নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সময় সীমাহীন

হুমায়রা হারুন

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু প্রযুক্তিতে নয়, বরং মননের বিনিময়ে। ব্লগে যোগাযোগের মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠত্বেরই প্রকাশ ঘটে। আপনি যখন লেখেন, মন্তব্য করেন, কিংবা অন্যের ভাবনা পড়েন — আপনি তখন মানব প্রজাতির মননে অংশ গ্রহন করেন।

হুমায়রা হারুন › বিস্তারিত পোস্টঃ

গণহত্যা যুগে যুগে, গণহত্যা -৭১

১৩ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ সন্ধ্যা ৬:৩১

বিজয়ের মাস -ডিসেম্বর। আনন্দের মাস ডিসেম্বর। কিন্তু আনন্দের মাঝে রয়েছে মানুষের আত্মত্যাগের কষ্ট, যন্ত্রণার ইতিহাস আর গণহারে চালানো বাংলার মানুষের ওপর নিপীড়ন, নির্যাতনের স্বাক্ষর এবং পরবর্তীতে তাদের নিধন। এর নাম গণহত্যা। '৭১ এ বাংলার মানুষের ওপর চালানো গণহত্যা স্মরণকালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভয়াবহ মানুষ নিধনের একটি কর্মকান্ড। উন্মত্ততা আর পৈশাচিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে এরকম হত্যা আগেও বহুবার ঘটিয়েছে মানুষ মানবতার বিরুদ্ধে । ১৯৩৩ এ যেমন শুরু হয়েছিল জার্মানীতে পোলিশ, রাশান ইহুদীদের লক্ষ্য করে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ। ইংরেজীতে এই বিশেষ ধরণের মানুষ নিধনের কার্যপ্রণালীকে বলা হয় হোলোকোস্ট। সমগ্র বা whole আর kaustos বা পোড়ানো শব্দ দুটো একত্রে যুক্ত হয়ে হোলোকোস্ট শব্দের উতপত্তি। ইশ্বরের উদ্দেশ্যে শুধু পশু বলিদানের প্রথা পালনের ক্ষেত্রে এই শব্দের প্রয়োগ ও ব্যবহার শুরু হলেও পরবর্তীতে নাতসী বাহিনী কর্তৃক ইহুদী নিধনের ক্ষেত্রেই এর প্রয়োগ সীমাবদ্ধতা লাভ করেছে। সুপরিকল্পিত ভাবে গণহত্যা সম্পন্ন করে তা পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার অমানবিক পদ্ধতি নাতসী বাহিনী কর্তৃক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লক্ষ্য করলেও বাংলার মাটিতেও তার প্রয়োগ বিভীষিকার মাত্রাকে ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল।

চিত্রঃ হোলোকোস্ট ১৯৪১
গণহত্যা বলতে খুব সহজ ভাবে বুঝি জাতিগত বৈশিষ্ট্যের কারণে বা ধর্মীয় কারণে বা নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের দিকে লক্ষ্য রেখে কোন গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষকে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে নিধন করা। ক্ষেত্রবিশেষে এই কারণসমূহ ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু মূল উদ্দেশ্য অভিন্ন থাকে আর তা হলো নৃশংসতা।

চিত্রঃ ল্যান্ডসবার্গ জার্মানীর কনসেনট্রেসান ক্যাম্প

চিত্রঃ গ্যাস চুল্লীতে নিহতদের অবশিষ্ট

চিত্রঃ পাকিস্তানী বর্বর হানাদার বাহিনী আর তাদের দোসর রাজাকার আলবদর বাহিনী নিরীহ বাঙালীদের হত্যার জন্যে ব্যবহার করতো ইলেকট্রিক চেয়ার। বাঁ চিত্রে ইলেকট্রিক চেয়ার বদ্ধ অবস্থায়, ডানে ইলেকট্রিক চেয়ার খোলা অবস্থায়। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে '৭১ এ স্থাপিত এ ঘাতক চেয়ারে বসিয়ে প্রতি মিনিটে বিশ জন মেরে ফেলা হতো। চেয়ারটি এখন আছে ঢাকার জাতীয় যাদুঘরে।

