নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

বাট আই ফোর্স আ স্মাইল, নোয়িং দ্যাট মাই অ্যাম্বিশন ফার একসিডেড মাই ট্যালেন্ট

অশেষ ইকবাল

ইট ওয়াজ মী....আই লেট দ্য ডগজ আউট

অশেষ ইকবাল › বিস্তারিত পোস্টঃ

বৃদ্ধরা (গল্প)

১৪ ই জুন, ২০১৩ বিকাল ৪:৩০

বৃদ্ধরা




বৃদ্ধ মানুষটি বাস করে ছোট্ট একটি শহরে।
মধ্যরাতে যখন নিঃস্তব্ধ হয়ে যায় গোটা শহর, শহরের সব মানুষের মন, যখন অন্ধকার হয়ে যায় সেই শহরের আকাশ, যখন থেমে যায় সেই শহরের অধিবাসী সব পাখির কোলাহল, তখন দিবানিদ্রা থেকে জেগে ওঠে বৃদ্ধটি। শয্যার পাশের জানলা দিয়ে সে বাইরে তাকায়, দীর্ঘক্ষণ চুপ ক’রে দেখে তার ঘুমন্ত শহরটিকে। চাঁদের আলো অনেকটা দূর ক’রে দিয়েছে রাতের অন্ধকার; মানুষটা বিরক্ত হয় চাঁদটার ওপর।
বৃদ্ধটি আলো দেখতে চায় না, আলো তার সহ্যও হয় না। সে চায় অন্ধকার, ঘুটঘুটে অন্ধকারেই সে স্বস্তি বোধ করে।
বৃদ্ধ মানুষটি দাঁত কিড়মিড় ক’রে, যদিও তার দাঁতের সংখ্যা পাঁচ-ছ’টির বেশি নয়, গালি দেয় চাঁদকে। চাঁদের অপরাধ, সে আলোকিত করার চেষ্টা করছে এ শহরকে।
বৃদ্ধটি আলো সহ্য করতে পারে না ব’লে দিনের বেলা ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমায়। দিন শেষে নিজের শহরটার জন্য তার মন কেমন করতে থাকে, সে বিদায় নেয় ঘুমের রাজ্য থেকে, আবার ফিরে আসে তার প্রিয় শহরে। রাতের অন্ধকারে নিমজ্জিত শহরটিকে দেখে সে সুখ বোধ করে। কিন্তু এই নচ্ছার চাঁদ, প্রায়শই, বিশেষ ক’রে পূর্ণিমার রাতে, আলোয় ভাসিয়ে দেয় শহরকে। সে-আলো দেখে কেঁপে ওঠে বৃদ্ধ লোকটি।
বৃদ্ধটির বয়স অনেক, তার মুখজুড়ে বার্ধক্যের সুগভীর বলিরেখা, দেহের চামড়া জায়গায় জায়গায় কুঁচকে গেছে। বহুকাল ধ’রে সে যেহেতু ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে দিন কাটিয়েছে, তার চেহারাটাই কেমন যেন অন্ধকার হয়ে উঠেছে।
বৃদ্ধটি যে শৈশব থেকেই আলো সহ্য করতে পারে না - তা নয়; জন্মের পর সে গভীর বিস্ময়ে দেখেছিল সূর্যকে, সূর্যের আলোয় আলোকিত এ পৃথিবীকে। কিন্তু যত দিন যেতে থাকল, পৃথিবীর বৃদ্ধ মানুষেরা, তার নিজের শহরের বৃদ্ধ মানুষেরা, তাকে বাধা দিল আলোকিত জগৎকে দেখতে। তাকে বোঝানো হল, আলো মানুষের জন্য বয়ে আনে অকল্যাণ। তাই মানুষের উচিত অন্ধকারে দিন কাটানো।
স্বভাবতই মানুষটি বৃদ্ধদের কথার প্রতিবাদ করেছিল, সে জানিয়েছিল যে অন্ধকারের চেয়ে বরং আলোই তার পছন্দ। অন্ধকার দেখলে অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠত তার বুক, অন্ধকার তার কাছে ছিল হাহাকারের মত; বরং সে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত আলোতে।
