![]() |
![]() |
নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
গোপাল ভাঁড় ছিলেন মধ্যযুগে নদিয়া অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত রম্য গল্পকার, ভাঁড় ও মনোরঞ্জনকারী। তাঁর আসল নাম গোপাল চন্দ্র প্রামাণিক তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীতে নদিয়া জেলার প্রখ্যাত রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় নিযুক্ত ছিলেন। রাজা তাঁকে তাঁর সভাসদদের মধ্যকার নবরত্নদের একজন হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
প্রায় দুইশত বছরেরও অধিক আবহমানকাল ধরে প্রচলিত তার জীবন-রস সমৃদ্ধ গল্পগুলো পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মাঝে, লোককথায় এখনো স্বমহিমায় টিকে আছে। কতগুলি গল্প প্রায় প্রবাদের ন্যায় ব্যবহৃত হয়। তাকে মোল্লা নাসিরুদ্দিন ও বীরবলের সমতুল্য হিসাবে পরিগণনা করা হয়।
গোপাল ভাঁড় চরিত্রটি ঐতিহাসিক, গবেষক ও ভাষাবিদদের কাছে বিতর্কের বিষয় বহুকাল থেকে। গোপালের গল্পগুলি সমাজে চুড়ান্ত জনপ্রিয় ও বহুল প্রচলিত হলেও গোপাল ভাঁড় বাস্তবে ছিলেন কিনা সে নিয়ে মতভেদ আছে। অনেকেই মনে করেন গোপাল ভাঁড় নামে কেউ নির্দিষ্ট করে ছিলেননা। তবে কোনো না কোনো বিদূষক রাজার প্রিয়পাত্র হন। সেরকম গোপাল নাম্নী নাপিত বংশীয় কোনো ব্যক্তি ছিলেন। গোপালের জন্ম কত বঙ্গাব্দে তা কোথাও লেখা নেই। তার জন্মস্থানের পক্ষেও কোনো নথি নেই, কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা হিসেবে তার সম্পত্তির কিংবা জায়গা-জমির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। গোপালের বাবার নাম জানা গেলেও তার মা ও স্ত্রী সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। নগেন্দ্রনাথ দাসের মতে গোপালের পদবী ছিল 'নাই'। মহারাজ তাকে হাস্যার্ণব উপাধী দান করেন। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও ভাষাবিদ সুকুমার সেন বলেছেন ‘গোপাল ভাঁড় সম্পর্কে আধুনিক বাঙালির কৌতুহল থাকার ফলে বাস্তব অথবা কল্পিত ব্যক্তিটির সম্পর্কে যে জনশ্রুতি জাতীয় ঐতিহ্য গজিয়ে উঠেছে ও উঠছে তার বীজ হচ্ছে ভাঁড় নামের অংশটি, গোপাল ভাঁড়ের ভাঁড়টুকু সংস্কৃত শব্দ ভাণ্ডারের ‘ভাণ্ড’-জাত মনে করে অনেক গোপালের জাতি নির্ণয় করেছেন। পক্ষের ও বিপক্ষের যুক্তি যাই হোক, গোপাল ভাঁড় বাঙালি রসিক ও লৌকিক সংস্কৃতিতে অমলিন হয়ে আছেন।
সেই আমলে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রাসাদের সামনে নির্মিত তাঁর একটি ভাস্কর্য এখনো সেখানে অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে। পরবর্তীতে কৃষ্ণনগর পৌরসভার সীমানায় ঘূর্ণীতে গোপাল ভাঁড়ের নতুন মূর্তি স্থাপিত হয়েছে।
এবার আসি অজানা গল্পে ...
নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কেন গোপাল ভাঁড়কে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন এবং কেনই বা গোপাল ভাঁড়কে কৃষ্ণনগর ছাড়তে হয়েছিল ?
