নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

পোশাক কারখানার মেধা-শ্রমিক । মেহনতী মানুষের জয় হোক । পড়তে ভাল লাগে, মূলত এই জন্যেই ব্লগে আসা-যাওয়া করি ।

কালমানব

বস্ত্র কারখানার পেশাজীবি

কালমানব › বিস্তারিত পোস্টঃ

হুজুরের পেটে কি...।

২৯ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১৭

সকাল থেকে শুকুর আলীর বাড়ীতে এলাহী কাণ্ড চলছে । হাট থেকে তাজা বড় রুই মাছ, খাসির মাংস আর দেশি মুরগি কিনে এনেছে আর নিজেই তরকারি কাটার তদারকি করছে । জরিনা তার বৌ, আর কাজের মেয়ে সুফিয়া রান্নাঘরে অনেক কাজ করছে । বিরক্ত হয়ে জরিনা হাত ধুয়ে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে উঠানে আসে, কপালের ঘাম শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে, বিরক্ত গলায় বলতে থাকে- বিয়া বাড়ীর ধুম লাগাইছে, কেল্লিগা এত পদ, এত রান্না!
শুকুর আলী রাগে না । তার মন আজকে অনেক ভাল । সে বলে, আহা জরি-পরী, রাগ কইরো না! আমরার কত বড় কপাল, আইজ এই অধমের বাড়ীতে এত বড়, মস্ত বুজুর্গ বিদ্বান-পীর সাহেব পা রাখছেন । আমরা উনার পায়ের ধুলা পড়ার সমানও নারে পরী ।
জরিনা পাত্তা দেয়না । বলে জানা আছে, কে কতবড় এলেমদার তাকে আর বলতে হবে না । এই জীবনে কতই না সে দেখল । যত বড় নাম, তত বড় ভন্ড ।
শুকুর আলী নাদান মেয়েলোকের কথায় পেরে উঠে না । তবুও সে বলে, জরিনা, তুমি বুঝতাছ না! ইনি যে-সে লোক না, পরম জ্ঞানী মানুষ । দ্যাশে-বিদ্যাশে উনার কত নাম, উনারে চিনেনা এমন লোক তুমি দুইন্যার মধ্যে পাবা না । বিদ্যার জাহাজ, উনার পেটভর্তি যত বিদ্যা আর জ্ঞান । মারফতি সব কথাবার্তা বলেন উনি, সব জানেন । এমন মানুষকে ঘরে ডেকে এনে সমাদর করতে পারাটাও ভাগ্যের ব্যাপার, বুঝলা?
জরিনার ভাগ্যে শুকুর আলীর সম্পন্ন সংসার, সে ভাগ্য মানে । তবে কেন জানি শুকুর আলীর পীরের হাসি, চোখের তাকানো, মুখের ভংগি তার ভাল লাগেনি । সে দ’একবার যাই দেখেছে তার ভাল লাগেনি । সে বলে, তোমার পীর সাবের চোখ ভালা না ।
শুকুর আলী অবাক হয়, কয় কি মহিলা? কেন? উনার নূরের চেহারা! চোখে কী এক মায়া!
জরিনা থামে না । সে বলে, নূরের চেহারা বুঝি না তয় লোভের চেহারা কি হেইডা আমি তোমার থিক্যা ভাল জানি । উনারে আমি হেইদিন গাঁয়ের চকের ’পরে এক মুরিদের সাথে কথা কইতে দেখেছি । ধর্মের কথা কম, কার কত জমি-জমা আছে, কার গোয়ালে কয়টা গাভী আছে—এইগুলি খবর নেয় । আমার তো মনে লয়, লোকটা আসলে একটা ভণ্ড! তোমগের বাঙাইয়া খাইতাছে ।
শুকুর আলীর মেজাজ খারাপ হয়ে যায় । সে ধমকে উঠে, আজাইরা কথা রাখ । যা, মাইয়ামানুষ এত বুঝিছ না । ব্যাডায় মানুষের ভালা করার জন্যি দ্যাশে-বিদ্যাশে ঘুইরা বেড়ায় । তানির মত বুজুর্গান আমরার লাহান দীন বান্দার দাওয়াত নিছেন এইডাই বেশী । যা, রাগ কমাইয়া রান্নাঘরে ঢুক । আর রান্না যেন ভালা অয় । পীর সাহেব য্যান খাইতে পারে ।
