| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বাংলা নিউজ অস্ট্রেলিয়া
অস্ট্রেলিয়ায় সর্বাধিক পঠিত একটি বাংলাপত্রিকা

এখানে ক্লিক করুন
বাংলাদেশের ভাষাশহীদদের সম্পর্কে পাকিস্তানের (সেখানকার পাঞ্জাবি ও কিছুসংখ্যক পাঠানের) নির্দেশে রচিত ইতিহাস ধর্মবিশ্বাসের মতো পড়ানো হয়েছে। আর তা ধর্মবিশ্বাসের মতো বয়ে চলেছে তাদের রক্তে। ফলে পাকিস্তানের আমজনতা মনে করে, এ বিষয়ে আপত্তি বা সন্দেহ প্রকাশ করা কুফর বা পাপকর্মের সমতুল্য। বিস্ময়ের কথা হলো, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, আল্লামা ইকবাল, স্যার সৈয়দ আহমদ খান—তাঁদের নিয়েও মিথ্যা ইতিহাস রচিত হয়েছে। তাঁরা যদি আবার জীবিত হয়ে এসে বলেন, তাঁদের সম্পর্কে রচিত কথাগুলো ভুল, তারপরও পাকিস্তানিরা (পাঞ্জাবি ও পাঠানরা) তা মানবে না। এর এক উদাহরণ আল্লামা ইকবাল। তাঁর সম্পর্কে পাকিস্তানিদের, বিশেষ করে পাঞ্জাবি ও পাঠানদের বিশ্বাস, পাকিস্তানকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন ইকবালই দেখেছিলেন। ইকবালের ছেলে বিচারপতি জাভেদ ইকবাল আজীবন এ কথাই বলে বলে মারা গেলেন যে পাকিস্তানের স্বপ্ন তো দূরের কথা, তাঁর পিতা কখনো ভারত ভাগেরও পক্ষে ছিলেন না। তবু পাকিস্তানিরা এই সত্য মানতে রাজি নয়। জাভেদ ইকবালকে তাঁরা মিথ্যাবাদী বলে মনে করে।
পাকিস্তানের ইতিহাসে জিন্নাহকে জোর করে একজন ধার্মিক মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়। মজার বিষয় হলো, ধর্ম সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণাই ছিল না। তিনি ছিলেন অকপট এক ‘ইংলিশ জেন্টেলম্যান’। আর স্যার সৈয়দ আহমদ খানও ছিলেন এমন প্রকৃতিরই মানুষ।
পাকিস্তানের ইতিহাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত এসব মিথ্যার সবচেয়ে বড় মিথ্যা বলা হয় রাষ্ট্রীয় ভাষা নিয়ে। উর্দুকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দেওয়ার মূল কারণ ছিল গোটা পাঞ্জাবি জাতিকে দমন করা এবং উর্দুকে পাঞ্জাবের শিক্ষাব্যবস্থায় নিয়ে আসা। উর্দুকে রাষ্ট্রীয় ভাষা করার পেছনে এ-ই ছিল উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্যটি সফলও হয়েছিল। পাঞ্জাবিরা উর্দুকে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা হিসেবে মেনে নেয়। জিন্নাহ—যাঁর নিজেরই উর্দু ভাষাজ্ঞান ছিল সীমিত, উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন। এর পেছনের কারণ দুটো: ১. পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী বেশির ভাগ লোকই ছিলেন উর্দুভাষী। লিয়াকত আলী খান ছিলেন এই দলের প্রধান। এই দল নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য উর্দুকে ব্যবহার করল। কিন্তু তাদের পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ইউপি বা উত্তর প্রদেশ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হয়েছিল ইউপি থেকে, অথচ এটি পাকিস্তানের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এই দলটি বুঝতে পেরেছিল, তারা সংখ্যালঘু এবং এ কারণে মোহাজের হিসেবে তাদের ক্ষমতায় আসা অনেকটা অনিশ্চিত। তাই উর্দুকে তারা ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করল। ২. ইংরেজ শাসনকে নিজেদের উত্তরাধিকার হিসেবে রক্ষা করা। পাঞ্জাবিদের দমিয়ে রাখার জন্য ইংরেজরা উর্দু ভাষাকে ব্যবহার করেছিল। মোগলদের ফারসি এবং পাঞ্জাবি শিখদের ভাষা দমন করে ইংরেজদের স্বার্থে উর্দুকে পাকাপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর ফল হিসেবে পাঞ্জাব নিরক্ষরতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যায়। শিক্ষার হার সেখানে নেমে আসে ৯৭ থেকে ২ শতাংশে। বিশ্বের সবচেয়ে শিক্ষিত জাতিকে এভাবে নিরক্ষরতার অন্ধকারে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। ব্রিটিশদের জন্য এভাবে নিরক্ষর ও অন্ধ জাতিকে শোষণ করা সহজ হয়ে গিয়েছিল।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগ ও জিন্নাহ ব্রিটিশ শাসনের নিয়ম অপরিবর্তিত রাখতে চেয়েছিলেন। ইংরেজরা পাঞ্জাবিদের দাবিয়ে রেখে এই নতুন রাষ্ট্রকে পরিচালনা করার জন্য মূল স্তম্ভ হিসেবে ব্যবহার করল উর্দু ভাষাকে। উর্দু তাদের কাছে ছিল একটি পবিত্র সম্পদের মতো। এতে পাকিস্তানের অন্য প্রদেশগুলোও উর্দুকে ইসলামের স্তম্ভ হিসেবে গণ্য করতে লাগল। কিন্তু উর্দু নিয়ে বাঙালিদের কী মত ছিল, তা ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকে হয় লুকানো হয়েছে অথবা মিথ্যার প্রলেপ দিয়ে ঢাকা হয়েছে।
১৯৪৮ সালে যখন এই সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয় যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, তখন বাঙালিরা ক্ষোভে জ্বলে উঠল। তারা এটা মেনে নিতে কঠোরভাবে অসম্মতি জানাল। প্রথমত, সংখ্যার দিক থেকে পাকিস্তানের একটি বড় জনগোষ্ঠী ছিল বাঙালি। বাঙালিদের স্কুল-কলেজে আনুষ্ঠানিক ভাষা হিসেবে বাংলা ব্যবহৃত হতো। দ্বিতীয়ত, শিক্ষায় বাঙালিরা এগিয়ে ছিল এবং উর্দু সম্পর্কে ছিল অজ্ঞ। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা মানে ছিল, বাংলাকে তাড়িয়ে গণতন্ত্রের পতন ও বাঙালিদের অশিক্ষার পথে ঠেলে দেওয়া। ১৮৪৯ সালে শিখদের হারিয়ে পাঞ্জাব দখলে বাঙালি রেজিমেন্টের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে মুখ্য। এই কারণে পাঞ্জাব থেকে ফারসি ও পাঞ্জাবি ভাষা দমনে বাঙালিদের হাত ছিল এবং ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য সম্বন্ধেও তারা অবগত ছিল। এই অবিচারের কারণে
পাঞ্জাব আর পাঞ্জাব রইল না। উর্দুকে প্রতিষ্ঠিত করার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো বাঙালিদের পাকিস্তানি সরকার লাঠিপেটা, টিয়ার গ্যাস ও গোলাগুলির মাধ্যমে বলপ্রয়োগ করে দমন করার চেষ্টা করল। এতে সালাম, জব্বার, রফিক, শফিক ও বরকত মারা গেলেন। বাংলাদেশে তাঁরা ভাষাশহীদ হিসেবে শ্রদ্ধার পাত্র। পৃথিবীর ইতিহাসে তাঁরাই প্রথম মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন। তাঁদের স্মরণে একুশে ফেব্রুয়ারিকে গোটা বিশ্বে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এসব অত্যাচার ও নিপীড়নের পরও বাঙালি পিছপা হয়নি। অবশেষে ১৯৫৬ সালে সরকার বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়, পূর্ব পাকিস্তানে একে সরকারি ভাষা হিসেবে গণ্য করা হয়।
