নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

অসুস্থ শহরের নাগরিক মন, তাই পালিয়ে বেড়ানোর আয়োজন...

কাঙাল মিঠুন

ইদানীং/ আবছা রোগে মরে যায় বইয়ের পাতা/ ক্যালেন্ডারে নকশা আঁকে প্রাক্তন প্রেমের দাগ/ বাগানের ফুল চুরি করে যায় আবেগহীন গুবরে...

কাঙাল মিঠুন › বিস্তারিত পোস্টঃ

মধ্যবিত্তের নাগরিক কথন -১০

০৩ রা নভেম্বর, ২০১৭ রাত ৮:৪১

শেষরাতের দিকে একটু করে বাতাস এসেছিলো, ঠাণ্ডা বাতাস। পায়ের কাছের কাঁথাটা টেনে নাকে মুখে দিয়ে আরেকটু ঘুমানোর আয়োজন করছিল। কিন্তু অনেকদিন ব্যবহার না করা কাঁথার কাপড়ে একটা বোঁটকা গন্ধ, কেমন যেনো ছুঁচো ছুঁচো ঝাঁঝ। তবে কি সে যখন রুমে থাকে না নিশাচর ছুঁচোরা তার কাঁথায় ঘুম পাড়ে?
ঠাণ্ডা বাতাস নাকি বৃষ্টির অস্তিত্ব জানান দেয়। ছোটবেলায় মা বলতো "গেঞ্জিডা শইল্লো দে রে, ঠাণ্ডা বাতাস আইতাসে। কুনোহানো মেঘ অইচে। এল্লিগা বাতাস ঠাণ্ডা, অসুখ পড়লে তো আমারে ভুগাইবে। তোরতো কিচু না। যতো জ্বালা সব আমার!"
আজকাল মা আর আগেরমতো বকা দেয় না। কটু কথাও বলে না। শুধু মাসের ৫ তারিখের দিকে আমতা আমতা করে বলে ‘দুকানো হাজার-বারশ টেকা বাকি পড়ছে, তোর বাপের ফেসারের ওষুধ শেষ। চিন্তা করতাসি ধইল্লা গাইডারে বাজার পাডায়াম। আগের মতন দুধ দেয় না।‘
মায়ের শাসন না করার মানে সে বোঝে, সাদা গরুটাকে বিক্রি করার উদ্দেশ্যও বোঝে ইদানীং। গরুটারই বা দোষ কি, সে কি কখনো ভেবেছিলো তার ওলানে দুধ কমে যাবে? বছর পেরিয়েও একটা বাছুর দিতে পারবে না? তার মা কি জানতো একদিন সেও আস্তে আস্তে বুড়ো হয়ে যাবে। অথচ বছর সাতেক আগে এই মা’ই প্রত্যেকবার বাড়ি ছাড়ার আগে কয়েকটা মুরগির ডিম আর চাল পলিথিনে দিয়ে বলতো, ‘বাবারে, হাতে টেহা নাই। কয়ডা চাইল আর ডিম দিলাম। ক্ষিদা লাগলে ডিম ভাজি ভাত খায়ালাইস। নইলে দুকানো বেইচ্চা বিস্কুট কিনিস। আমিওতো বাজারে যাইতে ফারি না। তোর বাপেরেও বেচার কথা কইতে ফারি না। হ্যায় বেইচ্চা চা-বিড়ি খায়া আইসা পড়ে। আমারে ট্যাহা দেয়না একটাও।‘
পুরান ফ্যানের বাতাসের সাথে ক্যাটর ক্যাটর শব্দটা আর ঘুমাতে দেয়নি। ঠাণ্ডা বাতাস নিয়ে সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে বাথরুমের দিকে দৌড়াল। একটু পরে গেলে অন্যরা দরজা ধাক্কাধাক্কি করে। শান্তিমতো বাথরুম করারও জো নাই। বাথরুমে পেস্ট নেই দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। সিগারেট টানতে টানতে দেখে সামনে কাপড় কাচার সাবান গলে আছে। আজকে সাবান দিয়েই দাঁত মেজে ফেলুক, সন্ধ্যায় একটা পেস্টের পাতা কিনে নিয়ে আসবে।