জরিনা বড় করে শ্বাস ফেলে, সে জানে শুকুর রেগে গেলে মানুষ থাকে না-এরপর গায়ে হাত তুলতে পারে । তবুও সে বিড়বিড় করে, সরল গরুর গায়ে বাঘের চাবুক! এত বয়স হলেও এই ব্যাডায় মানুষ চিনে না ।
শুকুর আলী জরিনাকে চটায় দিয়া শান্তি পায় না । সে তার সুর নরম করে, আহারে আমার জরী-পরী, এট্টু কষ্ট করো । উনার মন পাইলে উনার দোয়ার বরকতে-মাজেজায় আমাগের সংসার বাইড়া উঠবে, ঘরে কোনো বালাই থাকবে না । তুমি শুধু উনার সামনে ভালা কৈরা খাবার সাজাই দিবা, বাকিডা আমি দ্যাখতাছি ।
জরিনা গটগট করে রান্নাঘরে ঢুকে যায় আর মসলা বাটায় জোর বাড়ায় । শুকুর আলী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পীর সাহেবের আসার অপেক্ষায় বাইরের দরজার দিকে চেয়ে থাকে ।
দুপুরের দিকে পীর আতর আলী সাহেব তার দুই চ্যালাকে নিয়ে শুকুর আলীর বাড়ীতে এসে হাজির হলেন । জরিনা মনে মনে বিরক্ত হলেও, স্বামীর সম্মান রক্ষার্থে এবং অতিথি আপ্যায়নের লোকজ নিয়মে কোনো ত্রুটি রাখল না । সে যত্নসহকারে খাসির মাংস, রুই মাছের কালিয়া, দেশি মুরগির কোরমা আর সুগন্ধি পোলাও রান্না শেষ করে টেবিলে সাজিয়ে দিল ।
বৈঠকখানায় বড় কাঠের চেয়ারে পীর সাহেব বসেছেন । উনার সামনে টেবিলে থরে থরে সাজানো খাবারের বাটি । শুকুর আলী প্রায় হাতজোড় করে সামনে দাঁড়িয়ে আছে । জরিনা দূর থেকে পর্দার আড়াল থেকে লক্ষ্য করছে ।শুকুর আলী পারলে গলে পড়ে, বাবা, এই অধম ও তার স্ত্রীর হাতের সামান্য আয়োজন । যদি একটু মুখে তুলে নেন, তয় আমাগের জীবন ধন্য, বাবা ।
আতর আলী দাঁড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে, লোভী চোখে খাবারের দিকে তাকিয়ে দেখেন, হুম, সুবহানাল্লাহ! নিয়ামত ভালোই দেখা যাচ্ছে । তবে বাবা শুকুর আলী, আমরা তো জগত-সংসার ত্যাগী মানুষ, আহারের প্রতি আমাদের কোনো লোভ নেই । ভক্তের ভক্তিটাই আসল ।
মুখে এই কথা বললেও, পীর সাহেব আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করলেন না । বয়োবৃদ্ধ শরীর হলে কী হবে, খাবারের লোভ তিনি সামলাতে পারলেন না । পোলাওয়ের ওপর খাসির চর্বিযুক্ত মাংস আর আস্ত মুরগির রান টেনে নিয়ে গোগ্রাসে গিলতে শুরু করলেন । উনার খাওয়া দেখে মনে হচ্ছিল তিনি বহুদিনের উপোস ।
জরিনা পর্দার আড়াল থেকে সব দেখে আর বিড়বিড় করে, বাবা রে বাবা! হ্যার নাকি লোভ নাই, যেমনে গিলতাছে মনে লয় খাসির মাংসের সাথে বাটি হুদ্দা চাবাইয়া খায়! বুইড়া বয়সে এত খাওন ঠিক না, রাতে বুঝবা নে ঠেলা!
শুকুর আলী বহুত দিলখুশ । সে বলে, দেখছ জরিনা? পীর সাহেব কী মজা কৈরাই না খাইতাছে! উনি খুশী হৈলেই তো আমরার কাম হবে ।
জরিনা একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলে, তা তো ঠিকি! রহমত কীভাবে আইয়ে, হেইডা দেইখো, বুইড়া মাইনষের শরীল, সহ্যি করা পারবো তো?
