নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

তানভীর আহমেদ প্রিয়ম

তানভীর আহমেদ প্রিয়ম › বিস্তারিত পোস্টঃ

বোন

১১ ই নভেম্বর, ২০২২ রাত ৯:৫৪

আমি অয়ন।
বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান।
এখন ক্লাস ৭ এ পড়ি।
আমার একটা মাত্র ইচ্ছে আর সেটা হল আমার একটা বোন হোক।
এর জন্য কতকিছুই না করলাম।
মসজিদে আমার জমানো সব টাকা দিতাম।
নামায পড়ে দোয়া করতাম।
মা বাবার কাছে কতবার বলেছি আমাকে একটা বোন এনে দাও।
.
.
সব কল্পনা ঝল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজ আমি হাসপাতালে যাচ্ছি।
কারন আজ আমার মায়ের অপারেশন।
হ্যা একটি বাবু হবে।
আশা করি আমার বোনই হবে।
.
.
.
প্রায় ১ঘন্টা দাড়িয়ে আছি অপারেশন থিয়েটারের সামনে।
এখনো অপারেশন চলছে।
টেনশন এ আমার চুল ছিড়তে মন চাচ্ছে।
অবশেষে দেখলাম ডাক্তার বের হচ্ছে।
বাবার আগে আমি গিয়ে ডাক্তারকে জিজ্জেস করলাম
>আন্টি ছেলে হইছে না মেয়ে?(আমি)
>তুমি কে?(ডাক্তার)
>আমি রোগীর ছেলে।
>ও। কি হইলে তুমি খুশি হবে?
>অবশ্যই মেয়ে।
>ওকে তাহলে তোমার জন্য সুসংবাদ।
>কি?(আশ্চর্য হয়ে)
>তোমার বোন হয়েছে।
>ইয়াহু
.
.
সেইদিন আমার চেয়ে বেশি খুশি হয়তো দুনিয়ার আর কেউ হয়নি।
তবে আমার বোনটা সাত মাসে হয়েছিল।
তাই পরিপক্ক হয় নি।
তাই ওকে পাঠানো হয় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২৫ নাম্বার ওয়ার্ডের শিশু বিভাগে।
কারন বাংলাদেশের একমাত্র হাসপাতাল ছিল
ময়মনসিংহ মেডিকেল যেখানে সবচেয়ে বেশি চিকিৎসার আধুনিক যন্ত্রপাতি ছিল।
বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য।
.
.
.
জীবনে প্রথম গিয়েছিলাম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
সেখানে এতো মানুষ ছিল যা বলার বাইরে।
.
হাসপাতালে নেওয়ার সাথে সাথে আমার বোনকে নিয়ে যাওয়া হল ভীতরে।
আর কিছু ঔষধ আনতে বলা হল।
আব্বু ঔষধগুলো আনতে গেল আর আমি ওইখানে দাড়িয়ে রইলাম।
.
ওইখানে একটা সুবিধা ছিল যখন কোন বাচ্চার কিছু প্রয়োজন হত তখন স্পিকার এ জানিয়ে দেওয়া হত।
.
.
আর এই কারনে সবসময়ই কাওকে না কাওকে ওইখানে থাকতে হত।
.
যদি কিছু প্রয়োজন পড়ে তাই।
ওইখানে ২৪ দিন ছিলাম।
সিড়ির ভিতর।
মশার কামড় আর অসহ্য ভ্যাপসা গরম ভাব ছিল সেখানে।
তবুও থেকেছি।
কারন আমার বোন।
সেখানে থাকা অবস্থায় কোন কিছুই ঠিক মত হয়নি।
না খাওয়া দাওয়া না অন্য কাজ।
ওই পরিবেশ এ খাওয়ার হচ্ছেই জাগত না।
..
.

