| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
স____(একটি ছোটগল্প)
তৌফিক ফেরদৌস চাতক.
ওর সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল এক বৃষ্টির দিনে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছিল অটোর জন্য। ছাতা নিয়ে ছোটাছুটি করছে লোকজন। আমি একটু ঘুরতে বেড়িয়েছিলাম। কিন্তু দৃষ্টি আটকে যায় ওর দিকে। আমি হ্যাবলার মতো তাকিয়ে আছি দেখে চোখ গরম করে অন্য দিকে তাকালো। জ্যাকেটের হুডটা দিয়ে অন্য দিকে চলে গেলাম। ফিরে তাকালাম না। কারণ মায়ার বাঁধন বড় কঠিন বাঁধন। আমার এ বাঁধনে জড়ালে চলবে না। চলে যাওয়ার সময় শুনতে পেলাম মেয়েটি জোর গলায় চেঁচাচ্ছে। মুখে একটু হাসি নিয়ে চলে এলাম নিজের ঠিকানাতে। আমি অয়ন- কীভাবে কোথা থেকে এসেছি জানি না। থাকি পুরান ঢাকার এক বাড়িতে। খানিকটা নির্জন এলাকা। সারাদিন বিশেষ কোন দরকার না পরলে ঘর থেকে বের হই না। চাল ডাল যা দরকার পিন্টু এসে দিয়ে যায়।
সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে তবুও আমার চিন্তা জগত ঐ মেয়ে দখল করে আছে। না একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। রাত কাটালাম অর্নেস্ট হোমিং এর বই দিয়ে। দুপুরের দিকে পিন্টু এলো গল্প করতে। ছেলেটা আমার খুব ভক্ত। ভক্ত এই কারণেই যে আমি বেশ ভৌতিক গল্প করতে পারি। পিন্টুও আমার মতো পিতৃ পরিচয়হীন।
"বুঝলে অয়ন ভাই আজকে এক কাস্টমার পাইছিলাম মহা বেকুব। ২৫০০ টাকা কই দিয়ে মেরে দিলাম বুঝতেই পাড়ল না।"
বলে রাখি পিন্টু পার্টটাইম পকেটমার। দুই একবার ধরাও খেয়েছিল কিন্তু এ নিয়ে ওকে কখনো দু:খ করতে দেখি নি।
আমি বললাম, "দেখ পিন্টু চুরির পেশাটা আমার পছন্দ না। যদিও এটাকে পেশা না বলে বৃত্তি বলা উচিত ছিল তাও পেশা বলছি কারণ এ লাইনে তুই বেশ পেকে গেছিস।"
- কি যে বলেন অয়ন ভাই। আজকে আপনারে একটু অন্যমনস্ক লাগতেছে। ঘটনা কি?
- ঘটনা কিছুই না। কালকে এক মেয়েকে দেখে খুব হাসি পেয়েছিল।
- ভাই এই দিয়া ৩৩ টা মেয়ের হাসি আপনার ভালো লাগল। আপনি যে কি করেন। প্রতি বার আমি মাইয়ার খোঁজ খবর আইনা দেই। তারপর দেখি মাইয়াই উল্টা আপনারে খুঁজে। এরপর আর মাইয়ার দেখা পাওয়া যায় না। তাড়াতাড়ি বিয়া-সাদি করে ফেলেন।
পিন্টু বিয়ের উপদেশ দিলেও পর দিন ঠিক এসে মেয়ের ইনফরমেশন দিয়ে গেছে। মেয়েটির নাম নীলা। বাবার পয়সা-কড়ি আছে তবে বেশ বদমেজাজি টাইপের। পিন্টু যে কোথা থেকে খবর যোগাড় করে আনে সেটা ওই ভালো বলতে পারবে। এরপর অনেক দিন নীলার সাথে দেখা হয় নি। ভুলতেই বসেছিলাম প্রায়। এর মধ্যে মাথার চিনচিন ব্যথাটা অধিক হারে বেড়ে গেল। এটা নিয়ে বেশি দিন চলা যাবে না। তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করতে হবে। হঠাৎ করে আবার নীলার সাথে দেখা হয়ে গেল। বিকেলের দিকে আকাশ মেঘে ঢেকে গেলো। আমার বেরুনোর জন্য আদর্শ সময়। আজকেও মনে হয় মেয়েটি অটোর জন্য অপেক্ষা করছে। একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিলাম- মতিগতি ভালো ঠেকছে না। পাশের দোকানে মোবাইলে টাকা ভরার ভান করলাম। কিন্তু তাতেও কাজে দিল না।
কাছে এসে বলল, "এই যে মিস্টার? সেদিন থেকে দেখছি আপনি আমার পিছু নিয়েছেন। জীবনে সুন্দর মেয়ে দেখেন নি নাকি?"
আমি বললাম, "আপনি নিজেকে যতটুকু সুন্দর মনে করেন আসলে আপনি তা নন। আর সুন্দর জিনিসের প্রতি সকলেরই একটু দুর্বলতা থাকে। সুন্দর মনের মানুষ গুলোর জন্যই তো পৃথিবী আজও এতো সুন্দর। মনে হয় জনম ধরে বেঁচে থাকি এই মাটির কুলে।"
- দেখুন আমার সামনে ফিলসফি ঝাড়বেন না। আপনি আমাকে আর ফলো করবেন না ব্যাস।
- আমি আপনাকে কোথায় ফলো করলাম? উল্টো আপনিই তো আজ আমার অপেক্ষায় এখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এটা অনুমান করার জন্য অবশ্য বড় কোন ডিগ্রীর অধিকারী হতে হয় না। আসলে মানব প্রকৃতি বড় জটিল। কখন কার প্রতি ভালোলাগা জন্মে তা বোঝা মুশকিল। তবে জিনিসটাকে বেশি প্রশ্রয় দিতে নেই। একবার মাথায় উঠে গেলে আর নামতেই চায় না। আর আমি কিন্তু আপনার একটা নাম দিয়েছি- রুদ্রাণী। ভালো না নামটা?
নীলা কিছুক্ষণ চোখ গরম করে তাকিয়ে থেকে চলে গেল। আমার একটু হাসি পেল। মেয়েটা এখনো ছেলেমানুষি ছাড়তে পারে নি। আমি একটু বেশি করে ফেললাম মনে হচ্ছে।
এর ঠিক তিনদিন পর তিন রাস্তার মোড়ে দেখা হলো। একবার চোখাচোখি হওয়ার পরেই কোনো মতে চশমা আর জ্যাকেট বাঁচিয়ে চলে এলাম। আজ বোধয় এই কালো চশমার জোরেই বেঁচে গেলাম। কালো চশমা আমার জীবনে এক অবিচ্ছেদ্য কৃত্রিম অঙ্গ।
কয়দিন পর একটা ছোট্ট চিঠি পেলাম। এক ভিখারি মেয়ের হাত দিয়ে পাঠিয়েছে। মেয়েটার মুখ দেখে খুব মায়া হলো। হাতে দশটা টাকা ধরিয়ে দিলাম।
চিঠিতে যা ভেবেছিলাম তাই। আমার প্ল্যান কাজ করে গেছে। একটা ১১ ডিজিটের ফোন নাম্বার। কিন্তু আমাকে ফোন করলে তো চলবে না। সযত্নে চিঠি পকেটে রেখে দিলাম। রাত এগারটার দিকে মোবাইল বেজে উঠল। আন-নন নাম্বার। দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে বেশি বেগ পেতে হলো না।
"হ্যালো। কে বলছেন?" বললাম আমি।
"খুব বেশি ভাব ধরেন তাই না? আপনাকে যে নম্বর দিলাম তার পরেও একবার ফোন করলেন না!" বলল নীলা।
- ও আপনি। আমার জানা থাকলে অবশ্যই ফোন করতাম। আসলে এক ধরণের প্রতারক চক্র এই ধরণের মেথড ব্যবহার করে।
- ও আমি তাহলে প্রতারক চক্রের নারী সদস্য?
- আমি আপনাকে সদস্য বলি নি। আমি বলেছি মেথডের কথা। যাই হোক কেমন আছেন?
- হুম ভালো। আর আপনি নিজের চোখ দেখাতে চান না কেন? এই পর্যন্ত আপনার চোখের দেখা পেলাম না।
- চোখ? না আমি এটা কাউকে দেখাতে পছন্দ করি না।
৭ দিন ধরে কথা বলা চলল। সেদিন রাতে খুব ঝড় হচ্ছিল। ঘুমাতে গেলাম রাত দু-টোর দিকে। শেষের দিকটায় একটা আবেদন ছিল। কালকে ওর সাথে পার্কে দেখা করতে হবে। অনেক জোরাজুরির পর রাজি হলাম। প্রথমেই রাজি হয়ে গেলে অন্যসব ছেলেদের মতো ভেবে ফোনটা হয়তো কেটে দিতো। আর আজ রাতে যেহেতু ঝড় হয়েছে কালকের দিনটা আমার জন্য হবে উৎকৃষ্ট।
পাঁচটা ত্রিশের টাইম দিয়েছিল পার্কে দেখা করবার জন্য। আমি গেলাম সন্ধ্যার দিকে। আজকের দিনটাতেও ঝড় হবে ভেবেছিলাম কিন্তু তা হলো না।
"এতোক্ষণে আপনার আসার সময় হলো? আমি কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি আপনার ধারণা আছে?" বলল নীলা।
আমি বললাম, "আছে তো। তুমি দুপুর থেকে আমার জন্য অপেক্ষা করছ।"
মনে মনে বললাম, 'কেন দেরি করেছি একটু পরেই বুঝতে পারবে।'
কেঁদে দিল নীলা। আমি আস্তে করে ওর হাত ধরলাম।
ও বলল, "আমি তোমায় ভালোবাসি অয়ন। অনেক। কিন্তু কেন তা বলতে পারব না। হঠাৎ করে আমার কি যেন হয়ে গেলো। এরপর থেকে আমার চিন্তায় শুধু তুমি আর তুমি।"
ওর চোখ-মুখ আমায় চাইছে বুঝতে পারছি। আমি একটু কাছে গেলাম। নীলা হালকা নরম স্পর্শের জন্য ওর ঠোঁট বাড়িয়ে দিলো। আমি সামনে দাঁত দুটো বসিয়ে দিলাম নীলার ঘাড়ে। ও কোন শব্দ করতে পারল না। কয়েক মিনিটেই সব রক্ত চুষে নিলাম। খাতায় ৩৪ নাম্বার মেয়ের নাম যুক্ত হলো- নীলা।
©somewhere in net ltd.