ইতিহাস ভুলে যায় ইতিহাসকে, ইতিহাস হারিয়ে যায় ইতিহাসে। হাস্যরসিক গোপাল ভাঁড়ের নাম শুনেনি পৃথিবীতে এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সনি আর্ট কর্তৃক প্রচারিত কার্টুন অথবা বয়োবৃদ্ধদের মুখে শোনা গল্পগুজবের মাধ্যমে গোপাল ভাঁড়কে চেনা। আবার কেউবা তার অস্তিত্বের সঠিক ইতিহাস ঘেটে তার নামযশ ও ভাড়ামি সম্বন্ধে অবগত।
তিনি কৃষ্ণনগরের(পশ্চিমবঙ্গের অধিভুক্ত ঐতিহাসিক স্থান) রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাসদ ছিলেন। অত্যন্ত রসিক মানুষ ছিলেন বলে তৎকালীন সময়ে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবার প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন গোপাল। তিনি কবি ছিলেন। মিলানসাগর নামক তার কবিতা আছে। ভাঁড়ামি আর বুদ্ধির খেল দেখিয়ে তিনি রাজপ্রাসাদের সবার মন জয় করেছিলেন।মোটকথা, কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভা ও কৃষ্ণনগরের জনগনের যাবতীয় বিনোদনের আস্ত এক ভান্ডার ছিলেন বুদ্ধিমান গোপাল। কিন্তু এত প্রিয় মানুষ হয়েও এই বাংলাতে তার ঠাঁই হয়নি।
সালটা ছিল ১৭৫৭। তরুণ নবাব সিরাজ তখন বাংলা প্রেসিডেন্সি(বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ),বিহার ও উড়িষ্যার নবাবি করতেন। তখন মীর জাফর, ঘষেটি বেগম, জগৎ শেঠ, রায় দূর্লভ, উমিচাঁদরা নবাবকে সিংহাসনচ্যূত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। তারা প্রত্যেকেই তাদের হীনস্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে শর্তসাপেক্ষে ইংরেজ বণিকদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। ঠিক এই সময় কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র নবাব বিরোধী এই ভয়ঙ্কর বলয়ে যোগদান করেন। কৃষ্ণচন্দ্রের সকল সভাসদ তার যোগদানকে সমর্থন করলেও শুধু একজন ব্যক্তি সমর্থন করলেন না। আর সেই ব্যক্তিটি হল গোপাল ভাঁড়।
গোপাল কৃষ্ণচন্দ্রকে বোঝাতে লাগলেন। নিজ দেশের নবাবের বিরুদ্ধে গিয়ে ইংরেজদের সাহায্য করতে মানা করলেন। তিনি বললেন,"ইংরেজরা গায়ে সুচ হয়ে ঢুকে কুড়াল হয়ে বের হবে। তাদের স্বাঃর্থ-বিরোধী কাজ করলে আপনার সকল উপকারের কথা ভুলে আপনাকে শূলে চড়াতে পিছপা হবেনা।" সর্বোপরি, গোপাল বাংলা মায়ের এমন সর্বনাশ না করতে কৃষ্ণচন্দ্রকে বার বার অনুরোধ করলেন।
কিন্তু কৃষ্ণচন্দ্র তার কথায় কর্ণপাত করলেন না বরং তার সভাসদদের নিয়ে গোপালকে বিদ্রুপ করতে লাগলেন। কৃষ্ণচন্দ্র গোপালকে শর্ত দিলেন,"গোপাল, যদি তুমি নবাবকে মুখ ভেংচি দিয়ে আসতে পারো তবে আমি এমন সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকবো।"
গোপাল কৃষ্ণচন্দ্রের রাজদরবার থেকে বিদায় নিয়ে ছুটলেন মুর্শিদাবাদের দিকে। কিন্তু নবাবের হীরাঝিল প্রাসাদ(বর্তমানে নদীগর্ভে বিলীন) রক্ষিরা কিছুতেই ভিতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছিলেন না। উপায় খুঁজে না পেয়ে গোপাল এক রক্ষির হাতে কামড় বসিয়ে দিলেন। ফলশ্রুতিতে, প্রাসাদ-রক্ষি গোপালকে ধরে নিয়ে নবাবের কাছে গেলেন। সব শুনে নবাব বললেন,"কে তুমি? কোথায় থেকে এসেছো? আমাকে কি প্রয়োজন?"।
গোপাল কোনো কথা না বলে নবাবকে মুখ ভেংচি দিলেন।
নবাব ভাবলেন, কি ব্যাপার??
