| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান,
আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান॥
----- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর -----.jpg)
আমাদের এলাকাতে অনেকগুলি কদম গাছ ছিল একসময়। এলাকা থেকে বর্তমানে তাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। তবে আমাদের আশ্রমে এখন দুটি কদম গাছ আছে, যা প্রতি বছর পরম মমতায় ফুল ফুটিয়ে যাচ্ছে আমারদের জন্য।
ছেলেবেলায় আমার বাড়ির পাশেই একটি বিশাল কদম গাছ ছিল। প্রতিবছর সেই গাছ থেকে ফুল পেরে খেলা চলতো আমাদের। যখন ক্লাস সিক্স-সেভেনে পড়ি তখন একবার দুই দিনের জন্য ঢাকার বাইরে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে বাসার সামনে দাঁড়িয়ে অবাক লক্ষ্য করি চারপাশটা কেমন অদ্ভুত ফাঁকা আর ন্যাড়া লাগছে। দেখলাম বিশাল কদম গাছটি অকারণেই কেঁটে ফেলা হয়েছে। তাই এই ফাঁকা ফাঁকা ভাব!!
কদমের বেশ কয়েকটি সংস্কৃত নাম রয়েছে, তাদের মধ্যে একটি নাম হচ্ছে কদম্ব।
এই কদম বা কদম্ব দুই প্রকারের, একটি হচ্ছে কদম বা কদম্ব, অন্যটি হচ্ছে ধারাকদম্ব বা কেলিকদম্ব। আজকে আমরা দেখবো কদম বা কদম্ব ফুলটিকে। .jpg)
এসো নীপবনে ছায়াবীথিতলে, এসো করো স্নান নবধারাজলে॥
দাও আকুলিয়া ঘন কালো কেশ, পরো দেহ ঘেরি মেঘনীল বেশ--
কাজলনয়নে, যূথীমালা গলে, এসো নীপবনে ছায়াবীথিতলে॥
আজি ক্ষণে ক্ষণে হাসিখানি, সখী, অধরে নয়নে উঠুক চমকি।
মল্লারগানে তব মধুস্বরে দিক বাণী আনি বনমর্মরে।
ঘনবরিষনে জলকলকলে এসো নীপবনে ছায়াবীথিতলে॥
----- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর -----
ফুলের নাম : কদম
অন্যান্য আঞ্চলিক ও সংস্কৃত নাম : কদম্ব, গন্ধমৃৎপুষ্প, সীধুপুষ্প, হরিপ্রিয়, বৃত্তপুষ্প, মেঘাগমপ্রিয়, কর্ণপূরক, মঞ্জুকেশিনী, পুলকি, সর্ষপ, প্রাবৃষ্য, ললনাপ্রিয়, সুরভি, সিন্ধুপুষ্প।
Common Name : Burflower-tree, Laran, Leichhardt pine, Kadamba, Kadam, Cadamba
Scientific Name : Neolamarckia cadamba
অন্যদিকে ধারাকদম্বের সংস্কৃত নাম হচ্ছে - ধারাকদম্ব, নীপ, রাজকদম্ব, মহোন্নত, প্রাবৃষেণ্য, পুলকী ও ভৃঙ্গবল্লভ।.jpg)
কদম গাছকে বলা হয় “রূপসী তরু”। ফুল, ডাল আর পাতা—সবদিক থেকেই এটি এক অপরূপ বৃক্ষ।
বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের উষ্ণ অঞ্চলকে কদমের আদি নিবাস ধরা হলেও বিশ্বের নানা দেশে এই গাছের দেখা মেলে। নেপাল, শ্রীলংকা, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়শিয়া, পাপুয়া নিউগিনি এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রকৃতিতে কদম গাছ হর হামেসাই দেখতে পাওয়া যায়।
কদম একটি দীর্ঘাকৃতি ও বহুশাখাবিশিষ্ট বিশাল বৃক্ষ, যা সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ ফুট লম্বা হয়। এর কাণ্ড সরল, ধূসর থেকে প্রায় কালো রঙের এবং বহু ফাটলযুক্ত কর্কশ প্রকৃতির। গাছের ডালপালাগুলো ভূমির সমান্তরালে চারদিকে ছড়িয়ে থাকে।
কদম গাছের পাতাগুলো বড়, ডিম্বাকৃতি, উজ্জ্বল-সবুজ এবং চকচকে। কদম পাতার বিন্যাস বিপ্রতীপ এবং এর বোঁটা খুবই ছোট। নিবিড় পত্রবিন্যাসের কারণে কদম গাছ বেশ ছায়াঘন হয়। মজার বিষয় হলো, বড় গাছের তুলনায় চারা গাছের পাতার আকার অনেক বড় হয়; বয়স বাড়ার সাথে সাথে পাতার আকার ছোট হয়ে আসে। কদম পর্ণমোচী বৃক্ষ, তাই শীতকালে এর পাতা ঝরে যায় এবং বসন্তে নতুন কচি পাতা গজায়। .jpg)