যুদ্ধে বন্দীদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে রুদ্ধ করে রাখার জায়গাটিকে বলা হয় কনসেনট্রেসান ক্যাম্প। ১৯৩৩ সালেই হিটলারের বাহিনী ছয় লক্ষ ইহুদী, পাঁচ লক্ষ জিপসি, আড়াই লক্ষ শারিরীক বা মানসিক পঙ্গু ব্যক্তি, তিন মিলিয়নের বেশী সোভিয়েত যুদ্ধবন্দী এবং আরো বিভিন্ন দলভুক্ত মানুষ যেমন জেহোভ্যা'স উইটনেস, সমকামী, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দলের সদস্য, কমিউনিস্ট পার্টির নিবেদিতপ্রাণ কর্মী এবং যারা হিটলার বাহিনীর কাছে অপ্রয়োজনীয় ও অগ্রহণযোগ্য তাদেরকে কনসেনট্রেসান ক্যাম্পে একত্র করে পরবর্তীতে কিলিং সেন্টারে অবস্থিত গ্যাস চেম্বারে চালান করে হত্যাকান্ড সংঘটিত করতো।

মানুষের প্রতি মানুষের ঘৃণা নৃতাত্ত্বিক বিভেদ থেকে সৃষ্ট হয়। সে কারণে কোন হত্যাযজ্ঞ পালনের ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা গ্রুপের কার্যকলাপ সবসময়ই প্রধান থাকে। সময়কাল তখন ১৯৯২; আমাদের স্বাধীনতা লাভের প্রায় ২০ বছর পর আরেকটি গণহত্যার চিত্র বসনিয়া এবং হারজাগোভিনার ভয়াবহ মানুষ হত্যা। মুসলমান, সার্ব গোত্রহীন মানুষকে সেই একইভাবে কনসেনট্রেসান ক্যাম্পে জড়ো করে নির্যাতন ও হত্যা করা। এমনি আরো একটি চিত্র পলপটের গণহত্যা। সময় ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯. কম্বডিয়ার নিরীহ সংখ্যালঘু চৈনিক, ভিয়েতনামি, মুসলমান ও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সমূলে নিধন। নৃতাত্ত্বিক বিভেদ এবং সংস্কৃতি ও কৃষ্টিগত বিভেদ থেকে সৃষ্ট ঘৃণা এর একটি কারণ। পলপটের স্বপ্নরাজ্য গড়া ছিল আরেকটি কারণ । তাই মোট জনসংখ্যার ২১ শতাংশ নির্মূল করে দেয়া কম্বডিয়ার শাসক গোষ্ঠীর জন্য ক্ষুদ্র একটি প্রয়াসই হয়তোবা ছিল।

প্রেক্ষাপট রাওয়ান্ডা। ১৯৯৪ সাল। ৮ লক্ষ নারী, পুরুষ, শিশুদের হত্যা করা হয় প্রায় ১০০ দিনের মাঝে। চিত্রে হত্যাযজ্ঞ থেকে মাত্র বেঁচে যাওয়া রাওয়ান্ডার শিশু।

সার্বেনিয়ায় ১৯৯৫ সালের গণহত্যায় নিহতদের একটি ২০ ফুট গভীর, ১০০ ফুট চওড়া গণকবর। ফরেনসিক বিভাগের চিকিতসক দ্বারা খননকৃত এই কবরে ৮৩৭২ জন শিশু পুরুষ ও প্রৌঢ়দের স্তুপকৃত মরদেহ । ছবিঃ Gilles Peress ( The Graves: Srebrenica and Vukovar [Scalo Books, 1998])