তবে তার এই বক্তব্য সন্তুষ্ট করতে পারে নি শহরের বৃদ্ধদের। সেইসব বৃদ্ধরা জানতেন আলোর স্পর্শ কত ভয়াবহ ক’রে তুলতে পারে মানুষের জীবনকে। তাঁরা নিজেরাও জীবনভ’রে দেখেছেন আলোর প্রচণ্ড, প্রকট, তীব্র, ক্ষমাহীন, ধংসাত্মক ক্ষমতা; তাঁদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে জেনেছেন, নিজেদের জীবনযাত্রাকে আলোকিত ক’রে তুলতে গিয়ে এ পৃথিবীর কত সভ্যতা, কত শহর পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তাঁরা চান নি যে তাঁদের প্রিয় ছোট্ট এই শহরটিও আলোর ছোঁয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে উঠুক; তাই তাঁরা বিধি জারি ক’রে শহরের অধিবাসীদের জন্য নিষিদ্ধ ক’রে দিলেন আলোকদর্শন।
বয়স্ক মানুষেরা সে-সব বৃদ্ধদের নিষেধ মেনে নিলেও তাঁদের বিরোধিতা করল শহরের শিশুরা। শিশুদের এ স্পর্ধায় প্রথমে বিস্মিত ও পরে ক্রোধে অন্ধ হয়ে উঠলেন বৃদ্ধরা; সব অবাধ্য শিশুর চোখ বেঁধে দেওয়া হল কালো কাপড়ে, সারা শরীর আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলা হল শৃঙ্খল দ্বারা। পুরো জগৎ নিকষ কালো অন্ধকার হয়ে যায় শহরের শিশুদের কাছে। শিশুদের সেই দলে ছিল আমাদের পরিচিত এই বর্তমান বৃদ্ধ লোকটিও।
সে-সব শিশুদের জীবনের পরবর্তী কিছুকাল বেশ দুঃখে কাটে। দিনের পর দিন একফোঁটা আলো দেখতে না পেয়ে তারা পাগলের মত হয়ে যায়। শহরের মানুষ চিন্তিত হয়ে ওঠে এই ভেবে যে শিশুরা হয়ত আলো দেখতে না পাবার শোকে মারাই পড়বে, কিন্তু তাদেরকে সান্ত্বনা দেন বৃদ্ধরা এবং জানান যে বোকা শিশুগুলো শীঘ্রই অভ্যস্ত হয়ে উঠবে অন্ধকারে জীবনযাপন করতে। তাঁরা শহরের মানুষদের পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন যে আলো মানেই অশান্তি, আলো মানেই মৃত্যু। কাজেই সেই শহরের সব অধিবাসীকে অবশ্যই আলোকে অমঙ্গলের চূড়ান্ত রূপ ব’লে জানতে হবে এবং অন্ধকারেই দিনাতিপাত করতে অভ্যস্ত হ’তে হবে। যারা তা পারবে না, এ শহরে তাদের স্থান নেই।
বৃদ্ধদের কথামত ঠিকই শিশুরা শেষপর্যন্ত আর মারা যায় না, অবাধ্য সব শিশুরা একসময় একান্ত বাধ্য হ’য়ে ওঠে, বাধ্য হ’য়ে ওঠে এই বর্তমান বৃদ্ধটিও। ক’বছরের মধ্যেই সে ও তার সঙ্গীরা নিজেদের মানিয়ে নেয় অন্ধকারের সঙ্গে। শহরের মানুষ ও বৃদ্ধরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে ভাবে যে তাদের শহরটিকে বিপর্যয়ের হাত থেকে অন্তত আপাতত রক্ষা করা গেল।
সেই ঘটনার পর বহুকাল কেটে গেছে। শহরের সেইসব বৃদ্ধরা আজ আর নেই, যদিও তাঁদের সদুপদেশ মেনে চলার কারণে শহরবাসী আজ অব্দি এ শহরকে টিকিয়ে রাখতে পেরেছে। আমাদের পূর্বপরিচিত বৃদ্ধ লোকটির ওপরেই এখন বর্তেছে গোটা শহরে যেন অন্ধকার বিরাজ করে সেই বিষয়টি লক্ষ রাখার গুরুদায়িত্ব। বৃদ্ধটিও তাঁর পূর্বপুরুষদের মতই বেশ দক্ষতার সঙ্গে পালন করছেন সেই দায়িত্ব। নিজে একফোঁটা আলো দেখতে চান না ব’লে