| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
রমিজ যে অফিসে কাজ করে সেখানে কোন এক বিদেশী মহিলা যেনো এসেছে। সবাই তাকে নিয়ে দারুণ ব্যস্ত। অফিসটা ছোটখাটো একটা এনজিও, শুনেছে বিদেশীদের সাথে কি কি সব লেনদেন জানি থাকে এদের। রমিজ নিচের দিকের মানুষ এতো শত বুঝে তার কাজ কি!
এই বিদেশীগুলার কাজকর্ম সবসময়ই তার কাছে দুর্বোধ্য লাগে আজকের মহিলাটি এলো একগাদা ফুল নিয়ে। আফিসময় ঘুরে বেড়িয়ে সবাইকে ফুল বিলাতে লাগলো। সে হা হয়ে গেলো মহিলা যখন হেসে কীসব বলে তার হাতেও একটি গোলাপ ফুল ধরিয়ে দিলো। রমিজ ছোট পদের, অফিসে সবার ফুটফরমাশ ধরে, চা নাস্তা এনে খাওয়ায়। মাঝে মাঝে অফিসের আপাদের জন্য রিকশাও ডেকে আনে। এহেন গরীব মানুষ সে, তার কাছে এই ফুলের কি দাম!
ফুলের দিকে তাকিয়েই রমিজের মন ভালো হয়ে গেলো। রাস্তার পাশের ফুলের দোকানগুলির নেতিয়ে থাকা পানি ছিটিয়ে রাখা ফুল নয়, তরতাজা ফুল। চমৎকার রঙ, আর কি মিষ্টি গন্ধ! এই ফুলগুলি মন ভালো করা ফুল!
মনে মনে ভেবে নিলো বাসায় ফিরে কোন কথা না বলে জেসমিনের হাতে গুঁজে দিবে চমৎকার ফুলগুলো। জেসমিন তার বউ। কল্পনা করতে লাগলো ফুলটা হাতে নিয়ে কেমন লজ্জা পাবে মেয়েটা। প্রথমে অবশ্য অবাক হয়ে চেয়ে থাকবে কিছুক্ষণ। রমিজ মানুষটা এতো রোমান্টিক নাহ। কাজের কথা ছাড়া খুব বেশী আহ্লাদী কথা বলা হয়না বউটার সাথে; বরং প্রায়ই ধমক খায় বোকাসোকা মেয়েটা। এমন ইট-কাঠ-পাথরের মানুষটার হাত থেকে ফুল নিতে লজ্জায় মাথাই তুলতে পারবেনা হয়ত! লজ্জায় লাল হয়ে কপট সুর চড়িয়ে বলবে, “এগুলা কি তামাশা করেন? রঙ্গ করনের দিন আছে আমগো?” রমিজও অভিনয় কম জানেনা, “তাইলে ফেইল্লা দেও। মাইনষের শখের কোন দাম নাই কারো কাছে য্যান!” জেসমিন হয়ত হাতটাই ধরে ফেলবে, “আহারে, মানুষটার খুব গোস্যা হইসে!” রমিজ হাতটা আরও শক্ত করে ধরে হেসে ফেলবে; “তাইলে দেও, খোঁপায় লাগায়া দেই!”
বলতে বলতে রমিজ এখনই হেসে দিলো। তার বাসার সরু গলিটা চলে এসেছে। গলির মাথায়ই সারি সারি টিনের ঘর। তারই একটাতে সংসার তার। ছোট একটা বাসা, আলাদা রান্নাঘর নেই। এক কোনায় বউটা ঘামতে ঘামতে রান্না করে। টাকা জমিয়ে একটা চার্জের ফ্যান কিনবে ভেবেছিলো, কিন্তু সেই টাকা আর জমেনা!!
জেসমিন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। “ফুলের কাম কি? ফুল পাইলেন কই?” রমিজের মুখে কথা আসে না, “আরে বিদিশীগুলান পাগল সব। ফুল দিসে সবডিরে। আরে দিবি খাওনের কিছু দে, দিছে ফুল। এডি দিয়া কি প্যাট ভরে নি?” জেসমিন কিন্তু মুগ্ধ; “ফুলটা কি সোন্দর দেখসেন?”
