নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

গণতন্ত্র এবং মানুষ

ৰোহিতাশ্ব

তাসে ধানের শব্দ শুনিয়াছি, - ঝরিতেছে ধীরে ধীরে অপরাহ্ন ভরে; সোনালী রোদের রঙ দেখিয়াছি, - দেহের প্রথম কোন প্রেমের মতন রূপ তার - এলোচুল ছড়ায়ে রেখেছে ঢেকে গুঢ় রূপ - আনারস বন

ৰোহিতাশ্ব › বিস্তারিত পোস্টঃ

হোস্টেল : যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়

০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ দুপুর ১:৩৭

আমি এখন যেই মজার ঘটনার কথা বলছি তক্ষন আমি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাষ্টার্স ডিগ্রীর দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি। আমি আবাসিক ছাত্রদের জন্যে বরাদ্দ হোস্টেল এ থাকতাম অনাধিকার ভাবে। কারণ আমার জন্যে কোনো হোস্টেল রুম বরাদ্দ ছিল না। কিন্তু ফাইনাল ইয়ারের প্রজেক্টের কাজের জন্যে আমাকে মাঝে মধ্যেই হোস্টেল এ থাকতে হত। আর তাছাড়া হোস্টেলের কিছু ক্লাসমেট ও জুনিয়র ছাত্রদের ভালোবাসা উপেক্ষা করা এত সহজ ছিল না। আমাদের হোস্টেল ছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকেন্ড ক্যাম্পাসে, মানে সল্টলেক ক্যাম্পাস। সে এক অভূতপূর্ব পরিবেশ ওই তরুণ ছাত্রদের জন্যে। কারণ সিএবি গ্রাউন্ড এ প্রায় আমরা দেখতে পেতাম ইন্ডিয়া সফরে আসা বিদেশী ক্রিকেট টিম গুলির অনুশীলণ। সৌরভ গাঙ্গুলী , রিকি পন্টিং থেকে শুরু করে হার্শেল গিবস, মুরলীধরণ আরো যে কত বিখ্যাত সব প্লেয়ার দেখেছি চোখের সামনে তা বলে শেষ হবে না। এই সিএবি গ্রাউন্ড নিয়ে একটা মজহার ঘটনার কথা বলবো তাই এখানে এই মাঠের কথা উল্লেখ করলাম।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিক পশে ছিল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ফ্যাশন টেকনোলজি , জুরিডিক্যাল ইউনিভার্সিটি, এছাড়া ছিল লেদার ইনস্টিটিউট এবং ডাব্লিউ বি পিডিসিএল এর অফিস।

আমাদের সমস্ত সিনিয়র জুনিয়র ছাত্রদের মধ্যে এই ফ্যাশন ইনস্টিটিউট এর ছাত্রীদের নিয়ে চূড়ান্ত অবসেশন ছিলো। আমাদের কোন কোন ছাত্র সফল ও হয়েছিল প্রেম নিবেদন করে। সেই সব সফল ছাত্রদের কে আমরা একটা সম্ভ্রমের চোখে দেখতাম এবং সেই সকল ছাত্রদের মধ্যে একটা গর্বের ব্যাপার ও কাজ করতো। এই প্রসঙ্গে জুরিডিক্যাল সায়েন্স ইউনিভার্সিটি এর নাম না নিলে এই ঘটনার বিবরণ অপূর্ণ থাকে। এক কোথায় ওই দুটি ইনস্টিটিউটের অপুরূপা সুন্দুরী মেয়েদের কে নিজের সঙ্গনী হিসাবে পেতে আমাদের মধ্যে একটা চাপা প্রতিযোগিতা চলতো। তবে কোনো বিশেষ কারণে নিজেকে ওই প্রতিযোগিতায় সামিল করতে পারি নি, সে সব কারণ এখানে অপ্রাসঙ্গিক তাই ওসব আর এখানে বলছি না।

