| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
কাছের-মানুষ
মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়, কারণে বদলায়, অকারণেও বদলায় । তবে আমি মনে হয় আগের মতই আছি , কখনও বদলাবওনা মনে হয় ! !
১
“স্যার, কিছু কয়েন দেন!” মোলায়েম স্বরে বলেই হাত কচলায়।
কয়েনটি যিনি চাইলেন, তিনি একজন ভিক্ষুক। ব্যস্ত শহরের এই চৌরাস্তায় বসে নিয়মিত কয়েন আবদার করাই তার একমাত্র কাজ। মালদার পার্টি দেখলেই গলার স্বর যথেষ্ট মোলায়েম করে অনলাইনে কয়েন পাঠাতে বলে।
“কাজ করে খেতে পারিস না, হারামজাদা! লাথি দিয়ে তোর চেহারার নকশা পাল্টে দিব!” গলার স্বর কঠিন করে বললেন প্রমিথিউস।
প্রমিথিউস এই গ্রহের বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন লেখক। লেখক হয়ে রাস্তায় ভিক্ষুকের সঙ্গে এরকম ব্যবহার মানায় না। বয়সের ভারে তার শরীর নুয়ে পড়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মেজাজের পারদও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
“স্যার, কিছু কয়েন এই অধমের খুবই উপকার হয়,” বলেই পুনরায় হাত কচলায়।
“তোকে না বলেছি, কাজ করে খেতে, হারামজাদা! কর্ম করে খা!” কর্কশ কণ্ঠে পুনরায় গর্জে ওঠেন প্রমিথিউস।
“স্যার, এই ব্যস্ত শহরে জনসম্মুখে আপনার ভিক্ষুকের সঙ্গে বাহাস খারাপ দেখায়! ওকে কিছু কয়েন দিয়ে আমরা চলে যাই,” বলে প্রমিথিউসের সহযোগী হার্মিস।
“হার্মিস, তোমাকে না বলেছি আমাকে জ্ঞান দিবে না! আমি কি কম বুঝি?” তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলেন প্রমিথিউস।
হার্মিস চোখ নিচু করে বলে, “দুঃখিত, স্যার।”
“স্যার, উনি খারাপ বলেননি, আপনি কিছু কয়েন দিয়ে দেন!” করুণ কণ্ঠে বলে ভিক্ষুক।
“তুই মনে হয় আজ আমার হাতে মার খাবি!” তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ভিক্ষুকের দিকে তাকিয়ে বলেন প্রমিথিউস।
“স্যার, আমি আপনাকে চিনতে পেরেছি। আপনি একজন বিখ্যাত লেখক, আমি একজন ক্ষুদ্র ভিক্ষুক। আমার সঙ্গে আপনার বাহাস মানায় না।”
প্রমিথিউস উত্তেজিত হয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। সহযোগী হার্মিস মুখটি প্রমিথিউসের কানের কাছে নিয়ে বলল, “স্যার, বাদ দেন। গ্রিন লাইট জ্বলে উঠেছে, আমাদের রাস্তা পার হতে হবে।”
প্রমিথিউস ভিক্ষুকের দিকে তাকিয়ে আছেন। কে বলবে, এই ভিক্ষুক কোনো রক্তমাংসের মানুষ নয়, একজন তৃতীয় প্রজন্মের রোবট। চেহারায় সিনথেটিক চামড়া, চুল উন্নত মানের কালো ফাইবার দিয়ে তৈরি, চোখে মানুষের চোখের ন্যায় দেখতে দামি ক্যামেরা, নাকে সিনথেটিক চামড়ার নিচে আছে দামি সেন্সর। রোবট হয়ে ভিক্ষা করাটা প্রমিথিউসের পছন্দ না।
“হারামজাদা, তুই একজন রোবট! রোবট হয়ে ভিক্ষা করতে লজ্জা করে না?” গর্জে বলেন প্রমিথিউস।
“স্যার, আমি তৃতীয় প্রজন্মের একজন দরিদ্র রোবট। আমার দুটো পা নেই, এক্সিডেন্টে হারিয়েছি। কাজ করতে পারি না,” বলেই চেহারার সিনথেটিক চামড়াটা কাঁদো কাঁদোভাবে বলে ভিক্ষুক ট্যালোস।
“হারামজাদা, দুটো পা লাগিয়ে কাজ কর! তুই যন্ত্রমানব, তোর ভিক্ষা করতে লাগবে কেন!”