দিনের বেলা পারতপক্ষে ঘুমিয়েই থাকেন এবং তাঁর অক্লান্ত চেষ্টায় শহরের সব মানুষই মোটামুটি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে দিনগুলো ঘুমিয়ে কাটিয়ে রাতে কাজ করতে। শহরের সব পোষা পশু-পাখিও তাঁদের মনিবদের দেখাদেখি নিশাচর হয়ে উঠেছে। এভাবে শহরের অধিবাসীদেরকে আলোর করাল স্পর্শ থেকে রক্ষা করতে পেরে বৃদ্ধটি বর্তমানে বেশ সুখী জীবনই যাপন করছেন বলা যায়।
তবে একদিন তাঁর সুখে আবার বাদ সাধল শহরের কিছু শিশু। শিশুদের কথা শুনে বৃদ্ধটি ভাবলেন শহরের
অন্তিম মুহূর্ত বুঝি উপস্থিত। ব্যাপারটি আসলে এরকম যে, এক দঙ্গল শিশু হঠাৎ একটি বই নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল তাঁর ঘরের পাশ দিয়ে। বই বস্তুটি বহুকাল দেখেননি বৃদ্ধটি, তাই দূর থেকে শিশুদের হাতে বই দেখে প্রথমটায় সেটা চিনে উঠতে পারেন নি। কৌতুহলী হ’য়ে ডাকলেন শিশুগুলোকে এবং তাদের কাছ থেকে সেটি নিয়ে ভালো ক’রে একবার দেখে আঁতকে উঠলেন তিনি। আতঙ্কিত ভঙ্গিতে অস্ফুট স্বরে তিনি বললেন, “আরে! এ যে দেখছি একটি বই!” - উদ্বেগ ঝ’রে পড়ল তাঁর কণ্ঠ থেকে। তারপর কর্কশ কণ্ঠে ব’লে উঠলেন, “এটি তোরা কোথায় পেলি?” ভয়ে কম্পমান শিশুরা জানালো যে শহরের কিছু কিশোর বস্তুটি তাদের দিয়েছে।
এ কথা শুনে উত্তেজনায় প্রায় লাফিয়ে উঠলেন বৃদ্ধ - কিশোরদের হাতে বই! বই জ্ঞানের উৎস, আর জ্ঞানের আলো যে কত মারাত্মক তা এ শহরের কে না জানে? নিশ্চয়ই ওই অবাধ্য কিশোরগুলো কোথাও থেকে বইগুলো সংগ্রহ ক’রে এখন মেতে উঠেছে ওগুলো নিয়ে। কী সর্বনাশ যে ঘটতে যাচ্ছে তাদের শহরের তা ভেবে প্রায় সংজ্ঞাহীন হ’য়ে পড়ছিলেন বৃদ্বটি, শেষটায় নিজেকে সামলে নিলেন আর আদেশ দিলেন অবাধ্য কিশোরগুলোকে ধ’রে নিয়ে এসে তাদের চোখ উপড়ে ফেলা হোক এবং তাদের সব বই পুড়িয়ে ফেলা হোক।
সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেলো শহরের অধিবাসীরা, বন্দী করল সেই কিশোরদের; আটক করল তাদের সব বই। এরপর বৃদ্ধের আদেশে ওপড়ানো হ’ল কিশোরদের চোখ, অন্ধ ক’রে দেওয়া হ’ল প্রত্যেককে। বৃদ্ধ স্বয়ং বইগুলো এক এক ক’রে ছুঁড়ে ফেললেন আগুনে। শহরবাসী হাঁফ ছেড়ে ভাবল, অবশেষে বুঝি শহরে আবার শান্তি ফিরে এল।
দলে দলে মানুষ এসে ভীড় করতে লাগল বৃদ্ধের ঘরের সামনের রাস্তায়। সেখানে ইতঃস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে ব’সে ছিল সেই সদ্য অন্ধ হওয়া কিশোরেরা।
বৃদ্ধটি সমবেত শহরবাসীকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিলেন, এ শহরে টিকে থাকতে হ’লে, এ শহরকে টিকিয়ে রাখতে হ’লে, সবাইকে চিরকাল অন্ধ হ’য়েই থাকতে হবে।

অশেষ ইকবাল, ৮ কার্তিক ১৪১৩


(পূর্বে বিশদ সঙবাদ-এ প্রকাশিত)

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.