| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
দ্বীপ ১৭৯২
দ্বীপ সরকার। জন্মঃ ১লা মার্চ ১৯৮১ ইং। গ্রাম-গয়নাকুড়ি। বগুড়া জেলার শাজাহানপুর থানা। পিতা-মৃত হাবিবুর রহমান। মাতা-আলহাজ্ব আছিয়া বিবি। মুসলিম পরিবারে জন্ম। গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন ১৯৯৯ ইং। সম্পাদিত লিটেল ম্যাগ, কুয়াশা। প্রকাশিত বই ৫টি। ভিন্নভাষার গোলাপজল ২০১৮। ডারউইনের মুরিদ হবো ২০১৯। ফিনিক্স পাখির ডানা ২০২০। জখমগুচ্ছ ২০২৩। বুবুন শহরের গল্প ২০২৪।
কোদালিনী
দ্বীপ সরকার
বাছিরন বেওয়া। শ্যামলা বর্ণের। বয়স পয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে হবে। বাছিরন প্রতিদিন ভোরে কোদাল নিয়ে বের হয়। সাথে আঁচলে গুঁজিয়ে নেয় তার পাঁচ ছয় মাস বয়সের সন্তান পারুলকে। পারুল বাবাকে দেখেনি। তার আগেই তার বাবা মাঠে কাজ করতে করতে প্রচন্ড দাবদাহে হার্ট এ্যাটাকে মারা যায়। বাছিরনের এই জীবনে পারুল ছাড়া আর কেউ নাই। নাই কোন শোবার ঘর,বাসস্থান। যেখানে রাত সেখানেই কাত। গ্রামে গ্রামে কৃষকদের চেনা জানা বাছিরন বেওয়া। তাই রাত হলেই কেউনা কেউ তাকে উঠোনের এক কোণে থাকতে দেন। দু মুঠো খাবার দিলে তা নিজের মুখে তোলে এবং পারুলের মুখে যত সামান্য তুলে দেয়। পরের দিন সকাল হলে আবার পারুলকে পাঁজরের কাছে সুতি মোটা কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে কাঁধে কোদাল নিয়ে বের হয়।
প্রতিটা গ্রামেই জমি থেকে আলু উঠানোর জোর মৌসুম এখন। প্রতিটি কৃষক বিঘা বিঘা জমি আলু রোপন করে। এক সাথে যেমন রোপন করে আবার এক সাথে আলু উঠোয়। ফলে এলাকায় কামলা কিষাণ আর দিন মজুরের ভিড় জমিয়ে ওঠে এলাকায়। জমিতে কিষানের আলু উঠানো হয়ে গেলে সেখানে ততক্ষনাৎ নেমে পড়ে আলু কুড়ানির দল। তারা দল বেঁধে কোদাল দিয়ে খুঁড়ে খুঁড়ে আলু কুড়োয়। এইভাবে কেউ কেউ চার পাঁচ কেজি আলু কুড়োতে পারে। বাছিরনও এই মৌসুমে মন খানেক আলু কুড়োতে পারে। এই মন খানেক আলু বাছিরন বিশ্বস্ত এক কৃষককে বেচতে দেয়। টুকু,তুই এ্যনা হামার মন খানেক আলু বেচে দিবু?
—পাগলী তুই এতুডি আলু কুড়াচু। তাইলে আজি বেচে দেমোনি,দেস।
বিকালে বাছিরন বস্তা খানেক আলু টুকুকে দেয়। টুকু স্কেলে তুলে দেখলো পঞ্চাশ কেজি। বাছিরনকে বললো, এক মণের সামান্য কম আছে বাছি। হামার যে আর নাই। ওইটুকু হামি দিয়ে বেচে দেমোনি বাছি...। বাছিরন অতি সরল সহজ গ্রামের মহিলা। অতি সহজে সকলকে বিশ্বাস করে। এ ছাড়া যে তাদের মতো মানুষদের উপায়ও নাই। টুকুর দশ কেজি আলু মেরে নেয়ার কৌশল দেখার মতো চোখ বাছিরনের নাই। টুকু বাছিরনকে তার কুঁড়ে ঘরে থাকার কথাও বলে চলে যায়। পরের দিন বাছিরন আবার কোদাল নিয়ে ছোটে মাঠে। টুকুর সাথে দেখা হলে বলে,কয় টেকা বেচ্চু টুকু?