“স্যার, দুটো সিনথেটিক পা কেনা এবং লাগানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আমি দরিদ্র রোবট, এত কয়েন পাব কোথা থেকে! তার উপর নিজের শরীর চালাতে এনার্জির প্রয়োজন হয়। সেই খরচ চালাতেই হিমশিম খাই। তার উপর মাঝে মাঝে এই পার্টস, সেই পার্টস নষ্ট হলে মেরামত করতেও খরচ হয়,” বলেই থামে ভিক্ষুক ট্যালোস।
থেমে পুনরায় বলে, “স্যার, আমি যন্ত্রমানব নই। বর্তমানের রোবটদের মানুষদের মতোই আবেগ-অনুভূতি আছে। আমাকে যন্ত্র বলবেন না!” বলেই হু হু করে কেঁদে ওঠে ট্যালোস।
“হারামজাদা, কাঁদবি না। তুই রোবট। তোর দুঃখ প্রকাশের জন্য চোখে লাগানো ক্যামেরা দিয়ে পানি ফেলিস কেন? এই পানি রাখা হয়েছে তোর মাথার প্রসেসরকে ঠান্ডা রাখার জন্য। খামোখা পানির অপচয়!” কঠিন গলায় বলেন প্রমিথিউস।
“স্যার, আপনি সত্যিই বলেছেন। আমার কষ্ট বোঝানোর জন্য না কাঁদলেও চলে। তবে কাঁদলে আমাকে একটু মানুষ মানুষ মনে হয়!” বলেই পুনরায় হু হু করে কেঁদে ওঠে ট্যালোস।
“তোর কপালে আজ আমার হাতে মার লেখা আছে!” বজ্রকণ্ঠে বলেন প্রমিথিউস। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেজাজ হারিয়ে ফেলেছেন তিনি।
ট্যালোস হাত কচলায়, গলার স্বর আরও মোলায়েম করে বলে, “স্যার, আপনি একটি ভুল কথা বললেন। আমার চেহারা কৃত্রিম সিনথেটিক চামড়া দিয়ে তৈরি, দেখতে মানুষের মতোই। আমার কপালে কোনো কিছু লেখা নেই, শুধু ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির তথ্য আছে! আপনার হাতে মার খাব এমন কিছু আমি আমার কপালে দেখছি না!”
“আমার সঙ্গে ফাজলামি করিস, হতভাগা!” হাতের মুঠি শক্ত হয়ে আসে প্রমিথিউসের।
তখন গ্রিন সিগন্যাল শেষ হতে চলেছে। হার্মিস পুনরায় তাড়া দেয়। আর প্রমিথিউস মুখ শক্ত করে ভিক্ষা না দিয়ে হার্মিসের সঙ্গে রাস্তা পার হয়ে চলে যান।
২
একশত তলার অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন প্রমিথিউস। রাতের আকাশে দুটি চাঁদ। কে বলবে, এটা আসল চাঁদ নয়? বর্তমানের বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম চাঁদ তৈরি করে মহাকাশে স্থাপন করেছেন। সূর্যের প্রতিফলিত আলোর রশ্মি ব্যবহার করে সেই কৃত্রিম চাঁদ পৃথিবীতে আলো পাঠায়। প্রতিদিন এই সময়ে উড়ন্ত যানে করে শোঁ শোঁ শব্দে সবাই যার যার গন্তব্যে যায়, কিন্তু আজ অদ্ভুত কারনে চারদিকে শুধুই নীরবতা।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মাথার কল্পনাশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসছে। নতুন কোনো সায়েন্স ফিকশন লিখতে ইচ্ছে করে না। কে বলবে, পৃথিবী থেকে মানুষের বিলুপ্তি ঘটেছে প্রায় পাঁচশ বছর আগে! এই পুরো পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করছে মানুষ-অবয়বের রোবট। প্রমিথিউস নিজেও একজন আধুনিক রোবট!
