নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

অন্ত্যজ বাঙালী, আতরাফ মুসলমান ...

বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল, পুন্য হউক, পুন্য হউক, পুন্য হউক, হে ভগবান। বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠ, পুর্ন হউক, পূর্ন হউক, পূর্ন হ্‌উক, হে ভগবান।রবীন্দ্রনাথ

ইমন জুবায়ের

জীবন মানে শুধুই যদি প্রাণ রসায়ন/ জোছনা রাতে মুগ্ধ কেন আমার নয়ন। [email protected]

ইমন জুবায়ের › বিস্তারিত পোস্টঃ

গল্প: পারুলের গল্প ...

১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ সন্ধ্যা ৬:০৩

পারুলদের বাড়িউলি জিন্নাতুন বেগম বড্ড বদ কিসিমের । আলমের ঘরে পারুলকে ঠেলে দিতে চায় বুড়ি। বুড়ির বড় ভাসুরের ছেলে আলম, কোরিয়ায় চাকরি করে, কিছুদিন হল ঢাকায় এসেছে। পারুল দেখতে শ্যামলা হলেও চটক আছে, শরীরজুড়ে ঢলঢলে লাবণ্য আছে। জিন্নাতুন বেগম-এর ঘটকালি করার শখ হয়েছে। পারুল তো আর জিন্নাতুন বেগম কে বলতে পারে না ... আব্বার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। বলতে পারে না ... কারণ...পারুলের তখন জাহিদের শ্যামলা মুখটা মনে পড়ে ... পারুল জিন্নাতুন বেগম কে এড়িয়ে যেতেও পারে না । কারণ, ছয় মাসের বাসা ভাড়া বাকি।

পারুলের কিন্তু এখন বিয়ের চেয়ে বেশি দরকার একটা চাকরি।

পারুলের বাবা আহাদ আলীর টিপু সুলতান রোডে একটা ফার্মেসী ছিল- কী এক নেশার ঘোরে পড়ে সে দোকান বেচে দিয়েছে । জমানো টাকা যা ছিল সেসব হুহু করে ফুরিয়ে আসছে। পারুল আর যাই করুক-কষ্ট করে জগন্নাথ থেকে বি.এ পাশ করেছে। এখন হন্যে হয়ে একটা চাকরি খুঁজছে। একটা চাকরির খোঁজ অবশ্য পেয়েছে ও। যাত্রাবাড়িতে একটা মেডিক্যাল সেন্টারের রিসিপসনিস্ট। ভালো কথা। কিন্তু, কর্তৃপক্ষ ৫০ হাজার টাকা ঘুষ চায়।

পারুল ৫০ হাজার টাকা কোথায় পাবে এখন?

পারুলের মা দিলারা বেগম আলমকে দাওয়াত করেছে। আলমের পয়সা আছে এবং সংসারে এখন যা অবস্থা তাতে বড় মেয়েটির জামাই টাকাপয়সাওয়ালা হলেই ভালো। এটা একটা কারণ। দ্বিতীয় কারণটি হল- বাড়িউলি জিন্নাতুন বেগম কে খুশি করা। জিন্নাতুন বেগম বিধবা। দুই মেয়ের মা- দুটি মেয়েরই বিয়ে হয়ে গেছে। কাজেই বকেয়া বাড়ি ভাড়ার জন্য অযথা নির্দয় হন না বৃদ্ধা। তার ওপর আলমের বউয়ের জন্য বাড়িউলি পারুলের কথা ভাবছে -এ সংবাদ দিলারা বেগমের কানে পৌঁছেছে। দিলারা বেগম এতে অখুশি নন ...

পারুল সবই বোঝে।

অস্থির বোধ করে ও। জাহিদের পক্ষে এখুনি পারুলকে বিয়ে করে ঘরে তোলা সম্ভব না। জাহিদরা থাকে নারিন্দা, পারুলদের গলির দুটি গলি পরেই। জাহিদের অনেকগুলি ভাইবোন। জাহিদ বেকার। জাহিদের অবশ্য মোতালেব প্লাজায় একটা মোবাইলের দোকানে চাকরির কথাবার্তা চলছে। দেখা যাক কি হয়-

