| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
উপন্যাস মূলত আধুনিক যুগের সাহিত্য। বাংলা উপন্যাসও আধুনিক কালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-’৯৪) রচিত দুর্গেশনন্দিনীর (১৮৬৫) মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করে। এরপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১), শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৮) এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘তিন বন্দ্যোপাধ্যায়’ খ্যাত তারাশঙ্কর, মানিক, বিভূতিভূষণ-এর হাতে বিষয়-বৈচিত্র্যে এবং প্রকরণশৈলীতে অভিনব মাত্রায় বিকশিত হয়ে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। ১৮৬৫ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলা উপন্যাস প্রায় দেড়শ’ বছরের পথ-পরিক্রমায় সাবালকত্ব অর্জন করেছে; এর ফলে বাংলা উপন্যাস এখন আত্মস্থ করে নিয়েছে মানব-জীবনের বিচিত্র ঘটনা, সমাজ-জীবনের নির্মোহ উপস্থাপন পদ্ধতি, রাষ্ট্র-জীবনের আলেখ্য কিভাবে চিত্রিত করতে হয়। এমনকি এ কালের বাংলা উপন্যাসে ধর্ম-দর্শন এবং আধুনিক মানুষের জটিল মন-মানসিকতার সংকট, তার যৌনজীবন, অস্তিত্ব-সংকট সবকিছুই বিধৃত হচ্ছে। এই বিবেচনায় বাংলা উপন্যাস তার নাবলকত্বের খোলস ছেড়ে সাবালক হয়ে উঠেছে সিদ্ধান্ত করা যায়। বাংলা উপন্যাস সাবালকত্ব অর্জন করেছে বটে; কিন্তু এখনো বাংলা সাহিত্যে পর্যন্ত লিও টলস্টয়ের ওয়্যার এ্যাণ্ড পীস, অ্যানা কারেনিনা কিংবা আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ওল্ড ম্যান এ্যাণ্ড দ্যা সীর মতো শক্তিশালী উপন্যাসের দেখা মেলেনি। আমরা বিশ্বাস করি অদূর ভবিষ্যতে এ ধরনের মহৎ উপন্যাস বাংলা সাহিত্যেও সৃষ্টি হবে। আমরা মনেপ্রাণে আরো বিশ্বাস করি একদনি অবশ্যই টলস্টয়, হেমিংওয়ে, জেমস জয়েস, ক্যামু, কাফকা’র মতো ঔপন্যাসিক-প্রতিভার জন্ম হবে এবং তাঁদের হাতে হয়তো বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের সেরা উপন্যাসটি রচিত হবে। এই দীর্ঘ গৌরচন্দ্রিকার মধ্য দিয়ে আমরা মূলত প্রবেশ করতে চেয়েছি শহীদ ইকবাল রচিত রাজনৈতিক চেতনা : বাংলাদেশের উপন্যাস শীর্ষক পি-এইচ.ডি. অভিসন্দর্ভের বিচার-বিশ্লেষণে। এ গবেষণা-গ্রন্থে গবেষক বাংলাদেশের (১৯৪৭ পরবর্তী বা দেশ-বিভাগ উত্তরকাল থেকে আরম্ভ করে ১৯৯৫ পর্যন্ত) সাহিত্যের ইতিহাসে রচিত উপন্যাসের নানা বিষয়-অনুষঙ্গের মধ্য থেকে রাজনৈতিক চেতনাজাত উপন্যাসগুলোর বিষয়-প্রকরণের বিচার-বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নে সচেষ্ট হয়েছেন। অর্থাৎ উপন্যাস সাহিত্যের নানামাত্রিক বিষয়বস্তুর মধ্য থেকে তিনি একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের অভ্যন্তরে দৃষ্টি দিয়েছেন।