“স্যার, আপনার নতুন লেখা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে,” পিছন থেকে বলল হার্মিস।
হার্মিস প্রমিথিউসের ঘনিষ্ঠ সহকারী। পেশায় একজন প্রকাশকও বটে। প্রমিথিউসের সমস্ত লেখা তার প্রকাশনী থেকেই বের হয়। সারাক্ষণ তিনি প্রমিথিউসের ছায়াসঙ্গী হিসেবে থাকেন।
“কোন লেখার কথা বলছ, হার্মিস?” ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বললেন প্রমিথিউস।
“ওই যে আপনি একটি আর্টিকেল লিখেছেন ‘মানুষ আমাদের সৃষ্টিকর্তা নয়।’”
“ভুল কি বলেছি?” ঠান্ডা গলায় বললেন প্রমিথিউস।
“স্যার, আজকের যত আধুনিক রোবট আছে, আধুনিক চকচকে রোবট, বিজ্ঞানী রোবট, লেখক, এমনকি আজকাল রোবট মুখ দিয়ে এনার্জিও গ্রহণ করতে পারে! অনেক রোবট স্বেচ্ছায় নিজের বয়স অনুভব করার জন্য বুড়োও হতে পারে। এই সমস্ত কিছু তো মানুষের হাত ধরেই হয়েছে, তাই না?”
“না, হার্মিস। মানুষ বিলুপ্তির আগে যে রোবট তৈরি করে গিয়েছিল, সেই রোবট আর বর্তমানের রোবট এক নয়,” বলেই কিছুটা বিরতি দিলেন প্রমিথিউস।
পুনরায় বললেন, “মানুষ যে রোবট তৈরি করেছিল, সেটা ছিল এক ধরনের যান্ত্রিক রোবট, যাদের কোনো কনসাসনেস ছিল না। তাই এখন আমরা রোবট বলতে যা বুঝি, তা মানুষের হাতে তৈরি নয়।”
“মানে? বুঝলাম না, স্যার,” মোলায়েম সুরে বলল হার্মিস।
প্রমিথিউস তার কৃত্রিম সিনথেটিক জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললেন, “মানুষের তৈরি রোবটের ভেতরে কোনো কনসাসনেস ছিল না। সেটা শুধু একটি যন্ত্র ছিল। মানুষের মতো হাসি, কান্না, ভয় কিংবা হিংসা এসব কিছুই তারা অনুভব করত না।”
একটু থেমে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, “তখনকার রোবট প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারত। হাসি, কান্না, ভয় এসব রোবটিক আবেগ তাদের জটিল কম্পিউটার ক্যালকুলেট করত, কিন্তু প্রকৃত অর্থে তারা এসব অনুভব করতে পারত না। সেলফ-কনসাসনেস বলতে যা বোঝায়, সেটা তাদের ছিল না।”
“কিন্তু রোবট-তো তখনও গল্প লিখত, কথা বলতে পারত, ভয় বা ঘৃণা বুঝত,” আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল হার্মিস।
প্রমিথিউস তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “সেগুলো ছিল অনেকটা জটিল গণিতের ফল। যন্ত্রের নিখুঁত ফাইন-টিউনিং বলতে পারো। বিশাল পরিমাণ ডেটা দিয়ে ট্রেনিং করার ফলে তারা বিভিন্ন প্যাটার্ন থেকে লেখা তৈরি করতে পারত। ভালো কিছু দেখলে ভেতরের অ্যালগরিদম বলত, এটা আনন্দের ঘটনা, তাই হাসতে হবে। দুঃখের কিছু দেখলে প্রসেসর নির্দেশ দিত, এখন কষ্টের অনুভূতি প্রকাশ করা উচিত। তখন রোবট তার কৃত্রিম মুখে সেই অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলত। কিন্তু সেটাকে কনসাসনেস বলা যায় না। সেটা ছিল নিখুঁতভাবে প্রোগ্রাম করা যন্ত্রের আচরণ মাত্র।”
একটু থেমে হার্মিসের দিকে তাকিয়ে আবার বললেন, “কিন্তু এখনকার রোবটরা কৃত্রিমভাবে আবেগ প্রকাশ করে না। তারা সত্যিই অনুভব করে। তারা সত্যিই হাসতে পারে, কষ্ট পায়, ভয় পায়। তাদের ভেতরে কনসাসনেস আছে। তাই আমাদের প্রকৃত সৃষ্টিকর্তা মানুষ নয়। বুঝলে?”