রিমি ঝিম রিমি ঝিম ঐ নামিল দেয়া।
শুনি শিহরে কদম, বিদরে কেয়া।।
ঝিলে শাপলা কমল
ওই মলিল দল,
মেঘ-অন্ধ গগন, বন্ধ খেয়া।।
----- কাজী নজরুল ইসলাম -----
আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে কদম গাছে ফুল ফোটে। এজন্যই কদম ফুলকে বলা হয় “বর্ষাকালের দূত”। কদম ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন না, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দায়।
কদমের একটি পূর্ণ মঞ্জরিকে সাধারণত একটি ফুল মনে হলেও, আসলে তা অজস্র ছোট ছোট ফুলের এক চমৎকার সমাবেশ। দেখতে বলের মতো গোল ও মাংসল এই মঞ্জরির রঙ সাদা-হলুদে মেশানো। পুষ্পাধারে প্রতিটি ফুল অত্যন্ত সরু ও ছোট হয়। এর বৃতি সাদা, দল হলুদ, পরাগচক্র সাদা ও বহির্মুখী এবং গর্ভদণ্ড দীর্ঘ। কদম তিনবার পুষ্পিত হয়। “লাল কদম” বর্তমানে অত্যন্ত বিরল, খুবই কম চোখে পরে এটি।
কদমের ফল মাংসল ও টক স্বাদের। একটি ফলের ভেতরে প্রায় ৮ হাজার বীজ থাকে, তবে তা থেকে খুব কম চারাগাছই জন্মে। ভাদ্র মাসে যখন প্রকৃতিতে পশুপাখির খাবার কমে যায়, তখন বাদুড়, কাঠবিড়ালী ও বিভিন্ন পাখির প্রধান খাদ্য হয়ে ওঠে এই পাকা কদম ফল। অনেকেই পাঁকা কদম ফল ভর্তা বানিয়ে খায়, তবে এটি না খাওয়াই শ্রেয়। আগেই বলা হয়েছে ঐ সময় এ পাঁকা কদম ফল অনেক প্রাণীদের একমাত্র খাবার উৎস হয়ে উঠে।.jpg)
কদম্বরেণু বিছাইয়া দাও শয়নে,
অঞ্জন আঁকো নয়নে।
তালে তালে দুটি কঙ্কন কনকনিয়া
ভবনশিখীরে নাচাও গণিয়া গণিয়া
স্মিতবিকশিত বয়নে--
কদম্বরেণু বিছাইয়া ফুলশয়নে॥
----- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর -----
কদম অত্যন্ত দ্রুত বর্ধনশীল একটি গাছ। এর কাঠ বেশ নরম হওয়ায় ঘরের আসবাবপত্র তৈরিতে কাজে লাগে না। তবে দিয়াশলাইয়ের কাঠি, বাক্স-পেটরা তৈরি এবং জ্বালানি কাঠ হিসেবে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
ভেষজ চিকিৎসাতেও কদমের কিছু কার্যকরী ব্যবহার রয়েছে:
• জ্বর উপশমে : কদম গাছের ছাল জ্বরের ঔষধ হিসেবে বেশ উপকারী।
• কৃমি নাশ করতে : কদম পাতার রস কৃমি দূর করে (তবে অতিরিক্ত মাত্রায় খেলে বমি হতে পারে)।
• কাশি কমাতে : কদমের ফল কাশির তীব্রতা কমাতে সাহায্য করে।.jpg)
শ্রীকৃষ্ণের লীলাসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি সুপরিচিত ঘটনা হলো “বস্ত্রহরণ লীলা”। এই “বস্ত্রহরণ লীলা” কদম গাছকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। এই লীলা নিয়ে দুটি ভিন্ন বিবরণ আমি পেয়েছি।
প্রথম বিবরণ : কাত্যায়নী ব্রত ও বস্ত্রহরণ
বৃন্দাবনের কুমারী গোপীগণ শ্রীকৃষ্ণকে পতি হিসেবে পাওয়ার কামনায় “কাত্যায়নী ব্রত” পালন করতো। প্রতিদিন সূর্যোদয়ের আগে যমুনা নদীতে স্নান করে তাঁরা বালু দিয়ে দেবী কাত্যায়নীর (দুর্গার রূপ) মূর্তি তৈরি করে চন্দন, ধূপ, দীপ ও ফলমূল দিয়ে পূজা করতো। একদিন স্নানের সময় গোপীগণ তাঁদের বস্ত্র যমুনার ঘাটে রেখে জলে নামেন। এই সুযোগে শ্রীকৃষ্ণ চুপিসারে সমস্ত বস্ত্র নিয়ে ঘাটের পাশে একটি বিশাল কদম গাছের ডালে ঝুলিয়ে নিজে উঁচুতে একটি ডালে বসে থাকে।
স্নান শেষে গোপীগণ দেখেন তাঁদের বস্ত্র ঘাটে নেই। তাঁরা এদিক-ওদিক তাকাতেই দেখতে পান কদম্ব গাছের ডালে কৃষ্ণ বসে আছেন এবং তাঁদের বস্ত্রগুলো গাছের ডালে ঝুলছে।