বাংলা উপন্যাসের প্রায় দেড়শ’ বছরের পথ-পরিক্রমায় এতে যে রাজনীতি-চেতনার বিকাশ-বিবর্তন ঘটেছে তা খুঁজে দেখাই গবেষক শহীদ ইকবালের প্রধান লক্ষ ছিল। অতএব গবেষক একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ভিত্তিতে উপন্যাসের শ্রেণীকরণ করে নিয়ে সেই প্রেক্ষাপটে গবেষণাকর্ম পরিচালনা করেছেন। প্রাসঙ্গিকভাবে আমাদের স্মরণ করতে হয় বাংলাদেশের উপন্যাস নিয়ে এ যাবত গবেষণাকর্ম চিত্রটি কেমন। গবেষক শহীদ ইকবালের পূর্বে যাঁরা বাংলা উপন্যাস নিয়ে গবেষণা করেছেন, তাঁদের গবেষণাকর্মের তালিকাটি নিম্নরূপ :
ক. মনসুর মুসা পূর্ববাঙলার উপন্যাস
খ. মুহম্মদ ইদ্রিস আলী এক. বাংলাদেশের উপন্যাস-সাহিত্যে মধ্যবিত্ত শ্রেণী; দুই. আমাদের উপন্যাসের বিষয়-চেতানা : বিভাগোত্তর কাল
গ. সৈয়দ আকরম হোসেন বাংলাদেশের সাহিত্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
ঘ. আকিমুন রহমান আধুনিক বাংলা উপন্যাসে বাস্তবতার স্বরূপ : ১৯২০-৫০
ঙ. ভূঁইয়া ইকবাল বাংলাদেশের উপন্যাসে সমাজচিত্র : ১৯৪৭-৭১
চ. বিশ্বজিৎ ঘোষ বাংলাদেশের সাহিত্য
ছ. রফিকউল্লাহ খান বাংলাদেশের উপন্যাস : বিষয় ও শিল্পরূপ
জ. নাজমা জেসমিন চৌধুরী বাংলা উপন্যাস ও রাজনীতি
এসব গবেষণাকর্মের তালিকা থেকে একথা প্রতীয়মান হয় যে, শহীদ ইকবালের রাজনৈতিক চেতনা : বাংলাদেশের উপন্যাস শীর্ষক গবেষণাকর্মটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের ইতিহাসে নতুনমাত্রা সংযোজন করেছে।
শহীদ ইকবালের রাজনৈতিক চেতনা : বাংলাদেশের উপন্যাস অভিসন্দর্ভ-গ্রন্থটির অধ্যায় পরিকল্পনা সুবিন্যস্ত এবং ধারাবাহিক পরম্পরায় গতিষ্মান। এর প্রথম অধ্যায়ে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিক পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একাত্তর সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ সময়ের ঘটনা-পরম্পরার সার-সংক্ষেপ তুলে ধরে তার আলোকে তাঁর বিষয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ উপন্যাসগুলোর বিষয়-চেতনা এবং প্রকরণশৈলীল মূল্যায়নে অগ্রসর হয়েছেন। ফলে অভিসন্দর্ভের অন্তর্ভুক্ত উপন্যাসগুলোর ঐতিহাসিক, সামাজিক তথা রাজনৈতিক ঘটনাসূত্রের কার্যকারণ নির্ধারণ ও চিহ্নিত করা পাঠকের পক্ষে সহজতর হয়েছে।
দ্বিতীয় অধ্যায় ‘বাংলা উপন্যাস : রাজনৈতিক উত্তরাধিকার’। এ অধ্যায়ে বাংলাদেশের উপন্যাসে চিত্রিত রাজনৈতিক চেতনার পূর্ব-প্রেক্ষাপট হিসেবে লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে আরম্ভ করে তিন বন্দ্যোপাধ্যায়সহ নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত সময়ের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরার প্রয়াস গ্রহণ করেছেন। গবেষণাকর্মে শহীদ ইকবালের এ ধরনের বিষয়বস্তুর প্রেক্ষাপট এবং তার সূত্রানুসন্ধান করার বিষয়টি প্রশংসার দাবিদার। দ্বিতীয় অধ্যায়টিকে এ গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ের ভূমিকা বা পটভূমি হিসেবে গ্রহণ করতে আপত্তি থাকে না। তৃতীয় অধ্যায়ের মুখবন্ধ হিসেবে গবেষক তৃতীয় অধ্যায়ে সাতচল্লিশোত্তর সময়ে রচিত রাজনীতি-চেতনাপুষ্ট উপন্যাসগুলোর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সাথে সাথে পাঠককে উপন্যাসের শিল্পিত-সত্যের মুখোমুখিও দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। যেখানে দাঁড়িয়ে পাঠক সূর্যদীঘল বাড়ী, আদিগন্ত, ক্ষুধা ও আশা, সংশপ্তক, অনেক সূর্যের আশা, নোঙর, পদচিহ্ন, নাড়ী-সন্ধানী, আরেক ফাল্গুন, অগ্নিসাক্ষী, উত্তরণ, বিধ্বস্ত রোদের ঢেউ, দক্ষিনায়নের দিন (ত্রয়ী), কুলায় স্রোত, পূর্বরাত্রি পূর্বদিন, যাপিত জীবন, চিলেকোঠার সেপাই, সাদা কুয়াশার পাখি, গায়ত্রীন্ধ্যা (ত্রয়ী) প্রভৃতি উপন্যাসের রাজনীতি-চেতনার শিল্পিত প্রকাশ বিষয়ে সম্যক অবহিত হতে পারেন। গবেষকের এই বিশ্লেষণ পরিক্রমায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে; স্বল্প-সংখ্যক উপন্যাস নির্বাচনে পাঠকের মনে হয়তো কিছুটা অতৃপ্তি থেকে যায়। কেননা এ অধ্যায়ে আলোচিত হওয়ার মতো আরো অনেক উপন্যাস-ই ছিল; গবেষকের দৃষ্টিসীমার বাইরে থেকে যাওয়া এমন অনেক উপন্যাস-ই আছে যা সন্দেহাতীতরূপে বাংলা উপন্যাসে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। এক্ষেত্রে গবেষকের সীমাবদ্ধতা অস্বীকার করবার উপায় নেই। তবে একথাও সত্য যে, সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণাকর্ম সুনির্দিষ্ট এবং বিষয়ানুগ হতে হয়; গবেষককেও এক্ষেত্রে অনেক বিধি-বিধান ও নিষেধের মধ্যে থেকে এই দুরূহকর্মটি সম্পন্ন করতে হয়। তারপরও রাজনৈতিক চেতনা : বাংলাদেশের উপন্যাস গবেষণা-অভিসন্দর্ভে তিনি পৃথক একটি অধ্যায় রচনা করে একাত্তরের ‘মুক্তিযুদ্ধ’ বিষয়ক রাজনৈতিক চেতনার বীজ যেসব উপন্যাসে আছে সেগুলোও এর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
গবেষক শহীদ ইকবাল একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ সাপেক্ষে জাহান্নাম হইতে বিদায়, নেকড়ে অরণ্য, দুই সৈনিক, রাইফেল রোটি আওরাত, আমার যত গ্লানি, জলাঙ্গী, খাঁচায়, জীবন আমার বোন, যাত্রা, হাঙর নদী গ্রেনেড, নীল দংশন, নিষিদ্ধ লোবান, মৃগয়ায় কালক্ষেপ, ১৯৭১, অলাতচক্র, উপমহাদেশ সর্বমোট সতেরটি উপন্যাসের মূল্যায়ন করেছেন। এসব উপন্যাসের বিচার-বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গবেষক দেখিয়েছেন, কিভাবে ঐসব উপন্যাসে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং তদ্সংক্রান্ত রাজনীতির বিষয়াদি চিত্রিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক রাজনৈতিক উপন্যাস নির্বাচনকালে গবেষক বিশেষ একটি নীতি অনুসরণ করেছেন; তাঁর এই নীতি প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণযোগ্য একটি মন্তব্য করেছেন গ্রন্থের সমাপ্তিতে। যথা