আসার সময় করা কল্পনাগুলি সব দলা পাকিয়ে যায় গলায়। নিম্মবিত্তের ছেঁড়া কাঁথায় প্রেম ঢাকা পড়ে যায়। উঁচু তারে বাঁধা সংলাপ, গলা কাঁপানো কোন প্রেমের কথা, রহস্যময়ী হাসি-কান্না তার কুটিরের সরুতম গলিতে ঢুকতে পারে না!! অভ্যস্ত দারিদ্র্যের বিকর্ষণে বাঁধা পড়ে যায় অনভ্যস্ত প্রেমময় হাত! বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে ফুলটা বিছানার উপর রেখে গামছাটা নিয়ে বেড়িয়ে যায়।
মনটাই খারাপ হয়ে যায় রমিজের। কি এমন হতো আদর মাখানো হাতে ফুলটা জেসমিনের খোঁপায় পরিয়ে দিলে? কি ক্ষতি হতো ফুলের শরীরজুড়ে তার মায়াবতী বউটার গায়ের গন্ধ মাখিয়ে দিলে!
নিজেকে নিরেট পাথর মনে হয়।
ফিরে এসে দেখে ফুলটা একটা ছোট পটে পানি দিয়ে রেখেছে জেসমিন। মনটা আরও খারাপ হয়ে যায়। নীরবে খেয়ে শুয়ে পড়ে দুজনেই।
মুখের ওপর চাঁদের আলো পড়ায় মনে পড়লো টিনের চালের বড় ফুটোগুলো ঠিক করা হয়নি। বর্ষার আগেই মেরামত করে ফেলতে হবে। কিছু টাকা বেরিয়ে যাবে। কিন্তু চাঁদের আলোয় কোন একটা ব্যাপার আছে। মন ভালো হয়ে যায় দেখলে, সেই ফুলটার মতো। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে টিনের ফাঁকটা খুব দরকার ছিলো। মরচে পড়া টিনের ফাঁকে চাঁদের অপার্থিব রূপ দেখার সৌভাগ্য ক’জনের হয়!
চোখের কোণ দিয়ে জেসমিনের দিকে তাকিয়ে রমিজ অবাক হয়ে দেখল, যে ফুল নিয়ে দুজনের এতো অস্বস্তি প্রকৃতি গাঢ়তম মমতায় সেই ফুল জেসমিনের খোঁপায় পরিয়ে দিয়েছে, সেই ফুল ভাঙ্গা টিনের ফাঁক দিয়ে ঢোকা চাঁদের ফুল, জোছনার ফুল!!
চোখে পানি চলে এলো তার। তাড়াহুড়া করে চোখটা মুছে ফেলতে চেষ্টা করল, বড্ড অনভ্যস্ত চোখগুলা! ঘুমের ঘোরে পাশ ফেরার ভাণ করে আলতো করে মায়াভরা হাতটা তুলে দিলো বউটার হাতে! জেসমিন জেগেই ছিল, এবার তার চোখে ভেঙ্গে পড়লো সুখের আশ্চর্য তরল! দুজনের চোখই ফুলের দিকে; একজন দেখছে প্রকৃতির সুন্দরতম উপহার জোছনার ফুল, আরেকজনের চোখ তার নিজস্ব পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষটার লজ্জা মাখা ফুলে! জগতের সবচেয়ে ভারী মুগ্ধতা এসে ভর করে সেই চোখে!!
অগুনতি নক্ষত্রবীথি, গলিত রূপার মতো চাঁদের আলো, নারকেল গাছের পাতার ফাঁকে শিষ দিয়ে যাওয়া বাতাস, কোরাস গাওয়া ঝিঁঝিঁগুলো আর হাসনাহেনার সুগন্ধি চাদর ঘিরে রেখেছে এই রহস্যময় সময়ের চারপাশটা! সবাই মিলে চাইছে এই সহজ কিন্তু শুদ্ধতম ভালোবাসাগুলো বেঁচে থাকুক আরও বহুদিন, অনন্তকাল!!
এই সরল সম্পর্কগুলিতে নিত্য কমা আসে, সেমিকোলন আসে, কিন্তু কখনও দাঁড়ি পড়েনা!!
তোমাদের জন্যই ভালোবাসা!!
©somewhere in net ltd.