এই রকম তিন জন জুনিয়র ছিল আমাদের, যারা অল্পবয়সের রঙ্গীন স্বপ্ন এর কথা উপযোক্ত ভাবে বলতে পারে নি তাদের পছন্দের মানুষ টিকে। এদের নাম কাল্পনিক ভাবে যথাক্রমে ধরে নেওয়া যাক এইরূপ , মনোজ , ভুট্টো এবং রানা। এর মধ্যে মনোজ এবং রানা ছিল ইঞ্জিনিরিং এ স্নাতকোত্তর বিভাগের ও ভুট্টো ছিল ইঞ্জিনারিং এর তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। এদের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল অপরিসীম এবং এরা প্রত্যেকেই অত্যন্ত মেধাবী। মনোজ এবং রানার পছন্দের মেয়ে দুইজন থাকত জুরোডিক্যাল সাইন্স ইনস্টিটিউটের হোস্টেলে এবং ভুট্টোর মানষ প্রেমিকা থাকতো ফ্যাশন ইনস্টিটিউটের হোস্টেলে। এই তিন জন বহুবার চেষ্টা করেছিল নিজেদের মনের কথা তাদের পছেন্দের মানুষটিকে জানতে , কিন্তু ঠিক সময়ে আসল কথা না বলে আজে বাজে বকে ঘরে এসে বসে থাকত। একটু আধটু গাঁজার দম যখন এদের মস্তিকের কোষ গুলিকে ধূমায়িত করতো তখন বোঝা যেত তেনাদের নিয়ে এদের অবসেশন এর লেভেল কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এবার সেই মজার ঘটনা এখানে বলছি।

সেবার শীত টা একটু জাঁকিয়ে পড়েছে ডিসেম্বর মাঝামাঝি। সেমেস্টার শেষ আমাদের , হোস্টেলের অনেক ছেলেই বাড়ি চলে গেছে, কিছু ছেলে রয়ে গেছে হোস্টেলে তাদের নিজেরদের কিছু ব্যাক্তিগত ব্যাপারে। আমি আর আমার দুই তিন জন বন্ধু ও ছিলাম হোস্টেলে প্রজেক্টের কাজের জন্যে সে সময় ,আর ছিল ওই তিন মুর্তি। ঐই রকম সময়ে আমরা এক শীতের রাতে আয়োজন করলাম ছোট একটা পিকনিকের হোস্টেলের ছাদে , যথারীতি ওই তিন জনের নিমন্ত্রণ রইলো। খাওয়া দাওয়া সারতে রাত্রি ১০ টা বাজলো। আমরা সবাই ছাদ থেকে চলে আসলাম, এল না ওই তিন জন। তাদের প্ল্যান একটু মহাদেবের আশীর্বাদ নেবে ছাদে বসে, এই আমরা জানতাম। সকাল বেলা আর তাদের আর দেখা পাই নি এবং সেটাকে গুরুত্ব দিয়েও ভাবি নি। এরপর তাদের দেখা পেয়েছিলাম সন্ধেবেলার দিকে এবং যা শুনলাম আগের রাতের ঘটনা তাতে খানিক স্তম্ভিত কিন্তু ঢের বেশি রোমাঞ্চক লেগেছিলো । শুনেছিলাম, আমরা ছাদ থেকে নেমে আসার পর ওই তিন জন বাবার প্রাসাদ (মানে গাঁজা ) বেশ ভালো ভাবেই গ্রহণ করেছিল। এরপর তারা ছাদ থেকে নেমে সোজা চলে যায় ঈস্টার্ন বাইপাসের এক ধাবা তে। সেখানে কিছু বিয়ার এর বোতলে চুমুক দেওয়ার পর তাদের একসাথে সকলের ইচ্ছে হয় যে তারা তাদের প্রেমপ্রস্তাব আজই করবে। যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। প্রথেমেই ভুট্টোর অনুরোধে তারা হাজির হয় ফ্যাশান ইনস্টিটিউটের হোস্টেলের সামনে। সেখানে পাঁচিল টপকে তিন জন ঢুকে পরে ইনস্টিটিউট ক্যাম্পাসের মধ্যে। সামান্য কুঁয়াশার মধ্যে এবং অনেক টা নিজেদের বেসামাল পায়ের উপর ভর করে যাওয়ার সময় একদল কুকুর তাদের দেখতে পেয়ে সমস্বরে চিৎকার করতে থাকে। আর মধ্যে ভুট্টো বলে ছেলেটি ভয় পেয়ে পালতে গেলে হোঁচট খেয়ে পড়ে এক সিকিউরিটি পোস্টের সামনে। ওদের ইনস্টিটিউটের এক ছাত্র তা দেখতে পেয়ে চিৎকার করে অন্য ছাত্রদের ডাকাডাকি শুরু করলে তিন জন আবার পাঁচিল টপকে পালিয়ে যায়। এরপর ওরা আসে কিছুক্ষন বসে থাকে সামনের রাস্তায় এক চায়ের দোকানে। রাত তখন ১২ টা বা ১ টা হবে। কিছুক্ষন এদিক ওদিক করার পর ওরা ঠিক করে মনোজ ও রানা যাবে জুরিডিক্যাল সায়েন্সের হোষ্টেলে। তিন অবিচ্ছেদ্য বন্ধু আবার শুরু করে তাদের দ্বিতীয় নৈশ অভিযান।