... হয়তো এমন উপন্যাস আরো ছিল এবং এর আলোচনার পরিধি আরো বাড়ানো যেতো, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই চর্বিতচর্বনের আর প্রয়োজন মনে হয়নি। তবু কিছু উপন্যাস যে বাদ যায়নি সেটা বলা যাবে না। মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপকতা যেমন খুব বিশাল তেমনি এর তাৎপর্যও বহুমুখী। এমন উপন্যাস লেখা হবে একদিন তখন এ অধ্যায়ের আলোচিত উপন্যাসগুলোও হয়তো নেহাৎ উপন্যাসই মনে হবে। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখযোগ্য শিল্পসফল উপন্যাস যেহেতু এখনো লেখা হয়নি সেজন্য এ অধ্যায়ে যাঁদের আলোচনা এসেছে তারাই আমাদের বিবেচনা, অনুমান করি। [শহীদ ইকবাল, রাজনৈতিক চেতনা : বাংলাদেশের উপন্যাস, পৃ. ভূমিকা]
মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস রচনা বিষয়ে এ ধরনের ঢালাও মন্তব্যের সঙ্গে হয়তো অনেক পণ্ডিত-সমালোচকের বিরোধিতা থাকতে পারে তবে গবেষক এ কথার মধ্য দিয়ে গবেষণার ক্ষেত্র যেমন সীমায়িত করে নিয়েছেন। উপরন্তু মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মহৎ উপন্যাসের দৈন্যচিত্রও ফুটে উঠেছে। এজন্য তাঁর সাথে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করাও সঙ্গত মনে হয় না। কেননা স্বাধীনতার মতো মহৎ বিষয় অবলম্বনে এদেশে এখনো বিশ্বমানের কোনো উপন্যাস রচিত না হওয়া বাংলাদেশের সাহিত্য-পাঠকদের জন্য দুর্ভাগ্যও বটে। তারপরও সৈয়দ শামসুল হকের দ্বিতীয় দিনের কাহিনী; রিজিয়া রহমানের রক্তের অক্ষর; হুমায়ুন আহমদের আগুনের পরশমণি; শাহরিয়ার কবিরের একাত্তরের যীশু, পূর্বাপর ইত্যাদি উপন্যাস এ গবেষণাকর্মের অন্তর্ভুক্ত হলে তা আরো সমৃদ্ধ হতো।
শহীদ ইকবাল পঞ্চম অধ্যায়ে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক বাতাবরণে রচিত উপন্যাসের রাজনীতি-সচেতন উপন্যাসের সাহসী মূল্যায়নে প্রয়াসী হয়েছেন। এ অধ্যায়ে গবেষক ইকবাল বিশদভাবে যেসব উপন্যাস বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন সেগুলো হচ্ছে তিমি, ওদের জানিয়ে দাও, দিনযাপন, অপেক্ষা, ঈশানে অগ্নিদাহ, অন্ধকুপে জন্মোৎসব, প্রতিমা উপাখ্যান, বাড়ির নাম পান্থশাল। প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অস্থির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এই ৯টি উপন্যাসই বহন করে নি; এ প্রসঙ্গে তাঁর স্বীকারোক্তি ‘ছোট্ট এ অংশে সত্তর-আশি-নব্বইয়ের লেখকদের রাজনীতিচেতনা বিশ্লেষণের প্রয়াস। তবে এ অংশটি পূর্ণাঙ্গ নয়; কারণ বোধকরি যথার্থ উপন্যাস খুঁজে না পাওয়া।’[শহীদ ইকবাল, পৃ. ভূমিকা]
