| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
জোছনাকে ঢেলে সাজানোর আয়োজন চলছে। গত দুদিনের জোছনার কার্যাবলী নিয়ে ঈশ্বর দারুন বিরক্ত। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে অভিযোগ এসেছে। এ জোছনা নিয়ে নাকি কবিরা ঠিকমত কবিতা লিখতে পারছে না। উদ্ভ্রান্ত যুবকরা নগরীর পথে হেঁটে সস্তি পাচ্ছে না। যাযাবরের গাঁজার আগুন জোছনা ছুঁতে পারছে না।
এত্ত এত্ত অভিযোগ শুনতে শুনতে ঈশ্বর ভীষন ক্লান্ত। "ঢেলে সাজাও জোছনা" নামক একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। নিজেকে প্রধান বানিয়ে বাকিদের কর্মচারী বানিয়ে ঈশ্বর হাতে খাতা কলম নিয়েছেন। তিনি দেখতে চান ঠিক কতটুকু আলো ঠিকরে বেরুলে কবিদের কবিতায় কোন সমস্যা হবে না। পাশেই জোছনার আলোর রেগুলেটারে হাত দিয়ে একবার বাড়ানো হচ্ছে একবার কমানো হচ্ছে। রেগুলেটরে হাত দিয়ে আলো বাড়িয়ে দিলেন ঈশ্বর। কমিটির বাকি সদস্যরা চিৎকার করে উঠলেন "হইছে হইছে"। ঈশ্বর বিজ্ঞের ভাব ধরে বললেন "না হয়নি"
সাথে সাথে কমিটির অন্য সদস্যরা বলে উঠলো "হুমম সত্যিই হয়নি, কিছুটা বাড়াতে হবে"। ঈশ্বর এদিক ওদিক নাড়ালেন ঠিকই তবে কুল কিনারা করতে পারেননি।নাহ বলে হাঁফ ছেড়ে দিলেন।বাকি সদস্যরাও রব তুললেন “আপনার পারার কথা ছিলো না মহামান্য ঈশ্বর, যা চেষ্টা করেছেন তা ঢের বেশী। বাকিটা অলস ইঞ্জিনিয়ারদের উপর ছেড়ে দিন”
এমনটা আগে কখনও হয়নি। ঈশ্বর ব্যর্থ হবার পর “জোছনা উৎপাদন কেন্দ্রে” ইঞ্জিনিয়াররা কারিগরি ক্রটি ঘেঁটে দেখছেন। না সবকিছুই ঠিকই আছে। তবে? নতুন কমিটি গঠন করা হলো্। এই কমিটি পৃথিবীতে গিয়ে জোছনা পরিমাণ পর্যবেক্ষন করে আসবে। তারপর ঈশ্বরের বরাবর রিপোর্ট দিবে।
ভরা জোছনা নেমেছে আজ। ইউসুফ আলী মাঠের এক কোনায় বসে কলকিতে টান দিচ্ছেন। করিম উদ্দিন ইউসুফ আলীর খাস ভক্ত। গুরু যা বলেন তাই। আরও কিছু চ্যালাও আছে সাথে। কলকির টান শেষে গান ধরলেন
“মনা আমার মন কাইড়াছো
আন্ধার রজনীতে
পূর্নিমার এই আগুনে
ভাসাইছো কোন পিরিতে?
আস তবে মাখামাখি চান্দের আলোয়
বাতাস রাখছি বুকের ভিতর ….
মনা আমার মন কাইড়াছো..
নাহ এখানে ঠিকই আছে। পরিদর্শক দলের একজন যার নাম টোটন খাতা বের করে রিপোর্ট লিখে ব্যাগে খাতা ঢুকিয়ে রাখলেন। এখন যেতে হবে করিম সাহেবের বাসার ছাদে। সেখানে জোছনা রাতের পারিবারিক আড্ডা বসেছে। ইউসুফ আলীর গানের ঘোর টোটনকেও ধরছে। গুনগুণ করে “মনা আমার মন কাইড়াছো…”
শমসের সাহেবের হিসাবটা চমৎকার। চালের দাম যদি গত পাঁচ বছরে তিনগুণ হতে পারে, তবে জোছনার আলোও কিছুটা কমতে পারে। তাতে কোন সমস্যা তিনি দেখছেন না। কিন্ত তার খুঁতখুঁতে স্ত্রী এ কথা মানছেনই না। আগেরবার তার সাদা শাড়ীর উপর স্বর্নালী আলো পড়ে অন্যরকম বিক্রিয়া তৈরি করেছিলো কিন্তু এবার তেমনটা হচ্ছে না।
-হা হা হা আরে তোমার বয়স বেড়েছে না। তাই জোছনা তোমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
মেয়েও অবশ্যই মায়ের পক্ষে কথা বললো। “নাহ বাবা গতবার সত্যিই অনেক ভালো ছিলো। এইবার কিচ্ছু নেই”
শমসের সাহেবের আর কি করা। মা মেয়ে যখন বলছে তাহলে জোছনার আলো কমাটাকে অবশ্যই সমস্যা হিসাবে দেখতে হবে। হঠাৎ আসর চুপ মেরে গেল। রবীঠাকুরের গান চালু হলো “আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে “
টোটন তার খাতা বের করে এ বাড়ীর রিপোর্ট লিখতে লিখতে সহযোগী মোটনকে বললো “উনারা আড্ডা দিচ্ছেন না, জোছনার হিসাবের সুদ আসল করছেন”
-স্যার দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে।
-হুমম এখন আমরা কোথায় যাবো?
