| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
রিম অনেক্ষন ধরে বাসাটির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। রিম হচ্ছে সেই গোত্রের যারা যেকোন প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে না, সহজে বিশ্বাসও করতে চায় না। যেমন হাতের চাবিটাকে এই মুহূর্তে সে বিশ্বাস করতে পারছে না। প্রায় তিন ইঞ্চি লম্বা চাবিটার খাজ গুলো সন্দেহজনক রকম সুন্দর। মাঝে একটা চিপ বসানো। চাবিটা হাতে নেয়ার পর থেকেই তার অস্বস্তি হচ্ছে, আবার একই সাথে একটা নিষিদ্ধ আর্কষনও অনুভব করছে।
পিছনে মৃদু কথাপোকথনের আওয়াজে তার সৎবিৎ ফিরে এল। না তাকিয়েও বুঝতে পারল লোকগুলো নির্ঘাত তাকে পাগল ঠাওরাচ্ছে। অবশ্য পনের মিনিট ধরে বাসার সামনে চাবি হাতে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে পাগল ঠাওরানোটাই স্বাভাবিক। আশেপাশে যতদুর দেখা যায় সবগুলো বাড়ি দেখতে হুবহু একই রকম। একতলা বাসা, ছাই রঙের দেয়াল, দরজার দুই পাশে দুইটা জানালা, সামনে একটুখানি বাগানের মত। আর দরজার উপরে একটা লাইট। যেখানে এই মুহূর্তে সবুজ আলো জ্বলে আছে।
বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিম চাবিটা দরজার ফুটোয় ঢুকিয়ে দিল। তিন-চার সেকেন্ড মৃদু গুঞ্জন হয়ে থেমে গিয়ে লাল আলো জ্বলে উঠল। এনগেজ্ড। দরজার পাশের জানালা দিয়ে উকি মেরে তার চিরচেনা সেই ড্রয়িং রুমটাকেই দেখতে পেল রিম। সোফার উপর উল্টে রাখা ম্যাগাজিন, টেবিলের উপর এটো প্লেট।
“তারা শেষ পর্যন্ত করতে পেরেছে তাহলে।” মুখে তেক্তো হাসি নিয়ে ভাবে ও।
কি মনে করে চাবিটা টেনে বের করল রিম। সাথে সাথে বাসার ভিতরে একটা নীল আলোর ঝলক খেলে যেতেই কিছুক্ষনের জন্য অন্ধ হয়ে গেল সে। চোখ সয়ে আসতেই দেখল তার চিরচেনা রুম নিকষ অন্ধকারে উধাও। দেখেই গা শিরশির করে উঠল। সবুজ আলো আবার জ্বলে উঠেছে।
তাড়াতাড়ি চাবি আবার ঢুকালো সে, আলো লাল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল, তারপর দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে পড়ল। বাতাসে কাল রাতের রান্না করা মাংসের গন্ধ। ঠিক যেভাবে রেখে গিয়েছিল। আরো ভালভাবে বললে, ব্যুরো থেকে লোকগুলো এসে পুরো বাসা স্কেন করে ডিজিটাল ডাটায় পরিণত করে, পুরো বাসা ধ্বংস করে ফেলার আগে, ঠিক যেভাবে রেখে গিয়েছিল, সেরকমই আছে সব। চাবির মধ্যেই সব ইনফরমেশন দেয়া আছে। পোর্টেবল প্রযুক্তির সর্বশেষ সংযোজন।
বাসাটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল রিম। সবকিছু ঠিক থাকা সত্ত্বে তার অস্বস্তি যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে কোথায় যেন খুত রয়ে গেছে। রিডিং রুমের সামনে পুরোনো বইয়ের স্তূপ, সদ্য রং করা রান্নাঘরের দেয়াল থেকে কাচা রঙের গন্ধ, এমনকি টেবিলের উপর চায়ের দাগটাও, সব আগের মতই আছে। আস্তে আস্তে রিম স্বাভাবিক হতে লাগল। বাথরুমের দরজাটা খোলার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না, খুলতে পারবে আসাও