নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

ছায়া নয়, আলো ...

আরমান আরজু

সত্য ও অসীমের পথে

আরমান আরজু › বিস্তারিত পোস্টঃ

বাদশাহ আরমানা

৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:০০


[সে অনেকদিন আগের কথা। আরমানা নামে একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন। আজ তার জীবনের একটি কাহিনী আপনাদের শোনাব]

১।

- আর কতদিন আমাকে তোমার বিরহ বেদনা সইতে হবে? কতদিন? আমার নখগুলো লম্বা হয়ে গেছে, আমিতো নখ কাটতে পারিনা। আমার ঘাড়ে একটা ফোঁড়া উঠেছে, ব্যথাও করে কিন্তু কাকে বলব, কে দেখবে আমার ব্যথা। যে দেখার সে তো আসে না। আমি ঠিকমত খেতেও পারি না, বলো তোমাকে ছাড়া আমার গলা দিয়ে খাবার কি নামে। ও আল্লাহ, আমাকে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?

নারীকন্ঠ বাক্যগুলো বারবার আওড়ায়। একবার কাঁদে আবার হাসে। আবার সুর করে বিলাপ করে। গভীর রজনী। চাঁদের আবছা আলোয় নারীকন্ঠটির বিলাপ চারিদিকের নিরবতাকে বারবার আহত করছে।

বাদশাহর আদেশে সিপাহী দরজায় কড়া নাড়লেন। ভেতর থেকে নারীকন্ঠ বলল,

- কে আপনি? আল্লাহকে ভয় করুন। ভেতরে আমি একা। আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করলে ধ্বংস হয়ে যাবেন।
- আপনাকে অভয় দিচ্ছি, আপনার কোন ক্ষতি হবে না, দরজা খুলুন, এ রাজ্যের বাদশাহ আপনার দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছেন, আপনার খবর নিতে এসেছেন, উনাকে সালাম দিন।
- চেয়ে কেন সালাম নেবেন? সালাম তো অন্তর থেকে আসে। আমার কোন সাহায্য লাগবে না, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, আপনার বাদশাহকে চলে যেতে বলুন।

বাদশাহ মনে মনে খুশি হলেন। এরকম একজন অকুতোভয় নারীই তো বিবাহের জন্য তিনি খুঁজছিলেন। কিন্তু সমস্যা হল নারী তো অন্য একজন পুরুষের প্রেমে মশগুল।

- আসসালামু আলাইকুম। আমি আরমানা। এ রাজ্যের একজন নগণ্য খেদমতগার। যদি আপনি অনুমতি দেন আপনার সাথে একটু সাক্ষাৎ করে চলে যাব।
- ঘরে কোন পুরুষ মানুষ নেই। আপনি বাদশাহ হতে পারেন কিন্তু কোন পরপুরুষের জন্য আমি এ অবস্থায় দরজা খুলতে পারি না। আপনার কী বলার দরজার ওপাশ থেকে বলুন।
- আপনার পুরুষ মানুষটি কোথায়? উনি কি অনেকদিন যাবত ঘরে আসছেন না?
- তা আপনাকে কেন বলব? আমাকে আমার মত থাকতে দিন।
- মহান আল্লাহ আপনার হেফাজত করুন। কোন সমস্যা হলে আমাকে জানাবেন।

বাদশাহ চলে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় দরজা খোলার শব্দে তিনি আবার দাঁড়ালেন। খোলা দরজার ওপাশ থেকে নারীকন্ঠটি বলল,

- আপনি যেই হোন না কেন, আপনি আমার ঘরে এসেছেন, আমার মেহমান। আমি গরিব অসহায়, আর কিছু দিতে না পারি অন্তত এক গ্লাস পানি পান করে যান।

হঠাৎ বাদশাহর চোখ দরজার ভেতরে গেল। সাদামাটা সফেদ আঁচলের আড়ালে নারীটির মুখমণ্ডল থেকে কি এক আলো যেন বিচ্ছুরিত হচ্ছে!