—বেচ্চি তো,টেকাই দেয়নি মওজন।
—গায়ে হামার জ্বর বচ্চচে রে। ওষুধ খাওয়া লাগবি।
বাছিরন পারলকে কোঁচায় ধরে দলের সাথে আবার আলু কুড়োতে চলে যায়। চারদিকে শন শন বাতাস। মাঘ মাসের হার কাঁপানো শীত। বাছিরনের পরনে ময়লাযুক্ত মোটা সুতি কাপড় আর বুক ঢেকে আছে ছেঁড়াছুঁতো ব্লাউজ দিয়ে। তাতে এই মাঘের শীত কতটাইবা যায়। তার ওপরে গায়ে জ্বর। ফলে বাছিরন ক্রমে শীতে কাঁপছে। দলের কিছুজনের গায়ে মোটা চাদর,মোটা জামা থাকলেও অনেকের শরীরে তা নাই। বাছিরন এই মাঘের শীতের সাথে আর পেরে উঠলো না। কাঁপতে কাঁপতে টুকুর বাড়িতে আসলো। টুকু আলুর টেকাটা দে ভাই। টুকু বলে,বাছি তোর গায়ে তো খুব জ্বর। হামি ওষুধ দিচ্ছি এনে। বলে টুকু একটু দূরে স্ট্যান্ডে গিয়ে তিনটি নাপা,তিনটি সর্দি কাশির ট্যাবলেট এনে দিলো। বাছিরন খুশি হয়ে টুকুকে বলে,ভাই বাঁচালু তুই,আল্লা তোর ভালো করবি। টুকু এবার আলু বিক্রির এক মনের তিনশ টাকা হাতে দিয়ে বললো, আলুর চাশশো টেকা দিছিলো বুচ্চু বাছি,তার মধ্যে থেকা ওষুধ আননো একশ টেকা আর এই নে তিনশ টেকা। বাছিরন হিসেবের কী বোঝে। বাছিরন কাপড়ের আঁচলে টাকাগুলো গুঁজিয়ে পারুলকে পাশে শুইয়ে নিজেও মাথায় হাত ঠেকিয়ে শুয়ে পড়ল। জ্বরে শরীর খাঁ খাঁ করছে। তখন বেলা তিনটা বাজার কাছে। বাছিরন সামান্য আরামবোধ করলে আবার কোদাল কাঁধে নিয়ে পারুলকে কোঁচায় কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে মাঠে আলু কুড়োতে যায়। মাঠ থেকে তখন অনেকেই কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। তখন খলিল বললো,বাছি তুই এই কোন সময়ে আলু কুড়াতে যাস? বাছিরন কোন কথা বলে না। হট হট করে আল ধরে চলছে। কোলের সন্তান পারুল খিদেয় ছটপট করছে। বুকের দুধ তেমন পায় না। মুখে খাবার নেই,পুষ্টি নেই। দুধ আসে কোন্থেকে। সন্তানের ক্রোন্দন সহ্য করতে না পেরে বাছিরন কাঁধে কোদাল নিয়ে আবার ফিরে আসে গ্রামের দিকে। আসার পথে কোদালের ঘাড়িটা ভেঙে যায়। বাছিরনের মন খুব খারাপ হয়ে যায়। দুই তিন বছর হলে কোদালটা মেরামত করে নিয়েছে। তখনও একবার কোদালের ঘাড়ি ভেঙ্গে গিয়েছিল। মেরামত করতেও আবার সেই লোককে টাকা দিতে হয়। শক্ত বাঁশের গোড়ালী সংগ্রহ তারপর খুব মজবুত করে কোদালের সাথে জুড়িয়ে দিতে হয়। এ নিয়ে বাছিরন চিন্তিত হয়ে পরে। আবার টাকা লাগবে কোদাল মেরামত করতে। বাছিরন গ্রামের স্ট্যান্ডে এসে সন্তানের জন্যে একটা পাউরুটি নিজের জন্যে আরেকটা পাউরুটি কেনে দোকান থেকে। পারুল আস্তে আস্তে চোখ মুছে শান্ত হয়।
মাঘের সন্ধ্যা। কনকনে শীত। বাছিরন কোথায় রাত কাটাবে। পেটের ক্ষুধা তাকে তেমন কাত করতে পারে না। এ রকম অনেক দিন অনেক রাত বাছিরন না খেয়ে পড়ে কাটিয়েছে। তাই তার সহ্য ক্ষমতাও পোক্ত হয়ে গেছে। সামনে এসে খলিল বলে,বাছি থাকার ব্যবস্থা হচে তোর?