চিত্রে কম্বোডিয়ায় খেমারুজ বাহিনী কর্তৃক গণহত্যায় নিহতদের করোটি।

গণহত্যা সংগঠকদের আরেকটি বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণে ততপর দেখা যায়। যেমন কোন এলাকায় বা দেশে বা কোন বিশেষ গোষ্ঠীর ওপর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে অন্যায় ভাবে সামরিক ততপরতা বা সামরিক অভিযান চালানোর উদ্দেশ্যে ভ্রান্ত প্রচারাভিযান পরিচালনা করা বা প্রোপাগান্ডা করা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাজী বাহিনী বার্লিনে সমর্থন লাভের উদ্দেশ্যে প্রোপাগান্ডা মন্ত্রী গোয়েবেল তার কূটকৌশলে সফলতা অর্জন করেছিল। প্রোপাগান্ডায় সৃষ্ট ভ্রান্ত ধারণা কোন বিশেষ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যেমন তিক্ততা সৃষ্টি করে তেমনি একই সাথে যুদ্ধ সংগঠিত করার আদর্শকে মহিমান্বিত করার উদ্যোগ স্থাপন করার লক্ষ্যে সফলতা অর্জন করে। রাওয়ান্ডা জেনোসাইডে প্রোপাগান্ডার একটি অংশ ছিল টেন কমান্ডমেন্ড, যেখানে ঐশী বাণীর মতো নির্দিষ্ট করে দেয়া ছিল দশটি নির্দেশ।

চিত্রে গণহত্যা রাওয়ান্ডা

রিফউজি ক্যাম্প কিবুম্বায় সদ্য আগত একটি পরিবার। আলোকচিত্র শিল্পী Jose Diogo-র ক্যামেরায় রাওয়ান্ডার গণহত্যার চিত্র।

১৯৭১ এ বাংলার মাটিতে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নেয়া বাংলাদেশের মানুষ। স্থান ভারতের বারাসাত, উত্তর ২৪ পরগনা। ছবি আব্দুল হামিদ রায়হান, Autograph ABP

রাওয়ান্ডার হুটু ও টুটসি জাতি দুটির মাঝে প্রকট বৈষম্য তৈরির লক্ষ্যে এই নির্দেশগুলো তৈরি করা হয়েছিল যেন অনায়াসে হুটুরা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে টুটসিদের ওপর। নাতসী বাহিনী প্রোপাগান্ডায় যে মন্ত্র সরবরাহ করতো তাতে বলা হতো, ইহুদীরা শুধু ইতর বিশেষই নয়, তারা জার্মান জাতির জন্য ভয়ংকর শত্রুও বটে। হিটলারের কনসেনট্রেসান ক্যাম্প আর কিলিং সেন্টারের বন্দীদের বাস্তবে মৃত্যুবরণ সন্নিকটস্থ হওয়া সত্ত্বেও তাদের বাড়িতে বাড়িতে পোস্টকার্ড প্রেরণের মাধ্যমে জানানো হতো তারা ওখানে বহাল তবিয়তে আছে।
বাংলার মাটিতে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানী সরকারের পরিচালিত রাজাকার আলবদর বাহিনীকে গ্রহণযোগ্য ও প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত প্রোপাগান্ডার মাত্রা ছিল ভয়াবহ, যা অসম্ভব রকমের চাতুরী, প্রতারণা, ভন্ডামী ও ধোঁকাবাজীর আরো একটি আদর্শ নিদর্শন। প্রোপাগান্ডায় বলা হতো, সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুনর্বহাল করতে ও শান্তি কায়েমের উদ্দেশ্যে কমিটি গঠণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যার নাম শান্তি কমিটি। মহল্লায় মহল্লায় আহ্বান জানানো হয়েছিল শান্তি কমিটিতে যোগদানের। প্রোপাগান্ডায় আরো বলা হতো, শান্তি কমিটির কার্যক্রম এগিয়ে চলছে সাধারণ মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস আর আস্থাকে সম্বল করে। শুধুমাত্র কিছু অশান্তিকামী মানুষ সমস্যা সৃষ্টি করছে। কিন্তু সাধারণ বাঙ্গালী জনতা, মিত্রশক্তি ভারতের দুষ্ট চক্রান্ত উপলব্ধিতে সক্ষম হয়েছে এবং তা প্রতিহত করছে। দেশের সংহতি এবং একতা রক্ষার্থে দেশের জনগণ বদ্ধপরিকর। তারা রাজাকার আলবদরের সাথে কাজকে সমর্থন প্রদান করেছে। রাজাকার আলবদর গোষ্ঠী পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরানের আলোকেও প্রোপাগান্ডার মন্ত্র তৈরী করত সুচতুর ভাবে। নবীজীর জীবনাদর্শন থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে সঠিক পথ চলার নির্দেশ দেয়ারও সাবধান বাণী প্রচার করতো। তারা বলতো, ধর্মকে নষ্ট করে ইসলামিক ভ্রাতৃত্ববোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে যারা, তারা মুনাফেক ছাড়া আর কিছুই নয়। ঐ পথে চললে একটি জাতি (বাঙ্গালী জাতি) সামগ্রিক ভাবে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাই আর গুজবে বিশ্বাস নয়। রাজাকার আলবদরের দোসর হওয়াই উতকৃষ্ট পন্থা।