অনেকে বাঙালির এই বিদ্রোহকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রথম ফাটল হিসেবে দেখেন। আবার কিছু লোক একে বাঙালিদের অস্থিতিশীল অবস্থা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার প্রথম সিঁড়ি হিসেবে গণ্য করে থাকেন। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের স্থলে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হওয়ার পরপর সেখানে লাখ লাখ কবর, কসাইখানা, লাখ লাখ ধর্ষিত ও অন্তঃসত্ত্বা নারী ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তবে তাদের বড় সম্পদ ছিল শিক্ষা ও জাতীয়তাবাদ। আর এই দুটি জিনিসই তারা অর্জন করেছিল বাংলা ভাষার মাধ্যমে। আর তার ওপর ভর করেই অতীতের ক্ষুধার্ত ও দারিদ্র্যপীড়িত বাঙালি এখন একটি নেতৃত্বদানকারী দেশের কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে; এশিয়ার অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ঠাঁই করে নিয়েছে। এই গতিতে প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রসর হতে থাকলে বিগত সময়ের পাকিস্তানের এই উপনিবেশটি আগামী দিনে পাকিস্তানকে কয়েকবার কিনে নিতে পারবে।
পাঞ্জাবি জাতি এখনো ফেলে আসা সাপটির ওপর লাঠি পেটানোয় ব্যস্ত। আজও বাঙালিদের সম্পর্কে কথা বলার সময় পাঞ্জাবিদের মনের ভেতরের ঘৃণা গোপন থাকে না। আজও তারা বাঙালিদের দেশদ্রোহী, কাফের ও ভারতীয় এজেন্ট বলে উল্লেখ করে। কিন্তু কেন? প্রথমত, বাঙালিদের দোষ ছিল এই যে তারা সংখ্যায় ছিল বেশি। দ্বিতীয়ত, তারা শিক্ষিত ছিল। তৃতীয়ত, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করেছিল। চতুর্থত, তারা শাসন করার অধিকার চেয়েছিল। বাঙালিদের এখনো যখন দেশদ্রোহী বলা হয়, তখন আমার মনে একটি উদাহরণ জেগে ওঠে। পাকিস্তানের ভেতরে থেকে যাওয়া কোন কোন প্রদেশ পাকিস্তানের অধীনে থাকতে ইচ্ছুক, তা নিয়ে কখনো যদি কোনো গণভোটের আয়োজন করা হয়, আর তখন যদি পাঞ্জাব, সিন্ধু, খাইবার পাখতুনখাওয়া পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে, তখন কি তাদের দেশদ্রোহী বলার অধিকার পাওয়া যাবে?
দুঃখের কথা এই যে পাকিস্তানের ইতিহাসে আজও বাঙালিদের দেশদ্রোহী, কাফের, ভারতীয় এজেন্ট, কাপুরুষ ও ক্ষুধার্ত বাঙালি হিসেবে দেখানো হয়। পাকিস্তানের অধিকাংশ তথ্যমাধ্যম এই মত পোষণ করে। আমি মনে করি, এখন সময় পাল্টেছে। পাঞ্জাবিদের এখন নিজেদের মিথ্যা অহংকার ও নির্বোধ গোঁয়ার্তুমি থেকে বেরিয়ে এসে বাঙালিদের সম্পর্কে নিজের চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করার সময় এসেছে। তাদের উচিত, বাঙালির সত্যিকার ইতিহাস সম্পর্কে আগামী প্রজন্মকে জানানো এবং বাঙালি ভাষাশহীদদের শহীদ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া। একজন পাঞ্জাবি হিসেবে আমি দাবি জানাব, বাঙালিদের কাছ থেকে ভাষার প্রতি ভালোবাসা ও জাতীয়তাবাদ শেখার জন্য লাহোরে বাঙালি ভাষাশহীদদের ভাস্কর্য স্থাপন করা হোক। একই সঙ্গে ১৯৭১-এর গণহত্যার জন্য ক্ষমা চাওয়াও এখন একান্ত জরুরি। পাঞ্জাবিদের মহান জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। আর পাঞ্জাবি জাতির নিজস্ব স্বীকৃতির চাবিকাঠি হতে পারে এটিই।