—নারে খলিল,কোদালটার ঘাড়ি ভাঙে গ্যাছে,তুই ঠিক করে দিবু এনা? টেকাই দেমোনি। খলিল বলে,সময় পাইনারো,কালকে ভিঁউ ওমো। বাছিরনের মন আরো খারাপ হয়। বলে, খলিল তুই কয় টেকা লিবু ক তো? কোদাল ঠিক না হলে খামো কি এ্যা?
—দেখি কাল বৈকালে ক’রে দেমোনি। বাছিরন বলে,তাইলে তোর ওটি আজ থাকমোনি। কাল তুই কোদাল ঠিক ক’রে দিবু। বাছিরন ভাঙা কোদাল নিয়ে পারুলকে কোলে ধরে খলিলের বাড়িতে ওঠে।
খলিল গ্রামের একজন জোচ্চোর মানুষ হিসেবে পরিচিত। মুখে মুখে মাকাল ফলের মতো সুন্দর হলেও ভেতরটা কালো কুৎসিত। রাত বারোটার পর খলিল বাছিরনের কাছে যায়। বাছিরনের কায় ক্লেশের শরীর। বিছানায় মাথা ঠেকালেই আর জ্যান্ত থাকে না। ঘুমে বিভোর। বাছিরন খলিলের উপস্থিতি টের পায়। চমকে উঠে বসে পরে। খলিল হকচকিয়ে ওঠে। বলে,বাছি চুপ থাক,কথা কোস না। এই নে পাঞ্চাশ টাকা। বাছিরন বলে, কি করমু এই টেকা। ধাত,পাগলী,বুঝিস না। বাছিরন হুঁস জ্ঞানে কম। মাথা মোটা রকমের। সহজেই একটা কথা মাথায় ঢোকে না। তবে খলিলের আচরন অল্প অল্প করে বুঝতে পারে। বলে,কালকে তুই কোদাল ঠিক করে দিবু না? খলিল আস্তে বলে,হ পাগলী। কোদাল ঠিক কইরা দেমো, এই ধ, এই টেকাও নে। বাছিরন সম্পর্কে এলাকায় কোন রিপোর্ট নাই। রাত বিরাতে এথারে ওথারে ঘোরে,রাত কাটায়। সকলেই এক নামে চেনে। বাছি পাগলী। বাছিরন হাত জোর করে বলে,খলিল,তোর টেকা তুই নে। হামার কোদাল ঠিক করা লাগবি নে। এই পারুল ওঠ বাবা ওঠ। চ...। খলিল বাছিরনের হাত ধরতে যায়। বাছিরন হাত থেকে সটকে সন্তানকে নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে বাইরে বের হয়। সাথে কোদালটাও ভুল করে রেখে আসল না।
রাত তখন দুইটা পার। হিম কুয়াশার রাত। চার পাশে সাদা সাদা কুয়াশা। বাছিরন ঠুক ঠুক করে রাস্তা ধরে হাঁটছে। ঠান্ডায় কাঁপছেও। ছয় মাসের সন্তান পারুল তার প্রাণের গভীরে বসত করে থাকে সব সময়। শত কষ্ট ক্লেশে পারুলের চঞ্চল মুখের দিকে তাকালে স্বামী হারানোর কষ্ট ভুলে থাকে। কিছুদুর পেরোতেই পাকুর গাছের মোড়ে এসে দুইজন যুবক বাছিরনের পথ আটকায়। বাছিরনের কাছ থেকে আলু বিক্রির সমস্ত টাকা আর আলু নিয়ে সটকে যায়। বাছিরন নির্বিকার হয়ে ডুঁকরে কাঁদতে থাকে। হায় আল্লা,এহন,হামি পারুলকে কি খাওয়ামু। কি দিয়া কোদাল ঠিক করমু।
©somewhere in net ltd.