![]() |
![]() |
নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
নিমপাতা ।।
সকাল থেকেই বাসার আবহাওয়া অন্যরকম। কারণ আমার পড়ার ঘরটা ভীষণ অগোছাল-বইপত্র, কাগজ-পত্রিকা,হারমনিয়ম,কী-বোর্ড, ল্যপটপ ,দেয়াল জুড়ে রেকে বই,,সিডি স্যুভেনীর- সব এলোমেলো।
-‘এই কি ঘরের হাল? ঘর না গুদাম- এত বই কি হবে, কেনই বা? সব বই কি পড়েছ,সব কাজে লাগে? এক সাথে মানুষ ক'টা বই পড়ে যে এভাবে সারা ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছ? মহা-পন্ডিৎ হয়েছ যে একশো টা বই নামিয়েছ পড়ার জন্য? সারা ঘরের কি ছিরি করেছ- লোক এসে দেখলে কি বলবে ?' শেষে আরো খোঁচা- 'এত বই পড় - মাস্টার হলেও না হয় বুঝতাম- কি করবে এত জ্ঞান দিয়ে, পয়সা আসবে ঘটে ?- ইত্যাদি।
এ হেন অবস্থায় বোবা থাকাই শ্রেয় । তবু রবীন্দ্রনাথ ধার করে বলতে চাইলেম-, লক্ষী 'ঘরেতে আছেন নাইকো ভাঁড়ারে- সে কথা মানবে কে ?'কিন্তু সেটা বলার আগেই নোটিশ এল-'প্রয়োজনীয় ছাড়া সব বই ফেলে দাও বা কোন লাইব্রেরীতে দিয়ে আস-। ঘর ছিমছাম,খালি রাখতে হবে।
এবার প্রমাদ গুনলাম- এত বই সব কোথায় ফেলে দেব ? কত বছর ধরে তিলে তিল করে সঞ্চয় করা। ১৮৮৩'র এশিয়াটিক সোসাইটির খৈয়াম,নজরুলে 'বিষের বাঁশী'র প্রথম সংস্করণ থেকে হালের 'বিষাদবৃক্ষ 'দোজখনামা'। বইয়ের রেকের সামনে দাঁড়িয়ে পরম মমতায় হাত দিয়ে স্পর্শ করলাম- ওদের সবার মন খারাপ-'ঠাই নাই ঠাই নাই ছোট সে তরী। কাউকে যে যেতেই হবে।
যত বই, ঘরে তত রাখার জায়গা নেই । মধ্যবিত্ত ঘরে আলাদা 'পড়ার ঘর' বিলাসিতা বইকি। এই একই ঘরটা রূপান্তরিত কখনও ফ্যামিলি স্পেস, কখনও [জানলা-দরজাগুলো বন্ধ করে ] 'সঙ্গীত ভবন'; কখনও পড়ার লাইব্রেরী- অথবা ছোট্ট সায়নের প্রজাপতি খুঁজবার রহস্যময় বনাঞ্চল (তখন ঘরটাকে একটু অন্ধকার করে নিতে হয়, তারাবাতি টর্চ নিয়ে খাটের তলায় ঢুকতে হবে ), কখনও ইয়োগার মেডিটেশন রুম আর কখনও বা ( দেয়ালের ছবি উল্টিয়ে) অতিথিদের 'নামাজঘর।
বইগুলো সরানোর বা ফেলে দেবার আগে যতটুকু পারা যায় তাকের মধ্যে ফাঁকা জায়গাগুলোয় কিছু কিছু ভরালাম । শুধু তাই নয় -প্রথম সারির পেছনে আরেক সারি বানিয়ে সেখানে কিছু জায়গার সাশ্রয় হলো। কিন্তু এতে অসুবিধা হল যে পেছনের বইগুলো আর দেখা যাচ্ছেনা। পরে খুঁজে বের করতে গলদঘর্ম হতে হবে। তা হোক তবু আপাতত: ওদের বাঁচাতে তো হবে। রাজ্যের পত্রিকা-সেই কবে থেকে 'দেশ' কিনছি,-বাহাত্তর থেকে একনাগারে [ বিদেশ থাকাকালীন সময়াটা বাদ দিয়ে] প্রতি সপ্তাহে, সিকান্দর আবু জাফরের 'সমকাল, আকাশবাণী কলকাতার থেকে পাঠানো 'বেতার জগৎ' থেকে পুজা সংখ্যা উল্টোরথ ,জলসা,প্রসাদ থেকে হালের ঈদসংখ্যা,সব খাটের তলায় চালান হলো।
একটা ডেস্ক কাম বেড বানিয়েছিলাম-একটু বেঢপ সাইজের- কিন্তু ওতে অনেক বই ধরে-সেখানে ঠাসান হলো পুরনো সংবাদের সাহিত্য পাতা,একুশের সংকলন ,পত্রিকার কাটিং-পাড়াগাঁর মেলার দিনপঞ্জি- এভাবেই যাহোক কিছুটা ম্যানেজ করা গেল। কিছুদিনের জন্য বাঁচা।
এর মধ্যেই একদিন লোভ সামলাতে না পেরে আরও কয়েকটা বই কিনলাম। বাড়ীতে নেব কি করে ভাবছি,- দরজা খুলেই আবার যদি বইয়ের ব্যাগ দেখে এবার সাক্ষাৎ দরজা থেকেই নিশ্চিৎ বিদায় । তাই দরজা নক করার আগে বইগুলো সিড়ির গোড়ায় লুকিয়ে তারপর ঢুকলাম খালি হাতে। ও কিছু বোঝার আগেই নিজেই দরজা লাগিয়ে দিলাম। তারপর একটু আড়াল হতেই আবার ফিরে বইয়ের ব্যাগটা ভিতরে নিয়ে এলাম। তারপর সেগুলো তাড়াতাড়ি বইয়ের ভিড়ে মিশিয়ে দেবার জন্য বইয়ের তাকের ফাঁক খুঁজছি- কিন্তু একী !