গোপাল আবারও ভেংচি দিলেন।
নবাব গোপালকে আটক করলেন। বললেন, আগামীকাল তোমার বিচার হবে।
এরই মধ্যে গোপাল মীরজাফরকে বললেন, "আমি এসেছিলাম তোমাদের সকল ষড়যন্ত্র ফাঁস করে দিতে। কিন্তু আমি কিছু বলবোনা। কারণ এই ষড়যন্ত্রের কথা ফাঁস করে দিলে কৃষ্ণচন্দ্রও ফেঁসে যাবে। নবাব তাকে সরিয়ে অন্যজনকে ক্ষমতায় বসাবেন। আমি চাইনা কৃষ্ণচন্দ্র তার ক্ষমতা হারাক। কারণ তিনি যে আমার অন্নদাতা, পরমান্নদাতা"।
মীরজাফর তার এমন কথা শুনে রীতিমত ঘাবড়ে গেল। সে নবাবকে জানালো যে গোপাল তাকে শয়তান বলে গালি দিয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব তার ফাঁসির ব্যবস্থা করা হোক।
পরদিন সকালে গোপালের ফাঁসির ব্যবস্থা করা হল। কিন্তু গোপালের মাঝে কোনও পরিবর্তন দেখা গেল না। নবাব গোপালের মুখের দিকে তাকাতেই গোপাল আবার ভেংচি দিলো। এবার নবাব রীতিমত ভাবনায় পরে গেল। নবাব ভাবলেন,' এত দেখছি বড্ড পাগল। পাগলকে ফাঁসি দেওয়া ঠিক হবেনা।' নবাব কবিরাজকে ডেকে বললেন,"দেখুন তো, এ পাগল কিনা?"।
কবিরাজ রায় দিল, এ এক উন্মাদ।
নবাব গোপালকে মুক্ত করে দিলেন।
দেশপ্রেমিক গোপাল ফিরে এলেন কৃষ্ণ নগরে। যখন জানতে পারলেন কৃষ্ণচন্দ্র তার সিদ্ধান্তে অটল গোপাল ঠিক করলেন কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় আর যাবেন না। গোপাল এও ঠিক করলেন যে তিনি এই কৃষ্ণনগরে আর থাকবেন না। অত্যন্ত ব্যথিত মন নিয়ে কাউকে কিছু না বলে রাতের অন্ধকারে সপরিবারে রাজ্য ত্যাগ করলেন গোপাল ভাঁড়।এরপর থেকে সদাহাস্যময় গোপাল ভাঁড়কে বাংলায় আর দেখা মেলেনি।
পরবর্তীতে দেশদ্রোহী ও অত্যাচারী রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এবং বেঈমান মীরজাফররা ইংরেজদের পা চাটা গোলামে পরিণত হয়েছিল।।
তথ্যসূত্রঃ
১ । সিরাজুল ইসলাম (২০১২)। "গোপাল ভাঁড়"। ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি।আইএসবিএন 9843205901। ওসিএলসি 883871743।
২ । Siegel, Lee (1987). Laughing Matters: Comic Tradition in India. University of Chicago Press, United States. আইএসবিএন ০-২২৬-৭৫৬৯১-২. pp. 314-318.