আলম মরন চাঁদের পাঁচ কেজি মিস্টি নিয়ে দাওয়াত খেতে এল। কালো প্যান্ট আর সাদা পাঞ্জাবি পরেছিল । ড্রইংরুমে বিদেশি পারফিউমের গন্ধ সঙ্গে বিরিয়ানির গন্ধ মিশে অদ্ভূত এক গন্ধের সৃষ্টি হয়েছে। ... পারুল এক গ্লাস ট্যাং নিয়ে ড্রইংরুমে ঢুকল । আলম ভাইকে দেখলে তার কেমন মায়া লাগে। আলম ভাইয়ের গায়ের রং ফরসা। গোলগাল চেহারা। ছোট ছোট করে ছাঁটা লালচে শক্ত চুল। বেঁটেই বলা যায়। কেমন লাজুক লোকটা । পারুল এই লোকটাকে বিয়ে করবে না। কাজেই কথাবার্তায় ওর বিন্দুমাত্র জড়তা নেই । জিন্নাতুন বেগম ইচ্ছায় আলম ভাইয়ের সঙ্গেএর আগে টুকটাক কথা হয়েছে । আলম ভাইয়ের দেশের বাড়ি মুন্সিগঞ্জের কবুতরখোলা; কবুতরখোলার নূরপুর গ্রামের মেয়ে জোছনা, সাত বছর ধরে তারেই ভালোবাসে আলম ভাই । জোছনাকে বিয়ে করবে বলে পড়ালেখা বাদ দিয়ে কোরিয়া যাত্রা। এখন দেশে ফিরেছে জোছনাকে বিয়ে করার জন্য। পারুলকে বোনের মতো দেখে।

সত্যি আপনি আমারে বোনের মতো দেখেন? পারুল উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে বলে।

হ্যাঁ। মাথা নাড়ে আলম।

এতসব গোপন কথা পারুলদের বাড়িউলি জিন্নাতুন বেগম জানে না। বদ কিসিমের বুড়ি এসব না জেনেই পারুলকে আলমের ঘরে ঠেলে দিতে চায়।

পারুল সোফায় আলমের মুখোমুখি বসে। টুকটাক কথাবার্তা হয়। এক ফাঁকে নিরুপায় হয়ে পারুল বলেই বসল, আলম ভাই, আপনি কি আমাকে ৫০ হাজার টাকা ধার দিতে পারবেন?

এত টাকা? এত টাকা দিয়া তুমি কি করবা?

মাস ছয়েকের মধ্যে শোধ করে দেব।

আহা, সে তো বুঝলাম। কিন্তু তুমি অত টাকা দিয়া কি করবা?

আমার একটা চাকরি দরকার। সেজন্য ঘুষ লাগবে।

বুঝছি। বলে আলম মাথা নাড়ে। তারপর গ্লাসে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করে, যে চাকরি দিব তারে তুমি ভালো কইরা চিন?

চিনি। যারে টাকা দিমু তিনি আমার চাচা লাগে।

আচ্ছা দিব। আজ বিকালের বাসে আমি কবুতরখোলা যাচ্ছি। আগে সেখান থেকে ঘুরে আসি। তখন দিব।