গলে যাওয়া সাবান দিয়ে দাঁত মাজতে গিয়ে দেখলো ব্যাপারটা আসলে হজম করা সহজ না। অন্তত পেস্ট তৈরি করার ক্ষেত্রে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিছু কারিগরি আছে। সাবানের ক্ষার মুখের ভেতরের চামড়া একপ্রস্থ জ্বালিয়ে দিয়েছে। কুলি করতেই অস্বস্থি লাগছে।
গরমে ঘামতে ঘামতে বাসে উঠে ভিড়ের চাপে ইঞ্জিনের দিকে যেতে লাগলো। এদিকটাতে মহিলারা বসে। মাথার উপরে বড় করে লেখা আছে ‘মহিলা সিট ৪ জন’। গরম আর ইঞ্জিনের গরমে ঘামের পরিমাণটা বেশ বেড়ে গেলো। মাথার উপর হ্যান্ডেল ধরে ঝুলতে ঝুলতে সকালের অসমাপ্ত ঘুমে ঢুলতে লাগলো মধ্যবিত্ত।
আরেকটু হলেই সামনে বসা মহিলার গায়ে ছিটকে পড়তো সে। ড্রাইভার হঠাৎ বেশ কড়া ব্রেক চেপেছে, সামনে এক মোটরসাইকেল আড়াআড়ি রাস্তা পার হতে গিয়েছিল। এরকম বেয়াড়া সাইকেল চালাত স্বপন। ওর ভার্সিটির বন্ধু। বাপের টাকা ছিল, আবদার করে এক মোটর সাইকেল নিয়েছিল। পিছনের সিটে লাবণীকে বসিয়ে হঠাৎ হঠাৎ ব্রেক মারতে মারতে এমন অভ্যাস হয়েছিল যে ওরা কেউ কখনো স্বপনের পিছনে বসে ঘুরলেও এই কাজটা করতো। আর সরি বলতো। কিন্তু ওরা আরও দুইগুণ দাবড়ানি দিয়ে বলতো ‘শালা, সবাইরে গার্লফ্রেন্ড মনে করস’। লাবণীর কথা মনে হতে খেয়ার কথাও মনে হলো। ওরা দুই বান্ধবী থাকতো একই রুমে, আর প্রেম ছিলো ওর দুই বন্ধুর সাথে। লাবণীর সাথে স্বপনের, খেয়ার সাথে শঙ্করের। মূলত লাবণীর সূত্র ধরেই খেয়ার সাথে পরিচয় শঙ্করের। আর ছয় মাসের মধ্যেই দুটো নতুন ফ্রেন্ড কাপল নিয়ে বেশ ফুর্তিতে মজেছিল বন্ধু মহল। লাবণী প্রায়ই সেমাই নিয়ে আসতো, খেয়া আনতো পায়েস কিংবা লুচি। আর সেদিন চা সিগারেটের দাম দিতো বাকি বন্ধুরা। সব আনন্দ আড্ডাবাজি ছাপিয়ে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই শরফতের সাথে রিয়া’র সম্পর্কটা টক অব দ্য বন্ধু মহল হয়ে উঠলো। কারণও ছিল যথেষ্ট। শরফত এমন একটা ছেলে যাকে হাজার চড়েও রা’ করান যেতো না, সারাদিন ‘শরবত শরবত’ বলে ডাকলেও পিছন ফিরতো না, সেই ছেলে প্রেমে পড়েছে। একটু লম্বাটে চেহারা, মোটা চুল কখনওই বাতাসে উড়তো না- এক বছরের জুনিয়র রিয়া দেখতে শুনতে বেশই ছিল। অন্তত অন্যদের চেয়েতো বটেই। আর ওরাও বেশ খুশি হয়েছিল, যাক! অন্তত এই ফাঁকে ‘শরবত’টা শরফত হবে। রিয়াও মাঝে মাঝে খাবার আনতো, কোনোদিন নকশা পিঠা; কোনোদিন শুঁটকির তরকারি। তাদের ভাগেও পড়তো। সঞ্চয়ী করতে শরফতকে কয়েকটা টিউশনিও যোগাড় করে দিয়েছিল রিয়া। যেদিন রাতে টিউশনি থাকতো, কিংবা ফিরতে দেরি হতো রিয়াকে মেয়েদের হল অব্দি এগিয়ে দিয়ে আসতো। আবার কোনোদিন একটু অপেক্ষা করলে দ্বিতীয় দফায় রাতের খাবারটাও পেয়ে যেত শরফত।