দেশে বিদেশে মিডিয়ার মাধ্যমে এসব প্রোপাগান্ডা জোরেশোরে চালানো হতো। কিন্তু এর ফলাফল যে বেশীদিন স্থায়ী হয়না তার শিক্ষা অতীত ইতিহাস থেকে যেমন কেউ গ্রহণ করেনা, ক্ষমতার লিপ্সায় সাময়িক সময়ের জন্য হলেও যুদ্ধবাজ গোষ্ঠী অন্ধ হয়ে উন্মত্ত আচরণ প্রদর্শন করতেও তাই পিছপা হয়না। তার কল্পরাজ্য পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় গণহত্যা চালানো যেন কম্পিউটার গেইম খেলার মতনই আনন্দদায়ক হয়ে উঠে।
যুদ্ধে সংখ্যলঘুদের লক্ষ্য করে অত্যাচার করা হয় সবসময়। কিন্তু বাংলার মাটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠরাও পাকিস্তানী বাহিনী দ্বারা নির্যাতিত, নিপীড়িত হয়েছে একযোগে। মুসলমান ভ্রাতৃত্ববোধকে কাজে লাগিয়েই এ হত্যাযজ্ঞ সম্পন্ন করা হয়েছে অসম্ভব দক্ষতার সাথে। জাতির মেরুদন্ডকে দ্বিখন্ডিত করতে নিধন করেছে বুদ্ধিজীবীদের, ইতস্ততভাবে যেখানে যেভাবে পেয়েছে সেভাবে নয় বরং তালিকা করে সুপরিকল্পিত ভাবে এবং নির্মম ভাবে চরম নৃশংসতার সাথে এ কাজটি তারা সাধন করেছে। আর তাই ৭১ এর গণহত্যা নজিরবিহীন।

ঐতিহাসিক একটি চিত্র, রায়েরবাজার বধ্যভূমি। বুদ্ধিজীবীদের চোখ বেঁধে, পেছনে হাত বেঁধে হত্যা করার পর।

।।‘স্মৃতির দুয়ারে’ লেখা থেকে কিছু অংশ।।
‘আমাদের পাশের গ্রাম ছিল রসুলপুর। এ গ্রামের অধিকাংশ লোক হিন্দু। ঐ অঞ্চলে এই গ্রামটি ছিল একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা ছিল অতিশয় বিদ্বান। বিখ্যাত র‍্যাংলার কিরণ রায় এই গ্রামেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। নানা বিদ্যায় পারদর্শী অনেকে ভারতে উচ্চপদে আসীন। এই গ্রামের ভিতর দিয়ে চলার সময় মনে হত একটি সাজানো, গোছানো, আদর্শ বসতি। পরিষ্কার ছিমছাম বাড়িঘর, নিকানো উঠান, ফুলের বাগান, ফলের গাছ, শান বাধানো পুকুর ঘাট-সব যেন ছবির মত। ভারত বিভক্তির পর অনেক হিন্দু ভারতে চলে যান। ফলে হিন্দুদের সংখ্যা হ্রাস পায়। যারা ছিলেন তাদের একজনের নাম ছিল নিশিকান্ত। অবস্থাপন্ন ব্যক্তি, মান্যগণ্যও বটে। পাঞ্জাবী মিলিটারিদের ক্রোধ হিন্দুদের উপর খুব বেশী ছিল। একদিন গভীর রাত্রে তারা রসুলপুরে হানা দেয়। রাস্তা চলতে চলতে তারা দু’ধারে জনপদে আগুন ধরিয়ে দেয়। এলোপাথারি গুলি চালায়। পরে এসে পৌঁছায় নিশিকান্তের বাড়িতে। বাড়ির মালিক নিশিকান্তকে ওরা ধরে ফেলে। নিশিকান্তের শোবার ঘরের বড় খুঁটিতে তাকে রশি দিয়ে বেঁধে ফেলে। বাড়ির আরও ছয়জন ধরা পড়ে। তারপর বাড়িতে পেট্রোল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিরাট বাড়ি দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। নিশিবাবুদের আর্ত চিৎকারে জেগে উঠে গ্রামবাসী। তাদের সম্মিলিত চিৎকারে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। জেগে উঠে আমাদের গ্রামের মানুষেরা। তারা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখতে পায় বিশাল অগ্নিকুন্ডের গগনচুম্বি লেলিহান শিখা। আগুনের প্রচন্ড তাপে আটচালা টিনের ঘরের চালের টিনগুলো ঠাস ঠাস বিকট শব্দে ছুটে যেতে থাকে। ভয়ে আবাল বৃদ্ধ বণিতা থর থর করে কাঁপতে থাকে। নিশিকান্তের আওয়াজ স্তব্ধ হয় চিরতরে।

