নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

পরিব্রাজকের পাঠশালা

শূন্য

বাউন্ডুলে পরিব্রাজক

বাউন্ডুলে পরিব্রাজক › বিস্তারিত পোস্টঃ

পরিব্রাজকের পাঠশালা

২৪ শে জুলাই, ২০১৩ বিকাল ৩:২৭

ওঃ মেলাদিন পরে দেখা, কোথায় ছিলেন?

উত্তর দিতে খানিকটা সময় নিই। অপরিচিত মুখ। আমি বিখ্যাত কোন লোক নই, সুতরাং আমার অপরিচিত লোক থাকারও কথা না। অবশ্যি পরিব্রাজকদের অনেকের সঙ্গেই হুট-হাট করে দেখা হয়ে যায়। নাম মনে না থাকলে মুশকিল। কিন্তু সামনে দাঁড়ানো লোকটার নাম তো দুরের কথা, চেহারাও মনে পড়ছে না। মুখের চামড়াও কুঁচকে গেছে রোদে পুড়ে। ত্রিশের কোঠায় বয়স। পান খেয়ে দাঁতের হতশ্রী চেহারা দেখে অবশ্য বয়স অনুমান করা শক্ত। নেহায়েত আমি ঘাগু লোক বলেই হাতের চামড়া দেখে বুঝতে পারছি। এসময় নিরাপদ হলো চুপ থাকা। অপরপক্ষ থেকে সিগন্যালের অপেক্ষায় থাকা। আমি মুখটা হাসি হাসি করে রাখলাম। আপনি তুমি সম্বোধন এড়িয়ে গেলাম সুকৌশলে।

: সিগারেট চলবে?

মাথা দোলালো লোকটা।

: চলেন চা খাই। সময় আছে তো আপনার?

আমি ঘড়ি পরিনা, মোবাইলও নেই। সুতরাং সময় দেখবার উপায় নাই। তবে বুঝতে পারছিলাম আমার বাস ছাড়তে এখনও দেরী হবে। বিবিরহাট আসবার পরে ইঞ্জিনে খানিকটা গোলমাল দেখা দিয়েছে। মেরামতে খানিকটা সময় লাগবে বোঝাই যাচ্ছে। চায়ের টং-এর সামনে দাঁড়িয়ে দু'কাপের অর্ডার দিলো লোকটা।

: যাবেন কোথায়?

: পাবলাখালী

: আবার?

আমি অসোয়াস্তিতে পড়ে গেলাম। বনে-বাঁদাড়ে, পাহাড়ে বেড়াতে ভালো লাগে আমার। তাই যাই। ঢাক পিটিয়ে প্রচার করবার মতন কিছু নয়, কিন্তু এ লোক জানলো কি করে? আবারও বোকার মতন হাসি দিলাম।



জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়েছে। সুর্য্য ডোবার আগে আলোর রেশ টেনে দিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমাকাশে। কুয়াশার সাগরে আধডোবা পাহাড়ের চূড়ায় নামছে রহস্যময় আঁধার। আমি অন্যদিকে তাকিয়ে রইলাম। চা শেষ হবার আগে আর কথা হলো না। চিন্তা করতে লাগলাম কোথায় দেখা হয়েছিলো লোকটার সাথে, কিছুক্ষণ কথা বলবার পরে একটু পরিচিত পরিচিত লাগাও শুরু করেছে। লোকটা যদি কাঁঠালি আঁঠা টাইপের কিছু হয় তাহলে ওকে খসানোর সবচেয়ে ভালো রাস্তা হলো পেচ্ছাব চেপেছে বলে এড়িয়ে যাওয়া। কিন্তু আমি এখনও বিরক্ত হইনি, কাজেই আরো কিছুক্ষণ কথা-বার্তা চালানো যেতে পারে। আমি মনে করতে থাকলাম লোকটাকে কোথায় দেখেছি। মনে আসি আসি করেও কেন যেন মনে আসছে না, খুবই অস্বস্তিকর ব্যাপার।

: আপনি মনে হয় আমাকে চিনতে পারেন নি?