বাংলাদেশের ভাষাশহীদদের সম্পর্কে পাকিস্তানের (সেখানকার পাঞ্জাবি ও কিছুসংখ্যক পাঠানের) নির্দেশে রচিত ইতিহাস ধর্মবিশ্বাসের মতো পড়ানো হয়েছে। আর তা ধর্মবিশ্বাসের মতো বয়ে চলেছে তাদের রক্তে। ফলে পাকিস্তানের আমজনতা মনে করে, এ বিষয়ে আপত্তি বা সন্দেহ প্রকাশ করা কুফর বা পাপকর্মের সমতুল্য। বিস্ময়ের কথা হলো, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, আল্লামা ইকবাল, স্যার সৈয়দ আহমদ খান—তাঁদের নিয়েও মিথ্যা ইতিহাস রচিত হয়েছে। তাঁরা যদি আবার জীবিত হয়ে এসে বলেন, তাঁদের সম্পর্কে রচিত কথাগুলো ভুল, তারপরও পাকিস্তানিরা (পাঞ্জাবি ও পাঠানরা) তা মানবে না। এর এক উদাহরণ আল্লামা ইকবাল। তাঁর সম্পর্কে পাকিস্তানিদের, বিশেষ করে পাঞ্জাবি ও পাঠানদের বিশ্বাস, পাকিস্তানকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন ইকবালই দেখেছিলেন। ইকবালের ছেলে বিচারপতি জাভেদ ইকবাল আজীবন এ কথাই বলে বলে মারা গেলেন যে পাকিস্তানের স্বপ্ন তো দূরের কথা, তাঁর পিতা কখনো ভারত ভাগেরও পক্ষে ছিলেন না। তবু পাকিস্তানিরা এই সত্য মানতে রাজি নয়। জাভেদ ইকবালকে তাঁরা মিথ্যাবাদী বলে মনে করে।
পাকিস্তানের ইতিহাসে জিন্নাহকে জোর করে একজন ধার্মিক মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়। মজার বিষয় হলো, ধর্ম সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণাই ছিল না। তিনি ছিলেন অকপট এক ‘ইংলিশ জেন্টেলম্যান’। আর স্যার সৈয়দ আহমদ খানও ছিলেন এমন প্রকৃতিরই মানুষ।
পাকিস্তানের ইতিহাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত এসব মিথ্যার সবচেয়ে বড় মিথ্যা বলা হয় রাষ্ট্রীয় ভাষা নিয়ে। উর্দুকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দেওয়ার মূল কারণ ছিল গোটা পাঞ্জাবি জাতিকে দমন করা এবং উর্দুকে পাঞ্জাবের শিক্ষাব্যবস্থায় নিয়ে আসা। উর্দুকে রাষ্ট্রীয় ভাষা করার পেছনে এ-ই ছিল উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্যটি সফলও হয়েছিল। পাঞ্জাবিরা উর্দুকে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা হিসেবে মেনে নেয়। জিন্নাহ—যাঁর নিজেরই উর্দু ভাষাজ্ঞান ছিল সীমিত, উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন। এর পেছনের কারণ দুটো: ১. পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী বেশির ভাগ লোকই ছিলেন উর্দুভাষী। লিয়াকত আলী খান ছিলেন এই দলের প্রধান। এই দল নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য উর্দুকে ব্যবহার করল। কিন্তু তাদের পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ইউপি বা উত্তর প্রদেশ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হয়েছিল ইউপি থেকে, অথচ এটি পাকিস্তানের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এই দলটি বুঝতে পেরেছিল, তারা সংখ্যালঘু এবং এ কারণে মোহাজের হিসেবে তাদের ক্ষমতায় আসা অনেকটা অনিশ্চিত। তাই উর্দুকে তারা ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করল। ২. ইংরেজ শাসনকে নিজেদের উত্তরাধিকার