নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

ছায়া নয়, আলো ...

আরমান আরজু

সত্য ও অসীমের পথে

আরমান আরজু › বিস্তারিত পোস্টঃ

ফিরিতপুর

১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:০৯

ছুটির দিন বিকেল বেলা বাসার ছোট্ট বারান্দাটিতে বসে আমি চা পান করি। আর কল্পনা করি আমার সামনে ছোট্ট একটি ফুলের বাগান। বাস্তবে ইট-পাথরের জঞ্জাল।
হঠাৎ কোত্থেকে একটি দোয়েল পাখি আমার বারান্দার রেলিংয়ে এসে বসলো। দোয়েলের ঠোঁটে ছোট্ট একটি গোলাপ ফুল। পাখিটি আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
- ফুলটি একটু ধরো তো।
আমি ধরলাম। দেখি দোয়েলটি ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছে যেন সে অনেক ক্লান্ত।
- তোমাকে ধন্যবাদ। আমি একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার উড়াল দেবো।
- তুমি কোত্থেকে আসছো?
- ফিরিতপুর।
- ফিরিতপুর? এটা আবার কোথায়? তুমি মনে হয় ভুল উচ্চারণ করছ। তুমি কি ফরিদপুর এর কথা বলছ?
- আরে নাহ। ফিরিতপুর। তোমরা একটু শুদ্ধ করে বলো পিরিত আর বেশি শুদ্ধ হলে প্রেম। আসলে তোমরা কুরআনকে বেশি শুদ্ধ করে পড়তে গিয়ে আল্লাহ প্রেম থেকে দূরে সরে গিয়েছো। উচ্চারণ, ব্যাকরণ এগুলোও মেনটেইন করতে হবে তবে প্রেমই হওয়া উচিত সব সম্পর্কের মূল। আল্লাহ শুদ্ধ উচ্চারণ দেখেন না, তিনি দেখেন মানুষের অন্তরের প্রেম। আমার প্রেয়সী কোথায় থাকে সেটা বিবেচ্য নয়, সে যেখানেই থাকে সেটা আমার জন্য প্রেমময় একটি স্থান। আমার জন্য কেন সব প্রেমিকের জন্যই প্রেয়সীর স্থানটি প্রেমময়। আমার প্রেয়সী তাদের আঞ্চলিক ভাষায় প্রেমকে ফিরিত বলে। তাই তাকে ভালোবেসে আমিও তার উচ্চারণেই বলি ফিরিতপুর। এবার বুঝেছো?
- বাহ্, হোয়াট এ লাভ! তা তোমাদের কত বছরের সম্পর্ক?
- এইতো আবার ভুল বললে, প্রেমের কি কোন বয়স আছে। আমি যখন প্রেয়সীর কাছে থাকি তখন সময়কে আমার কাছে স্থির মনে হয়। মনে হয় সময় যেন থেমে গেছে। আবার যখন দূরে চলে যাই মনে হয় অনন্তকাল আমি তার দেখা পাই না।
- তোমার প্রেয়সী বুঝি দেখতে খুব সুন্দর?
- আচ্ছা, তুমি কি আল্লাহকে দেখেছ?
- নাহ। তিনি কি দেখা দেন?
- দেখা দেন কি দেন না সেটা পরের বিষয়। তুমি তাঁকে দেখোনি। তুমি কি আল্লাহকে ভালোবাসো?
- এটা আবার কী প্রশ্ন করলে, আমার সৃষ্টিকর্তা, আমার পালনকর্তা। তাঁকে তো সবারই ভালোবাসা উচিত।
- এত প্যাঁচানো উত্তর আমার ভালো লাগেনা। তোমাকে প্রশ্ন করেছি তুমি তাঁকে ভালোবাসো কিনা?
- হ্যাঁ, ভালোবাসি।
- তুমি আল্লাহকে দেখোনি অথচ তাঁকে ভালোবাসো। না দেখে কি কাউকে ভালোবাসা যায়?