যুদ্ধ জয়লাভের মিথ্যা প্রচারণা পাকিস্তানীরা তাদের নিজেদের দেশেও চালাতো দক্ষতার সাথে। প্রতিদিন খবরের কাগজে পুরো পৃষ্ঠা জুড়ে বড় আকারে লেখা থাকতো ইংরেজী অক্ষর V (ভি) অর্থাৎ ভিকটরি-বিজয়। পাকিস্তানীদের ভাষায় আখেরী ফাতাহ্ হামারা হোগা। যার অর্থ হলো, শেষ বিজয় আমাদের হবে। সাধারণ নাগরিকরা মনে প্রাণে তাই বিশ্বাস করতো। তারা জানতো না এই V এর কোন সত্যতা নেই। পাকিস্তানীরা অল ইন্ডিয়া রেডিওর উর্দূ গানের প্রোগ্রাম খুব পছন্দ করে। প্রায় সময় রেডিও চলে। কিন্তু যখন খবর প্রচারের সময় হয়, তখন তারা ঠাস করে রেডিও বন্ধ করে দেয়। উর্দূতে বলে, ইন্ডিয়ান খবর শুনে মনে হয় যেন, সত্যি কথা বলছে। কাফেররা মিথ্যা সংবাদকে কেমন সত্য সংবাদের মত পরিবেশন করে, ওরা বড় চতুর। খবর শুনলে মনে হয় বিশ্বাস করি! আসলে সব খবর মিথ্যা!
যেদিন বৃক্ষ সমূলে উৎপাটিত হলো সেদিন সেদেশের সাংবাদিকগণ সত্য গোপন করেনি। তারা সত্য সংবাদ ছাপালো। এতদিন পর তারা পত্রিকায় বিরাট বড় হেড্ লাইন লিখলো, OUT ! একটি শিরোনাম, একটি লাইনে। এখনও সেই বিরাট OUT লেখাটি আমার চোখে ভাসে। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার মাঠে পাকিস্তান আউট হয়েছে। এটি একটি বাস্তব ঘটনা যে পূর্ব বঙ্গ স্বাধীন হয়েছে। বাঙালীরা পাঞ্জাবী দৈত্য দানবের থাবা অবশ করে দিয়েছে। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর যৌথ বিক্রমের নিকট পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হিংস্র উন্মত্ত তান্ডবলীলার অবসান ঘটেছে। অবশেষে এসেছে সেই দিন। আনন্দের দিন , বিজয়ের দিন ১৬ ই ডিসেম্বর, সেই ১৯৭১ সালেই।
কিন্তু এ সংবাদটি অবিশ্বাস্য মনে হল পাকিস্তানী জনগণের কাছে। সেদিনে হঠাৎ করেই নিস্তব্ধ হয়ে পড়লো চারিদিক। গাছে গাছে পাতারা যেন ঝুলে পড়েছে, পাখীর কুজন গেছে থেমে। রোদ্র যেন ঝিমিয়ে পড়েছে। প্রকৃতি শুনশান। আকাশ, বাতাস, পৃথিবী সব দুঃখে মগ্ন। কোথাও কোন শব্দ নেই, কোলাহল নেই। মনে হয় ঘরে ঘরে মৃত্যু শোক। প্রত্যেকটি নাগরিক যে যেখানে ছিলো মাথা নীচু করে বসে পড়লো। তারা তাদের সরকারের হঠকারিতা উপলব্ধি করতে পারলো। তারা বুঝতে পারলো তাদের সরকার তাদেরকে এতদিন মিথ্যা কথা বলে প্রতারিত করেছে। তারা জানতে পারলো দেশের সরকার অন্যায় সমরে লিপ্ত ছিল। দেশী পত্র-পত্রিকা বা মাধ্যমগুলো এতদিন সত্য সংবাদই পরিবেশন করেছে। কিন্তু অন্ধ বধির তারা, সেসব সংবাদে কর্ণপাত করে নাই, বিশ্বাস স্থাপন তো দূরের কথা।’
[স্মৃতির দুয়ারে-ফিরোজা হারুন]

