নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

পৃথিবী

সাগর চৌধুরী নিলয়

স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করতে পছন্দ করি।

সাগর চৌধুরী নিলয় › বিস্তারিত পোস্টঃ

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর : বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা করা হয় ১২ ডিসেম্বর

১৩ ই ডিসেম্বর, ২০১৪ দুপুর ১২:৩৫


সে সময়ের মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার আগের দিন ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের বন্ধুরাষ্ট্র রাশিয়ার প্রতিনিধি ভোরেন্টসভকে হুঁশিয়ার করে বলেন, পরদিন (১২ ডিসেম্বর) মধ্যাহ্নের আগে ভারতকে অবশ্যই যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বাধ্য করতে হবে। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেই প্রয়োজনীয় সামরিক ব্যবস্থা নেবে।

কিন্তু কিসিঞ্জার নিশ্চয়ই জানতেন, রণাঙ্গনে আসন্ন বিজয় দৃষ্টে ভারত এই চরমপত্র অগ্রাহ্য করবেই। কাজেই মার্কিন প্রশাসন ওই দিনই কোনো এক সময়ে তাদের আসন্ন হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত পাকিস্তানকে জানিয়ে দেয়, উপমহাদেশে তখন অবশ্য ১২ ডিসেম্বর। এই সংবাদের সঙ্গে সঙ্গে লে. জেনারেল গুল হাসান টেলিফোনযোগে পশতু ভাষায় নিয়াজিকে জানিয়ে দেন, পরদিন অর্থাৎ ১৩ ডিসেম্বরের মধ্যাহ্নে পাকিস্তানি বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য উত্তর ও দক্ষিণ উভয় দিক থেকে বন্ধুরা এসে পড়বে।

দক্ষিণের বন্ধু তথা সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগর অবধি আসার জন্য মার্কিন নাগরিক উদ্ধারের যে অজুহাত ব্যবহার করে সেই মার্কিন ও অন্যান্য পাশ্চাত্য নাগরিকদের উদ্ধারকর্ম তিনটি ব্রিটিশ রয়েল এয়ারফোর্সের বিমান কর্তৃক ১২ তারিখেই সম্পন্ন হয়। গুল হাসানের সংবাদের পর ঢাকার সামরিক কর্তৃপক্ষ নিজেদের প্রতিরক্ষার আয়োজন নিরঙ্কুশ করার জন্য ২৪ ঘণ্টার জন্য কারফিউ জারি করে ঘরে ঘরে তল্লাশি শুরু করে।

এ দিন রাতে প্রাদেশিক সরকারের বেসামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী আলবদর ও আলশামসের কেন্দ্রীয় অধিনায়কদের ডেকে পাঠান সদর দপ্তরে। তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় গোপন শলাপরামর্শ। এই বৈঠকে বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা প্রণয়ন করা হয়। ফরমান আলী তাদের হাতে তুলে দেন বুদ্ধিজীবীসহ বিশেষ বিশেষ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের নামের তালিকা। বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা হিসেবে সেই রাতেই আলবদর বাহিনী সাংবাদিক নিজামউদ্দিন আহমদ, আ ন ম গোলাম মোস্তফাকে তাদের বাসভবন থেকে অপহরণ করে। তারা আর কখনো ফিরে আসেননি।

পাকিস্তানিদের শেষ লড়াইয়ের প্রস্তুতি সত্ত্বেও রণাঙ্গনে তাদের পশ্চাদপসারণের ধারা তখনো অপরিবর্তিত। ১২ ডিসেম্বর সকাল ৮টায় নরসিংদীর ওপর পাকিস্তানি দখলের অবসান ঘটে। বিকেলে ভারতের আর একটি ইউনিট (৪ গার্ডস) ডেমরা ঘাট থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে এসে হাজির হয়। সূর্যাস্তের আগে জামালপুর ও ময়মনসিংহের দিক থেকে জেনারেল নাগরার বাহিনী টাঙ্গাইলে প্যারাস্যুট ব্যাটালিয়নের সঙ্গে যোগ দিয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মিত্রবাহিনী টাঙ্গাইলের মির্জাপুর, কালিয়াকৈর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ছত্রীসেনা নামিয়ে রাতে প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে কাদেরিয়া বাহিনী। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। ফলে ঢাকা অভিযানের সর্বাপেক্ষা সম্ভাবনাপূর্ণ পথের সদ্ব্যবহার শুরু হয়।