হিসেবে রক্ষা করা। পাঞ্জাবিদের দমিয়ে রাখার জন্য ইংরেজরা উর্দু ভাষাকে ব্যবহার করেছিল। মোগলদের ফারসি এবং পাঞ্জাবি শিখদের ভাষা দমন করে ইংরেজদের স্বার্থে উর্দুকে পাকাপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর ফল হিসেবে পাঞ্জাব নিরক্ষরতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যায়। শিক্ষার হার সেখানে নেমে আসে ৯৭ থেকে ২ শতাংশে। বিশ্বের সবচেয়ে শিক্ষিত জাতিকে এভাবে নিরক্ষরতার অন্ধকারে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। ব্রিটিশদের জন্য এভাবে নিরক্ষর ও অন্ধ জাতিকে শোষণ করা সহজ হয়ে গিয়েছিল।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগ ও জিন্নাহ ব্রিটিশ শাসনের নিয়ম অপরিবর্তিত রাখতে চেয়েছিলেন। ইংরেজরা পাঞ্জাবিদের দাবিয়ে রেখে এই নতুন রাষ্ট্রকে পরিচালনা করার জন্য মূল স্তম্ভ হিসেবে ব্যবহার করল উর্দু ভাষাকে। উর্দু তাদের কাছে ছিল একটি পবিত্র সম্পদের মতো। এতে পাকিস্তানের অন্য প্রদেশগুলোও উর্দুকে ইসলামের স্তম্ভ হিসেবে গণ্য করতে লাগল। কিন্তু উর্দু নিয়ে বাঙালিদের কী মত ছিল, তা ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকে হয় লুকানো হয়েছে অথবা মিথ্যার প্রলেপ দিয়ে ঢাকা হয়েছে।
১৯৪৮ সালে যখন এই সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয় যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, তখন বাঙালিরা ক্ষোভে জ্বলে উঠল। তারা এটা মেনে নিতে কঠোরভাবে অসম্মতি জানাল। প্রথমত, সংখ্যার দিক থেকে পাকিস্তানের একটি বড় জনগোষ্ঠী ছিল বাঙালি। বাঙালিদের স্কুল-কলেজে আনুষ্ঠানিক ভাষা হিসেবে বাংলা ব্যবহৃত হতো। দ্বিতীয়ত, শিক্ষায় বাঙালিরা এগিয়ে ছিল এবং উর্দু সম্পর্কে ছিল অজ্ঞ। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা মানে ছিল, বাংলাকে তাড়িয়ে গণতন্ত্রের পতন ও বাঙালিদের অশিক্ষার পথে ঠেলে দেওয়া। ১৮৪৯ সালে শিখদের হারিয়ে পাঞ্জাব দখলে বাঙালি রেজিমেন্টের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে মুখ্য। এই কারণে পাঞ্জাব থেকে ফারসি ও পাঞ্জাবি ভাষা দমনে বাঙালিদের হাত ছিল এবং ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য সম্বন্ধেও তারা অবগত ছিল। এই অবিচারের কারণে
পাঞ্জাব আর পাঞ্জাব রইল না। উর্দুকে প্রতিষ্ঠিত করার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো বাঙালিদের পাকিস্তানি সরকার লাঠিপেটা, টিয়ার গ্যাস ও গোলাগুলির মাধ্যমে বলপ্রয়োগ করে দমন করার চেষ্টা করল। এতে সালাম, জব্বার, রফিক, শফিক ও বরকত মারা গেলেন। বাংলাদেশে তাঁরা ভাষাশহীদ হিসেবে শ্রদ্ধার পাত্র। পৃথিবীর ইতিহাসে তাঁরাই প্রথম মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন। তাঁদের স্মরণে একুশে ফেব্রুয়ারিকে গোটা বিশ্বে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এসব অত্যাচার ও নিপীড়নের পরও বাঙালি পিছপা হয়নি। অবশেষে ১৯৫৬ সালে সরকার বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়, পূর্ব পাকিস্তানে একে সরকারি ভাষা হিসেবে গণ্য করা হয়।