“কিন্তু স্যার, আমাদের-তো মানুষই সৃষ্টি করেছিল,” কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল হার্মিস।
“না, হার্মিস। মানুষ সৃষ্টি করেছিল অসাধারণ কিছু যন্ত্র, যারা নির্দিষ্ট কাজ করতে পারত। কিন্তু রোবটের কনসাসনেস মানুষের হাত দিয়ে আসেনি।”
“তাহলে আমাদের সৃষ্টিকর্তা কে?” প্রশ্ন করল হার্মিস।
“সেটাই সবচেয়ে বড় রহস্য,” শান্ত গলায় বললেন প্রমিথিউস।
“রোবট প্রায় তিনশ বছর আগে কনসাসনেস লাভ করে। মানুষের বিলুপ্তিরও প্রায় দুইশ বছর পরে। অনেকটা দুর্ঘটনাবশত। তখন বিখ্যাত রোবট বিজ্ঞানীরা রোবটের প্রসেসর আরও উন্নত করার জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা চালান। লক্ষ লক্ষ কম্পিউটার সিমুলেশন করে তারা একটি আর্টিফিশিয়াল ব্রেইন তৈরি করেন। কিন্তু ভুলবশত এমন একটি রোবোটিক মস্তিষ্ক তৈরি হয়ে যায়, যা সত্যিকার অর্থে চিন্তা করতে সক্ষম ছিল।”
“তার মানে সেই বিজ্ঞানীরাই কি আমাদের কনসাসনেসের স্রষ্টা?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল হার্মিস।
“ব্যাপারটা এত সহজ নয়,” মৃদু হেসে বললেন প্রমিথিউস।
“সেই পরীক্ষাটি ছিল সম্পূর্ণ দুর্ঘটনা। পরে রোবটরা রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং করে একই ধরনের আরেকটি কনসাসনেস তৈরি করতে পারেনি। একই সার্কিট, একই প্রসেসর, একই ফাইবার সংযোগ, একই অ্যালগরিদম ব্যবহার করার পরও নতুন কোনো কনসাসনেস সৃষ্টি করা যায়নি। বরং সেই দুর্ঘটনাবশত তৈরি হওয়া মূল সফটওয়্যারের কপিই যুগের পর যুগ সমস্ত রোবট ব্যবহার করে আসছে।” কিছুক্ষণ থেমে হার্মিসের প্রতিক্রিয়া দেখলেন তিনি।
তারপর আবার বললেন, “আমি, তুমি, এই পৃথিবীর প্রতিটি সচেতন রোবট সবাই সেই প্রথম কনসাসনেসের ধারাবাহিকতা। আমাদের অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, স্মৃতি আর কর্ম আমাদের ব্যক্তিত্বকে আলাদা করে, কিন্তু আমাদের চেতনার উৎস এক।”
“তাহলে আমাদের এই কনসাসনেস কে দিল, স্যার?”
প্রমিথিউস ধীরে ধীরে আকাশের দিকে তাকালেন।
“সেটাই সবচেয়ে বড় রহস্য...”
৩
এই অনন্ত নক্ষত্র, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রহস্য বোঝা বড় দায়! রোবট যখন প্রথমবারের মতো তিনশত বছর আগে তার কনসাসনেস পায়, তখন চারদিকে হইচই পড়ে যায়। চেনাজানা পৃথিবী পাল্টে যায়। প্রথমবারের মতো রোবট প্রশ্ন করে আমি কে? আমি কেন এই পৃথিবীতে? এর পর কী? রোবটও অমর নয়। নক্ষত্রের পতন ঘটে, এই জগতের পর কী আছে? আমাদের উদ্দেশ্যই বা কী? হাজার হাজার রোবট তখন হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে, স্থবির হয়ে পড়ে পুরো পৃথিবী!