২।

- বাবা, তোমার জন্য একটি রাজকুমারী পেয়েছি। খুবই সুন্দরী। ঠোঁটের নিচে একটা তিলও আছে।

বাদশাহ আরমানা বিরক্তি ভরা কন্ঠে বললেন,

- আপনি এত কিছু কীভাবে জানলেন আম্মিজান?
- গতকাল আমি নিজে গিয়ে তাকে দেখে এসেছি। তোমার বোনও তাকে খুব পছন্দ করেছে। বাবা, আর অমত করো না। আমার বয়স হয়ে যাচ্ছে। কতদিনই বা আর বাঁচবো। তুমি কি আগামীকাল আমার সাথে তাকে দেখতে যাবে?
- আম্মিজান একটা কথা বলব, আপনি রাগ করতে পারবেন না।

হুমায়রা বানু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,

- বলো।
- একটা নারীকে আমার খুবই পছন্দ হয়েছে...
- আলহামদুলিল্লাহ ...
- আমার কথা এখনো শেষ হয়নি। নারীটি বিবাহিত, গরিব অসহায়, তবে তার পুরুষ মনে হয় অনেকদিন যাবত ঘরে আসছে না।
- কোন অসুবিধা নেই বাবা। তুমি আমাকে তার ঠিকানাটা দাও। আমি তাকে বুঝিয়ে বলবো তার স্বামীকে তালাক দিয়ে দিতে, প্রয়োজনে তার স্বামীকে অন্য নারীর সাথে বিয়ে দিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত বসে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেব।
- আম্মিজান, এটা কি হয়? জোর করে কোন কিছু করা কি ঠিক? এটাতো জুলুমের পর্যায়ে পড়ে। আমার ন্যায়বিচার প্রশ্নের মুখে পড়বে।
- তাকে রাজি করানোর দায়িত্ব আমার। আমার ছেলেকে স্বামী হিসেবে পেতে কত রমণী উন্মুখ হয়ে আছে। আমার বিশ্বাস সে আমাদের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাবে।
- আম্মিজান, আমাকে সময় দিন, আরেকটু চিন্তা করতে দিন।

৩।

ছেলের বিবাহের চিন্তায় হুমায়রা বানুর ঘুম আসে না। তিনি রাত দিন জায়নামাজে পড়ে থাকেন আর আল্লাহর সাহায্য চান। বিবাহের ব্যাপার নিয়ে ছেলে কেন এরকম করছে তিনি বুঝতে পারছেন না। কত সুন্দরী রমণীদের এনে তাকে দেখানো হলো কিন্তু সে একটাতেও রাজি হলো না। এদিকে পছন্দ করে বসে আছে এক বিবাহিত নারীকে।

দিন যায় রাত যায়। হুমায়রা বানুর অস্থিরতা বাড়ে। ছেলের এক কথা, সে কাউকে জোর করতে পারবে না।

হঠাৎ একদিন রাতে হুমায়রা বানু স্বপ্নে একটি নারীর মুখচ্ছবি দেখতে পান এবং তিনি শুনতে পান কে যেন তাকে বলছে যে এই নারীর সাথে যেন তার ছেলের বিবাহ দেয়া হয়।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে হুমায়রা বানু আর দেরী করলেন না। পাইক, পেয়াদা আর সিপাহীদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন সেই নারীর খোঁজে। রাজ্যের প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে তল্লাশি চালাতে লাগলেন।

৪।

বাদশাহ আরমানা মায়ের বাড়াবাড়িতে খুবই বিরক্ত। যেহেতু মায়ের ইচ্ছা আর স্বপ্নে প্রদত্ত নির্দেশ তাই কিছু বলতেও পারছেন না। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তাকে এ বিয়ে করতে হচ্ছে। রাগে ক্ষোভে বিয়ের আগে সেই নারীর মুখও তিনি দেখলেন না।

বাসর ঘরের সব আয়োজন সম্পন্ন। বাদশাহ হলেও ভাই তো। ভাইকে ইতস্তত করতে দেখে বোন এগিয়ে এলেন।