অনেকে বাঙালির এই বিদ্রোহকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রথম ফাটল হিসেবে দেখেন। আবার কিছু লোক একে বাঙালিদের অস্থিতিশীল অবস্থা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার প্রথম সিঁড়ি হিসেবে গণ্য করে থাকেন। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের স্থলে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হওয়ার পরপর সেখানে লাখ লাখ কবর, কসাইখানা, লাখ লাখ ধর্ষিত ও অন্তঃসত্ত্বা নারী ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তবে তাদের বড় সম্পদ ছিল শিক্ষা ও জাতীয়তাবাদ। আর এই দুটি জিনিসই তারা অর্জন করেছিল বাংলা ভাষার মাধ্যমে। আর তার ওপর ভর করেই অতীতের ক্ষুধার্ত ও দারিদ্র্যপীড়িত বাঙালি এখন একটি নেতৃত্বদানকারী দেশের কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে; এশিয়ার অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ঠাঁই করে নিয়েছে। এই গতিতে প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রসর হতে থাকলে বিগত সময়ের পাকিস্তানের এই উপনিবেশটি আগামী দিনে পাকিস্তানকে কয়েকবার কিনে নিতে পারবে।
পাঞ্জাবি জাতি এখনো ফেলে আসা সাপটির ওপর লাঠি পেটানোয় ব্যস্ত। আজও বাঙালিদের সম্পর্কে কথা বলার সময় পাঞ্জাবিদের মনের ভেতরের ঘৃণা গোপন থাকে না। আজও তারা বাঙালিদের দেশদ্রোহী, কাফের ও ভারতীয় এজেন্ট বলে উল্লেখ করে। কিন্তু কেন? প্রথমত, বাঙালিদের দোষ ছিল এই যে তারা সংখ্যায় ছিল বেশি। দ্বিতীয়ত, তারা শিক্ষিত ছিল। তৃতীয়ত, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করেছিল। চতুর্থত, তারা শাসন করার অধিকার চেয়েছিল। বাঙালিদের এখনো যখন দেশদ্রোহী বলা হয়, তখন আমার মনে একটি উদাহরণ জেগে ওঠে। পাকিস্তানের ভেতরে থেকে যাওয়া কোন কোন প্রদেশ পাকিস্তানের অধীনে থাকতে ইচ্ছুক, তা নিয়ে কখনো যদি কোনো গণভোটের আয়োজন করা হয়, আর তখন যদি পাঞ্জাব, সিন্ধু, খাইবার পাখতুনখাওয়া পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে, তখন কি তাদের দেশদ্রোহী বলার অধিকার পাওয়া যাবে?
দুঃখের কথা এই যে পাকিস্তানের ইতিহাসে আজও বাঙালিদের দেশদ্রোহী, কাফের, ভারতীয় এজেন্ট, কাপুরুষ ও ক্ষুধার্ত বাঙালি হিসেবে দেখানো হয়। পাকিস্তানের অধিকাংশ তথ্যমাধ্যম এই মত পোষণ করে। আমি মনে করি, এখন সময় পাল্টেছে। পাঞ্জাবিদের এখন নিজেদের মিথ্যা অহংকার ও নির্বোধ গোঁয়ার্তুমি থেকে বেরিয়ে এসে বাঙালিদের সম্পর্কে নিজের চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করার সময় এসেছে। তাদের উচিত, বাঙালির সত্যিকার ইতিহাস সম্পর্কে আগামী প্রজন্মকে জানানো এবং বাঙালি ভাষাশহীদদের শহীদ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া। একজন পাঞ্জাবি হিসেবে আমি দাবি জানাব, বাঙালিদের কাছ থেকে ভাষার প্রতি ভালোবাসা ও জাতীয়তাবাদ শেখার জন্য লাহোরে বাঙালি ভাষাশহীদদের ভাস্কর্য স্থাপন করা হোক। একই সঙ্গে ১৯৭১-এর গণহত্যার জন্য ক্ষমা চাওয়াও এখন একান্ত জরুরি। পাঞ্জাবিদের মহান জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। আর পাঞ্জাবি জাতির নিজস্ব স্বীকৃতির চাবিকাঠি হতে পারে এটিই।
©somewhere in net ltd.