রাত গভীর হয়েছে । ভারী ও অতিরিক্ত খাওয়ার ফলে পীর সাহেবের পেট ততক্ষণে ঢাকের মতো ফুলে উঠেছে । গ্যাসের ওষুধ হলে ভাল হতো । তিনি বারবার অস্বস্তিতে ঢেকুর তুলছেন । শুকুর আলী উনার জন্য নিজের ঘরের সবচেয়ে নরম ও আরামদায়ক বিছানাটি ছেড়ে দিয়েছেন । সেখানে ধবধবে সাদা চাদর বিছানো ।
শুকুর আলী পীর সাহেবের পা টিপে দিতে দিতে জানতে চান, বাবা, কোনো কষ্ট হৈতাছে না তো?
পীর সাহেব ভারী পেটে সোজা হয়ে শুতে চেষ্টা করলেন, পারলেন না । কাত হয়ে শুয়ে শুকুরের মুখোমুখি হলেন, না বাবা শুকুর, সব ঠিক আছে । তোমার সেবা আর আহারে আমি বড় সন্তুষ্ট । এবার তুমি যাও, আমি একটু জিকির-আসকার করি ।
শুকুর আলী ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর আতর আলী আরামদায়ক বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন । কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লান্তি ও ভারী খাবারের চোটে তিনি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন । কিন্তু মধ্যরাতে উনার দুর্বল ও বয়োবৃদ্ধ পরিপাকতন্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করল । অতিরিক্ত তেল-মসলা আর মাংসের চাপ সহ্য করতে না পেরে ঘুমের ঘোরেই উনার পেটের ভেতর তড়পানো শুরু হলো । পীর সাহেব এতই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন যে, টের পাওয়ার আগেই বিছানার ওপরই উনার বড় রকমের প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদন হয়ে গেল!
সময়: ভোর ৪:৩০ মিনিট, চারদিক তখনো অন্ধকার, কেবল ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে ।
পীর সাহেবের হঠাৎ ঘুম ভাঙল । তিনি নাক কুঁচকে এক তীব্র দুর্গন্ধ পেলেন । বিছানায় হাত দিতেই উনার পিলে চমকে উঠল! তিনি বুঝতে পারলেন, সারা জীবনের কামানো "বুজুর্গী" ইজ্জত এক রাতেই শেষ হয়ে গেছে । বিছানার ধবধবে সাদা চাদর আর উনার পরিধেয় বস্ত্রের তখন শোচনীয় অবস্থা ।
আতর আলী মনে মনে, আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ইয়া মাবুদ! এ কী কেলেঙ্কারি হলো! সকাল হলে শুকুর আর তার বউ তো এই দৃশ্য দেখে ফেলবে । সে এক বড়িয়া কেলেংকারী হবে!
পীর সাহেব আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না । লজ্জা আর অপমানের ভয়ে তিনি অন্ধকার থাকতেই, কাউকে কিচ্ছু না বলে, নিজের নোংরা কাপড় কোনোমতে সামলে নিয়ে পা টিপে টিপে পেছনের দরজা দিয়ে এক দৌড়ে বাড়ি থেকে চম্পট দিলেন । উনার চ্যালারাও টের পেল না পীর সাহেব কোথায় হাওয়া হয়ে গেছেন ।
ভোর হতেই শুকুর আলী হুজুরের ওযুর পানি ও মেসওয়াক রেডি করে হুজুরের ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন । দরজাটি আলতো করে চাপানো । শুকুর আলী আস্তে করে ভেতরে ঢুকলেন, কিন্তু বিছানা খালি দেখে চমকে উঠলেন । তিনি বারান্দায়, উঠানে, এমনকি বাইরের আমবাগানেও গিয়ে হুজুর হুজুর বলে ডাকলেন, কিন্তু কোথাও কেউ নেই । শুকুর আলীকে হন্যে হয়ে খুঁজতে দেখে জরিনা ঘর থেকে বের হয়ে এল ।