দিনাজপুর অঞ্চলের মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী খানসামা থানা আক্রমণ করে। যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর ১৫ জন ও সাত মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তাদের হাতে এক মেজরসহ পাকিস্তানি বাহিনীর ১৯ জন ধরা পড়ে। তবে এ দিনই দিনাজপুরের বিরল থানায় বহলা গ্রামে ঘটে গণহত্যার নৃশংস ঘটনা। ১২ ডিসেম্বর পাকহানাদার বাহিনীর একটি দল প্রবেশ করে ওই গ্রামে। ওই সময় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণের মুখে পিছু হটার এক পর্যায়ে কাঞ্চন ক্যাম্পের খান সেনারা অনুপ্রবেশ করে ওই গ্রামে। তারা গ্রামবাসীকে গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। খান সেনাদের নির্দেশ মতো তল্পিতল্পা নিয়ে গ্রামবাসীরা গ্রাম ছাড়ার উদ্যোগ নেয়। এই সময় খান সেনারা মাইকযোগে আবার তাদের এক হওয়ার নির্দেশ দেয়। তখন মাগরিবের নামাজের সময়। অনেকে নামাজের কাতারে দাঁড়িয়ে গেছে। সবাই নামাজের কাতারে দাঁড়ালে ব্রাশফায়ার করা হয় পেছন থেকে। এতে ঘটনাস্থলে শহীদ হন ৩৭ জন।

এ দিন নীলফামারী, গাইবান্ধা, নরসিংদী, সরিষাবাড়ী, ভেড়ামারা, শ্রীপুর হানাদারমুক্ত হয়। দক্ষিণে ভারতীয় নৌবাহিনী সপ্তম নৌবহরের আসন্ন তৎপরতা সর্ব উপায়ে বিঘ্নিত করার জন্য চালনা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ছোট বড় অবশিষ্ট সব জাহাজ ও নৌযান, উপক‚লীয় অবকাঠামো, কক্সবাজার বিমানবন্দর প্রভৃতি ধ্বংস বা অকেজো করে ফেলে।

এদিকে, নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমিন অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ভারতকে পাকিস্তান ছেড়ে যেতে বলেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ মাতৃভূমি রক্ষায় শেষ পর্যন্ত লড়ে যেতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ।

অন্যদিকে, সেদিন মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ব্যাপকভাবে সমর্থন দেয়ার জন্য ভারত সরকার ও ভারতীয় জনগণকে ধন্যবাদ জানান। তিনি তার দলের সদস্যদের এবং সমর্থকদের বাংলাদেশ সরকার, আওয়ামী লীগ, মুক্তিবাহিনীর পক্ষে একসঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দেন। বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, মুক্তিসংগ্রামে জয়লাভের আর দেরি নেই।

দিল্লিতে কুজনেটসভ এবং মস্কোতে ডি পি ধরের যুগপৎ আলোচনার ফলে দ্রুতগতিতে উভয় সরকার মার্কিন ও চীনা হস্তক্ষেপের হুমকি মোকাবেলায় যুগ্ম ভূমিকা গ্রহণে সক্ষম হন। সপ্তম নৌবহরের আগমনসংক্রান্ত খবর তখনো (এবং ১৩ ডিসেম্বরের সন্ধ্যা পর্যন্ত) ভারতে কেবল স্বল্পসংখ্যক নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সীমিত। তবু মার্কিন প্রশাসনের হুমকির প্রকাশ্য জবাব দেয়া এবং ভারতের জনসাধারণকে আসন্ন বিপদ ও কঠোর সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করার উদ্দেশে ১২ ডিসেম্বর দিল্লিতে বিশেষভাবে আয়োজিত এক জনসভায় ইন্দিরা গান্ধী ‘সম্মুখের অন্ধকার দিন’ ও ‘দীর্ঘতর যুদ্ধের সম্ভাবনা’ সম্পর্কে সতর্ক করেন। সে সঙ্গে সাধারণ পরিষদের সাম্প্রতিক আহ্বানের জবাবে এবং পরোক্ষভাবে মার্কিন চরমপত্র প্রত্যাখ্যান করে জাতিসংঘ মহাসচিক উ থানকে এক বার্তায় ইন্দিরা জানান, ভারত যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং ভারতীয় সৈন্য স্বদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রস্তুত আছে, একমাত্র যদি পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহারে এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ মীমাংসায় পৌঁছাতে সম্মত হয়।

একাত্তরের এই দিনে হানাদারমুক্ত হয় কক্সবাজার। এরপর মুক্তিযোদ্ধারা শহরের পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে জড়ো হয়ে বিজয়ের লাল-সবুজের পতাকা উড়ান। এদিকে, যাদের রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে তাদের নেই যথাযথ মুল্যায়ন। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীর সন্তানদের ‘বধ্যভূমি’ও অরক্ষিত হয়ে আছে কক্সবাজারে। ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে এ দেশের নিরস্ত্র মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা মুক্তিকামী ও মুজিব আদর্শের নেতাকর্মীদের বেছে বেছে হত্যা করে। এ থেকে বাদ পড়েনি কক্সবাজারে মুক্তির আদর্শের সৈনিকরাও। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিশ্বাসীদের ধরে এনে বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয়েছে। সারা দেশের মতো কক্সবাজার জেলায় পাকিস্তানি সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে নির্যাতনের পর নৃশংসভাবে হত্যা করত। এদিকে অনেক ত্যাগ, রক্ত আর মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত হয় কক্সবাজার।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১৪ রাত ৯:১৬

আলম দীপ্র বলেছেন: বাহ ! দরকারি পোস্ট !

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.