করেনি। দরজা পানিতে ভিজে ফুলে উঠাতে সহজে খুলতে চায়না। মনে মনে একচোট হেসে নিল রিম। কোন সন্দেহ নেই, এটা তারই বাড়ি। পুরো ব্যাপারটা কি করে তারা নিখুত ভাবে করল ভাবতে ভাবতে আনমনে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই ভুত দেখার মত চমকে উঠল রিম। জানালা দিয়ে যে পার্কটা দেখা যাচ্ছে সেটা ওখানে থাকার কথা না, পার্কটা তার বাসার বাম দিকে থাকার কথা। কোন কারনে দৃশ্য মিরর হয়ে গেছে। যদিও ও জানে জানালার পুরো দৃশ্যই প্রোগ্রাম করা, তারপরেও সে ব্যাপারটা মানতে পারল না।
“এটা আমার বাড়ি না” বিড়বিড় করে বলতে লাগল রিম।“আমার সাথে প্রতারণা করা হয়েছে।”
কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই রিম নিজেকে বাইভার্বাল এর উপর আবিষ্কার করল। আগে যে বাড়িতে থাকত সে দিকে ছুটতে লাগল। যেকোন খালি বাড়িতে তার নির্ধারিত চাবি ঢুকালে সেটা তার বাড়ি হবে জানা স্বত্তেও, তার নিজের বাড়িতে, যেখানে সে তার স্মৃতি বিজারিত দশটি বছর কাটিয়েছে, সেখানে থাকাটাই প্রাধান্য পাচ্ছে তার কাছে।
হঠাৎ করে তার মনে খুব আনন্দ হতে লাগল। মনে হচ্ছে কতদিন পর বাড়ি ফিরছে। মনে মনে পরবর্তি কাজের পরিকল্পনা করে নিল। তার চাবি ব্যবহার করে বাড়িতে ঢুকবে, গোসলটা সেরে নিয়ে রাতের রান্না বসিয়ে দিবে। হঠাৎ মনে পড়ল, বেশ কিছুদিন আগে তিতির পাখির মাংস আর আঙুরের রস জোগাড় করে রেখেছিল ও, কোন বিশেষ দিনে খাবে বলে। তার এক প্রিয় লেখকের বই এ পড়েছিল এই খাবার নাকি স্বর্গের অমৃতের মত। আজ খাওয়া যেতে পারে, খুশি মনে ভাবল ও। নিজের অজান্তেই বাইভার্বালের গতি আরো বাড়িয়ে দিল।
কিন্তু গন্তব্যে পৌছতেই কোন পরিকল্পনাই মনে থাকল না আর। বাড়িটাকে দেখতে পাচ্ছে ও। হুবহু একই রকম। একতলা, দুই জানালা, সামনে বাগান। পার্কটাও বামদিকে। শুধু একটা জিনিস ছাড়া।
দরজার উপর লাল আলো জ্বলে আছে।
দরজায় অন্য একটা চাবি লাগানো। রিম একদৃষ্টিতে আলোটার দিকে চেয়ে রইল। কি করবে ভেবে উঠতে পারছে না। সন্তর্পণে দরজার পাশের জানালা দিয়ে উকি দিল। অচেনা একটা রুম। এক যুগল দম্পতি তার দিকে পিছন ফিরে সোফার উপর বসে টিভি দেখছে। মনে হয় কমেডি কিছু হচ্ছে, অন্তত একটু পর পর তাদের হেসে উঠা দেখে তাই মনে হচ্ছে। হঠাৎ তার প্রচন্ড ক্রোধ হতে লাগল।
“কত বড় সাহস! আমার বাড়িতে অনুপ্রবেশ করেছে আবার হাসাহাসিও করছে।” রাগে বিড়বিড় করতে লাগল রিম।
দরজার সামনে এসে দাড়াল আবার। একবার ভাবলো নক করবে, কিন্তু সাথে সাথেই সে চিন্তা বাতিল করল। নিজের উপরই রাগ হতে লাগল। এভাবে চলে আসাটা বোকামি হয়ে গেছে। কিন্তু নিজের বাড়িতে অন্যের অবস্থানও মানতে পারছে না। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষন ভাবল। আস্তে আস্তে নার্ভ শান্ত হয়ে এল। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে।
ধীরে ধীরে চোখ খুলল রিম। চোখে খুনে দৃষ্টি। ফিসফিস করে বলল, “এটা শুধুই আমার বাড়ি।”
তারপর দরজায় লাগানো চাবিটা ধরে টান দিল।
©somewhere in net ltd.