তবে আড্ডার সময় রিয়া আর শরফত একটু দূরেই থাকতো। শরফত রিয়ার আপনজন হতে পারে, কিন্তু বাকি সবাই তো সিনিয়ার। আর ভার্সিটিতে সিনিয়ার-জুনিয়ার একটা সূক্ষ্ণ পার্থক্য ঐতিহ্যগতভাবেই এখনো টিকে আছে।
স্বপনের বাবা মারা যাওয়ার পর লাবণীর সাথে স্বপনের সম্পর্কে ভাটা পড়ে, যার রহস্য ও আজও জানে না। ফোর্থ ইয়ার ফাইনাল দিয়েই লাবণী কানাডা প্রবাসী এক ছেলেকে বিয়ে করে চলে যায়। আর দেখা হয়নি। ইদানীং ফেসবুকে স্বামী-ছেলেকে নিয়ে বেশ সুন্দর সুন্দর ছবি দেয়। বেশ ভালই আছে বোঝা যায়। আর স্বপনকে পাওয়া খুব কষ্ট, এখন এলাকায় রড সিমেন্টের ব্যবসা করে। বেশ টাকা কামিয়েছে। একটা হোঁৎকা পেট নিয়ে বাইক চেপে দোকানে বসে। মাসে মাসে সিম পালটায়। ফোনে নাগাল পাওয়া কঠিন। তবে মাঝে মাঝে ওকে ফোন করে লাবণীর খবর নেয়, লাবণী ওকে ফেসবুকে ব্লক মেরে রেখেছে। মাঝে মাঝে লাবণীর সুখের ছবি স্বপনকে ইনবক্স করে। বন্ধুর জন্য এটুকু করাই যায়। আর স্বপনের গোপন খারাপ লাগা অনুভব করে এক ধরনের সুখ পায় মধ্যবিত্তটি।
খেয়ার সাথে শঙ্করের বিয়েতে যায়নি সে। সামান্য চাকরির বেতনে বাড়তি খরচ হয়ে ওঠেনি। তাতে সে কষ্ট না পেলেও শরফত যখন রিয়ার সাথে পাঁচ বছরের সম্পর্ক ভেঙ্গে দিয়ে এক বছরের মাথায় একটি প্রতিবন্ধী মেয়েকে বিয়ে করলো, কষ্ট পেয়েছিল সে। তার অন্য বন্ধুরাও। যার কারণ সে পরে একদিন বলেছে। হঠাৎ একদিন তার ঘরে, মদ খেতে খেতে, অথচ সে জানতোই না সেদিন রিয়ার বিয়ে হচ্ছিল। প্লাস্টিকের ওয়ান টাইম গ্লাসে মদ ঢালতে দিব্যি রোজিনার সাথে স্বাভাবিক ‘জানু’ করে কথা বলছিল! শরফতের তখন চোখে জল, মুখে হাসি, সামনে লাল শরবত। আহা! বুকের রক্তের ফোয়ারা, সামনে লাল পানির গ্লাস। এক চোখে প্রেম, আরেক চোখে বিরহ।
‘ওই মতিঝিল, মতিঝিল’। হেল্পারের ডাকে বাস থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে একটা কথাই ভাবছিল,
রিয়াকে ভালোবাসলো, কিন্তু প্রতিবন্ধী রোজিনাকে কেনো বিয়ে করলো সে? তাহলে কি মুনীর চৌধুরীই সঠিক ছিলেন?
‘তোমরা পুরুষেরা বড়ই প্রপঞ্চক। নিজের সাথে তো করই...’
-০-

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.