| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মোঃ ফরিদুল ইসলাম
জন্ম- ১৯৮৭ খ্রিঃ চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলাধীন ২নং বাকিলা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের লোধপাড়া গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। পিতার নাম মোঃ সিরাজুল ইসলাম, মাতার নাম ফাতেমা বেগম।
প্রাথমিক শিক্ষা একটি জাতির মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তিপ্রস্তর। এই স্তরেই শিশুর ভাষা, গণিত, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা, সামাজিকতা ও জীবনদক্ষতার ভিত নির্মিত হয়। যে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা যত শক্তিশালী, সেই দেশের অর্থনীতি, সামাজিক উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক চর্চাও তত সুদৃঢ় হয়। বাংলাদেশ গত দুই দশকে প্রাথমিক শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিদ্যালয়ে ভর্তি বৃদ্ধি, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, উপবৃত্তি কর্মসূচি, নতুন শিক্ষাক্রম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার—এসব উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিক্ষার প্রবেশাধিকার (Access) অনেকাংশে নিশ্চিত হলেও শিক্ষার গুণগত মান (Quality) এখনো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে Foundational Literacy and Numeracy (FLN) বা মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞানকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, তৃতীয় শ্রেণির শেষে যে শিশু সাবলীলভাবে পড়তে, বুঝতে এবং মৌলিক গণিত করতে পারে না, তার পরবর্তী শিক্ষাজীবনে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। এ কারণে FLN-কে কেন্দ্র করে শিক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণ সময়ের দাবি।
তবে বাস্তব চিত্র বলছে, অনেক শিক্ষার্থী শ্রেণি উত্তীর্ণ হলেও প্রত্যাশিত শেখার ফল অর্জন করতে পারছে না। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা, পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সীমিত প্রয়োগ এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। শিক্ষা তখন জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে কেবল সনদ অর্জনের মাধ্যম হয়ে যায়।
শিক্ষকই শিক্ষার প্রাণ। কিন্তু অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকস্বল্পতা, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, প্রশাসনিক কাজের চাপ এবং পর্যাপ্ত বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের অভাব শিক্ষাদানের গুণগত মানে প্রভাব ফেলছে। একজন শিক্ষক যদি একই সঙ্গে পাঠদান, প্রশাসনিক কাজ, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রমে অতিরিক্ত ব্যস্ত থাকেন, তবে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত শেখার প্রয়োজন অনুযায়ী সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
অবকাঠামোগত বৈষম্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। এখনো অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, নিরাপদ ভবন, মানসম্মত টয়লেট, বিশুদ্ধ পানীয় জল, পাঠাগার, বিজ্ঞান কর্নার, ডিজিটাল ডিভাইস কিংবা স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগ নেই। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার যুগে এই বৈষম্য শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ দক্ষতা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে।
শিক্ষা শুধু বইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি শিশুর মানসিক সুস্থতা, আনন্দময় পরিবেশ, খেলাধুলা, সংস্কৃতি চর্চা এবং নিরাপদ বিদ্যালয়ও শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার চাপ, অতিরিক্ত কোচিং নির্ভরতা এবং আনন্দময় শিক্ষার ঘাটতি শিশুদের শেখাকে একঘেয়ে করে তুলছে। সুখী শিক্ষার্থীই সবচেয়ে ভালোভাবে শেখে—এই সত্যকে আমাদের শিক্ষা পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে।
এছাড়া বিদ্যালয় ও পরিবারের অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করা জরুরি। অভিভাবক যদি সন্তানের শেখার প্রক্রিয়ায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন, তবে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, শিখনফল ও আচরণগত উন্নয়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডিজিটাল দক্ষতা, যোগাযোগ, সহযোগিতা, সৃজনশীলতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রাথমিক শিক্ষাকে কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে। একই সঙ্গে নৈতিক শিক্ষা, পরিবেশ সচেতনতা, স্বাস্থ্যবিধি, সহমর্মিতা এবং দেশপ্রেমের মতো মূল্যবোধও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।
করণীয়:
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন—
তৃতীয় শ্রেণির মধ্যেই সকল শিক্ষার্থীর মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান নিশ্চিত করা।
শূন্যপদ দ্রুত পূরণ এবং ধারাবাহিক, মানসম্মত শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত যৌক্তিক পর্যায়ে আনা।
দক্ষতাভিত্তিক ও ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতি কার্যকর করা।
প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিরাপদ অবকাঠামো, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, পাঠাগার ও ডিজিটাল সুবিধা নিশ্চিত করা।
বিদ্যালয়কে আনন্দময়, শিশুবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশে রূপান্তর করা।
অভিভাবক, স্থানীয় সম্প্রদায় এবং বিদ্যালয়ের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলা।
তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, নিয়মিত গবেষণা এবং শিখনফল মূল্যায়নের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণ করা।
বাংলাদেশ উন্নত ও স্মার্ট রাষ্ট্র গঠনের যে স্বপ্ন দেখছে, তার বাস্তবায়নের ভিত্তি হবে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা। ভবন নির্মাণ, পাঠ্যবই বিতরণ কিংবা ভর্তি হার বৃদ্ধি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে শিশুর প্রকৃত শেখার ওপর। প্রতিটি শিশুকে যদি আনন্দময় পরিবেশে মৌলিক দক্ষতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং জীবনোপযোগী শিক্ষা দেওয়া যায়, তবে তারাই আগামী দিনের দক্ষ, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
প্রাথমিক শিক্ষার সংকট সমাধান কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, শিক্ষক, অভিভাবক, স্থানীয় সমাজ এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। আজকের সঠিক বিনিয়োগই আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা।
আমার পরামর্শ, এই নিবন্ধে আপনার নিজের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, বাস্তব উদাহরণ এবং সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য যুক্ত করলে এটি জাতীয় দৈনিক যেমন প্রথম আলো, দৈনিক ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন বা সমকাল-এর মতামত পাতায় প্রকাশের জন্য আরও শক্তিশালী হবে। শুভকামনা রইল।
লেখক: ফরিদুল ইসলাম, চিন্তক, সমাজ ও মানবাধিকাকর্মী এবং গবেষক।
©somewhere in net ltd.