জরিনা হাতে ঝাড়ু নিয়ে ঠাঁয় দাড়িয়ে থাকে আর বোঝার চেষ্টা করে পীর সাহেব কোথায় গেলেন?
শুকুর আলীকে বেশ চিন্তিত দেখায়, তবে কি হুজুর তাকে ফাঁকি দিয়া চলে গেলেন কোন মার্ফতি দিশা না দিয়াই । তার ব্যাপক অস্থির লাগে । হুজুর কি তবে কোন ভুল পাইলেন তার ?
জরিনার সন্দেহ যায় না । মনে লয়, ডাল মে কুছ কালা হ্যায় । মানুষ কাউরে কিছু না কয়া এম্নে চোরের মতো ভোরবেলা পালায়? জ্যুৎ কৈরা দ্যাহ, ঘরের আলমারি বা বাক্সের তালা ভাঙা কি না । গয়না-ট্যাহা চুরি করে নাই তো আবার? ভণ্ডগের তো বিশ্বাস নেই!
শুকুর আলীর ঝট করে মাথায় রক্ত উঠে যায়, মুখ সামাল বেওকুফ মহিলা । একজন মার্ফতি পীর, মস্ত বড় বুজুর্গ মানুষকে তুমি চোর বলছ? তওবা কর, তওবা! উনার মতো মানুষের কি ধন-সম্পদের অভাব আছে? তরে কতবার কৈছি, হুজুরের পেটে কত ইলম (জ্ঞান), কত বিদ্যা! উনাকে চোর কৈয়া নিজের আমল নষ্ট কৈর না । যাও, ঘরডা গুছিয়ে ফালাও ।
শুকুর আলীর ধমক খেয়ে জরিনা আর কথা বাড়াল না । সে গজগজ করতে করতে, মুখ বাঁকিয়ে হুজুরের শোয়ার ঘরে ঢুকল । ঘরের জানালাটা খুলতেই এক তীব্র, ভ্যাপসা দুর্গন্ধ উথলে উঠে জরিনার নাকে লাগল । সে নাক কুঁচকে "উফ" বলে শাড়ির আঁচল দিয়ে নাক ঢাকল । এরপর বিছানার চাদরটা ঝাড় দেওয়ার জন্য যেই না হাত বাড়িয়েছে, অমনি তার চোখ গেল চাদরের মাঝখানের সেই শোচনীয় অবস্থার দিকে! পীর সাহেবের রাতের কীর্তি তখন চাদরের ওপর লেপ্টে আছে । মুহূর্তের মধ্যে জরিনা পুরো বিষয়টা বুঝতে পারল । তার রাগ আর ঘেন্না এক নিমেষে হাসিতে রূপ নিল । সে চিৎকার করে শুকুর আলীকে ডাকতে লাগল ।
জরিনা হাসতে হাসতে বাঁকা হয়ে যাচ্ছিল, ওগো! শুনছ? জলদি আইয়ো! তোমার ইলমওয়ালা হুজুরের কেরামতি দেইখা যাও! তাড়াতাড়ি আইও তো!
শুকুর আলী তার বৌয়ের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে, হৈছে কি তোর, চিল্লাস ক্যান?
জরিনা নাক চেপে ধরে, এক হাত দিয়ে বিছানার দিকে আঙুল উঁচিয়ে ধরে, এই দ্যাখ! চোখ মেইল্যা ভালো করে দ্যাখ তোমার বুজুর্গ পীর সাহেবের কাণ্ড! তুমি না কইতা তোমার হুজুরের পেটে কত ইলম, কত জ্ঞান, কত বিদ্যা গিজগিজ করছে? হ্যাঁ! খুব তো ইলমের বড়াই করছিলা! এখন নিজের চোখে দ্যাখ, তোমার হুজুরের পেটে কোনো ইলম-ফিলম কিচ্ছু নাই; আছে শুধু পেটভরা গু!

মন্তব্য ২ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ২৯ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১০

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: যে কারো পেট খারাপ হতে পারে;হুজুরদের নিয়ে এরকম লেখা উচিত নয়।

২| ২৯ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৭

রাজীব নুর বলেছেন: চমৎকার গল্প।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.