আজ ১১ দিন হতে চলল বোনটাকে দেখতে পারি নি একবারের জন্যও।
শুধু যখন প্রয়োজন পড়ে তখন ঔষধ আর স্যালাইন দিয়ে আসতে হয়।
এর মধ্যে সেখানে এক নার্সের সাথে মোটামুটি ভাব জমিয়ে বোনকে দেখার চেষ্টা করি।
যেহেতু ইন্টার্নি নার্স ছিল তাই সে রাজি হয়ে যায়।
অতঃপর সে তার ফোন দিয়ে একটা ছবি তুলে এনে আমাকে দেখায়।
.
.
সব কষ্ট ভুলে যাই।
আমার বোনটা সুস্থ আছে এই ভেবে।
মুখে একটা মলিন হাসি ফুটে উঠে।
এ হাসিটা ছিল প্রাপ্তির।
যার মূল্য অনেক।
.
.
আজ ১৭ দিন
ডাক্তার কিছু টেস্ট করতে বলে।
বাবা টেস্টগুলো করিয়ে আনে
ওর জন্ডিস ধরা পড়ে।
ডাক্তার পুরো শরীরের রক্ত পরিবর্তন করতে বলে।
.
.
পাগলের মত রক্ত খোজা শুরু করি।
অনেক আত্বীয়দের রক্তের গ্রুপ ছিল O+
কিন্তু সবাই বাহানা দেখায় রক্ত না দেওয়ার জন্য।
বাবার ডায়েবেটিস থাকায় বাবার রক্তও নিতে অসম্মতি জানায় ডাক্তার।
.
.
অবশেষে আমার রক্ত নেওয়ার জন্য ডাক্তারকে বলি।
কিন্তু আমার বয়স না হওয়ায় ডাক্তার না করে দেয়।
অনেক জোর করার পর ডাক্তার রক্ত নিতে রাজি হয়।
.
.
অবশেষে আমার বোন কিছটা সুস্থ হয়।
আজ ২৪ দিন।
হাসপাতাল থেকে আমার বোনকে রিলিজ দিয়ে দেয়।
এখন আমার বোনটাকে নিয়ে বাসায় যাচ্ছি।
সাথে মা বাবা আমি ও আমার নানী।
বাড়ি যাওয়ার পর অনেকেই আমাকে চিনতে পারে নি।
শুকিয়ে গিয়েছিলাম অনেক।
এই ২৪ দিনের জন্য একবারের জন্যও বাড়িতে যাই নি।
বাবা অনেক বলেছে কিন্তু যাই নি।
আজ ২৪ দিন পর বাড়ি যাচ্ছি।
.
.
আমার বোনটা হাসছে।
এই হাসিটার জন্য দুনিয়ার সব কাজ করতে রাজী আছি আমি। .
.
.
আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে আমার বোন।
আমার কলিজা।
আমার পকেট খরচের সব টাকা জমিয়ে আমি আমার বোনের জন্য খেলনা কিনতাম।
যদিও বাবা না করত।
তবুও।
ও হ্যা আমার বোনের নামই তো বলা হয় নি।
ওর নাম রেখেছিলাম আমি।
ওর সম্পূর্ন নাম
"তাহসীন নাবিহা মিথি"
.
.
এখন আমার বোন হাটতে পারে।
বেশি না একটু একটু।
.
.
তারিখটা ২৮ অক্টোবর
আমার বোন আমাকে প্রথমবার ভাইয়া বলেছে।
আসলে ভাইয়া তো স্পস্ট করে বলতে পারে না।
উচ্চারনটা ছিল আইয়া।
.
তবুও তো ডেকেছে।
.
.
আজ আমার বোনের ৪ বৎসর পূর্ন হল।
আমার এসএসসি পরীক্ষাও শুরু হল আজ থেকে।
ওর কারনে আমি একটু মোবাইলে কথাও বলতে পারি না।
সোজা আম্মুর কাছে গিয়ে কমপ্লেন করে।
আর আম্মু চিল্লায় আমার উপর।
আর সে দাত বের করে হাসে।
.
তখন কি যে করতে মন চায়।
তবে আমার বোনটা আমার জন্য অনেক লাকী।
.
যেদিন ওর কপালে চুমু দিয়ে কোন কাজে বের হই
সেই কাজে আমি সফল হবই।।
.
.
আমার বোনটা আমাকে ভাইয়ু বলে ডাকে।
আর আমার মা আমাদের দুই ভাই বোনকে টম এন্ড জেরি বলে ডাকে।
.
.
সেই থেকে ও আমাকে টম ভাইয়ু বলে ডাকে আর আমি ওকে জেরি আপু বলে ডাকি।
.
.
এরই মধ্যে আমার পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়।
আমি A+ পাই।
তারপর কলেজে ভর্তি হইল।