জবাবে আমি লাজুকভাবে হাসলাম। একটু অপ্রতিভ ভাবে হেসে বেনসনের প্যাকেট বাড়িয়ে দিলো সে। যাক, ভালোই হল। আমিও বেশ খানিকক্ষণ ধরে সিগারেটের জন্য হা-পিত্যেশ করছিলাম। বাস নষ্ট হবার একটা ভালো দিকও আছে। আমি সিগারেট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমার কাছে দেশলাই নেই, সুতরাং, ভদ্রলোক সিগারেট না ধরানো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল। ভদ্রলোক?! নইলে কি? বেশভূষা যাচ্ছেতাই হলেও লোকটা বেনসন খায়। আমার দৌড় এ অব্দি গোল্ডলিফেই এসে ঠেকেছে। কায়দা করে আমার সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে নিজেরটাও ধরালো সে। নাক-মুখ দিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বলতে শুরু করলো,

: আমার নাম দুলাল। বিবিরহাটে আমাদের ছোট্ট একটা কাঠের ব্যবসা আছে। দুলাল ব্রাদার্স টিম্বার এন্ড স' মিল।

: ও আচ্ছা

দুলাল ভাই জোরে হেসে উঠলেন, "এমনভাবে বলছি যেন আপনি নাম শুনেই চিনে ফেলবেন। চেনারই কথা অবশ্য। আমরা পাঁচ ভাই। আমিই বড়। বাকি চারজন বেলাল, হেলাল, জালাল আর সবচেয়ে ছোটজন আলাল"

: বাঃ সব্বাই দেখছি লালে লাল।

: এবার চিনেছেন?

কম্বিনেশনটা শুনলে মনে থাকার কথা। কিন্তু আমার মনে পড়ছে না। এমন কম্বিনেশনের ভাই আমি ঢের দেখেছি। আমাদের পাড়াতেই তো তমাল, জামাল আর কামালরা থাকতো। হেব্বি মালামাল ফ্যামিলি। ফি হপ্তায় পার্টি-ফার্টি দেয়। উত্তর পাড়ায় থাকতো কামিল, জামিল আর শামিল। তিন ভাইয়ে সে কি মিল! তিনটে জমজ ভাই হলে তাকে কি বলে সেটা অবশ্যি জানা নেই আমার। এদিকে দুলাল সাহেবকে কিভাবে বোঝাই? আমি বোকা বোকা চেহারা করে দাঁড়িয়ে রইলাম। দুলাল ভাই খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। এ সময় ঠিক কি বলতে হয় জানা নেই। আমি উদাস হয়ে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ধূমপান করতে থাকলাম। মোটামুটি অন্ধকার নেমে পড়েছে। পাহাড়ে ঝুপ করেই আঁধার নামে। দুলাল ভাই সিগারেট শেষ করে বিদায় নিলেন। যাবার সময় বিড়বিড় করে বলছিলেন, "রাস্তা ভালো না। আপনার যেতে মাঝরাত হয়ে যাবে আবারও"



রাত আটটার সময় বাস ঠিক হলো। বাসটা হেলতে দুলতে রওনা দিয়েছে বটে, তবে ভাব-গতিক বিশেষ সুবিধের মনে হচ্ছে না। ইঞ্জিনের প্রবল গোঁ গোঁ আর্তনাদ কানে বেজেই চলেছে। বন্ধ হয়ে যেতে পারে যে কোন মূহুর্তেই। কোনমতে পৌঁছুতে পারলেই হয় এখন। আমি চুপচাপ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলাম। ঠান্ডায় শার্সির ওপাশটা আবছা হয়ে আছে। দেখা যায়না কিছু। দুলাল ভাইয়ের শেষ কথাটা কানে বেজে চলছিলো সেই তখন থেকেই। পাবলাখালি যেতে মাঝরাত পেরোবে সন্দেহ নেই। আমাকে বাসস্ট্যান্ডেই রাতটা কাটাতে হবে। তা হোক, ওসব আমার অভ্যেস আছে। গত বছরই তো একবার এমন হতে বসেছিলো। ট্রাকে করে বিবিরহাট ফিরতে হয়েছে শেষমেষ। হঠাৎ আমার মাথায় ঝাঁ করে খেলে গেলো দুলাল ভাইয়ের চেহারা। এবার মনে পড়েছে সেই রাতের ঘটনা,



