| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
জুল ভার্ন
এপিটাফ এক নিঃশব্দ প্রচ্ছদে ঢাকা আছে আমার জীবনের উপন্যাস... খুঁজে নিও আমার অবর্তমানে... কোনো এক বর্তমানের মায়াবী রূপকথায়। আমার অদক্ষ কলমে... যদি পারো ভালোবেসো তাকে... ভালোবেসো সেই অদক্ষ প্রচেষ্টা কে, যে অকারণে লিখেছিল মানব শ্রাবণের ধারা.... অঝোর শ্রাবণে।।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬"- আশা ও শঙ্কা.....
‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ পাস হয়েছে।
জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬-এ জোরপূর্বক গুমকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো ভুক্তভোগী মারা গেলে অথবা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে তাঁর কোনো সন্ধান না পাওয়া গেলে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
বিলে কমিশনের এখতিয়ার স্পষ্ট করা হয়েছে এবং অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে। তদন্ত চলাকালে ভুক্তভোগীদের তাৎক্ষণিক হুমকি থেকে রক্ষা এবং আরও ক্ষতি প্রতিরোধে কমিশনকে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়ার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো, জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের ঐচ্ছিক প্রটোকল (OPCAT) অনুযায়ী একটি জাতীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা (National Preventive Mechanism- NPM) ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা। এই ইউনিট নির্যাতন, হেফাজতে মৃত্যু ও জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধে কাজ করবে।
জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলে জোরপূর্বক গুমকে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপস অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
বিলটি জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ, অপরাধীদের বিচার, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের সুরক্ষার জন্য একটি আইনি কাঠামো তৈরি করেছে।
আইনে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীর সদস্য তাঁর সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগ করে- অথবা কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ বা শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীর অনুমোদন, সহায়তা বা সম্মতিতে- কাউকে গ্রেপ্তার, আটক, অপহরণ বা অন্য কোনোভাবে তাঁর স্বাধীনতা হরণ করেন এবং পরে সেই আটক বা স্বাধীনতা হরণের বিষয় অস্বীকার করেন কিংবা ওই ব্যক্তির অবস্থান, শারীরিক অবস্থা বা পরিণতি গোপন করেন, যার ফলে তিনি আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হন- তাহলে সেটি জোরপূর্বক গুম হিসেবে গণ্য হবে।
গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধানের জন্য আদালত তল্লাশি পরোয়ানা জারি করতে পারবে। আইনে অনুপস্থিতিতে বিচার (trial in absentia), ডিজিটাল প্রমাণ গ্রহণ এবং সাক্ষী, অভিযোগকারী, হুইসেলব্লোয়ার ও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার অধিকার থাকবে। কী ঘটেছিল সে সম্পর্কে সত্য জানার এবং নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি জানার অধিকারও তাঁদের দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া একটি বিশেষ তহবিলের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির সম্পদ থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় করা হবে। তবে তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্র সেই ব্যয় বহন করবে।
গুম হওয়া ব্যক্তির স্বামী/স্ত্রী ও নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের তাঁদের ভরণপোষণ ও জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ওই ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
পাঁচ বছর পর একটি ‘গুমের সনদ’ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে, যাতে উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তি করা যায়। গুমের ঘটনায় একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেস এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তদন্ত ও বিচার- উভয়ই সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।
একজন গুম-নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগী এবং সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি- এই আইন বাংলাদেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে একই সঙ্গে এর কিছু বিধান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ও আশঙ্কাও রয়েছে।
★যে বিষয়গুলো ইতিবাচকঃ
(১) গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি
এটাই সবচেয়ে বড় অর্জন। গুমকে আর নিছক ‘নিখোঁজ’ বা সাধারণ ‘অপহরণ’ হিসেবে পাশ কাটানোর সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে কাউকে গুম করা যে গুরুতর অপরাধ- আইন সেটিকে স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
(২) কঠোর শাস্তির বিধানঃ
গুমের অপরাধে যাবজ্জীবন এবং গুমের শিকার ব্যক্তির মৃত্যু বা দীর্ঘদিন সন্ধান না পাওয়ার মতো গুরুতর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এটি সম্ভাব্য অপরাধীদের জন্য একটি শক্ত বার্তা।
(৩) ডিজিটাল প্রমাণ ও অনুপস্থিতিতে বিচারঃ
গুমের মতো অপরাধে ডিজিটাল তথ্য, কল রেকর্ডসহ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলো ব্যবহারের সুযোগ এবং পলাতক অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার চালানোর বিধান কার্যকর বিচারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
(৪) ভুক্তভোগী পরিবারের অধিকার ও পুনর্বাসনঃ
নিখোঁজ ব্যক্তির সম্পত্তি পরিবারের ভরণপোষণে ব্যবহারের সুযোগ, নিখোঁজ সনদ, সরকারি আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা- ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা।
★মন্দ দিক বা ত্রুটি /নেতিবাচক ও সমালোচিত দিকসমূহঃ
(১) স্বাধীন তদন্ত কমিশন নাই- এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। গুমের অভিযোগ যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠে, তাহলে সেই বাহিনী তদন্ত করবে না- এটা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু তদন্তের দায়িত্ব যদি অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী দলের কাছে দেওয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়-
অভিযুক্ত বাহিনীর বদলে অন্য বাহিনী তদন্ত করলেই কি সেটা সত্যিকার অর্থে স্বাধীন তদন্ত হয়ে যায়?