সরকারি পলিটেকনিক এ আমার চান্স হয়। সুদুর চট্টগ্রাম।
.
সেখানে কি করে থাকব আমি আমার বোনটাকে ছেড়ে
আমি কিছুতেই ভাবতে পারছিলাম না।
চোখদুটো ঝাপসা হয়ে আসছিল।
.
.
কাল চলে যাব চট্টগ্রাম।
রাতে ঘরে বসে বসে ভাবছি
কিভাবে থাকব বোনটাকে ছেড়ে।?
আমার কলিজাকে ছেড়ে আমি কখনোই যে থাকি নি।
.
.
ওইসময় আমার বোনটা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে।
আর বলে ...
>কালকে তুমি চলে যাবে ভাইয়া?(মিথি)
>হ্যা রে বোন। (কথাটা বলা মাত্রই আমার চোখ দিয়ে
দুইফোটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ে)
>ভাইয়া কেদ না। তুমি ভাল করে পড়বে।
>হুুম।
>আমার জন্য চিন্তা কর না আমি ভাল থাকব।
তোমাকে একটু মিস করব। বেশি না তো একটু।
(ওর চোখে জল টলমল করছে। যেকোন সময় বৃষ্টি ঝড়বে)
>একটু? হুুম একটু?
>হুুম।
(এই বলে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কেদে দেয়। )
.
.
.
আমিও নিজের চোখের জল আটকাতে পারি নি।
আমাদের দুইজনের অবস্থা দেখে বাবা মা ও কেদে দেয়।
.
.
.
হুুম। এখন সকাল। চট্টগ্রামের ট্রেনে উঠবি একটু পরে।
এই পিচ্চি মেয়েটা আমাকে বোঝাচ্ছে।
ভাইয়া ভাল করে পড়বে।
তোমার জন্য না আমার জন্য।
আমি যখন বড় হয়ে ডাক্তার হব তখন তো অনেক টাকার
দরকার পড়বে। ভাল করে না পড়লে ভাল চাকরি পাবে না।
আর টাকাও পাবে না। পরে আমি ডাক্তার কিভাবে হব?
আর তুমিও একটা সুন্দর বউ পাবে না আর আমি ভাবী।
.
.
ওর লাস্ট কথাটা শুনে সবাই হেসে দিলাম।
ওকে বললাম
>ওরে আমার বুড়ি রে। কত বুঝে।
আচ্ছা আমি পড়ব।
আর তুমি আম্মুকে ডিস্টার্ব করবে না।
ঠিকমত স্কুলে যাবে।
দুষ্টামি করবে না।
আর ওই রুহানের সাথে ঝগড়া করবে না। (রুহান আমাদের
পাশের বাসায় থাকে)
>আমি আম্মুকে কখন ডিস্টার্ব করলাম?
আম্মু আমাকে ডিস্টার্ব করে।(মিথি)
>ওকে জেরি আপু
>ওকে টম ভাইয়া।
.
.
ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে।
যতটুকু দেখা যায় ততটুকু দেখলাম
আমাকে হাত নেড়ে টাটা জানাচ্ছে আর ওর চোখ দিয়ে
পানি পড়ছে।
আমারও তাই।
.
.
আমার কলিজার টুকরাকে রেখে আমি কিভাবে থাকব?
.
.
চট্টগ্রাম এসে কিছুই ভাল লাগছে না।
বার বার মিথির কথা মনে পড়ছে।
দুপুরের খাবারটাও খেতে পারলাম না।
কারন ওকে না খাইয়ে দিয়ে আমি কখনোই খাই না।
.
.
আর তখনই বাসা থেকে আম্মুর ফোন।
সাথে সাথে রিছিভ করলাম।
ওপাশ থেকে আমার বোন বলে উঠল
>ওই টম ভাইয়ু খাইছ?
>আমি তোমাকে না খাইয়িয়ে কখনো খেয়েছি?
>জানতাম। এইযে আমি খাচ্ছি। তুমিও খাও
>ওকে আপু।
আমি ফোনটা কেটে দিয়ে ভিডিও কল করলাম।
দেখলাম ও খাচ্ছে আর আমাকে বলছে তুমিও খাও। খেয়ে
শুয়ে থাক।
>ওকে ভাইয়া বলে কেটে দিলাম।
.
.
এভাবেই কাটতে লাগল দিন।
যখনই সময় পেতাম বাড়ি চলে যেতাম।
.
.
আমার বোনকে দেখার জন্য।
.
আস্তে আস্তে আমি আর ও ভিডিও কল করে কথা বলতাম।
তবুও বুকের মাঝে এক ধরনের শূন্যতা অনুভব করতাম।