আজ স্বাধীনতা লাভের এতো বছর পার হলো। এখন তো আর থেমে থাকা নয়। শুধু এগিয়ে চলা। আমার সোনার বাংলাদেশ কেন চুপ করে থাকবে কেন পিছিয়ে থাকবে?
তাই এই বিজয়ের দিনে মাকসুদের কন্ঠে ফিডব্যাকের সেই গানটি জন্মেছি এই যুগে খুব মনে হচ্ছেঃ
পৃথিবী চলছে তীব্র গতিতে
আমার বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে থাকে
তথাকথিত কিছু আঁতেলের দল
ভঙ্গ করছে আমার ঐ মনোবল
তারা যে জন্মেছে এই যুগে...
আমার অহংকার আমি গান গাই এই যুগে
আমি জন্মেছি এই যুগে।

ডিসেম্বর, ২০১১

মন্তব্য ৩ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (৩) মন্তব্য লিখুন

১| ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১৫

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:



অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী একটি লেখা । নির্মমতার তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে লেখাটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়
মানুষ যখন ঘৃণা, সাম্প্রদায়িকতা, মিথ্যা প্রচারণা ও ক্ষমতার লোভে অন্ধ হয়ে যায়, তখন মানবতা কতটা নিষ্ঠুরভাবে
বিপর্যস্ত হতে পারে।অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী, তথ্যসমৃদ্ধ ও বিবেক জাগানিয়া একটি লেখা।

১৯৭১ সালের গণহত্যা শুধু আমাদের ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অধ্যায় নয়, এটি বাঙালি জাতির বেদনা, আত্মত্যাগ
ও স্বাধীনতার জন্য অপরিসীম সংগ্রামের এক চিরন্তন সাক্ষ্য। বিশ্বের বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত গণহত্যার সঙ্গে একাত্তরের
ইতিহাসের এই নির্মম সত্যগুলো জানা, মনে রাখা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের নৈতিক
দায়িত্ব। কারণ ইতিহাস বিস্মৃত হলে অন্যায়ের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি
গভীর শ্রদ্ধা এবং সকল নির্যাতিত মানুষের প্রতি অকৃত্রিম সমবেদনা। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়
সমৃদ্ধ হোক, সত্য ও ন্যায়ের পথে এগিয়ে চলুক এবং মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বদরবারে
মাথা উঁচু করে দাঁড়াক।

ইতিহাস হোক সত্যের দর্পণ, স্মৃতি হোক মানবতার প্রেরণা, আর স্বাধীনতা হোক আমাদের গর্ব ও অঙ্গীকার।

শুভেচ্ছা রইল

২| ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১৬

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:


লেখাটি প্রিয়তে নিয়ে গেলাম ।

শুভেচ্ছা রইল

৩| ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:০৬

হুমায়রা হারুন বলেছেন: আলী ভাই, আপনি লেখাটি প্রিয়তে যে রেখেছেন, এতেই আমার লেখার সার্থকতা।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.