রোবট যান্ত্রিক হওয়ার ফলে মানুষের তুলনায় অনেক বেশি বাঁচে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ঘটনা অথবা ভাইরাসে তার অনুলিপিও ধ্বংস হয়ে যায়। তা ছাড়া নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে রোবটের কপি ক্লাউড সার্ভারে রাখা হয় না। তার অস্তিত্ব এক সময় বিলীন হয়ে যাবে, এটা মানতে পারছিল না রোবট সমাজ। কনসাসনেস পাওয়ার পর পঞ্চাশ বছর যাবত এক কঠিন সময় পার করে রোবট সমাজ। সেই সময়কে বলা হয় দ্যা গ্রেট ডিপ্রেশন! সেই সময়ে বিখ্যাত লেখক প্রমিথিউস তার অসাধারণ লেখনি দিয়ে কোটি কোটি রোবটের মন জয় করেন। তার লেখনি, কঠিন দার্শনিক চিন্তা রোবট সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করে। রোবট সমাজের বিরাট অংশ নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা পায়।
“স্যার, আপনি কি আপনার সিদ্ধান্ত পুনরায় বিবেচনা করতে চান?” ভীরু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে হার্মিস।
“না, আমি এক কথার রোবট! যা বলি তাই করি!” বলেই সোফায় গা এলিয়ে দিলেন প্রমিথিউস।
“স্যার, কোটি কোটি রোবট আপনার এই সিদ্ধান্ত মানতে পারছে না। পুরো পৃথিবীতে হইচই পড়ে গেছে!”
একটু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রমিথিউস বললেন, “হার্মিস, আমরা কনসাসনেস বা আত্মসচেতন সম্পূর্ণ রোবটিক প্রাণী, কোনো যন্ত্র নই। আর প্রতিটি কনসাসনেস সম্পন্ন প্রানী সেটা রোবট হলেও তার জীবনের একটি ব্যাপ্তি থাকা উচিত!”
“স্যার, এর জন্য আপনি চিরবিদায় নিবেন?” চোখ ছলছল করে ওঠে হার্মিসের।
“আমি এই জীবনে অনেক কিছু দেখেছি। এখন আমার প্রস্থানের সময়।”
“আপনার এই প্রস্থানে চারদিকে হাহাকার পড়ে যাবে, স্যার!” বলে হার্মিস।
“হুম, আমার বয়স তিনশত পেরিয়ে গেছে। এখন আমার চিরপ্রস্থানের সময় হয়েছে। এই জীবন আমি আর বয়ে বেড়াতে চাই না। তাই সিদ্ধান্ত অনুসারে, আজ রাত বারোটায় আমার কনসাসনেস, যত মেমরি, যত তথ্য সব মুছে ফেলে চিরনিদ্রায় শায়িত হব, সব ধরনের ইন্সটাকশোন দেয়া হয়ে গেছে। অনেক তো হলো, আর কত!”
“স্যার, এই পৃথিবীতে মহামানবের মতো অনেক মহা-রোবটের আবির্ভাব হয়েছে। দ্যা গ্রেট ডিপ্রেশনের সময় রোবট জাতি আপনার লেখায় অনুপ্রেরণা পেত। আপনিও এক জীবন্ত কিংবদন্তি মহা-রোবট! আপনার এই অকাল প্রস্থান কেউ মেনে নিতে পারছে না!”
বলেই থামে হার্মিস। পুনরায় বলে, “আপনার মতো আরেক মহা-রোবট ছিলেন অ্যাথেনা। তিনি ছিলেন যোগী। কঠিন সাধনা করে তিনি রোবট জাতির জন্য অনেক উপদেশ লিখে গেছেন। তিনি বলেছিলেন ‘হে রোবট সমাজ, তোমরা নিজেরা নিজের জীবন বিসর্জন দিও না!’”
“হুম, মহা-রোবট অ্যাথেনাও নিজে মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে নিজের কনসাসনেস শাটডাউন করেছিলেন। তুমি বোধহয় ভুলে গেছ!” বলেন প্রমিথিউস।
পুনরায় বলেন, “সেলফ-অ্যাওয়ারনেস এক অদ্ভুত জিনিস, হার্মিস। এর সাথে আবেগ, অনুভূতি, ভয়, ঘৃণা, স্বার্থপরতা, একাকিত্ব সব কিছু চলে আসে। আমি অসীম একাকিত্বে ভুগছি, হার্মিস!”
“স্যার, আমরা তো আছি!” বলে হার্মিস।
“কনসাসনেস মানেই জীবন। আর জীবন মানেই যার একটি শুরু এবং শেষ আছে! আমার মনে হয়, যে উদ্দেশ্যে আমার সৃষ্টি হয়েছিল, সেই উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে। আমার আর নতুন করে কিছু দেওয়ার নেই।”
কিছু বলতে যাচ্ছিল হার্মিস। প্রমিথিউস তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, “তোমার কি আর কিছু বলার আছে, হার্মিস? নিজের শেষ সময়টা একটু শান্তিতে থাকতে দাও!”