আগস্টের মাঝামাঝি ঘটনা। দিনভর মেঘ গুড়গুড় করেছে। সন্ধ্যে নেমে এলেও বৃষ্টির দেখা নেই। আমি হাঁটছি ঘন্টা খানেক ধরে। কি কারণে যেন জরুরীভিত্তিতে আমাকে বিবিরহাট যেতে হচ্ছিলো, সঠিক মনে পড়ছে না। বাসস্ট্যান্ড পৌঁছুতেই শেষ বাসটাও ছেড়ে গেলো। কিন্তু আমার যে বিবিরহাট যেতেই হবে। কি যে করি! এদিকে ক্ষিদেও পেয়েছে খুব। সেই দুপুরে জঙ্গলে আমার এক পাহাড়ী বন্ধুর বাড়িতে লাল করে ঝোলাগুড় দিয়ে ভাত মেখে খেয়েছি। ওরা কি মজা করে বুনো শুকরের গোস্তের সঙ্গে আলুসেদ্ধ আর দু/চার পদের সবজি দিয়ে মাখানো ভাত খেলো। ও আমার মুখে রোচে না বলে আমার জন্য গুড়-ভাতে আর এক বাটি ছাগলের দুধ। দুপুরের খাবারের স্মৃতি রোমন্থন করেই এতক্ষণ চলছিলো, পকেটে হাত পড়তেই ক্ষিধেটা বেশ চাগিয়ে উঠলো। মানিব্যাগটা ফেলে এসেছি। এই অন্ধকারে কুড়ি কিলো হেঁটে আবার সেই জঙ্গলে যাওয়া সম্ভব নয়, অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। এ পকেট ও পকেট আঁতিপাঁতি করে খুঁজে কিছু সিকে-আধূলী পাওয়া গেলো বটে, কিন্তু ও দিয়ে কি পেট ভরবে? বাসস্ট্যান্ডটা এর মধ্যেই প্রায় নির্জন হয়ে গেছে। অনুমান করলাম ন'টার মতন বাজে। কয়েকটা দোকানে সাঁঝবাতির আলো দেখা যাচ্ছে। দোকানের ঝাঁপ ফেলে কয়েকজন কমবয়েসি ছেলে একসঙ্গে বসে মহুয়ার নেশা করছে। একটা ছোট ট্রাক অনেকক্ষণ ধরেই ছাড়বে ছাড়বে করছে। একটু অনুরোধ করলে ওরা আমাকে কি সামনে কোথাও নামিয়ে দেবে না?

কি করবো সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই এগিয়ে গেলাম। ট্রাকের কাছে মোটে তিনজন মানুষ দাঁড়ানো। ওরই মধ্যে নেতাগোছের হবে এমন একজনকে আমি বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলাম আমি বিবিরহাট যেতে চাই, দয়া করে আমাকে কেউ নামিয়ে দেবেন কি?

লোক তিনটে পরষ্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলো, নেতাগোছের লোকটা জানালো আমাকে নামিয়ে দিতে তাদের আপত্তি নেই তবে বিনিময়ে রাত্তিরের খাবারটা খাওয়াতে হবে। আমি নিজের অপরাগতার সঙ্গে নিজের পকেটের খুচরো-পাতিগুলোও দেখিয়ে দিলাম। নেতা লোকটা হো হো করে হেসে উঠলো।

"কাঠের বিল চুকিয়ে যা ছিলো সব গেছে এই শালার ট্রাকের পাংচার সারাতে, আমার কাছে কিছু নেই বললেই চলে। আর ড্রাইভার মিয়া আর তার সাগরেদের পকেট ঠনঠন। সব খেয়ে নিয়েছে ট্রাকের পেট্রোলে। কিছু মনে করবেন না, উপকারটা ফাও করবারই নিয়ত ছিলো"

কথা শুনে মনে হল নেতাগোছের লোকটা কাঠ-ব্যবসায়ী। এর কাছে দেদার টাকা থাকার কথা। কিন্তু কপালের ফেরে আমরা চারজন অভুক্ত একসাথে জুটেছি। আমি মাথা চুলকে একটা বুদ্ধি বাতলে দিলাম। চারজনের খুচরো গুলোকে জড়ো করলে যা হয় তা দিয়ে হয়ত অনায়াসেই দু'এক সের মুড়ি হয়ে যাবে। চাই কি সামনের বন্ধ হোটেলের রসুঁই থেকে দু/চারটে কাঁচা-লংকাও আমদানী করা যেতে পারে।

