিহীন স্বার্থপরতার সমাজে ছড়িয়ে আছে ঘৃণা, বিবাদ, নিন্দাবাদ, মামলাবাজি। ২০০ বছরের বেশি সময় পরও এসব কথাকে অস্বীকার করা যাবে?
এর প্রায় ১০ বছর পর ১৮০১ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসল বাংলার জেলা জজ এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের কাছে একটি প্রশ্নমালা বা কোশ্চেনার পাঠান। যার একটি অংশে প্রত্যেক জেলার অধিবাসীদের নৈতিক চরিত্র ও স্থানীয় অপরাধ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা জানতে চাওয়া হয়। এ থেকে গোটা বাংলাদেশের মানুষদের সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। তৎকালীন সময়ের সব বিচারকদের মতেও বাঙালিরা কপট, অকৃতজ্ঞ এবং মিথ্যাচারে সাধারণ মানুষ অসহায় নির্বিকার।
- সে সময় যশোরের বিচারক লিখেন, পুলিশ বাহিনী ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন। কর্মচারীদের সঙ্গে চোর ডাকাতদের যোগ সাজস রয়েছে। সাক্ষ্য দিলে সাক্ষীর হওয়ার আশঙ্কা থাকায় লোকে সাক্ষ্য দিতে ভয় পায়।
- ঢাকার বিচারক জানান ঢাকার লোকেরা কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুগত শহরে তেমন মারাত্মক অপরাধ নেই। তবে যাদের টাকা-পয়সা খরচ করবার মত ক্ষমতা আছে তারা সাধারণত ভোগবিলাসী, লম্পট।
- বাঘরগঞ্জ বা আজকের বরিশালের বিচারক লিখেন এই জেলার অধিবাসীদের নৈতিক চরিত্র অতি জঘন্য। এমন কোন জোট চুরি নেই যা উচ্চ শ্রেণীর মধ্যে দেখা যায় না। নিম্নশ্রেণীর মধ্যে আছে ডাকাতি। শাস্তির ভয়ে এদেরকে সংযত করতে পারে নীতি শিক্ষা বা আদর্শ এদের কখনোই সৎপথে চালিত করতে পারবে না।
- ত্রিপুরা বা আজকের কুমিল্লার বিচারকের মতামত এখানকার অধিবাসীদের নৈতিক চরিত্র অতিশোচনীয়। রাজশাহীর বিচারকের মতে যুবক থেকে বৃদ্ধ প্রায় সবার মধ্যেই ঝলচাতুরির প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই দোষ সংশোধন করা কঠিন।
- জামালপুরের বিচারক বলেছিলেন বাল্যকালে নীতি শিক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই। ভোগাশক্তি সংযমের শিক্ষাও দেয়া হয় না। এটাই অপরাধ প্রবণতার কারণ। আরেক চিঠিতে তিনি লিখেন নৈতিক কর্তব্য সম্পর্কে এদের কোন ধারণা নেই। সাধারণ লোকেরা ছলচাতুরি করে চলে। এরা অলস ও ইন্দ্রিয় পরায়ণ। নিশংস অথচ কাপুরুষ। উদ্ধত আবার হীনমন্য।
- রংপুরের বিচারক লিখেন, এখানকার লোকেরা বেশিরভাগে অত্যন্ত অলস অজ্ঞ এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন। অনেক সময় প্রতিহিংসা পরায়ণ স্বার্থপর, মিথ্যাচারী ও নির্লজ্জ। জালিয়াতি ও ফাঁকিবাজিকে এরা খুব বাবার কাজ বলে মনে করে। এ কারণে পরিবারেও একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারে না।
আজও বুদ্ধিজীবী শ্রেণী, বিচারক, আইনজ্ঞ, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক বা ব্যবসায়ী সব জায়গায় একই চিত্র। যেন এক ধরনের সামঞ্জস্যহীন প্রতিযোগিতা চলছে। কে কাকে ডিঙিয়ে যেতে পারে, নিয়ম কানুনের বালাই নেই। সে সময় সমাজ হিন্দু ও মুসলিম দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। কয়েকশো বছর শাসন করেছে মুসলিম শাসকরা হিন্দুদের সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয় এরা ডাহা মিথ্যা বলতে পারে। চাকরের মত তোষামত করতে পারে। শিক্ষা কেবল তাদের নিজ ভাষা পরিচয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মুসলমানদের সম্পর্কে বলা হয় তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কিছুটা ছিল। কিছু নীতিকথা, রাজকার্যের কিছু মূল সূত্র শিখলেও সেগুলো মেনে চলে না সাধারণ থেকে দেওয়ান পর্যন্ত সবার কাজ হলো, কথা গোপন করা। অন্যকে ফাঁকি দেওয়া। ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সেই প্রতিবেদনগুলো তৈরি করা হয়েছিল প্রশাসন এবং বিচার ব্যবস্থা পরিচালনার স্বার্থে কর্মকর্তা কর্মচারীদের যাতে মানুষকে বুঝে শুনে কাজ করতে পারেন। বাঙালিকে অপমান করার উদ্দেশ্য তাদের ছিল না। এসব প্রতিবেদন তাই তারাও প্রচারও করেনি। আবার বিভিন্ন যুগে পর্যটক সমাজতাত্ত্বিক এবং রাজনীতিবিদরা নানাভাবে বাঙালির চরিত্র বর্ণনা করেছেন।
এসব বিশ্লেষণে রয়েছে পরস্পর বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি। কেউ বলেছেন বাঙালি চিন্তাশীল বিপ্লবী। কারো মতে বাঙালি কল্পনাবিলাসী, বাস্তব বিমুখে,অলস। কারো কারো ধারণা বাঙালি কলহপ্রিয় আত্মকেন্দ্রিক তবে ব্রিটিশ আমলের সেই প্রতিবেদনগুলো ছিল অনেক বেশি তৃণমূল সম্পৃক্ত। ভাবাবেগের চেয়েও যেখানে নির্মহ চিত্র ছিল বেশি। তবে এসব প্রতিবেদন একবারে তৈরি হয়নি একটি নির্দিষ্ট সময় পর।
___________________________________________________
আশরাফুল মাহমুদ
ফ্রীল্যান্স ফিল্মমেকার এন্ড রাইটার
বিবিসি এ্যাকশন মিডিয়া
ঢাকা, বাংলাদেশ।

©somewhere in net ltd.
১|
১৪ ই মে, ২০২৬ রাত ২:৩২
আহমেদ রেহান বলেছেন: একদম ✌