পারুলের খুশিতে নাচতে ইচ্ছে করে। ওর একটা চাকরি হলেই এ সংসারটা টিকে যাবে, নইলে কী যে তা আল্লাই ভালো জানেন। আব্বার যে কী ঘোর লাগল । কী এক নেশায় ভালো মানুষটা বছর খানেক ধরে আধ-পাগল হয়ে গেছে। কে আব্বাকে বুঝিয়েছে- সোনার গাঁয়ের মাটির নীচে নাকি রাজা-বাদশাহদের এন্তার সোনাদানা লুকানো আছে । গোপনে সেই সোনাদানার সন্ধান করছে একটি পার্টি। পার্টির নাম ‘রত্নাকর’ পার্টি। তো, সোনাদানার সন্ধানে খরচ কম না। এ জন্য একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। তহবিলে কেউ পঞ্চাশ লাখ, কেউ এক কোটি, কেউ দেড় কোটি টাকা দিয়েছে। পারুলের আব্বার অত টাকা নেই । সে টিপু সুলতান রোডের ফার্মেসী বেচে পনেরো লাখ টাকা দিয়েছে। পারুলদের দেশের বাড়ি গাজীপুরের বান্না। রেলস্টেশনের ধারে পৈত্রিক জমিজমা ছিল। সে জমি বেচে আরও পাঁচ লাখ দিয়েছে। এ নিয়ে পারুলের মা দিলারা বেগম ফোঁস ফোঁস করে। পারুলের আব্বা বলে, যখন টাকা হইব দিলু, তখন টাকা রাখার জায়গা পাইবা না। বুঝলা, আমরা এ দেশ ছাইড়া মালয়েশিয়া চলে যাব। দেখতেছ না ঢাকা শহরের কী অবস্থা, রাস্তায় বার হইলেই জ্যাম আর ডিজেলের গন্ধ। মালয়েশিয়া মুসলিম কান্ট্রি। বুঝলা। দিলারা বেগম ফোঁস করে বলে, সে তো বুঝলাম । কিন্তু তুমি টাকা পাইবা কবে? পারুলের আব্বা বলে, টাকা একদিন না একদিন পামুই। আরে আমার লগে কত বড় বড় পার্টি মিটিং করে। আমি কপালের জোরে চান্স পাইছি । কথাটা ঠিকই। জুরাইনের কবির হোসেনের জানের দোস্ত বলেই আহাদ আলীকে ‘রত্নাকর’ পার্টিতে নেওয়া হয়েছে। কবির হোসেন বড্ড চালু লোক। সমাজের উঁচুনীচু শ্রেণিতে কবির হোসেনের যোগাযোগ ভালো। চাকরি কিংবা ব্যবসা কিছুই করে না সে-অথচ সবসময় ফিটফাট থাকে। জাহিদ অবশ্য কবির হোসেন কে চেনে। জাহিদ বলে: কবির হোসেন লোক ভালো না। ধান্ধাবাজ। দশ বছর আগে গুলিস্তানের ফুটপাতে রত্নপাথর বেচত। এখন রত্নপাথর না-বেচলেও ধান্ধাবাজি করে বেড়ায়। বড়লোকের বাগানবাড়িতে মেয়ে সাপলাই দেয়, সিনেমায় এক্সট্রা সাপলাই দেয়। এসব কথা শুনে রাগ হয় পারুলের । জাহিদের সঙ্গে ঝগড়া করে। জাহিদ হাসে। কবির চাচা আব্বার বন্ধু। সে খারাপ হয় কী করে? আব্বার না-হয় সোনা-রূপার নেশা লাগছে, অন্য বদ অভ্যাস তো নাই। যাই হোক। সেই কবির চাচাই যাত্রাবাড়ির একটা মেডিক্যাল সেন্টারে রিসিপসনিস্ট-এর চাকরি খবর এনে দিয়েছেন। কিন্তু কথা হইল মা রউফ সাব নগদ ৫০ হাজার টাকা ঘুষ চান।

রউফ সাহেব কে চাচা?

আছে, আছে। সে একজন বড় দিলদাল মানুষ। যাত্রাবাড়ির মেডিক্যাল সেন্টারে শেয়ার আছে। নিজে মালিক হইলে খরচ কম হইত। গেল বছরে আমি রউফ সাবরে মেরুলে দশ কাটা জমি কিন্না দিছিলাম । সেই জমি এখন আমিন মোহাম্মদের কাছে বেইচা কোটি টাকার মালিক হইছেন রউফ সাব ।

বুঝলাম। কিন্তু, অত টাকা কোথায় পাব চাচা?

হুমম। বড় ভাবনার কথা মা । আচ্ছা, দেখি কী করতে পারি।

এরপর আর কবির চাচার দেখা নেই ...



রাত ন’টার দিকে আলম ভাইয়ের ফোন এল । বললেন, এইমাত্র কবুতরখোলায় পৌঁছলাম। আরও আগে পৌঁছতাম। রাস্তায় জ্যাম ছিল।

আচ্ছা। ভালো থাইকেন। পারুল বলে।

ফোন অফ করতেই ফোনটা আবার বাজল। ঝুমা। ঝুমা জাহিদের খালাতো বোন । এক সঙ্গে পড়ত জগন্নাথে । সে সূত্রেই জাহিদের সঙ্গে সম্পর্ক। ঝুমা বলল, কাল আমার জন্মদিন।