তিন জন পাঁচিল টপকে ভিতরে ঢোকার পর ঠিক করে ভুট্টো পাঁচিল ঘেঁষে ঘনো ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকবে এবং মনোজ ও রানা যাবে মেয়েদের হোস্টেলে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার যে মনোজ জানতো মেয়ে দুটির হোস্টেল রুম নম্বর। গুটি গুটি পায়ে মনোজ ও রানা এগোতে থাকতে নির্দষ্ট লক্ষ্যের দিকে আর ভুট্টো বসে পরে ঝোপের আড়ালে। উত্তজনায় বুক দুরু দুরু করতে থাকে দু জনের, ইনস্টিটিউটের বাগান থেকে ছিঁড়ে নেই গোটা দশেক গোলাপ। গোলাপের কাঁটায় চিরে যায় কিছু আঙ্গুল ও তার সাথে। এগোতে থাকে তারা, চারিদিকে কেও কোথায় নেই। বাগান ছাড়িয়ে , কলেজ ছাড়িয়ে তারা উঠে আসে হোস্টেলের মূল ফটকে। এরই মধ্যে ভুট্টো পড়েছে ঘুমিয়ে , আর কতক্ষনই বা চোখ খুলে রাখা যায় ? যাক যে , ইতিমধ্যে এক সিকিউরিটি গার্ড হোস্টেলের গ্রুন ফ্লোরের বাথরুম থেকে বেরিয়ে নিজের রুমের দিকে যেতে গেলে হঠাৎই মুখোমুখি হয় মনোজ ও রানার। কিছুক্ষন অপলক দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকার পর, ভূত দেখার মতো চমকে গিয়ে ফুঁ দিতে থাকে নিজের বাঁশি তে। চারিদিকে সব হৈ হৈ রবের সাথে জ্বলে উঠে থাকে সমস্ত হ্যালোজেন। ওরা দুজন পালতে গিয়ে, ভুট্টো কে খুঁজে না মেয়ে বিমর্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে পরে পাঁচিলের ধাড়ে। ধারা পরে ওরা দুজন , কিছুক্ষন ভুট্টো কে পাওয়া যায় ঝোপের পিছনে ঘুমন্ত অবস্থায়। প্রথমে উত্তেজিত ছাত্র ছাত্রীদের হাত থেকে ওদের রক্ষা করে ওই সিকিউরিটি গার্ডরাই। কিন্তু সমানে চলে থাকে প্রশ্ন , ওদের নাম, কোথায় থাকে, এখানে কেন এসেছে এসব। সব সোনার পর ওদের সিকিউরিটি অফিসার ফোন করে ওদের ইনস্টিটিউট রেজিস্ট্রার কে। রেজিস্ট্রার জানায় থানায় খবর দিতে এবং তিনি আসছেন। ঘটনার ১ ঘন্টা পর আসে পুলিশ ও রেজিস্ট্রার। পুলিশ ওদের থানায় নিয়ে গেলে , সব সোনার পর একটা জেনারেল ডাইরি করে এবং মুচলেখা নিয়ে ওদের ছেড়ে দেয় সকল ৮ টার দিকে । কিন্তু রেজিস্ট্রার এর রাগ যেন কিছুতেই কমে না , হয়তো কোনো কারনে খাপ্পা ছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি। রেজিস্ট্রার ইতিমধ্যে ফোন সব ঘটনা জানিয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ডীন অফ অকাডেমিক্স কে। তিনি আবার কইফেরত চেয়েছেন আমাদের হোস্টেল সুপারিন্ডেন্ট থেকে এবং ওই তিন ছাত্র কে নিতে অতি দ্রুত তার অফিসে আসতে বলেছেন।

