| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ফা হ মি
নিতান্তই সাধারণ মানুষ কিন্তু স্বপ্ন দেখি অসাধারণ কারণ বিশ্বাস করি মানুষ তার আশার সমান বড়। পড়ব বেশি,লিখব যখন যা মনে আসে...।

আজ ২৬ মার্চ।স্বাধীনতা দিবস।স্বাধীনতার ৪৫ বছর পূর্তিতে এসে পড়া শেষ করলাম ‘একাত্তরের দিনগুলি’।বড্ড বেশি দেরি হয়ে গেল!
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের এই রোজনামচা আরো আগেই পড়ার কথা ছিল।কিন্তু হয়ে ওঠে নি যে কোন কারণেই হোক।মনে আছে,একবার আমাদের ‘আশরাফুল ইমাম শাকিল গ্রন্থাগার’ থেকে এই বই পড়ব বলে মনস্থির করি।কিন্তু অন্য পাঠকের কাছে বইটা থাকায় আর পড়া হয় নি।সেইবার নিয়ে এসেছিলাম জাহানারা ইমামের ‘ক্যান্সারের সাথে বসবাস’।পড়ে মুগ্ধ হচ্ছিলাম লেখিকার লেখনীতে,তাঁর ব্যক্তিত্বে।উনার সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছিলাম।তখন বুঝেছিলাম কতটা দৃঢ় চরিত্রের অধিকারী তিনি।কিন্তু পুরোটা জানা হয় নি।আজ এত বছর পর এসে যখন এই অমূল্য দলিল পড়লাম,চোখের সামনে স্লাইড শো’র মত দেখলাম একাত্তরের মার্চ থেকে ডিসেম্বরের একেকটা দিনকে-শিহরিত হলাম।কী কঠিন ত্যাগ করেছেন এই জননী;কী অপূর্ব সাহসিকতায়!শ্রদ্ধার পারদ তরতর করে কয়েকগুণ উপরে উঠে গেল।
রুমী-জামী –অনেক শুনেছি এই নাম দুটো।কিন্তু এভাবে চিনি নি আগে।রুমীর ফুপা একরাম সাহেবের বয়ানে রুমী সম্পর্কে একটা ধারণা জন্মে।উনি বললেন, ‘রুমীর সঙ্গে আলাপ করে আমি তো হতবাক! এইটুকু ছেলে এই বয়েসে এতো পড়াশুনা করে ফেলেছে? আগে তো ভাবতাম বড়লোকের ছাওয়াল হুশ হুশ করে গাড়ি হাঁকিয়ে বেড়ায়, চোঙ্গা প্যান্ট পরে, গ্যাটম্যাট করে ইংরেজি কয়, আলালের ঘরের দুলাল। কিন্তু এখন দেখতিছি এ বড় সাংঘাতিক চিজ! মার্কস এঙ্গেলস একেবারে গুলে খেয়েছে। মাও সে তুং-য়ের মিলিটারি রাইটিংস সব পড়ে হজম করে নিয়েছে। এই বয়েসে এমন মাথা, এমন ক্লিয়ার কনসেপশান, বাউরে, আমি তো আর দেখি নাই’।
রুমীর দূরদৃষ্টির পরিচয় পাই ২৫ শে মার্চ দিনের বেলা মায়ের সাথে কথোপকথনে।রুমীর মুখে দুদিনের খোঁচা খোঁচা দাড়ি।মাথার চুল খামচে ধরে রুমী বলল, “আম্মা বুঝতে পারছ না মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা ব্যর্থ হতে বাধ্য। এটা ওদের সময় নেবার অজুহাত মাত্র। ওরা আমাদের স্বাধীনতা দেবে না। স্বাধীনতা আমাদের ছিনিয়ে নিতে হবে সশস্ত্র সংগ্রাম করে”।
কতই বয়স তার!মাত্র ২০!সদ্য কৈশোর পেরুনো রুমী।সবেমাত্র ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ইঙ্গিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছে।আমেরিকার ভার্সিটিতে স্কলারশীপ পেয়েছিল।ভার্সিটির ডরমেটরীর রুম নাম্বারও তাকে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল।কিন্তু রুমীর চিন্তা ছিল অন্যরকম।
রুমী বলেছিল “আম্মা শোন, ছাত্রজীবন লেখাপড়া করার সময় এসবই চিরকালীন সত্য; কিন্তু ১৯৭১ সালের এই এপ্রিল মাসে এই চিরকালীন সত্যটা কি মিথ্যে হয়ে যায় নি? ........ হাত আর চোখ বেঁধে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে, কটকট করে কতকগুলো গুলি ছুটে যাচ্ছে, মুহূর্তে লোকগুলো মরে যাচ্ছে। এইরকম অবস্থার মধ্য থেকে লেখাপড়া করে মানুষ হবার প্রক্রিয়াটা খুব বেশী সেকেলে বলে মনে হচ্ছে না কি? আম্মা, দেশের এই রকম অবস্থায় তুমি যদি আমাকে জোর করে আমেরিকায় পাঠিয়ে দাও, আমি হয়তো যাব শেষ পর্যন্ত। কিন্তু তাহলে আমার বিবেক চিরকালের মত অপরাধী করে রাখবে আমাকে। আমেরিকা থেকে হয়ত বড় ডিগ্রী নিয়ে এসে বড় ইঞ্জিনিয়ার হবো; কিন্তু বিবেকের ভ্রুকুটির সামনে কোনদিনও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। তুমি কি তাই চাও আম্মা?”
