| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বাংলা নিউজ অস্ট্রেলিয়া
অস্ট্রেলিয়ায় সর্বাধিক পঠিত একটি বাংলাপত্রিকা

নিউজ সাইটের জন্য এখানে ক্লিক করুন
ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা, তর্কবিতর্ক ও আপত্তির মুখে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ বিল-২০১৭’ পাস করে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের মাধ্যমে এটি আইনে পরিণত হয়েছে।
নতুন এই আইন অনুযায়ী মেয়ে ও ছেলেদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স হবে যথাক্রমে ১৮ ও ২১ বছর। তবে আইনে বিশেষ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটলে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ে ও ২১ বছরের কম বয়সী ছেলের বিয়ের বিধান রাখা হয়েছে। এই বিশেষ বিধান নিয়ে যত তর্ক আর সমালোচনা। এ আইনের ১৯ ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইনের অন্যান্য বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারীর সর্বোত্তম স্বার্থে আদালতের নির্দেশনাক্রমে এবং মা-বাবার সম্মতিক্রমে বিধি দ্বারা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ ক্রমে বিবাহ সম্পাদিত হইলে, উহা এই আইনের অধীন অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে না।’
আইনটি পাস হওয়ার আগে দেশের বিভিন্ন নারী, শিশু, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সংগঠন বিশেষ পরিস্থিতিতে কম বয়সীদের বিয়ের বিধান রাখার বিষয়টির বিরোধিতা করেছিল। তাদের বক্তব্য ছিল আইনে বিশেষ পরিস্থিতিতে কম বয়সী ছেলেমেয়েদের বিয়ের বিধান রাখা হলে তা বাল্যবিবাহকে না কমিয়ে বরং বাড়াবে। তাই এই বিধান বাদ দিতে হবে।
ঠিক কী ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তা বিশেষ পরিস্থিতি হিসেবে গণ্য হবে, সে ব্যাপারে আইনের একটি বিধিমালার প্রাথমিক খসড়া ইতিমধ্যে তৈরি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রেমের সম্পর্কের কারণে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ে নিজেরা বিয়ে করলে এবং মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হলে বা সন্তানের মা হয়ে গেলে আদালত বিয়ের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারবেন। আবার অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েটির ভরণপোষণের উপযুক্ত নিকটাত্মীয় কেউ না থাকলে সে ক্ষেত্রেও আদালত তাঁর বিশেষ এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারবেন।
বিশেষ পরিস্থিতির এই সংজ্ঞা দেখে মনে প্রশ্ন জাগছে, এই আইন কি আদৌ বাল্যবিবাহ রোধ করতে পারবে? মনে হয় না। এখন দেখা যাবে এই বিশেষ পরিস্থিতির উদ্ভব হতে বেশি সময় লাগছে না। সুযোগসন্ধানীরা ঠিকই বিশেষ পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে এবং এর ফলে বাল্যবিবাহের ঘটনা বাড়বে। অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার পর আমাদের দেশে বহু মেয়ের বাল্যবিবাহ হয়েছে। পার্থক্য হলো আগে এ ধরনের বিয়েতে আইনি অনুমোদন ছিল না, এখন হয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, এর ফলে শিশু-কিশোরী ধর্ষণের ঘটনা বাড়বে। আর ধর্ষককে শাস্তি দেওয়ার বদলে তার সঙ্গে ধর্ষিতার বিয়ে দিয়ে তাকে পুরস্কৃত করা হবে।
এই আইন যে বাল্যবিবাহ রোধ বা বন্ধ করতে পারবে না, তা চোখ বুজেই বলে দেওয়া যায়। বিশেষ পরিস্থিতিতে অল্প বয়সীদের বিয়ের এই বিধান এই আইনের একটি বড় ক্ষতচিহ্ন। আসল কথা হলো, আইন প্রয়োগ করে কিছু হবে না। বাল্যবিবাহ রোধে আগেও আইন ছিল। সে আইন কি বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে পেরেছে? কেউ কি আইনের প্রয়োগ হতে দেখেছে? গত কয়েক বছরে দেশে যে কয়টি বাল্যবিবাহের বন্ধের ঘটনা ঘটেছে, তাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বাল্যবিবাহ সংঘটনকারীদের মুচলেকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বা সতর্ক করা হয়েছে। এর বেশি কিছু নয়। কেউ সাত দিনের জন্যও জেল খাটেনি।
নতুন আইনেও আইন ভঙ্গকারীদের জন্য বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু যেখানে আইনের প্রয়োগই নেই, সেখানে আইন করে লাভ কী। আসলে আমাদের সমাজে বাল্যবিবাহকে অপরাধ হিসেবেই মনে করা হয় না। এটি সামাজিকভাবে স্বীকৃত, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। আইন করে বাল্যবিবাহ ঠেকানো যাবে না। এ জন্য সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতা সৃষ্টি করা।
বাল্যবিবাহের কুফল অনেক। কোনো মেয়ের যখন অল্প বয়সে বিয়ে হয়, তখন তার ব্যক্তিগত ক্ষতি হয় অনেক, তার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়, তার শরীর গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত না হলেও সে গর্ভধারণ করে। এতে সে নানা ধরনের স্বাস্থ্য জটিলতায় ভোগে। মা হওয়ার পর সে নিজে ও তার সন্তান আরও সমস্যায় ভোগে। কম বয়সী মায়ের সন্তানেরা প্রয়োজনের তুলনায় কম ওজন নিয়ে জন্মায়। দ্বিতীয় জাতীয় পুষ্টি কর্মপরিকল্পনার (২০১৬-২০২৫) খসড়া দলিলের তথ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনের চেয়ে কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণকারী শিশুর হার এখন ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় এক-চতুর্থাংশ সদ্যোজাত শিশু বড় রকমের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীতে যুক্ত হচ্ছে। আমাদের আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণের হার মাত্র ৩৬ শতাংশ। এর পেছনের অন্যতম কারণ হচ্ছে বাল্যবিবাহ। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) গত বছর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যাতে বলা হয়, মাধ্যমিকের ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া প্রায় ৪৬ শতাংশ ছাত্রী দশম শ্রেণি শেষ করার আগেই শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে। আর এই ঝরে পড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, দারিদ্র্য ও বাল্যবিবাহ। বাল্যবিবাহের এসব কুফল সম্পর্কে সবাইকে জানাতে হবে। অল্প বয়সে বিয়ে দিলে সন্তানের ভালো হওয়ার বদলে যে তার ক্ষতি হয়, এটাই সবাইকে বোঝাতে পারলে আমাদের আর কোনো ধরনের আইনের প্রয়োজন হবে না।
Web: http://www.bangla-news.com.au
©somewhere in net ltd.