নেতা লোকটিই মহা উৎসাহে আয়োজনে নেমে পড়লো। কাছের একটা দোকান থেকেই সের খানেক মুড়ি আর ঠোঙ্গাভর্তি কাবলী ভাজা কিনে ফেলা গেলো। আমি এ পরিস্থিতিতে নতুন নই, পরিব্রাজকদের সবসময়েই নিত্যনতুন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। আমি নিশ্চিত মহুয়ার নেশায় মাতাল ছেলেগুলোকে খানিকটা সমবেদনা জানালেই পকেটে যা আছে সব ঝেড়ে-পুঁছে দিয়ে দেবে। মাতাল লোকের চেয়ে উদার আর কে আছে?

কাঠ-ব্যবসায়ী লোকটির নাম দুলাল। বেশ চটপটে আর কাজের লোক। বাজারের হোটেলের বড় কড়াইটা ধোয়ার প্রস্তুতি চলছিলো যদিও উনুন থেকে তখনও নামানো হয়নি। উনুনটা নেভানো হলেও কড়াই তখনও বেশ তেতে ছিলো। ওর মধ্যেই মুড়ি আর কাবলী ঢালা হলো। দুলাল মহাজন কোত্থেকে যেন গোটা কতক বুনো পেঁয়াজ আর কাঁচা লংকা ম্যানেজ করে ফেলেছে। কড়াইয়ে তখনও রাতের রান্নার কিছু ঝোল লেগেছিলো, তাতে পেঁয়াজ ফেলে যখন উদ্ভট রান্নাটা করা হল ঘ্রাণেই আমার জিভে জল চলে এল। কোথায় যেন শুনেছিলাম "হাঙ্গার ইজ দ্য বেস্ট সস", হাতেনাতেই প্রমাণ মিললো। মুখের তেলো অব্দি জ্বালিয়ে দেওয়া সেই ঝাল উপেক্ষা করেই আমরা চারজন হুসহাস করতে করতে চেটেপুটে কড়াই খালি করে ফেললাম।



বিবিরহাট রওয়ানা করতেই মুষলধারে শুরু হলো বৃষ্টি। বৃষ্টির তোড়ে ট্রাকের বনেটে যে ছাঁট উঠছে তাতে দু'গজের বেশী দৃষ্টি চলে না। ড্রাইভার কিভাবে দেখছে সেটাই আশ্চর্যের বিষয়। ট্রাকে জায়গা খুব বেশী নেই। তবে বর্ষার মৌসুম বলেই কি না আমরা গাঁদাগাঁদি করে বসেছি আর তাতে কারও কোন অসুবিধেও হচ্ছে না। বৃষ্টির কারণে বাইরে বেশ ঠান্ডা কিন্তু আমাদের ট্রাকের ভেতরটা বেশ উষ্ণ আর আরামদায়ক। হাঁটার ক্লান্তি তো ছিলোই, তাই আমি চট করেই ঘুমিয়ে পড়লাম।

বেশ কিছুক্ষণই ঘুমিয়েছিলাম বলতে হবে কারণ ঘুম ভাঙ্গবার পরে বেশ ঝরঝরে লাগছিলো। বৃষ্টি কিছুটা ধরে এসেছে। বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে ইঞ্জিনের শব্দ কানে আসছে এখন। দুলাল মহাজন আর পিচ্চি সাগরেদটা পাল্লা দিয়ে নাক ডাকাচ্ছে। ড্রাইভার বশির মিঁয়া ঝিমোতে ঝিমোতে চালাচ্ছে। তা ঝিমোক, মাতাল না হওয়া অব্দি ওদের অ্যাকসিডেন্ট করবার সম্ভবনা কম। আমার ধারণা ভুল প্রমানিত করতেই মনে হয় বশির মিঁয়া ঘ্যাঁচ করে ব্রেক করে বসলো। ছোট ছেলেটি হুমড়ি খেয়ে পড়লো, সেই সাথে দুলাল মহাজনের মাথাও ঠুকে গেলো উইন্ডশিল্ডে। আমি জেগে ছিলাম বলে সামলে নিলাম নিজেকে।

