![]() |
![]() |
নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
গৌতম ঘোষের 'শঙ্খচিল' চলচ্চিত্রটি দেখে আসা অবধি ঝিম মেরে বসে ছিলাম। ভাষা খুঁজে পাইনি কিছু বলার । দেশভাগ নিয়ে অনেক গল্প ছবি হয়েছে।তবে বেশীর ভাগই ওপারের মানুষদের,সংখ্যালঘূ সম্প্রদায়ের যাদের উপরের ঝড় বয়েছিল বেশী বা সবটাই। সিংহভাগ তারাই ভূক্তভোগী এবং এদেশে তারা ছিল হিন্দু।এই বিষয় নিয়ে তারাই লিখেছেন, ছবি করেছেন । ঋত্বিক বা মৃনাল রাজেন তরফদার সহ অনেকেই নিজেরাও ছিলেন ভুক্তভোগী ফলে তার পক্ষেও নিরাসক্ত হওয়া সব সময় সম্ভব হয়নি।
এপারের আমাদের বাঙালি মুসলমানদের দেশভাগের ব্যথা,দুর্ভোগ সেইভাবে অনুরনিত করে না – আমরা বরং অনেকেই তার সুফল ভোগী ।ফলে সেভাবে শিল্প- সাহিত্যেও তার প্রতিফলন হয়নি ।যদিও বৃহত্তর পরিসরে আমরা সবাই ভুক্তভোগী , বাঁচার জন্য কেবল সংখ্যালঘূরা নয়, এখন নানা কারনে সংখ্যাগুরুদেরও এক বিশাল সংখ্যা ওপারে যায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও, যে কারনে আজও ফেলানীদের কাঁটাতারে ঝুলতে হয়।
শঙ্খচিল এই ভিন্ন আঙ্গিকে,ভিন্ন সময়কালে এবং ওপার থেকে যারা এসেছিল একই রকম গাই-গরু ভিটেমাটি বাগান পুকুর ফেলে তাদেরই এক উত্তরসুরি 'মুনতাসির বাদল কিরকম ভিন্ন সমস্যায় পড়ে ,তাদের একই দেশভাগ কোন পরিস্থিতিতে নিয়ে যায়-কেন এখনও আবারও ওইপারে সীমানা ভাঙতে হয়, অন্ন বস্ত্রের সন্ধানে কেন ফেলানিদের আজও তারে ঝুলতে হয় তার অন্তরস্পর্শী বয়ান। প্রতিদিন অন্নের লড়াই করতেই যাঁরা কাঁটাতার পেরিয়ে আসেন, তাঁদের প্রতিনিধি বাদল। এক দৃশ্যে দেখা যায় ইন্ডিয়া থেকে আসা বরযাত্রীবাহী নৌকো ফিরিয়ে দিচ্ছে,দুই পারে আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে তবু -বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী প্রধান স্বীকার করেন –‘প্রতিদিন এমন কত ঘটে,কটা আটকাব, তাও আমরা তো সবে আটকাচ্ছি ৬৭-৬৮ বছর হল, আর এইসব মানুষ পারাপার করছেন হাজার বছর ধরে।
যেখানে হাজার বছর ধরে বাস করতো এক জনপদের মানুষ-পরাধীন ছিল,-তারপর যেদিন স্বাধীন হলো দেখলো দেশটা আর তার নেই-কারও বাড়িটা বাংলাদেশে ,কিন্তু রান্নাঘরটা ইন্ডিয়ায়-এক তালগাছ হেলে আছে , যার গোড়া ইন্ডিয়ায় কিন্তু মাথাটা বাংলাদেশে, ফলে তাল পাকলে পড়ে এদিকে-। চলমান জীবন অনেকসময় এই ভাগ মেনে চলতে দেয়না। এরকমই বিষয় নিয়ে এই ছবি এমনি এক পরিস্থিতে মুনতাসীর বাদলের অসুস্থ মেয়েকে বাঁচাতে ভারতে নিতে হয় – ভিন্ন হিন্দু পরিচয়ে। মেয়ের মুখের পানে তাকিয়ে পিতা রাজী হয়-যদি তাতেও বাঁচে। কিন্তু যে ওই শঙ্খচিলের মত উড়তে উড়তে যেতে চেয়েছিল ইছামতির ওই ওপার- কিন্তু নিজের জীবনটা আর পার করতে পারেনি । সমস্যা আরও জটিল হলো হাসপাতাল যখন অবৈধ ভাবে পার হওয়া ওই মুসলিম দম্পতির একমাত্র মেয়েটির তার ডেথ সার্টিফিকেটেও হিন্দু পরিচয়ে লিখলো,কারন ভর্তির সময় ওই মিথ্যা পরিচয়টাই দেয়া ছিল।আবার সত্যি কথাটা বললে তারা হবে অনুপ্রবেশকারী- । এটাই ট্রাজেডি।গল্পের ক্লাইমেক্সও এটাই।
এই ছবিতে রূপসা’ চরিত্রে সাঁঝবাতি কেবল অভিনয় করেনি- যেন তারই জীবনের প্রতিচ্ছবি -মেকআপ ছাড়া ও যেন আরেক ডাকঘরের অমল যার অফুরন্ত ভালবাসায় মরা গাছেও পাতা গজায়। আর কুসুম শিকদারের অভিনয় অপুর্ব ,যে কোন প্রথম সারির অভিনেত্রীর সমতুল্য –আর প্রসেনজিৎকেও কখনও মনে হয়নি সে কেবল বাংলা বানিজ্যিক ছবিরও মুকুটহীন সম্রাট ,অন্যধারার ছবিতেও সালীল।তার পিতৃত্বের হৃদয়কাড়া বুনন অনুরণন তোলে বুকে।ছবিতে আছে অজস্র বিভিন্ন ছোটখাট মুহূর্ত ছবিতে বাঙময় হয়ে আছে সর্বত্র ।-প্রায় আড়াইঘন্টার এই ছবির সময় কোথায় কিভাবে কেটে যায় টের পাওয়া যায় না।সীমান্তের অনেক দুর্লভ ছবি, নাবলা নাজানা তথ্য অপুর্ব ফটোগ্রাফীর মাধ্যমে বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে।
ছবিটি ট্রাজেডী,কিন্তু কখনও ডুকরে কাঁদতে দেয়না-কিন্তু আবার বুকের অন্তহীন ক্ষরণ থামতেও দেয়না,অজান্তে চোখ ভিজিয়ে দেয়। বরং কখনও মনে হয়েছে এত পরোক্ষে থাকা কেন এ আমার পাপ,তোমার পাপ-আমাদের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে নতুন আগামীতে- যেখানে ইছামতির উপরে অবাধে উড়ে যাবে শঙ্খচিল দুই পারের মানুষগুলোর অন্তহীন স্বপ্নে ।
©somewhere in net ltd.