৩। শোয়েব সর্বনাম (১৩ মে ২০১৬)। "গোপাল ভাঁড়ের খোঁজে"। দৈনিক ইত্তেফাক। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জানুয়ারি ২০১৭ ।
৪ । জনতার কন্ঠ
০২ রা আগস্ট, ২০২০ সকাল ১০:৩৭
অসিত কর্মকার সুজন বলেছেন: হুম আ তা আর বলতে ।
২| ২৭ শে জুলাই, ২০২০ বিকাল ৪:০৮
সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই বলেছেন: অজানা গল্পে গোপাল ভাঁড়ের মৃত্যু দণ্ডাদেশের যদি সত্যতা থাকে, তাহলে গোপাল ভাঁড় কোনো কাল্পনিক চরিত্র না।
গোপাল ভাঁড়, মোলা নাসিরুদ্দিন হোজ্জা আর বীরবলের গল্পের মধ্যে অনেক মিল পাওয়া যায়। আবার একই গল্প কখনো গোপাল ভাঁড়, কখনো বা নাসিরুদ্দিন হোজ্জার গল্প নামেও দেখা যায়। কোনটা যে কার গল্প তা নিয়ে দ্বিধান্বিত।
সনি আর্টে যে গল্প দেখানো হয়, এগুলো আধুনিক নতুন গল্প বলেই আমার মনে হয়।
পোস্টটা ভালো লিখেছেন।
০২ রা আগস্ট, ২০২০ সকাল ১০:৩৯
অসিত কর্মকার সুজন বলেছেন: আমাদের আসল কাজ হলো সবকিছু তালগোল পাকিয়ে ফেলা । সেই ধারাবাহিকতায় গোপাল ভাঁড়, মোলা নাসিরুদ্দিন হোজ্জা আর বীরবলের গল্পের মধ্যেই মিল বেশী । খেয়াল করে দেখবেন ইনারা কারো ক্ষতি করেনি।ধন্যবাদ আপনাকে ।
৩| ২৭ শে জুলাই, ২০২০ বিকাল ৪:৩৯
রাজীব নুর বলেছেন: পোষ্টটি খুব উপভোগ করলাম।
০২ রা আগস্ট, ২০২০ সকাল ১০:৪০
অসিত কর্মকার সুজন বলেছেন: ধন্যবাদ আপনাকে ।
৪| ২৭ শে জুলাই, ২০২০ বিকাল ৪:৩৯
নেওয়াজ আলি বলেছেন: অসাধারণ প্রকাশ ।
ভীষণ ভালো লাগলো।
০২ রা আগস্ট, ২০২০ সকাল ১০:৪০
অসিত কর্মকার সুজন বলেছেন: ধন্যবাদ আপনাকে ।
৫| ২৭ শে জুলাই, ২০২০ বিকাল ৫:৫১
ফুয়াদের বাপ বলেছেন: অসাধারন পোষ্ট। অনেক কিছু জানলাম যা আগে জানা ছিল না। ধন্যবাদ।
০২ রা আগস্ট, ২০২০ সকাল ১০:৪১
অসিত কর্মকার সুজন বলেছেন: আমাদের জানার শেষ নেই আসলে । ধন্যবাদ আপনাকে ।
৬| ২৭ শে জুলাই, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৫৭
সাড়ে চুয়াত্তর বলেছেন: গোপাল ভাঁড় সম্পর্কে এত কিছু জানা ছিল না। আপনার পোস্ট পড়ে ওনার সম্পর্কে ভালোভাবে জানলাম জানলাম। ধন্যবাদ সুন্দর পোস্টের জন্য।
০২ রা আগস্ট, ২০২০ সকাল ১০:৪২
অসিত কর্মকার সুজন বলেছেন: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সময়য় নিয়ে পোষ্ট পড়ার জন্য ।
৭| ২৭ শে জুলাই, ২০২০ রাত ৮:৫৭
সাইন বোর্ড বলেছেন: বাচ্চাদের কল্যাণে আমারও গোপাল ভাঁড় দেখা হয়, বেশ মজা পাই ।
০২ রা আগস্ট, ২০২০ সকাল ১০:৪৩
অসিত কর্মকার সুজন বলেছেন: আমিও দেখি মাঝে মাঝে ভালোই লাগে ।
৮| ২৮ শে জুলাই, ২০২০ রাত ১২:৫৪
রাজীব নুর বলেছেন: পোষ্ট টি আরেকবার পড়লাম।
০২ রা আগস্ট, ২০২০ সকাল ১০:৪৪
অসিত কর্মকার সুজন বলেছেন: আপনাকে আরেক বার ধন্যবাদ জানালাম ভাই
৯| ২৯ শে জুলাই, ২০২০ সকাল ১০:৩৮
দেশ প্রেমিক বাঙালী বলেছেন: দেশপ্রেম দেখে গোপালভারের প্রতি ভালোবাসা আরো বেড়ে গেলো।
১০| ০২ রা আগস্ট, ২০২০ সকাল ১০:৪৪
অসিত কর্মকার সুজন বলেছেন: এটাই স্বাভাবিক।
©somewhere in net ltd.
১|
২৭ শে জুলাই, ২০২০ বিকাল ৩:৫৭
কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত) বলেছেন: সত্যিই দেশপ্রেমিক ছিলেন।