মনে আছে। পারুল বলল।

কাল সকাল ন’টার মধ্যে সাইজা গুইজা বাংলাবাজারের মোড়ে আইসা দাঁড়ায় থাকবি। আমরা যে দোকান থেকে পুরান বই কিনতাম সেই দোকানের সামনে। আমরা তরে তুলে নিব।

পারুল খুশি হয়ে বলল, আচ্ছা।

পরের দিনটা ছিল মেঘলা। সকালের দিকে পারুল, ঝুমা, জাহিদ আর মিল্টন লালবাগ কিল্লা ঘুরে বেড়াল। জাহিদের বন্ধু মিল্টন সূত্রাপুর থাকে। ঝুমার সঙ্গে মিল্টনের সম্পর্ক বছর দুয়েকের। লম্বা, শুকনো আর শ্যামলা মতন দেখতে মিল্টন। ওদের পরিবার চাইনিজ মোটরসাইকেল ইমপোর্ট করে। বিজয়নগরে শোরুম আছে...

দুপুরে নীলক্ষেতে তেহারি খাওয়াল ঝুমা। নীল রঙের শাড়ি পরেছে। ফরসা আর সুন্দরী ঝুমা। নীল শাড়িতে ভালো মানিয়েছে। ঝুমা আর মিল্টনের বিয়ের কথাবার্তা চলছে .. খেতে খেতে সে তথ্য ফাঁস করে দিল। বিয়ে হবে পারিবারিক ভাবেই। খবরটা শুনে জাহিদ ক্ষুন্ন হয়েছে বলে মনে হল পারুলের। জাহিদের মোতালেব প্লাজায় সেই মোবাইলের দোকানে চাকরিটা হয়নি। সকাল থেকেই গুম হয়ে ছিল। জাহিদের বাবার হাঁপানির সমস্যা আছে; এক রকম কর্মহীন মানুষ তিনি। বংশাল দুটো দোকান আছে জাহিদদের। সেই ভাড়ার টাকায় সংসার চলে। বেকার জাহিদের অস্থির লাগবেই।

বলাকায় ‘মনপুরা’ চলছিল। মিল্টন আগেই টিকিট কেটে রেখেছিল। পরীর মৃত্যু ঝুমা আর পারুল কে জোর ধাক্কা দিল মনে হল। যদিও বিচ্ছেদের কাহিনীটি ওরা আগে থেকেই জানত। মুখ কালো করে হল থেকে বেরুল ওরা। প্রাণপন কান্না চাপছিল। হল থেকে বেরিয়ে মেঘলা দিনের ভিড় - ভিড় ফুটপাতে হাঁটে ওরা। গাউছিয়া মার্কেট থেকে সুন্দর একটা চামড়ার ব্যাগ কিনে ঝুমাকে গিফট করল পারুল। ঝুমা খুশি। হঠাৎ জাহিদের দিকে চোখ গেল পারুলের । জাহিদকে ভীষন ক্লান্ত দেখাচ্ছে। পারুল বলল, আরে, তুমি অত চিন্তা কর কেন- আমার মেডিক্যাল সেন্টারে চাকরি হইব।

জাহিদ পঞ্চাশ হাজার টাকা ঘুষের কথা জানত। জাহিদ জিজ্ঞেস করে, চাকরি হইব বুঝলাম কিন্তু অত টাকা তুমি পাইবা কই?

পারুল ফস করে বলল, টাকা কবির চাচা ধার দিব কইছে।

এমনিতে মিল্টন-ঝুমার বিয়ের কথা শুনে জাহিদের মেজাজ বিগড়ে ছিল। সে ক্ষিপ্ত হয়ে বলল, ঐ কবির ফটকার টাকা নিবা তুমি?

পারুল ফুরফুরে মেজাজে ছিল। এখন পারদ নেমে এল শূন্যের ঘরে। পারুল চেঁচিয়ে বলে, কবির চাচা ফটকা! তোমারে কইছে, না? তোমার হাতে প্রমান আছে?

প্রমান চাও?

চাই!

প্রমান দিমু, খাড়াও।

হাঁটতে -হাঁটতে ওরা চারজন নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছিল। মিল্টন একটা সিগারেট ধরিয়ে টানছিল। ওর পয়সা আছে বলে ও ঝুমার খবরদারি মানে না। কালো টি-শার্ট আর জিন্সের প্যান্ট পরেছে। রাস্তায় চোখ। সিএনজি খুঁজছে। রাস্তার ওপর একটা সিএনজি থেমে ছিল।

ঝুমা ধমক দিয়ে বলে, এই! তুমরা কি শুরু করলা?