‘অন্য বাহিনী’ আর ‘স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থা’- দুটি এক জিনিস নয়।
(২) মিথ্যা অভিযোগের শাস্তি- ভুক্তভোগীদের জন্য ভয়।
অভিযোগ মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এই বিধানটি যেন প্রকৃত ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের ভয় দেখানোর অস্ত্র হয়ে না দাঁড়ায়।
একজন ভুক্তভোগী যদি মনে করেন, অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলেই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে- তাহলে অনেক পরিবার অভিযোগ করতেই ভয় পেতে পারেন।
৩. প্রভাবশালী অভিযুক্তদের পার পাওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। গুম কোনো একক ব্যক্তির সিদ্ধান্তে হয়েছে, নাকি একটি কমান্ড কাঠামো, নির্দেশনা বা প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার মাধ্যমে হয়েছে- তদন্তে সেটাও বেরিয়ে আসতে হবে।
৪. সাক্ষী সুরক্ষা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে?
আইনে সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার কথা থাকলেই হবে না। গুমের মামলায় সাক্ষীকে নিরাপত্তা দেবে কে, কীভাবে দেবে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বাধীন ব্যবস্থা কী- এসবও পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন।
উপসংহারঃ
গুমের বিচার করতে গিয়ে যদি তদন্তের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে ভয় পান, সাক্ষী নিরাপত্তাহীন থাকেন কিংবা প্রভাবশালীরা আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যান- তাহলে আইনটি কাগজে যত কঠোরই হোক, বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না।
মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা থাকা অন্যায় নয়। কিন্তু গুমের মতো ভয়াবহ অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযোগকারীর পক্ষে তা প্রমাণ করার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। কারণ, যারা গুম করে তারা সাধারণত প্রশিক্ষিত ও সংঘবদ্ধ রাষ্ট্রীয় শক্তি। পারস্পরিক যোগসাজশে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে গুমের ঘটনা ঘটানো হয়।
যাকে গুম করা হয়, তিনি কেবল জীবিত অবস্থায় ফিরে আসতে পারলেই ঘটনার কথা বলতে পারেন। কিন্তু গুম থেকে ফিরে আসা একজন ব্যক্তির একক ও ক্ষীণ কণ্ঠস্বরের বিপরীতে বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় শক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণ হাজির করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, গুম হওয়ার পরও যে প্রায় ২৫০ জন এখনো ফিরে আসেননি, তাঁদের অবস্থা কেমন- তা বলাই বাহুল্য।
তাই এই বিধানটি যেন প্রকৃত ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের ভয় দেখানোর অস্ত্র হয়ে না দাঁড়ায়। একজন ভুক্তভোগী যদি মনে করেন, অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলেই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে- তাহলে অনেক পরিবার অভিযোগ করতেই ভয় পেতে পারেন।
এই অপব্যবহারের সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে মংলার মিরাজ শেখের ঘটনাটি সামনে এসেছে। মিরাজ শেখের পরিবারের সদস্যরা গত পাঁচ মাস ধরে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে সাক্ষ্যপ্রমাণ ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা তুলে ধরেছেন। অথচ প্রশাসনের একটাই কথা- তারা কিছুই জানে না। আল্লাহ মালুম, মিরাজ শেখের পরিবারই কি ‘পাঁচ বছর জেল’ দণ্ডের প্রথম উদাহরণ হতে যাচ্ছে?
আমি মনে করি এই আইন প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচনা। কিন্তু একটি ভালো আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন তার প্রয়োগ হয় স্বাধীনভাবে, নিরপেক্ষভাবে এবং ভুক্তভোগীবান্ধবভাবে।
©somewhere in net ltd.