যতদূর মনে পরে আর পরের ঘটনা টা এমন ছিল। তিন জন সকাল ১১ তা নাগাদ যখন ডীন অফিসে ঢোকে তখন সেখানে হোস্টেল সুপারিন্ডেন্ট, ওদের বিভাগীয় প্রধান এবং আরো কয়েকজন প্রফেসর ওই ঘটনা নিয়ে আলোচনা করছেন। সেখানে হোস্টেল সুপারিন্ডেন্ট আপ্রাণ বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে জুরিডিক্যাল সায়েন্স এর সিকিউরিটি ওদের জোর করে চায়ের দোকান থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছে এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কে ছোট করানোর জন্যে এটা নোংরা রাজনীতি। এই ব্যাখ্যা যে ডীন স্যারের পছন্দ হয়েছে এবং তিনি যে এইরকম এ কিছু আঁচ করেছিলেন তা তিনিও বোঝাতে চাইছেন বাকি অন্য প্রফেসরদের কে। ওদের নিজের নিজের বিভাগীয় প্রধান দরাজ সার্টিফিকেটে দিচ্ছেন তিন জন কে, খাসা ছেলে, মেধাবী ছেলে , মিথ্যে ষড়যন্ত্রের শিকার। আর এই দিকে মনোজ, রানা এবং ভুট্টো অবাক হয়ে নিজের গায়ে চিমটি কাটছে। কারো একটু আগেও ওদের ইউনিভার্সিটি থেকে রাষ্ট্রীকেট হওয়ার ভয়ে বুক ধুকপুক করছিলো, আর এখন তো নিজের কানেই যা শুনছে তাতে মনে হচ্ছে নিজেদের হ্যাং ওভার এখনো কাটে নি। ডীন স্যার ওনার অফিসে থানার পুলিশ অফিসার কে আসতে অনুরোধ করলেন এবং তাকেও বোঝালেন যে এই সব মিথ্যে কেস। ওই তিন জন ডীন অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা চলে যায় দক্ষিনেশ্বর মন্দিরে, সেখানে পূজা অর্চনা করে এদিক ওদিক ঘুরোঘুরি করে সন্ধ্যার দিকে ফিরে আসে হোস্টেল এ।

আমরা অবাক শুনে , কারুর কারুর আরো প্রশ্ন ওদের কাছে। রাতারাতি ওরা তিন জন ফেমাস পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই ঘটনা আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগের , ঘটনাটার আরো অনেক কিছুই ভুলে গেছি কিন্তু যা মনে আছে তাই দিয়ে একটু গুছিয়ে বলার চেষ্টা করলাম।


(গবেষক , আই আই ই এস টি - শিবপুর , ইন্ডিয়া )

বি :দ্রঃ এই গল্পের সমস্ত চরিত্র কাল্পনিক।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.