আমি চুপ।

- শোনো, যখন তোমার মনে হবে যে কোন সত্ত্বা তোমার পুরো শরীরে আষ্টেপৃষ্ঠে আছে তখনই কেবল তুমি তাকে ভালবাসবে। তাকে দেখো আর না-ই দেখো। সে কি সুন্দর না অসুন্দর সেটিও বিবেচ্য নয়। একটা কথা আছে না, যার নয়নে যারে লাগে ভালো। দুনিয়া তাকে কালো বললেও আমার চোখে আমার প্রেয়সী বিশ্বসুন্দরী কারণ সে আমার পুরো শরীরে মিশে আছে। আমি তো আমার ব্যাখ্যা দিলাম। এবার তুমি বলো তুমি আল্লাহকে কেন ভালোবাসো।
- আমি তাঁকে আমার পুরো শরীরে অনুভব করি।
- কীভাবে অনুভব করো?
- সেটা বলতে পারবো না, তবে অনুভব করি।
- তুমি মিথ্যে বলছো। আল্লাহকে পুরো শরীরে অনুভব করলে তোমার মাঝে একটা লক্ষণ ফুটে উঠত, সেটা দেখা যাচ্ছে না। এই যে, আমাকে দেখো, আমাকে দেখে তোমার কী মনে হচ্ছে, আমি কি স্বাভাবিক?
- তোমাকে বিধ্বস্ত লাগছে।
- লাগবেই তো, বিষ খেয়ে কেউ কি বাঁচার আশা করে? আমি প্রেয়সীর প্রেমের বিষ পান করেছি। দুনিয়ার একটা প্রেয়সীর প্রেম অথচ আমি মৃতপ্রায়। আল্লাহ প্রেম তো এর চেয়ে আরো কঠিন। তোমরা সব মিথ্যুক। তোমরা প্রেমের ভান করছ। তোমরা কেউ আসলে আল্লাহকে চাও না কিন্তু তার নেয়ামত ভোগ করতে চাও। তোমরা সব স্বার্থপর।