যেখানেই একটু ফাঁক সেখানেই দেখি নিমের পাতার গুচ্ছ। কে আনলো এসব,কিসের জন্য রেখেছে-কিছুই বুঝছি না। পিছনের এলান করে রাখা সারি গুলোতে রাখতে গিয়ে দেখি ওখানেও সেই নিমপাতা । এমনিতে প্রতিদিন ধুলো পড়া ঝাড়তে পারিনা,ময়লা জমে বইয়ের রঙগুলো বদলে যাচ্ছে। তার উপর এই সব তেতো নিমপাতা কোত্থেকে কে আনলো ভেবে- মেজাজটা খারাপ । এক সময় গোলাপ বা বটের পাতা বইয়ের ভেতরে চাপা দিয়ে রাখতাম। অনেকদিন পর সেগুলোও পাতার মত পাতলা হয়ে যায়। তারপর সেসব আঠা দিয়ে পেস্ট করে গ্রিটিং কার্ডস বানাতাম- তো এই নিমপাতা সেরকম কিছুর জন্য কি ?
বুয়া কি রেখেছে কোন কারণে। ও প্রায়ই ঘরের ফেলে দেয়া কোন কাগজ বা পুরনো বলপেন উঠিয়ে বইয়ের তাকে রেখে দেয়।কখনও নিজের কোন ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিষও রাখে ।সে রকম কোন ব্যপার ভেবে ডাকলাম-
‘বুয়া, এসব কি আমার বইয়ের উপর? এইসব জঞ্জাল রাখার আর জায়গা পেলে না তুমি? কিসের জন্য এই নিমের পাতা ? আমি বেশ চোটপাট শুরু করতে সে জবাব দিল-
-'দুলাভাই, আমি তো রাখি নাই-
-এই জবাবই তো দেবে জানি,-তো রাখলো টা কে? তুমি প্রায়ই দেখি ফেলে দেয়া কাগজ,ময়লা,মাথার ক্লিপ উপরে তুলে রাখ কেন? আর এখন বন জঙ্গল রাখা শুরু করলে কবে থেকে?'
- আপায় রাখসে এসব, আপনার বইয়ের জন্যই তো ড্রাইভার রে দিয়া কত খুঁইজা আনাইছে ওই নিমের পাতা । ওইটা বইয়ের সাথে রাখলে পোকায় কাটবে না, দেখেন নাই কয়টা বইয়ে পোকায় কাটছে ?কাইল সারাদিন তো আপনার সব বইয়ের ফাঁকে ফুঁকে ওই নিমের পাতা রাখছে '।-
কানের পাশটা ঝিম ঝিম করে উঠলো।। তবু ঠিক কি যে শুনলাম ঠিকমত ঠাহর করে উঠতে পারিনি। তাই আবারও জিঙ্গেস করলাম এবং একই উত্তর পেলাম। পোকায় যাতে না কাটে সে জন্য নিম পাতা আনিয়ে বইয়ের ফাঁকে ফাকে রেখেছে , যে নাকি এই সেদিনই বলেছিল- বইগুলো ফেলে না দিলে বই সমেত আমাকেই ঘরছাড়া করছিল? এবার বুকের মধ্যে যেন দক্ষিণা বাতাসের পরশ ।
পুনরায় বইয়ের র্যাকটার পাশে এসে দাঁড়ালাম। কদিন আগের মন খারাপ করা সব বইগুলো এবার যেন কলকলিয়ে উঠলো-এই রাউন্ডে তাহলে কোন এলিমিনেশন নেই-হুর্রাহ। সবাই যেন একসাথে মেলে দিতে চাইল যেন নিজেকে আমার কাছে । শাস্ত্রী মহাশয় থেকে কাজী আব্দুল ওদুদ, চৈতন্য থেকে আমীর আলী, জরথ্রুস্ত থেকে মার্ক্স, জীবনানন্দ থেকে সুনীল-শামসুর একযোগে বলছে -'এবার আমাদের নাও।'
বইগুলোয় আলতো করে হাত বুলিয়ে বললাম- 'দাঁড়া আসছি। আগে নিমপাতার গন্ধটা আরেকবার বুক ভরে নিই।'
তারপর কখন যে নিমপাতাগুলো একটা চাঁপাকলির মত মধুময় হাতে পরিণত হয়ে গেল জানিনি। বইগুলোর পাশে আবারো ওদের সাজিয়ে দিলাম। নিমপাতা সত্যি পোকা থেকে বাঁচায় কিনা জানিনা- জানার দরকার নেই । পৃথিবীর সব রহস্য সমাধান করতেই হবে কে দিব্যি দিয়েছে। যদি মিথ্যেও হয় হোক ,এই মুহূর্তে আমার কাছে এর চেয়ে বড় সত্য আর কি!
ততক্ষনে- দ্বিতীয় সারিতে রাখা রচনাবলী থেকে রবীন্দ্রনাথ তারস্বরে আবৃত্তি করছেন 'পুরস্কার' কবিতাটির শেষ কটি লাইন-
'চেয়ে সেই প্রেমপূর্ণ বদনে,
বাঁধা প'ল এক মাল্যবাঁধনে, লক্ষ্মীসরস্বতী।’
©somewhere in net ltd.
১|
২২ শে জুন, ২০১৭ রাত ২:০৪
ভ্রমরের ডানা বলেছেন: বাহ!