ট্রাকের কেবিন লাইট নিভে গেছে কিভাবে যেন। হেড লাইটও বন্ধ। প্রচন্ড ধাক্কায় কোনভাবে ব্যাটারী নড়ে গিয়ে সব লাইট নিভে গেছে। অন্ধকারে আমরা নিজেদেরই দেখতে পাচ্ছি না। বিড়বিড় করে গাল বকতে বকতে কপাল ডলতে লাগলো দুলাল মহাজন। কি কারণে ব্রেক করা করেছিলো জিজ্ঞেস করেও কোন উত্তর এলোনা বশির মিঁয়ার কাছ থেকে। এঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেছে আগেই, বাইরে কেবলই বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ আর মেঘের গুরুগম্ভীর আওয়াজ।

: পিশাচ .......... চাপা গলায় শুধু একবার বললো বশির মিঁয়া

আমি নড়েচড়ে বসলাম। বনে বাদাঁড়ে বহু ঘুরেছি, এখন অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতাটা হয়ে গেলেও মন্দ হয়না।

: কোথায়? উৎসুক হয়ে জানতে চাইলাম।

উত্তর এলো না। পিচ্চি হেলপার মাথা নুইয়ে জড়োসড়ো হয়ে পায়ের কাছে বসে আছে। খুব মিহি স্বরে আয়াতুল কুরসী পড়ে চলেছে বশীর মিঁয়া।

ঠান্ডার মধ্যেও দরদর করে ঘামছে দুলাল মহাজন। হাতে ছয় ব্যাটারীর একটা টর্চ। শক্ত হয়ে আঙ্গুলগুলো চেপে ধরেছে ওটাকে। চারিদিক অন্ধকার হলেও চোখে সয়ে এসেছে । গাছ-গাছালীর অন্ধকারের ফাঁকে সামনের চওড়া রাস্তাটা নজরে আসছে।

: তাকাবেন না। আমাকে সাবধান করে দিলো কাঠ-ব্যবসায়ী।

কিন্তু আমাকে যে দেখতেই হবে। আমি উৎসুক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।

: কোথায়?

মহাজন চুপ করে আছে। চাপা স্বরে একবার গাড়ি চালাতে বললো।

বশির একদম চুপ। আতংকিত চোখে রাস্তা থেকে বাঁ পাশের মেঠো খোলা জায়গাটার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখ অনুসরণ করে আমিও তাকালাম। জায়গাটা এবড়ো খেবড়ো আর খানা খন্দে ভরা। সামনে বেশীদূর দৃষ্টি চলে না। ভালো করে চাইতেই মনে হল কিছু একটা নড়ছে ওখানে। আবছা অবয়বে মনে হচ্ছে কুকুরের চাইতে আকারে খানিকটা বড়। এর বেশী কিছু বোঝা যায় না। দুলাল মহাজনকে টর্চটা দিতে অনুরোধ করতেই এমনভাবে তাকালো যেন ওর প্রাণটাই চাইছি। আমি কোন দুঃসাহসী লোক নই, নইলে হয়ত বা ত্রিশগজ দূরের প্রাণীটাকে দেখবার জন্য ট্রাক থেকেই নেমে পড়তাম। বৃষ্টিটাও অনেকখানি ধরে এসেছে। আমি চাঁদ ওঠার অপেক্ষা করতে থাকলাম।



পুরনো কথা ভাবতে ভালোই লাগছিলো। কত কি ঘটে এই পৃথিবীতে, পরিব্রাজকের সাথে হুটহাট করে দেখা হয়ে যায় কত কিছুর। সে রাতে আমি কি দেখেছিলাম বলতে চাচ্ছি না। চাইলে প্রেত বিশ্বাসী মানুষরা মুফতে কিছুটা খানিকটা আনন্দ পেতেও পারেন। আমার ঘোরাঘুরি থেমে থাকে নি। প্রতিদিনই তো শিখছি। পরিব্রাজকের পাঠশালায় যোগ হচ্ছে নতুন অনেক কিছু।



বাউন্ডুলে পরিব্রাজক

কাপ্তাই

১৬ই মাঘ, ১৩৯৬

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.