কারন প্রতিদিন মিথি আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাত।
আর আজ দুইমাস হয়ে গেল আমার বোন আমার সাথে নেই।
.
.
আজ বাড়িতে যাচ্ছি।
অনেক গুলো চকলেট আর খেলনা ভর্তি আমার ব্যাগ।
.
.
বাড়িতে গিয়ে দেখি কেউ নেই।
আম্মুকে ফোন দিলাম বলল মিথি অসুস্থ তাই ডাক্তারের
কাছে এসেছে।।
অতঃপর আম্মু বাসায় আসল।
আর মিথি এসে ভাইয়ু বলে আমাকে জড়িয়ে ধরল।
ওর সাথে সময় কাটিয়ে ওকে ঘুম পাড়ালাম।
আর আম্মুর কাছে গিয়ে জিজ্জেস করলাম
>কি হয়েছে মিথির আম্মু?
>তেমন কিছু না। একটু মাথা ব্যাথা করছিল তাই ডাক্তার
দেখিয়ে আনলাম।
>ও আচ্ছা।
আর কথা না বাড়িয়ে আমার রুমে চলে আসলাম।
এসে মিথির চেহারার দিকে তাকিয়ে আছি।
অদ্ভুদ এক মায়া ওর চেহারাতে।
এমন সময় মিথি উঠে পড়ল আর আমাকে বলতে লাগল….
>এমনভাবে দেখছ যেন তোমার আপুকে কখনো দেখইনি।
আমি মনে হয় হারিয়ে যাব। (মিথি)
.
ওর কথা শুনে বুকের ভিতর ধক করে উঠল। একটা চিনচিন
ব্যাথা অনুভব করলাম।
সাথে সাথে ওকে জড়িয়ে ধরলাম আর বললাম এমন কথা
কখনোই যেন না বলে।
.
.
ও একটা হাসি দিয়ে বলল
কোথাও যাব না ভাইয়ু তোমাকে ছেড়ে।
.
.
আমার কলেজ এর ছুটি শেষ হওয়ার কারনে চলে আসলাম
চট্টগ্রাম।
এদিকে টিসির জন্য এপ্লাই করলাম।
যাতে বাড়ির কাছেই থাকতে পারি। আর আমার বোনকে
দেখতে পারি।
.
.
আমার পরীক্ষা চলছে। প্রথম সেমিষ্টার।
হঠাৎ একদিন দুপুরে আম্মুর ফোন।
শুধু বলল তুই তাড়াতাড়ি বাড়িতে আয়।
আর কিছু বলল না।
মায়ের কন্ঠটা অন্যরকম মনে হল।
ভাবলাম হয়তো বাবা বেশি অসুস্থ।
কারন বাবার শরীরটা কিছুদিন যাবৎ ভাল যাচ্ছিল না।
.
.
তাই পরীক্ষার মাঝখানে বন্ধ থাকায় সাথে সাথে বন্ধুকে
নিয়ে বাড়িতে চলে আসলাম।
ও অনেক আগেই আসতে চেয়েছিল আমার বোনকে দেখার
জন্য যার জন্য আমি এতো পাগল।
বিকাল ৪ টা নাগাদ বাড়িতে আসলাম।
এসে দেখি বাড়িতে পিনপতন নিরবতা। কেউ কিছু বলছে
না আমায়।
সবাই কাদছে।
কেমন যেন লাগছে পরিবেশটা আমার কাছে।
মিথি বলে দুইটা ডাক দিলাম কিন্তু ও আসছেনা।
যেখানে ১ ডাকেই ও চলে আসে আমার কাছে।
বাড়ির উঠোনে গিয়ে দেখি একটা ছোট লাশ।
হ্যা এই লাশটা আমার বোনেরই।
আজ সকালে স্কুল থেকে আসার সময় রোড এক্সিডেন্ট এ
মারা যায় আমার বোন।
যার জন্য আমি এতো কিছু করলাম
যার খুশির জন্য আমি দুনিয়ার সব ছাড়তে পারি আজ সে
আমাকে ছেড়েই চলে গেল না ফেরার দেশে।
এটা কল্পনাও করতে পারছি না আমি।
আমার চোখ দিয়ে শুধু পানি পড়ছে আমি আর কিছুই বলতে
পারি না।
আমি সেন্সলেস হয়ে গেলাম।
এখন রাত ৮ টা বসে আছি কবরের পাশে।
আমার বোনটাযে অন্ধকারকে খুব ভয় পায়।
আমি আমার জেরি আপুকে রেখে কোথায় যাব??
ফিরে আয়না আপু। একবার শুধু টম ভাইয়ু বলে ডাক দে।
আমার টিসি এসে গেছে। আমি এখন প্রতিদিনই ওর কবরটা
দেখি। যেটা কখনোই চাইনি।
.
{সমাপ্ত}
(জীবন থেকে নেওয়া)

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.