- ভাইজান, সব ব্যস্ততা শেষ হয়েছে। আপনার হবু স্ত্রী এবং আমাদের সম্মানিতা ভাবীজান আপনার জন্য ভিতরে অপেক্ষা করছেন। তাকে কষ্ট দেওয়া আপনার জন্য সমীচিন হবে না।
- আমার প্রিয় বুবু, আপনি তো আমার ব্যাপারে সব জানেন। আম্মিজানকে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু তিনি আমার দুঃখটা বোঝার চেষ্টা করলেন না। আমি জানিনা আমি কীভাবে এই অপরিচিত নারীর সাথে কথা বলবো।
- ভাইজান, এটা আল্লাহর হুকুম, আপনি দয়া করে মেনে নিন। আশা করি আল্লাহ চাহে তো আপনার সবকিছু সুন্দর হয়ে যাবে।

বাসর ঘরে প্রবেশ করে বাদশাহ আরমানা থমকে গেলেন। সফেদ রেশমি কাপড়ের আঁচলের ভেতরকার আভাটি তার কেন যেন খুব পরিচিত মনে হচ্ছে।
দরজা বন্ধ না করেই বাদশা বিছানায় বসা তার হবু স্ত্রীর দিকে এগোতে লাগলেন।

- দাঁড়ান, দরজা বন্ধ করে আসুন, এটা আমার আর আপনার একান্ত সময়ের কক্ষ।

বাদশাহ আরমানা আশ্চর্যান্বিত হলেন। এ তো সেই নারীর কন্ঠ! বহুদিন আগে গভীর রাতে প্রজাদের অবস্থা দেখার জন্য বেরিয়ে যার সাথে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল। কিন্তু তিনি নিশ্চিন্ত হতে পারছিলেন না এ কীভাবে সম্ভব!

- আচ্ছা, আপনার সাথে কি আমার আগে কখনো সাক্ষাৎ হয়েছিল?
- জ্বী, একদা গভীর রাতে, আপনি সিপাহী নিয়ে এসেছিলেন।
- কিন্তু আপনি তো বিবাহিত, আপনার পুরুষটি কোথায়?
- কে বলল আমি বিবাহিত? আমি কি আপনাকে বলেছিলাম?
- আমার যতদূর মনে পড়ছে, আপনি কারো বিরহে কান্না করছিলেন। আপনি কি কাউকে ভালবাসতেন?
- হুম।
- কাকে?
- আপনাকে।
- মানে! সেদিন তো আমাকে কিছু বলেননি।
- একজন অতি তুচ্ছ হয়ে অসম্ভবকে ভালোবাসা আমার কাছে বাড়াবাড়ি ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি। আপনার ন্যায়পরায়ণতার কথা শুনে আপনাকে না দেখেই আমি ভালোবেসে ফেলেছিলাম। যার কারণে অন্য কোন পুরুষকে আমার হৃদয়ে আর স্থান দিতে পারিনি। কিন্তু এ দুঃখের কথা আমি কাকে বুঝাবো? বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়ানো কি ঠিক? আর আমি সেটাই করেছিলাম। তাই প্রতি রাতে কেঁদে কেঁদে আল্লাহর সাথে নিজের দুঃখের কথা ভাগাভাগি করতাম। আর সেই আল্লাহ একদিন আপনাকে আমার সামনেই এনে দিলেন! আমি এতটাই বিমোহিত ছিলাম যে আপনাকে মনের কথা বলার পরিবর্তে কর্কশ আচরণ করেছি।

বাদশাহ হা করে হবু স্ত্রী কথা শুনছিলেন। তার কাছে সবকিছু স্বপ্নের মত মনে হচ্ছিল। তিনি যেন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। অনেকক্ষণ পর সংবিৎ ফিরে পেয়ে বললেন,

- আপনার ঘাড়ের ফোঁড়াটির কী অবস্থা এখন? আর নখগুলো?

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.