কবির ফটকার টাকা নিলে তুমার সঙ্গে আমার আর সম্পর্ক নাই। কথাটা বলে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করে জাহিদ। পারুলের কথায় মাস দুয়েক ধরে সিগারেট কমিয়ে দিয়েছিল। আজ সারাদিন একটা সিগারেটও খায়নি সে । অনেক ক্ষণ ধরে বুকের ভিতরে কেমন ফাঁপড় লাগছিল। এখন সিগারেটর ধরিয়ে জানান দিল-সে আর পারুলকে পাত্তা দেয় না।

পারুলের মাথায় আগুন ধরে যায়। ও এদিক-ওদিক তাকায়। তারপর হন হন করে রাস্তায় থেমে থাকা সি এন জি-র এগিয়ে যায়। মেঘলা দিনের বৃষ্টিতে পারুল অনেকটাই ভিজে গেছে। সেসব অবশ্য খেয়াল করছে না।

ঝুমা কিছুটা দৌড়ে ওর পিছন পিছন যেতে যেতে বলে, এ্যাই পারুল, এ্যাই। তুই আমাদের লগে যাবি না? মিল্টনে বসুন্ধরায় নিয়া যাইব। থাই সুপ খাওয়াইব কইছে।

পারুল উত্তর দেয় না। শরীর ভরতি রাগ নিয়ে সিএনজি তে ‘নারিন্দা চলেন’ বলে উঠে বসে।

সিএনজি চলতে শুরু করে।

জাহিদের সঙ্গে পারুলের সেই শেষ দেখা ...



তিন দিন পর আলম কবুতরখোলা থেকে ফিরে আসে।

এসে পারুলকে ফোন করে দেখা করার জন্য।

বিধ্বস্ত চেহারা। মুখে দাড়ি গজিয়েছে। পারুল টের পায় আলম ভাইয়ের কিছু একটা হয়েছে। খুব খারাপ । আলম ভাই সব খুলে বলে। জোছনার বিয়ে হয়ে গেছে। গ্রামের এক স্বচ্ছল পরিবারের ছোট ছেলের সঙ্গে গত এক বছর ধরে জোছনার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আলম ভাই টের পায়নি। এবার গ্রামে গিয়ে সব জানতে পারে। মা অবশ্য অন্য জায়গায় বিয়ে ঠিক করে রেখেছিল। ক্ষুব্দ হয়ে সে বিয়ে ভেঙে দিয়েছে। অস্থির লাগছিল। ঢাকায় চলে এসেছে।

বলেন কি! পারুল স্তব্দ হয়ে যায়।

হ। জোছনা এমন ব্যবহার করবে জানলে কোরিয়া থেকে ফিরতাম না। আমার কত টাকা নষ্ট হইল। ফেরার পথে শখ কইরা সিঙ্গাপুর থেকে শাড়ি-গয়নাগাঁটি কিনছিলাম। এখন? বলে আলম ভাই খোঁচা খোঁচা দাড়িতে হাত বোলায়।

পারুল বিপদের আঁচ পায়। আলম ভাই যদি এখন আমাকে বিয়ে করতে চায়?

আপনি এখন কি করবেন? সাবধানে জিজ্ঞেস করে পারুল।

আলম কাঁধ ঝাঁকায়। বলে, আমি আর কোরিয়া যাব না। পোর্টে কাজ করতাম। ওইখানে অনেক কষ্ট। বরফ পড়ে। জোছনার জন্য এত কষ্ট করতাম। ওই যখন ফাঁকি দিল ...শালার। ভাবতেছি ঢাকায় ব্যবসা করব। কবুতরখোলা আর যাব না।

কন কী! আপনি আর কবুতরখোলা যাবেন না?

না। কবুতরখোলায় থাকলে কখন জোছনার জামাইয়ের কল্লা দায়ের এক কোপে নামায়া দেই ...শালার ...