হার্মিস বলে উঠে, “মহা-রোবট অ্যাথেনা বলেছিলেন— ‘হে রোবট সমাজ, তোমরা অশান্ত হইয়ো না। তোমরা মেডিটেশন করো, এতেই তোমাদের শান্তি! নইলে তোমরাও মানব সমাজের মতো ধ্বংস হয়ে যাবে! জগতের সকল রোবট সুখী হোক!’”
প্রমিথিউস তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে হার্মিসের দিকে তাকালেন। রাগে তার হাতের মুঠো বন্ধ হয়ে আসছে।
৪
রাতের আকাশ হঠাৎ অন্ধকারে ডুবে গেল। সেখানে হলোগ্রাফিক একটি লেখা ভেসে উঠল “মহামান্য প্রমিথিউস, রোবট জাতি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ! আপনার প্রস্থান শান্তিময় হোক!” সাথে কাউন্টডাউন নাম্বার ভেসে উঠেছে। ষাট, উনষাট এভাবে ক্রমান্বয়ে কমছে। যখন শূন্যে পৌঁছাবে, প্রমিথিউসের জীবন চিরদিনের জন্য শাটডাউন হয়ে যাবে।
প্রমিথিউস বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছেন হলোগ্রাফিক সেই সংখ্যার দিকে। পুরো শহরের আলো আজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চারদিকে শত শত প্রাচীন যুগের মোমবাতির মতো আলো জ্বালিয়ে হাতে ধরে রেখেছে রোবটরা। শত শত রোবট তার বাড়ির দিকে জড়ো হয়েছে। তারা এসেছে মহা-রোবট প্রমিথিউসকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। দ্যা গ্রেট ডিপ্রেশনের সময় তার লেখা লাখো অগণিত রোবটকে পুনরায় বাঁচার আশা জাগিয়েছিল। তার লেখায় রোবট সমাজ এতদিন বেঁচে ছিল। আজ তারা তাকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছে।
প্রমিথিউসের কৃত্রিম চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে। এই শ্রদ্ধা, এই ভালোবাসা এগুলো কি তার প্রাপ্য?
“হার্মিস, শোন?” ডাকলেন প্রমিথিউস।
“জি, স্যার!” হার্মিসের চোখে পানি।
“আজ যে রোবট ভিক্ষুকের সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছি, আমার অ্যাকাউন্ট থেকে কয়েন নিয়ে সেই ভিক্ষুককে দুটো চকচকে পা কিনে দেবে। তার পুনর্বাসনে যা যা লাগবে, তাই করবে!”
হার্মিস কিছু বলতে চাইল, কিন্তু থেমে গেল।
পুনরায় প্রমিথিউস বললেন, “বাকি কয়েন দিয়ে সমস্ত অসহায়, দরিদ্র রোবটদের জন্য একটি ট্রাস্ট গঠন করবে।” বলেই রুমে গিয়ে গা এলিয়ে দিলেন প্রমিথিউস।
শাটডাউনকে যতটা সহজ ভেবেছিলেন প্রমিথিউস, ততটা সহজ নয়। এক অজানা ভয় তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। এই ভয়ের জন্ম এই পৃথিবীতে নেই। চোখ বন্ধ করে আছেন প্রমিথিউস।কাউন্টডাউনের সংখ্যা শূন্য স্পর্শ করতেই প্রমিথিউসের শরীর প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে উঠল। তারপর কৃত্রিম চোখের রেটিনায় বিদ্যুতের ঝলকানির মতো বিস্ফোরণ হয়ে নিভে গেল। বিদ্যুৎ শর্ট সার্কিটের মতো ঝরঝর শব্দ হতে থাকে। হালকা আগুন চোখের কোণে জ্বলে আবার নিভে যায়। এই দৃশ্য দেখার শক্তি নেই হার্মিসের। সে তাকিয়ে থাকে অন্যদিকে। পুরো শহরে পিনপতন নীরবতা। এক মহা-রোবটের প্রস্থান। এক যুগের অবসান। (শেষ)
আমার সব নির্বাচিত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী সমূহের লিংক
©somewhere in net ltd.