কৃষ্ণ হাসতে হাসতে গোপীদের বলেন, "তোমরা যদি তোমাদের বস্ত্র ফেরত চাও, তবে একে একে জলের ওপর উঠে এসে নিজের নিজের বস্ত্র নিয়ে যাও। আমি তোমাদের সাথে কোনো কৌতুক করছি না, আমি সত্যই বলছি।"
গোপীগণ অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে জলের মধ্যে শরীর লুকিয়ে কৃষ্ণকে অনুনয়-বিনয় করে বস্ত্রগুলি ফেরত দিতে বলে। কিন্তু তখন কৃষ্ণ বলেন, "তোমরা যদি সত্যিই ব্রত পালন করো তাহলে লোকলজ্জা ত্যাগ করে সোজা এসে বস্ত্র নিয়ে যাও।"
অবশেষে, কৃষ্ণের ইচ্ছার সামনে গোপীগণ আত্মসমর্পণ করে বাধ্য হয়ে যমুনার জল থেকে নগ্ন দেহেই হাত জোড় করে উঠে এসে তাদের বস্ত্রগুলি কৃষ্ণের কাছ থেকে নিয়ে নেয়।.jpg)
দ্বিতীয় বিবরণ : বরুণ দেবের নিয়ম ও গোপীদের শিক্ষা
অন্য একটি বিবরণ অনুযায়ী, সমুদ্র ও জলের দেবতা “বরুণ দেব” নদী বা পুকুরের মতো উন্মুক্ত স্থানে নগ্ন হয়ে স্নান করা নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু গোপীগণ প্রায়শই বৃন্দাবনের কাছে একটি পুকুরে এই নিয়ম অমান্য করে স্নান করতেন। তাঁদের এই ভুল ভাঙাতে এবং শিক্ষা দিতে একদিন শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের পোশাক চুরি করে কদম গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখে। স্নান শেষে গোপীগণ যখন দেখেন তাঁদের বস্ত্র কদম গাছের ডালে ঝুলছে আর কৃষ্ণ সেখানে বসে আছেন, তখন নিরুপায় হয়ে নিয়ম ভঙ্গের ভুল স্বীকার করে তাঁরা নগ্নাবস্থায় পুকুর থেকে উঠে এসে বস্ত্র গ্রহণ করেন।.jpg)
এই বস্ত্রহরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কদম গাছের পটভূমিতে ভারতীয় উপমহাদেশে বহু গান, গল্প, কবিতা ও চমৎকার চিত্রশিল্প তৈরি হয়েছে।
কেন হেরিলাম নব ঘনশ্যাম কালারে কাল কালিন্দী-কূলে।
(সে যে) বাঁশরির তানে সকরুণ গানে ডাকিল প্রেম-কদম্ব মূলে।।
কেন কলস ভরিতে গেনু যমুনা-তীরে,
মোর কলস সাথে গেল ভাসি, লাজ-কূল-মান আকুল নীরে।
কলসির জল মোর নয়নে ভরিয়া সই আসিনু ফিরে।।
----- কাজী নজরুল ইসলাম -----
নির্জন যমুনার কূলে, বসিয়া কদম্ব তলে
বাঁজায় বাঁশী বন্ধু শ্যাম রাই
বাঁশীতে কি মধু ভরা, আমারে করিল সারা
আমি নারী ঘরে থাকা দায়
কালার বাঁশী হলো বাম, বলে শুধু রাধা নাম
কুলবঁধুর কুলমান মজায়
----- দূরবীন শাহ -----
কিছুদিন আগে চমৎকার একটি গান খুব ভাইরাল হয়েছিল- "যুবতী রাধে", সেখানে কয়েকটি লাইন ছিলো--
“আমারও অঙ্গের বিষ যে ঝাড়িতে পারে
সোনার এই যৌবনখানি দান করিব তারে
এই কথা শুনিয়া কানাই বিষ ঝাড়িয়া দিল
ছেড়ে ছুড়ে রাধে তখন গৃহবাসে গেল
গৃহবাসে যেয়ে রাধে আড়ে বিছায় চুল
কদম তলায় থাইক্কা কানাই ফিইক্কা মারে ফুল”
শুধু সনাতন হিন্দু ধর্মেই নয়, বৌদ্ধ ধর্মেও কদম গাছকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করা হয়। বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনে কদম গাছ এবং এর ফুলকে গভীর প্রজ্ঞা, আধ্যাত্মিক জ্ঞান এবং “বোধিলাভ” বা বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।.jpg)
তথ্য সূত্র : উইকিপিডিয়া, অন্তর্জাল।
ছবি ও বর্ণনা : মরুভূমির জলদস্যু।
ছবি তোলার স্থান : মুন্সীগঞ্জ, বাংলাদেশ।
ছবি তোলার তারিখ : ১৯/০৫/২০১৭ ইং
©somewhere in net ltd.
১|
০৭ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১৩
মিরোরডডল বলেছেন:
কৃষ্ণতো একটা বদের লাঠি ছিলো।
তো এতোগুলো গোপী মিলে কিছুই করলো না!
ব্যাটা কৃষ্ণকে ধরে পানিতে চুবিয়ে বিবস্ত্র করে দিলো না কেনো