পারুলের বুক কাঁপে। বলে, থাক। আপনি তাইলে আর কবুতরখোলা যাইয়েন না।

না, যামু না। আলম বলে। আমার এক বন্ধু প্রিন্স প্লাজায় চাইনিজ মোবাইলের শোরুম নিছে। শওকতের পার্টনার দরকার। আমি ওর পার্টনার হব ভাবতেছি। তুমি তুমার টাকার জন্য ভাইবো না। টাকা তুমি কালই নিয়া নিও। তোমার চাকরি দরকার পারুল-আমি বুঝি ...

আচ্ছা, দিয়েন। পারুলের বুক ধকধ করে।

এরপর সুর নরম করে আলম বলে, একটা কথা বলি পারুল।

বলেন। পারুলের মনে হল ঘরটা দুলছে। ঘরে কেউ নেই। বাড়িউলি জিন্নাতুন বেগম ড্রইংরুমে বসে টিভি দেখছেন। কাজের মেয়ে কুলসুম রান্নাঘরে।

তোমারে আমার পছন্দ পারুল। আলমের কন্ঠে গভীর আবেগ।

পারুল চুপ করে থাকে। কানের লতিতে তাপ টের পায়। হাতের তালু ঘেমে যাচ্ছে। তলপেটের কাছে কেমন একটা শিরশিরানি।

এখন তুমি কি বল?

পারুল কিছুক্ষণ মাথা নীচু করে থাকে। বুকটা ভীষণ কাঁপছে। বলল, না, আলম ভাই। আপনি আমার ভাই লাগেন। আর ... আর ... আমি একজনকে পছন্দ করি। কথাটা বলার পর জাহিদের মুখটা মনে পড়ল। মুহূর্তেই রাগ টের পেল পারুল। কত্ত বড় সাহস! কবির চাচাকে বলে ফটকা। আমি মানা করার পরও সিগারেট ধরায়।

আলম চুপ করে থাকে। কেমন বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। লোকটা ভালোই। বলে, তুমার যা ইচ্ছা। আমি জোর করব না।

আমি এখন যাই। বলে ও দ্রুত বাড়ি ফিরে এসে কবির চাচাকে ফোন করে।

পরদিন বিকেলে কবির চাচা এসে টাকা নিয়ে যায়। এই গরমেও মাঝবয়েসি লোকটার গলায় লাল মাফলার প্যাঁচানো। সব সময় সাদা শার্ট পরে থাকেন । গায়ে সিগারেটের গন্ধ। মাথার সামনের দিকে টাক, শুকনো, গায়ের রং কালো। কন্ঠস্বরটি কিন্তু ভরাট। জুরাইন কবরস্থানের কাছে বাড়ি। অবশ্য কখনও যাওয়া হয়নি। কবির চাচাকে পারুলের ভালোই লাগে। ভদ্র । মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় মাথা নীচু করে থাকে। অথচ জাহিদ বলে -কবির হোসেন লোক ভালো না। ফটকাবাজ। বড়লোকের বাগানবাড়িতে মেয়ে সাপলাই দেয়, সিনেমায় এক্সট্রা সাপলাই দেয়। এসব কথা শুনলে রাগ হয় না?

কবির চাচা টেলিফোন করে ইন্টারভিউর তারিখ জানিয়ে দিলেন। ৮ তারিখে ইন্টারভিউ। বললেন, ৯টার মধ্যে অফিসে উপস্থিত হইবা মা। না পারলে চাকরি পাইবা না, টাকাও ফেরত পাইবা না।

যাব, চাচা। আপনি টেনশন কইরেন না।

৮ তারিখ বুধবার। সাতটার মধ্যে তৈরি হয়ে ঘর থেকে বের হয় পারুল। আব্বা কাল রাতে ফিরেনি। আব্বা ইদানীং প্রায়ই বাড়ি ফিরছে না। ইদানীং আব্বাকে মলিন দেখায়। এখনও সোনাদানা হাতে আসেনি। বাজারে ধারদেনা বাড়ছে। ক’দিন হল মায়ের গয়নার বাক্স পাওয়া যাচ্ছে না। বাক্সটা আলমারীতে ছিল। এ নিয়ে বাড়িতে তুলকালাম। রুমাকে মায়ের সন্দেহ। রুমা পারুলের ছোটবেন। কলেজে পড়ে। পাড়ার এক উঠতি মাস্তানের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। পারুলের ধারণা কাজটা আব্বার । ইদানীং কেমন সন্দেহ হয় পারুলের-ওদের সংসারের এই দূরাবস্থার জন্য কবির চাচা দায়ি নন তো? জাহিদ কবির চাচা সহ্য করতে পারে না। জাহিদ রগচটা হলেও অসত্য বলে না। কেমন একটা সারল্য আছে ওর ভিতরে। কবির চাচা কি সত্যিই ধান্ধাবাজ ? পারুলের বুক কাঁপে।