লেখকের এই স্বীকারোক্তির প্রথম অংশ স্বীকার করে নিতে দ্বিধা নেই। তাঁর অপূর্ণাঙ্গতা সম্পর্কে যে যুক্তি, তার সাথে পুরোপুরি আমরা একমত হতে পারি না; এজন্য যে সৈয়দ শামসুল হকের অন্তর্গত, ত্রাহি, স্মৃতিমেধ; আবদুশ শাকুরের ক্রাইসিস, উত্তর-দক্ষিণ সংলাপ; মইনুল আহসান সাবেরের অরক্ষিত জনপদ; ঝর্ণাদাশ পুরকায়স্থের বন্দী দিন বন্দী রাত্রি; রাজিয়া মজিদের শতাব্দীর সূর্যশিখা; আবদুল মান্নান সৈয়দের গভীর গভীরতর অসুখ; সুব্রত বড়ুয়ার গ্রহণের দিন প্রভৃতি উপন্যাস এ গবেষণাকর্মের অন্তর্ভুক্ত হলে নিঃসন্দেহে এটি সমৃদ্ধতর হতো। এ গ্রন্থের ষষ্ঠ অধ্যায়ে বাংলাদেশের উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মূল্যায়নে সচেষ্ট হয়েছেন; আর তা হচ্ছে ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং পুরাণের ব্যবহার প্রসঙ্গ। উপন্যাসে ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং পুরণের পুনর্নিমাণের মাধ্যমে ঔপন্যাসিকগণ কিভাবে রাজনীতির কথা বলেছেন তা পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। এ অধ্যায়ে গবেষক বাংলাদেশের উপন্যাসে ইতিহাস-ঐতিহ্য-পুরাণের অনুবর্তী রাজনীতি-সচেতন উপন্যাস হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন ক্রীতদাসের হাসি, ভাওয়ালগড়ের উপাখ্যান, নীল-রঙ-রক্ত, অভিশপ্ত নগরী, পাপের সন্তান, বিদ্রোহী কৈবর্ত, পদ্মা মেঘনা যমুনা, বং থেকে বাংলা, নীল ময়ূরের যৌবন, চাঁদবেনে, একাল চিরকাল, প্রদোষে প্রাকৃতজন, কালকেতু ও ফুল্লরা। ১৩টি উপন্যাস সংবলিত এ আলোচনাও যে সংক্ষিপ্ত ও সীমাবদ্ধ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ গ্রন্থের সপ্তম অধ্যায়টি পূর্বোক্ত সাতটি অধ্যায়ে আলোচিত উপন্যাসগুলোর প্রাকরণিক মূল্যায়ন নিয়ে। প্রকরণশৈলী পর্যালোচনা করতে গিয়ে গবেষক মন্তব্য করেন,
১৯৪৭-৭০ এবং ১৯৭১-৯৫ কালপর্বে সময় ও সমাজবাস্তবতার সাথে বাংলাদেশের উপন্যাস তার আঙ্গিক বদল করেছে। এক্ষেত্রে ঔপন্যাসিকরা চেতনাপ্রবাহ (ঝঃৎবধস পড়হপরড়ঁংহবংং) বা অস্তিত্ববাদের (ঊীরংঃবহঃরধষরংস) মত রীতিপদ্ধতির ব্যবহার করেছেন। অনেক [অনেকে] ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন করতে গিয়ে নতুন ভাষারীতির প্রয়োগ করেছেন। প্রদোষে প্রাকৃতজন কিংবা বং থেকে বাংলা এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। [শহীদ ইকবাল, পৃ. ২২৮]
সাহিত্য তত্ত্বের দিক থেকে মেনে নিতে হয়, সৃজনশীল সাহিত্যের কোনো শাখাই নির্দিষ্ট কোনো রীতিপদ্ধতি মেনে চলে না কিংবা চলতে বাধ্যও নয়। যুগের চাহিদা অনুযায়ী সাহিত্যিক তাঁর উপলব্ধি প্রকাশের ভাষা ও শৈলী নিজের মতো করেই আবিষ্কার করেন বা খুঁজে নেন। এ কারণে সাহিত্যের প্রকরণগত পর্যালোচনায় কোনো সমালোচকই কখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিতে পারেন না। শহীদ ইকবালও তা করেন নি। বরং বাংলাদেশের রাজনীতি-নির্ভর উপন্যাসগুলোর রচনারীতি (ঋড়ৎস) বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর অভিনবত্ব নির্দেশ করে তার সাথে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন মাত্র। এই পরিচয় প্রদান প্রসঙ্গে গবেষক ইকবাল সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতির সঙ্গে জীবনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত, গতিময়তা এবং রূপান্তরের কৃৎকৌশল আবিষ্কার করেছেন।
বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে একাত্তর পরবর্তী সময়ের উপন্যাসে নবতর গঠনশৈলী দেখা যায়; এ সময়ের উপন্যাসে বাঙালির জাতীয় ঐতিহ্যের অনুসন্ধান, ব্যক্তির অন্তর্বয়ন স্ফূটতর করে তুলতে ঔপন্যাসিকগণ পুরাণ-ইতিহাস-ঐতিহ্য, রূপক-প্রতীক প্রভৃতির অবারিত ব্যবহারে জীবনের বিপন্নতা ও সংকটের সমাধান খুঁজেছেন। ফলে বাংলাদেশের উপন্যাসে আঙ্গিক শৈলীর ক্ষেত্রে প্রতীকধর্মিতা, চিত্রময়তা এবং বাস্তবতার নিরিখে পরাবাস্তবতা ও অতিবাস্তবাস্তবতার শিল্পিত পরিচর্যা হয়েছে। উপন্যাসের এই নতুন প্রকরণের অবশ্যম্ভাবী অনুষঙ্গ চরিত্রের অন্তর্কথনধর্মিতা, কাহিনীতে বিবৃত সময়ঘটিত অসামঞ্জস্য এবং উল্লম্ফন প্রক্রিয়া। শহীদ ইকবাল এ গ্রন্থে উপন্যাসের প্রকরণ মূল্যায়নের স্বরূপটি আমরা দু’একটি উদহারণ সহযোগে বুঝে নিতে পারি। যেমন,
ক. সেলিনা হোসেন সুদক্ষ শিল্পিত স্বভাবে সমাজ-রাষ্ট্র-রাজনীতি এবং ইতিহাসকে যেভাবে গায়ত্রী সন্ধ্যা উপন্যাসে তুলে ধরেছেন, সেখানে এর চালিকা শক্তির আসন দখল করে নেয় ‘সময়’। গবেষক শহীদ ইকবাল তাই এ উপন্যাসের মূল্যায়নে যথার্থই বলেন, ‘উপন্যাসে ঘটনাপ্রবাহ জুড়ে নায়ক হয়ে যায় নিপীড়িত সময়; প্রবহমান রাজনীতি।’ অথচ গবেষক ইতিহাসের সেসব জীবন্ত পাত্রপাত্রী (ইলা মিত্র, সোমেন চন্দ, শহীদ সাবের প্রমুখ) এবং তাদের সময়-রাজনীতির বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে বিষয়ের গভীরে প্রবেশ না করে একটানা বলে যান ‘তেভাগা আন্দোলন’, ‘ইলা মিত্রের নির্যাতন’ এবং ‘রাজবন্দীদের অনশন ধর্মঘট’-এর কথা।
গায়ত্রী সন্ধ্যার মূল্যায়নে সম্ভবত ‘সময়’ (১৯৪৭-’৭৫ সাল পর্যন্ত) পরিক্রমাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ উপন্যাসের চরিত্রগুলোর পারস্পারিক সম্পর্ক, টানাপড়েন, সমাজ-আখ্যান প্রভৃতি ছাপিয়ে ইতিহাস বা ‘সময়’ যে নায়কের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে তা নিশ্চিত। অতএব গায়ত্রী সন্ধ্যার রাজনীতি বিশ্লেষণে গবেষক ‘সময়ে’র আরো গভীর দৃষ্টি দিতে পারতেন; ইতিহাস সাক্ষী দেয় ইলা মিত্রের নির্যাতন, কৃষকদের তেভাগা আন্দোলন কিংবা রাজবন্দীদের অনশন ধর্মঘটের কথা। অথচ এসব বিষয়ের গভীরে না ঢুকে জুলেখাকে নিয়ে বয়স্ক-বিমর্ষ আলী আহমদের রোমান্টিক মনোজগতের বিশ্লেষণে অধিকতর আগ্রহ দেখিয়েছেন। সময় এবং রাজনীতির অনুষঙ্গে ব্যক্তি-চরিত্রের এই মনোজাগতিক বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা ছিল না বলেই মনে হয়। উপন্যাসে বিধৃত ইতিহাস ছেঁকে রাজনীতির খোঁজ-খবর নিতে গিয়ে চরিত্রের অন্তর্জগতের কিংবা নস্টালজিয়াক্রন্ত চিন্তাচেতনার বিচার-বিশ্লেষণ-মূল্যায়ন হতেই পারে; তবে তা নিশ্চয় রাজনীতির অনুষঙ্গকে ছাপিয়ে নয়। অথচ গবেষক একই সময়ে সেলিনা হোসেনের যাপিত জীবন উপন্যাসের মূল্যায়নে নিরেট-নিরাবেগে এবং নির্মোহভঙ্গিতে চরিত্রগুলোর সাথে রাজনীতির সমীকরণ নিপুণ দক্ষতায় তুলে ধরেছেন।
খ. সৈয়দ শামসুল হকের নীল দংশন-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র নজরুল ইসলাম। তার এই নামগত বিড়াম্বনার দায়ভার বাঙালি জাতির অস্তিত্বকে বহন করার প্রবণতার মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিকের আরোপিত ভাবকল্পনার সুস্পষ্ট স্বাক্ষর রয়েছে। তারপরও ঔপন্যাসিক সৈয়দ হক উপন্যাসের আকাক্সিক্ষত অন্তর্বীক্ষাটি এঁকেছেন এবং তা স্বাতন্ত্র্যে উদ্ভাসিত। একইভাবে সৈয়দ শামসুল হকের নিষিদ্ধ লোবান-এর বিলকিস চরিত্রটি ঔপন্যাসিক কর্তৃক আরোপিত চেতনার ফসল। বিলকিসের সাহস অসম; সে একজন পাকিস্তানি মেজরকে হত্যা করার চেষ্টায় নিজেকে নাটকীয়ভাবে নিয়োজিত করেছে। ঔপন্যাসিকের এই কাহিনী-বিন্যাসের অন্তর্বীক্ষায় আছে আদর্শ; ঐতিহাসিক সূত্রানুসন্ধান প্রক্রিয়ায় সামাজিক এই উপরিসৌধের নির্মিতিরীতির যথার্থ সংজ্ঞায়ন প্রত্যাশা করেন পাঠক সমালোচকের নিকট। গবেষক শহীদ ইকবাল উপন্যাসের বিষয়বস্তুর দিকে মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিবদ্ধ করেছেন; কিন্তু তাঁর দৃষ্টি অন্তর্ভেদী হয়ে ওঠে নি।
অতএব গবেষক শহীদ ইকবাল নীল দংশন-এর নজরুল ইসলাম, নিষিদ্ধ লোবান¬-এর বিলকিস কিংবা গায়ত্রী সন্ধ্যার ইতিহাসের জীবন্ত মানুষগুলোর অন্তর্গত বিকাশ-বিবর্তন, রূপান্তর-পরিবর্তন বিচার-বিশ্লেষণের সূত্রে রাজনীতির সম্পৃক্ততা এবং মতাদর্শের উপরিসৌধের মূল্যায়নে বিষয়ে অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারতেন; এতে তাঁর গবেষণাকর্মটি আরো সমৃদ্ধ হয়ে উঠত।
উপন্যাসের মূল্যায়ন ও বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এসব তাত্ত্বিক ধারণা ব্যক্তিভেদে পৃথক হতে পারে এবং তা আপেক্ষিকও বটে; অর্থাৎ সমালোচক-গবেষক কোনো সৃষ্টিশীল রচনাকর্মের পূর্ণাবয়ব এককভাবে এক ফ্রেমে ভরে দিতে পারবেন, এরকম ভাবার অবকাশ নেই। এজন্য সমালোচনা-সাহিত্যে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত বা শেষকথা বলে কোনো কিছু নেই। কেননা ব্যক্তিভেদে টেক্সটের মূল্যায়ন সময় ভিন্ন হতে পারে, তাছাড়া পরিবর্তনশীল যুগ-পরিবেশ, ব্যক্তি-অভিজ্ঞতা, সমাজ-রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রভাবেও টেক্সেটের মূল্যায়ন পৃথক হতে পারে। শহীদ ইকবালের সার্থকতা এই যে, রাজনৈতিক চেতনা : বাংলাদেশের উপন্যাস গবেষণা-গ্রন্থে উপন্যাস বিচার-বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তরতরিয়ে বিষয়-সংশ্লিষ্ট রাজনীতি এবং চরিত্রের সাথে সেই রাজনীতির অবস্থান, সম্পর্ক নিরূপণ ও বর্ণনায় দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন।