তার্কিক ছেলের যুক্তিতে হার মানেন মা।বুকে পাথর বেঁধে,চোখ বন্ধ করে বলেন-‘না,তা চাই নে।ঠিক আছে,তোর কথাই মেনে নিলাম।দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবানি করে।যা,তুই যুদ্ধে যা’।
রুমী যুদ্ধে যায়।সেক্টর টুতে খালেদ মোশাররফ রুমীদের নায়ক।ঢাকায় আসে রুমীরা কজন একটা অপারেশনের জন্য।২৫ আগস্ট একটা দূর্দান্ত অপারেশন সফল করে ওরা।
রুমীর গান শোনা আর বই পড়ার বাতিক।২৮ আগস্ট মায়ের সাথে গল্পের মাঝেই টম জোনসের ‘গ্রীন গ্রীন গ্রাস’ নামের গানটা রুমী রেকর্ড বাজিয়ে শোনায় তার মাকে।বহুবার শোনা এ গান।রুমী প্রায়ই বাজায়।তিন মিনিটের গানটা শেষ হলে রুমী আস্তে আস্তে বলল,‘গানটার কথাগুলো শুনবে? এক ফাঁসির আসামী তার সেলের ভেতর ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিল সে তার গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেছে। সে ট্রেন থেকে নেমেই দেখে তার বাবা-মা আর প্রেয়সী মেরি তাকে নিতে এসেছে। সে দেখল তার আজন্মের পুরনো বাড়ি সেই একই রকম রয়ে গেছে। তার চারপাশ দিয়ে ঢেউ খেলে যাচ্ছে সবুজ সবুজ ঘাস। তার এত ভাল লাগল তার মা-বাবাকে দেখে, তার প্রেয়সী মেরিকে দেখে। তার ভাল লাগল তার গ্রামের সবুজ সবুজ ঘাসে হাত রাখতে। তারপর হঠাৎ সে চমকে দেখে সে ধূসর পাথরের তৈরি চার দেয়ালের ভেতরে শুয়ে আছে। সে বুঝতে পারে সে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল’।মায়ের চোখ টলমল করে পানিতে।সাথে আমারও।হাত বাড়িয়ে রুমীর মাথাটা বুকে টেনে মা বললেন-‘রুমী। রুমী। এত কম বয়স তোর, পৃথিবীর কিছুই তো দেখলি না। জীবনের কিছুই তো জানলি না।’
রুমী মুখ তুলে কি একরকম যেন হাসি হাসল, মনে হলো অনেক বেদনা সেই হাসিতে। একটু চুপ করে থেকে বলল, “ ‘বিন্দুতে সিন্ধু’ দর্শন একটা কথা আছে না আম্মা? হয়ত জীবনের পুরোটা তোমাদের মতো জানিনি, ভোগও করিনি, কিন্তু জীবনের যত রস-মাধুর্য-তিক্ততা-বিষ-সব কিছুর স্বাদ আমি এর মধ্যেই পেয়েছি আম্মা। যদি চলেও যাই, কোন আক্ষেপ নিয়ে যাব না”।
২৯ আগস্ট রুমীকে ধরে নিয়ে যায় মিলিটারি পুলিশ।সাথে তার বাবা,ভাইকেও।ওদের ছেড়ে দেয় দুদিন পর।কিন্তু রুমী ছাড়া পায় না।সব দায় নিজের ঘাড়ে নিয়ে ‘ভাংব,তবু মচকাব না’ নীতিতে অটল থাকে রুমী।ঐ রুমীর শেষ দেখা তার মায়ের সাথে।
রুমীকে নিয়ে লেখা শেষ হবে না।শেষ হবে না শহীদ জননীকে নিয়ে লিখলেও।আমি পড়ি আর চোখের জল ফেলি।কীভাবে রুমীর মা সব মুক্তিযদ্ধার মা হয়ে ওঠেন-উপলব্ধি করি একটু একটু করে।
পড়া শেষ করে রেশ কাটে না।শেষের দিকে এসে মনে হয়-আরেকটু বড় হলে ভালো হতো বইটা।আমি বই নিয়ে গুগল সার্চ করা শুরু করলাম।রুমীর বন্ধু হ্যারিসের কাছ থেকে পাওয়া ফটোগ্রাফ খুঁজে পেয়ে আমার যে কী আনন্দ হলো!জানলাম আরো অনেক অনেক অজানা।
অন্যজনের ব্যক্তিগত একটা ডায়েরী যে আরেকজনের এতটা আপন হতে পারে-আমার জানা ছিল না।কী অসাধারণ একটা বই!যেন জীবন্ত চলচ্চিত্র দেখলাম।পরিচিত কত নাম পেলাম এই বইয়ে।এই বই একটা অবশ্য পাঠ্য বই মনে হয়েছে আমার কাছে।আর চলচ্চিত্রের বাস্তবায়ন দেখার অপেক্ষায় রইলাম।এই বই আমার জানার তৃষ্ণাকে বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ।মনে মনে তালিকা তৈরি করেছি বইয়ের।মহান মুক্তিযুদ্ধের এই মহানায়কদের তো জানতে হবে আরো ভাল করে।আজ ৪৫ তম স্বাধীনতা দিবসে এটাই শপথ নিলাম।
২|
২৬ শে মার্চ, ২০১৬ সকাল ৯:৩৭
সোজোন বাদিয়া বলেছেন: এতো হৃদয়কাঁপানো আলোড়ন, তারপর কী?
©somewhere in net ltd.
১|
২৬ শে মার্চ, ২০১৬ ভোর ৫:০৬
রুদ্র জাহেদ বলেছেন: অনেক ভালো লাগা।খণ্ড খণ্ডভাবে কিছুটা জানি।কিন্তু খুব বেশি জানা নেই।প্রিয় মানুষের লেখা এই বই পুরোটা এখনো পড়িনি।ভালো লাগল এখানে এমন হৃদয়ছোঁয়া আলোড়িত হওয়ার মতো লেখা পড়ে