রোদ ঝলমলে দিন। যাত্রাবাড়ির মেডিকেল সেন্টারের গেটের ওপরে বড় করে লেখা ‘রউফ মেডিকেল সেন্টার’। আট হাজার টাকা বেতন। বেতনের টাকায় আগে বাড়িভাড়া শোধ করবে। বাড়িউলি জিন্নাতুন বেগম ভাড়ার জন্য চাপ না দিলেও মাঝেমাঝেই খোঁটা মারেন। সেটা সহ্য হয় না। বাসায় অবশ্য বেতন কম করে বলতে হবে। নইলে আব্বা টাকা চেয়ে নিয়ে সোনাদানা খোঁজার কাজে খরচ করবে। পারুল একটা টিউশনি করে। মাস গেলে ২০০০ টাকা পায়। আব্বা মাঝে-মাঝে দু-চার পাঁচশ টাকা চেয়ে নেয়। বলে, একবারে সব শোধ করে দিমু মা। বাড়ি ভাড়া দিতে না হলেও বাজার-সদাই, ইলেট্রিক বিল আর গ্যাসের বিল দিতে হয়। পারুলের টেনশন হয়, আব্বা না আবার আলম ভাইয়ের কাছে টাকা চেয়ে বসে । তখন আর লজ্জ্বার শেষ থাকবে না। আলম ভাইকে গত রাতে ফোন করে ইন্টারভিউর কথা বলেছিল পারুল। হাজার হলেও বিনা দলিলে এত টাকা দিলেন। আলম ভাই বললেন, দশটার দিকে ফোন করে খোঁজ নেবে ইন্টারভিউ কেমন হল ।

রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মেটাল পারুল। সাদা রঙের সালোয়াল-কামিজ পরেছে। সবুজ ওড়না। ওর হাতে একটা নীল রঙের ফাইল। তাতে সার্টিফিকেটগুলি আছে। কম্পিউটারের কোর্স করেছে দুটো । এক্সেল জানে। সে সব সনদপত্রও আছে ফাইলে।

গেটে ঢোকার মুখে ঝুমার ফোন। একবার ভাবল অফ করে দেয় ...আজ একটা বিশেষ দিন। পরে কী মনে করে ধরল।

হ্যালো, ঝুমা, ক।

ঝুমা চিৎকার করে বলে, জাহিদ ভাই এ্যাক্সিডেন্ট করছে। জলদি তুই মেডিকেল কলেজ আয় ... ঝুমার কথা শেষ হয় না।

যেন মৃদু ভূমিকম্প হল । হাত থেকে ফাইল আর মোবাইলটা পড়ে যেতে যেতে সামলে নিল পারুল। বুক ভীষণ কাঁপছে। চোখে ঝাপসা দেখে। খালি একটা সিএনজি। এদিকেই আসছিল। ‘মেডিকেল কলেজ’ বলে উঠে পড়ে পারুল।

পারুলের মনে হল ওর ভীষণ জ্বর। আর চারপাশ ভীষণ রকম শব্দহীন। চারপাশের শব্দগুলি ওর কানে পৌঁচ্ছাচ্ছে না। ঘাম হচ্ছে ভীষণ। কন্ঠনালী শুকিয়ে আছে। জাহিদের মুখটা মনে করতেই মুখটা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যাচ্ছে।

কখন যে পৌঁছে গেল মেডিকেল কলেজের সামনে। গেটের কাছে ভিড়। রিকশার জটলা। চেনা কাউকে দেখা গেল না। ঘোরের মধ্যে ভাড়া মিটিয়ে এলোমেলো পায়ে হেঁটে গেটে কাছে চলে এল। জাহিদ আমার ওপর জিদ করল। হঠাৎ চোখে পড়ল মিল্টন ভাই। মটরসাইকেল থেকে নামছে। মিল্টন ভাই- বলে দৌড়ে যায় পারুল।

তুমি কার কাছে শুনলা? মিল্টন ভাই জিজ্ঞেস করে।

ঝুমায় ফোন করছিল। জলদি ভিতরে চলেন। কি হইছিল?

