| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আবহমানবাংলা
যতদূর চোখ যায় অশ্রু ও আগুনের গহণ অরণ্যে......
বুয়াজিজি’র শরীর এদেশেও জ্বলছে!
“বন্ধুরা, আমি এমন একটি অপরাধ করতে যাচ্ছি,
যা আমার পরিবার, আইন ও ধর্মের বিরুদ্ধে।
আমি রেললাইনের ওপর শুয়ে আছি। ট্রেন আসছে।
এই
হতচ্ছাড়া নিজেকে দূরে সরিয়ে দিতে যাচ্ছি,
যে অপদার্থ কিনা শুধু খেতেই জানে।
আমি একটা কমেন্ট লিখেছিলাম, আমার
যেতে হবে। তারপর তোমাদের কেউ একজন
জানতে চেয়েছো, কোথা থেকে কোথায়
যাচ্ছো? আমি জানি আমি কোথায় যাচ্ছি।
কিন্তু আমি যাচ্ছি। এই
অকর্মা নিজেকে ছেড়ে যাচ্ছি। বিদায়, বিদায়
চিরতরে। মহান আল্লাহ তোমাদের সবার মঙ্গল
করুন।”
এটাই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল
বিভাগের মাস্টার্স পরীক্ষার্থী মাহবুব
শাহীনের শেষ স্ট্যাটাস
(ইংরেজি থেকে অনূদিত)। মঙ্গলবার রাত
সাড়ে আটটার দিকে যার লাশ পাওয়া গেল
খিলগাঁও রেলগেট কাঁচাবাজারের পাশের
রেললাইনে। ধারণা করা হচ্ছে ওই
রেললাইনে শুয়েই শেষ
স্ট্যাটাসটি লিখেছিলেন তিনি।
শাহীনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত
করে ঢাকা রেলওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই)
মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, “শাহীনের
পকেটে চারটি চিঠি পাওয়া গেছে। ওই
চিঠিতে তার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়
এমনটা লিখেছে সে।”
মাহবুব শাহীনের বাড়ি গোপালগঞ্জের
মোকসেদপুর থানার মুনিরকান্দি গ্রামে।
ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেখার পরপরই শাহীনের
বন্ধুবান্ধবরা তার
সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে।
কিন্তু তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
সোমবার রাত সাড়ে আটটার দিকে স্থানীয়
ক্রসিং মাস্টার মরদেহটি দেখতে পান। এরপর
তিনি কমলাপুর রেলওয়ের স্টেশন
মাস্টারকে ফোন করে বিষয়টি অবহিত করেন।
ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে মাহবুব শাহীনের লাশ
উদ্ধার করে এবং তার পকেটে থাকা চিঠির সূত্র
ধরে তার পরিবারকে বিষয়টি জানায়। পুলিশের
মতে, ঢাকা থেকে দিনাজপুরগামী ট্রেনেই
কাটা পড়েন শাহীন।
খবর পেয়েই রেলওয়ে থানায় ছুটে যায় শাহীনের
কয়েকজন সহপাঠী। আত্মহত্যার খবরে তাদের কেউ
কেউ বিস্ময় প্রকাশ করে। শাহীনের বড় ভাই
শরীফুল ইসলাম জানান, আত্মহত্যা করার
মতো কোনো অবস্থা হয়েছিল
বলে তারা মনে করেন না। তবে মাস্টার্স
ফাইনাল দেওয়ার পর চাকরি নিয়ে তার ভেতর
হতাশা ছিল অনেক। আর এই হতাশাই
তাকে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য
করেছে বলে ধারণা বন্ধুদেরও।
শাহীনের পকেটে প্রায় দুই হাজার
টাকা পাওয়া গেছে।
একটি চিঠিতে সে লিখেছে, ওই
টাকা দিয়ে যাতে তার লাশটাকে আঞ্জুমান
মুফিদুলে দাফনের কাজে ব্যয় করা হয়।
আরেকটি চিঠিতে শাহীন তার বন্ধু ডাক্তার
রোমানের নাম উল্লেখ করে জানায়, ওই বন্ধুর
কাছে তার ৪০ হাজার টাকা দেনা রয়েছে। আজ
শাহীনের মরদেহ তার গ্রামের
বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।
উচ্চশিক্ষিত বেকার যুবক মোহামেদ
বুয়াজিজি (২৬) শিক্ষা জীবন সমাপন
ঘটিয়ে অনেক চেষ্টা করেও বেঁচে থাকার
মতো সামান্য একটি চাকরি যোগাড় করতে ব্যর্থ
হন। উপায়ন্তর না দেখে তিনি তিউনিশিয়ার
একটি বাজারে সবজি বিক্রি শুরু করেন।
সবজি বিক্রি করে তার আয়-রোজগার ভালোই
হচ্ছিল। কিন্তু এটা সে দেশের সরকারের পছন্দ
হয়নি। সরকার তার ব্যবসা বন্ধ করে দেন।
ফলে বুয়াজিজি চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু
করেন। কিন্তিু তিনি দমে যাবার পাত্র নন।
সরকারের এই অমানবিক আচরণের
প্রতিবাদে বুয়াজিজি নিজেরে গায়ে আগুন
লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। তার এই
আত্মাহুতি তিউনিশিয়ায়
জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলে।
বুয়াজিজি অচিরেই তিউনিসিয়ার ৩০ শতাংশ
শিক্ষিত বেকার যুবকের প্রতিনিধিতে পরিণত
হন। তার আত্মাহুতি দিকে দিকে বিদ্রোহের
আগুন জ্বেলে দেয়। এই আগুনে পুড়ে ছারখার
হয়ে যায় তিউনিশিয়ার একনায়ক দু’দশকেরও
বেশি সময়
ধরে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা প্রেসিডেন্ট জাইন
আল-আবেদি বেন আলির সোনার সিংহাসন। এক
পর্যায়ে তিনি ক্ষমতা ছেড়ে সৌদি আরবে পলিয়ে যেতে বাধ্য
হন। বুয়াজিজির আত্মত্যাগ শুধু তিউনিশিয়ায়
রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তন করেনি গোটা আরব
বিশ্বের রাজনীতিতে বিরাট
ঝাঁকুনি দিয়েছে। তারাই প্রভাবে মধ্যপ্রচ্যের
দেশে দেশে বইছে গণতন্ত্র জোয়ার। কিছুদিন
আগেও যেখানে গণতন্ত্র ছিল স্বপ্নের মতো আজ
সেখানেই বইতে শুরু করেছে গণতন্ত্রের সুবাতাস।
বুয়াজিজি’র শরীরের ওই আগুনের
তাপে পুড়ে যায় বিন আলী’র মসনদ।
বিক্ষোভে ফেটে পড়ে পুরো তিউনিশিয়া।
মাত্র একমাসের মাথায়
ক্ষমতা থেকে নেমে যেতে বাধ্য হন
তিউনিশিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জয়নাল
আবেদিন বিন আলী।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক নীতিনির্ধারকরা ভাবতেই
পারেননি বুয়াজিজির শরীরের আগুন
দাবানলের মতো এতটা দূর ছড়িয়ে যাবে। কারণ
তিউনিশিয়ার এই বিপ্লবের
ছোয়া লাগে মিসরে। অভ্যূত্থান সামাল
দিতে না পেরে ক্ষমতা ত্যাগ করতে বাধ্য হন
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা হোসনী মোবারক।
সেই জাগরনের ঢেউ গিয়ে লাগল মিশর,
সিরিয়া, লিবিয়াসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে।
লেখক : হাসান
©somewhere in net ltd.