-এক কবির ভাঙ্গা ঘরে। যেখানে ছাদের ফুটো দিয়ে জোছনা আসে।
মাটিতে হাঁটুগেড়ে বসে আছেন তমাল মল্লিক। এক দৃষ্টিতে মাটির দিকেই চেয়ে আছেন। অথচ তার ঘরে ছাদ ভেদ করে জোছনা আলো ফেলছে। তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নাই।পুরো এক ঘন্টা একটিবারের জন্য তিনি অন্যদিক চোখ সরালেন না। টোটন এবং মোটন শেষমেষ বিরক্ত হয়ে মানুষ বেশ ধরে জিজ্ঞেস করে ফেললেন “কি ব্যাপার আপনি এতক্ষন ধরে মাটিতে কি খুঁজছেন?
-জোছনা খুঁজি, জোছনা।
-জোছনাতো উপরে মাটিতে কেন?
তিনি খুব বিরক্ত হয়ে প্রথমবারের মত মুখ ফেরালেন। আবার মাটিতে মনযোগ দিলেন।“শোনেন চাঁদ জোছনা দেয়, মাটি তা ধারন করে। কতটা ধারন করতে পারলো আমি সেটাই দেখছি।আপনারা যানতো বিরক্ত করবেন না”
এখানে রিপোর্টটা কনফিউজিং হলো। আর কিছুক্ষন পরই জোছনা উবে যাবে। সকাল হবার জন্য রাত অপেক্ষা করছে। সিগারেট হাতে এক যুবকের পিছু নিলো দুজন। যুবক কেবল হাঁটছে।মাঝে মাঝে ইচ্ছা করেই ফুটপাতে বসে থাকছে। তেমন কোন লক্ষ নেই। এমনকি জোছনার প্রতি সামান্য ভ্রুক্ষেপ নেই। বিরক্ত হয়ে দুই পর্যবেক্ষক যুবককে ছেড়ে দিয়ে এক বস্তিতে প্রবেশ করলো।
নাটে উটকো গন্ধের সাথে হইচই শোনা গেল। শেষ রাতে এত হইচই কেন?
সকাল কাজে যেতে হবে তাই এই বস্তিতে আলো আসার আগেই চলে রান্না ঘর দখলের চেষ্টা। যার আগে যে দখল করে সকালের খাবার রান্না করতে পারে।রান্নাঘর দখল নিয়ে প্রাথমিকভাবে কয়েক পশলা গালি বিনিময় হয়, তারপর শুরু হয় টয়লেট দখল নিয়ে গালিগালাজ। নারী-পুরুষ কিংবা শিশু কেউ কম যায় না।
“ধুর এখানে আসাই ভুল হয়েছে” টোটন বেশ বিরক্ত হয়েই বললো।
তখনও জোছনার আলো একেবারে চুপসে যায়নি। কাজ গুটিয়ে ঈশ্বরের অফিসে ফেরত যাবার জন্য রওনা হয়ে গেছে দুজন। যাবার আগে জোছনার শেষ আলোটুকু দেখে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে দুজনেই রাস্তায় হাঁটছে। ঈশ্বরের কাছে থাকলেতো আর জোছনা দেখা হয় না! সামনেই বেশ জোরেই হেঁটে যাচ্ছে প্রেমিক-প্রেমিকা। তার আজ ঘর ছেড়ে পালিয়েছে
-তুমি বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে তুমি ঘরহীন আমার সাথে যাচ্ছো ! সামনেই কিন্তু ঘোর অন্ধকার
-দেখেছো আজ জোছনা কত বেশী আলো ছড়াচ্ছে
-সত্যিইতো !
ছেলেটি হাত বাড়িয়ে দিলো, মেয়েটি হাত শক্ত করে ধরে হাঁটার গতি দ্বিগুন করে পরিচিত এলাকা পেরুতে পারলে বাঁচে।
-আজকে আমাদের জোছনা উৎসব শুরু
-হুমম আজকে থেকেই আমরা স্বাধীন জোছনার নিচে স্নান করবো।
দুই পরিদর্শক একটু এগিয়ে তাদেরকে অতিক্রম করলো।ছেলে মেয়ে দুজনেই তাদের চেনা।শমসের সাহেবের মেয়ে এবং রাস্তায় হাঁটা সেই উদভ্রান্ত যুবক !
ক’দিন পরেই ঈশ্বর ঘোষনা দিলেন জোছনা উন্নয়ন কাজ শেষ। যার যার জোছনা তার মত খুঁজে দেখার আহবানও করা হয়েছে।
কাসাফাদ্দৌজা নোমান
©somewhere in net ltd.