সকালবেলা জাহিদে বংশাল গেছিল ভাড়ার টাকা তুলতে। রাস্তার পার হওয়ার সময় প্রাইভেট কার ধাক্কা মারছে।

ওহ্ । মিথ্যা কথা। মিল্টন ভাই মিথ্যা বলছে। সত্যি কথাটা পারুল ছাড়া কেউ জানে না।

হাসপাতালের করিডোরে ভিড়। ফিনাইলের গন্ধ। বমি পায় পারুলের। মিল্টন ওর হাত ধরে আছে। কে যেন চিৎকার করে কাঁদছে । পারুলের দৃষ্টি ঝাপসা, মাথার ভিতরটা কেমন অবশ হয়ে আসছে ... জাহিদ বাঁচবে তো । ওর সঙ্গে ভীষণ জরুরি কথা ছিল। ... কালো রঙের একটা কালেপসঅ্যাবল গেটের এ পাশে ঝুমা দাঁড়িয়ে। ও বোরখা পরা একজন মহিলাকে জড়িয়ে ধরে আছে। জাহিদের মা? মহিলা কাঁদছেন। ঝুমা কাঁদছে। ওদের পাশে জাহিদের ছোট বোন নাজমা -সেও কাঁদছে। জাহিদের বাবাকেও দেখতে পেল পারুল। পায়জামা পাঞ্জাবি পরা বৃদ্ধ অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে।

মিল্টন ঝুমার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ঝুমা ওকে দেখে মাথা নাড়ল।

সব শেষ!

পারুলের মাথা টলে ওঠে। অতল এক খাদের কিনারে পৌঁছে ...কে যেন ওকে জড়িয়ে ধরে আছে। নাজমা? না ঝুমা? ওর শরীরটা ভীষণ ভারি ঠেকছে। পরক্ষণেই হালকা হয়ে এল। ভিজে শরীর জুড়ে কী রকম তাপ ছোটাছুটি করছে ...

পারুলের মোবাইলটা বাজছে।

আলম ভাই।

ফোনটা রিসিভ করার আগে একবার জাহিদের মুখটা দেখার খুব ইচ্ছে হল ওর ...

মন্তব্য ১০ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (১০) মন্তব্য লিখুন

১| ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ সন্ধ্যা ৭:২৯

বিনবি বলেছেন: ভালো লাগলো।

১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ সন্ধ্যা ৭:৩৭

ইমন জুবায়ের বলেছেন: :)

২| ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ রাত ৯:৫১

রেজোওয়ানা বলেছেন: এমন দিনে এমন একটা গল্প লিখলেন.......

১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ রাত ৯:৫৪

ইমন জুবায়ের বলেছেন: :(

৩| ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ রাত ৯:৫৮

রেজোওয়ানা বলেছেন: আজকে রেডিও মিরচির গানের এওয়ার্ড দেয়ার অনুষ্ঠান দেখলাম।
গানের অনেক গুলো ক্যাটাগরীর মধ্যে একটা দেখলাম, সুফি ট্রাডিশনের গান! ইমন ভাই সুফি ট্রাডিশনের গান বলতে কি বোঝায়, সুফি দর্শনের প্রভাবিত গান, নাকি অন্য কিছু?


এইটা সুফি ট্রাডিশনের গান হিসাবে বেস্ট হয়েছে।

১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ রাত ১০:১৫

ইমন জুবায়ের বলেছেন: সুফি দর্শনের প্রভাবিত গান।

৪| ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ রাত ১০:০৯

মেহবুবা বলেছেন: জীবন ঘনিষ্ট গল্প ।

১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ রাত ১০:১৬

ইমন জুবায়ের বলেছেন: ধন্যবাদ।

৫| ০৯ ই মে, ২০১২ রাত ১১:৫৭

বিরোধী দল বলেছেন: Manuser koto kosto :( :( :(

১০ ই মে, ২০১২ ভোর ৫:০৫

ইমন জুবায়ের বলেছেন: অনেক কষ্ট। :)

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.