আমি আবারো চুপ।

- প্রেমের যখন এই পরিণতি তবে প্রেমে জড়ালে কেন?
- তুমিও এ কথা বলছ? প্রেম কি বলে কয়ে আসে? জোর করে কি প্রেম হয়? প্রেম স্বর্গীয়। সূরা ইমরানে আল্লাহ কি বলেননি, 'তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাসতে চাও'। বাকিটা আর বললাম না। প্রভুর কথা কি বুঝেছো। তিনি তোমাদের ভালবাসা চান। তোমাদের এই সস্তা ইবাদতের দাম তাঁর কাছে কানাকড়ি। তিনি প্রেমের কাঙ্গাল। তিনি তো একাই ছিলেন, নিরালায়, নিশ্চিন্ত। কখনো কি ভেবেছ কেন তিনি সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় গেলেন? তোমরা কেউ তাঁকে বোঝোনি। তাঁর সাথে প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন না করে তাঁর সৃষ্টির সাথেই মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে গেলে। প্রেয়সীর ভালোবাসা আমাকে বারবার তাঁর কথা মনে করিয়ে দেয়। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এখন থেকে আমি তাকে আল্লাহর স্বার্থেই ভালবাসবো।
- মানে বুঝলাম না।
- বোঝোনি? বান্দারা তাঁকে ভালো না বাসলেও আল্লাহ ঠিকই তার বান্দাদের অনেক ভালোবাসেন। তাদের কেয়ার করেন, তাদের খাওয়ান। আমার প্রেয়সীকেও আল্লাহ ভালবাসেন। যেহেতু আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন তাই আমিও তাকে ভালোবাসি। বান্দারা অনেক দোষ করে, অন্যায় করে কিন্তু তবুও আল্লাহ তাদের ভুলে যান না, ভালোবাসেন।
- বাহ্, এভাবে তো কখনো চিন্তা করিনি। আচ্ছা তুমি সস্তা ইবাদত বলে তো ইবাদতকে একেবারে নরমালাইজ করে ফেললে। এটা কি শরিয়াহকে অবজ্ঞা নয়?
- শরিয়াহ পালন অনেকটা অনুষ্ঠান পালনের মত। লোকদেখানো একটি ব্যাপার আছে। ইবাদত আর শরিয়াহ এক জিনিস নয়। কুরআনে বলা হয়েছে, মানুষকে ইবাদতের জন্যই সৃজন করা হয়েছে। ইবাদত অনেক গভীর একটি বিষয়, এর অনেক প্রকারভেদ আছে। ইবাদত ছাড়া শরিয়াহ নেই কিন্তু শরিয়াহ না মানলেও ইবাদত করতে হবে।
- তাহলে ইবাদত কী?
- প্রেমের মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্যই হলো ইবাদত। মানুষ ছাড়া আর সকল সৃষ্টিই কিন্তু আল্লাহর আনুগত্য করছে। কিন্তু তাদের মধ্যে প্রেম নেই। প্রেমহীন ইবাদত মানুষকে আর দশটা সৃষ্টির কাতারে ফেলে দেয়।
- আচ্ছা আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছি না। তুমি বললে তুমি প্রেয়সীর প্রেমের বিষ পান করেছ। তোমার তো উচিত ছিল আল্লাহ প্রেমের বিষ পান করা।
- আরে বোকা, আল্লাহকে তুমি কোথায় পাচ্ছো যে তাঁর প্রেমের বিষ পান করবে? কুরআনে তিনি নিজেকে তিনভাবে উপস্থাপন করেছেন, জাহের অর্থাৎ দৃশ্যমান, বাতেন অর্থাৎ গোপন এবং নূর। তাঁর দৃশ্যমান রূপটি কী? তিনি কি দৃশ্যমান? তোমরা বলবে সকল সৃষ্টির মাঝেই তিনি বিরাজমান। ভালো কথা। তবে আমরা তাঁকে দেখি না কেন। কারণ সৃষ্টির মাঝে তিনি আহাদ রূপে সর্বত্র বিরাজমান। তাঁর আরেকটি শক্তিশালী রূপ আছে, সামাদ। সামাদ রূপে তিনি সবার মাঝে বিরাজমান নন, কারো কারো মাঝে বিরাজমান। এখন তোমাকে বের করতে হবে আল্লাহর সামাদ রূপটি কার মাঝে আছে। কুরআনে আহাদ শব্দটি অনেক জায়গায় পাবে কিন্তু সামাদ শুধু এক জায়গায়ই আছে। সামাদ জন্ম দেনও না, জন্ম নেনও না। তাঁরা সমস্ত বিষয় মোহের ঊর্ধ্বে। পৃথিবীতে যে মানুষটির কাছে সামাদ রূপটি আছে একমাত্র তাঁর কাছ থেকেই শুধু আল্লাহর পরিচয় পাবে। আমি সৌভাগ্যবান যে আমি এমন একজনের পরিচয় পেয়েছি। এবং আমি তাঁর প্রেমে পড়ে গেছি। সে-ই আমার প্রেয়সী। আমি তাঁর মাঝে বিলীন হওয়ার চেষ্টা করছি, তোমরা যাকে ফানা বল। একটা মানুষের প্রেমে পড়তে পারছো না আর তুমি আসছো আল্লাহ প্রেমের গল্প শেখাতে। প্রেমও করবে আবার আত্মসম্মানও চাইবে, এটা পাগলামি। আত্ম মানেই তো আমিত্ব। মানে আমি আর আমি। মনে রেখো, যেখানে শুধু 'আমি' থাকে সেখানে কখনো 'তুমি' আসেনা। যাকগে, অনেক কথা হয়েছে। এবার আমার ফুলটি দাও। আমার চলে যাবার সময় হয়েছে।
- আরেকটু সময় থাকো, তোমার সাথে কথা বলে ভালো লাগছে।
- না, আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমাকে বিদায় নিতে হবে। এমনিতেই প্রেয়সীর দেয়া একটি ওয়াদা আমি ভঙ্গ করেছি।
- কী ওয়াদা?
- কথা ছিল ফুলটি যেন আর কারো হাতে না পড়ে। সে বলেছে যেদিন ফুলটি থেকে আমি আরেকটি ফুল সৃজন করতে পারব সেদিনই তার সাথে আমার মিলন হবে, আমি তার মাঝে ফানা হয়ে যাবো। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে। আমার মনে হয় ফানার স্তরে পৌঁছা আমার পক্ষে আর সম্ভব হবে না কারণ ফুলটি তোমার হাতে পড়েছে।
- দোয়েল পাখি, আমি তোমার জন্য দোয়া করি তুমি যেন খুব শীগ্রই ফানার স্তরে পৌঁছতে পারো।
- তুমি আমায় দোয়েল পাখি বললে কেন? দোয়েল তো আমার প্রেয়সীর জাত। আমি তো চাতক পাখি।
- কে বলল তুমি চাতক পাখি, আমি তো দিব্যি দেখতে পাচ্ছি তুমি দোয়েল পাখি। আয়না আনবো?
- আনো তো।

ভেতর থেকে আয়না এনে বারান্দায় এসে দেখি দোয়েল পাখি নেই। ফুলটি পড়ে আছে এবং সেটি সবুজ বর্ণ ধারণ করেছে। গোলাপ ফুল কি সবুজ হয়? শুনলাম কে যেন গাইছে-
মান তু শুদাম, তু মান শুদী
মান তান শুদাম, তু জা শুদী
তা কিছ না গোইয়াদ বাদ আযি
মান দিগারাম তু দিগারি।*

আমি হব তুমি তুমি আমি
আমি হব কায়া হৃদয়ে তুমি
এরপর কেউ যেন বলতে না পারে
কে তুমি আর কে আমি।*
(ভাবানুবাদঃ আরমান আরজু)

* নিজামুদ্দিন আউলিয়ার আধ্যাত্মিক শিষ্য কবি আমির খসরু'র একটি দ্বীপদী।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.