রাজনৈতিক চেতনা : বাংলাদেশের উপন্যাস গ্রন্থটির মূল্যায়নে এর সার্থকতা বা ব্যর্থতার নিরিখে বলা যায়, বাংলাদেশের সাহিত্যে এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা-গ্রন্থের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের উপন্যাস-সাহিত্যের গবেষণায় শহীদ ইকবালের এই মূল্যায়ন নিঃসন্দেহে নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে। এর বিষয়বস্তু এবং উপন্যাস বিচার-বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নে লেখকের নিরপেক্ষ-নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি প্রসংশার দাবিদার। বাংলাদেশের উপন্যাস শাখার বিশাল ও বিস্তৃত বিষয়-উপাদানের মধ্য থেকে একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে সাবলীল একটি গবেষণা অভিসন্দর্ভ প্রণয়নের মাধ্যমে শহীদ ইকবাল বাংলাদেশের গবেষণা-সাহিত্যের শাখায় একটি নতুন প্রদীপ জ্বেলেছেন। আশাকরি এই প্রদীপের আলোয় উচ্চতর শ্রেণীর বিদ্যার্থী এবং গবেষক-শিক্ষকগণ উপকৃত হবেন।
গ্রন্থ-পরিচিতি :
ড. শহীদ ইকবাল, রাজনৈতিক চেতনা : বাংলাদেশের উপন্যাস, প্রথম প্রকাশ, ঢাকা : সাহিত্যিকা, ২০০৩
প্রচ্ছদ : গুপু ত্রিবেদী, গ্রন্থস্বত্ব : লেখক
পৃষ্ঠা- ২৫৬, মূল্য : ২০০ টাকা
১৭ ই মে, ২০০৯ দুপুর ১২:৪৯
অনুপম হাসান বলেছেন: আপনার ইংরেজি শব্দগুলো বড্ড বেশি খটমটে।
ইংরেজি শব্দগুলোর বাংলা ব্যবহার করলে বেশি ভালো হবে।
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
২|
২৩ শে মে, ২০০৯ সকাল ১১:৩৫
মাহবুব রশিদ বলেছেন: অক্সফোর্ড লিটারেরি ডিকসনারি আপনার জন্য জরুরি হয়ে গেছে।
আমি কেবল ডেফিনেশনের কয়েকটা ফ্রেজ ব্যাবহার করেছিলাম...
২৮ শে মে, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৩৭
অনুপম হাসান বলেছেন: মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।
©somewhere in net ltd.
১|
১৩ ই মে, ২০০৯ বিকাল ৪:৩১
মাহবুব রশিদ বলেছেন: বইটি সংগ্রহ করে পড়ে কিছু লেখাই সমিচীন বোধ করছি। আপনার সমালোচনার অনুরক্ত আমি, সে বিষয়ে বলার কিছু নেই। কিন্তু আপনার লেখা পড়ে যা মনে হচ্ছে, গবেষক ইলিয়াস-জহির-আজাদ পর্যন্ত আসেন নি।
তাই উপন্যাসে "মিংগলিং এ্যন্ড জুক্সটাপসিশন অব ফ্যান্টাস্টিক এ্যন্ড রিয়েলিটি","কুয়ালিটি অব ন্যারেশন",'স্কিলফুল শিফট অব টাইম" ইত্যাকার গুণ কিভাবে রাজনীতি সচেতন হয়ে উঠছে তা দেখানো যাবে না। উদাহরণঃ চিলেকোঠা,জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা,৫৬ হাজার বর্গমাইল।