| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
নৈতিকতা, দ্বিচারিতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কি আছে?
এখানে ছবি আছে ক্লি করে দেখতে হবে, যেহেতু আমাকে ছবি আপলোডে ব্লক করেছে এডমিন।
দেশের রাজনীতিতে একটি পুরোনো প্রবণতা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠছে- জনগণের বাস্তব সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতা, প্রতিপক্ষ এবং দায় এড়ানোর খেলায় ব্যস্ত থাকা। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করা, বাজার স্থিতিশীল রাখা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা সৃষ্টি করা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমান পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
জ্বালানি তেল ও এলপিজি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি শুধু একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সরাসরি মানুষের রান্নাঘর, পরিবহন ব্যয়, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর আঘাত হানে। যখন একটি পরিবার মাসের হিসাব মেলাতে হিমশিম খায়, তখন নীতিনির্ধারকদের উচিত ছিল ব্যাখ্যা দেওয়া—কেন দাম বাড়ানো হলো, কী বিকল্প ছিল, এবং জনগণকে কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া হবে। কিন্তু আমরা দেখি সিদ্ধান্ত আসে, ব্যাখ্যা আসে না; বোঝা চাপানো হয়, দায় নেওয়া হয় না।
রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া প্রকল্প, মজুদনীতি, অবকাঠামো কিংবা প্রশাসনিক প্রস্তুতি যদি আজও দেশকে সহায়তা করে, তবে সেটি স্বীকার করতে লজ্জার কিছু নেই। একইভাবে আগের সরকারের ভুল থাকলে তা-ও তথ্যসহ বলা উচিত। কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে সত্যকে স্বীকার করার সংস্কৃতি দুর্বল। এখানে কৃতিত্ব নিতে সবাই আগ্রহী, কিন্তু সংকটের দায় নিতে কেউ প্রস্তুত নয়।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো রাজনৈতিক বক্তব্য ও বাস্তব নীতির মধ্যে ফারাক। জনসভায় কঠোর ভাষণ দেওয়া সহজ, কিন্তু বাস্তবে সেই একই দেশের জ্বালানি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি বা সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হলে কূটনৈতিক সততা প্রয়োজন। জনগণ এখন আগের চেয়ে অনেক সচেতন। তারা বুঝতে পারে কে নীতির কথা বলছে, আর কে শুধু আবেগ উসকে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চাইছে।
বর্তমান সংসদীয় সংস্কৃতিও প্রশ্নের মুখে। সংসদ যদি জাতীয় সমস্যার সমাধানের কেন্দ্র না হয়ে কেবল বাকবিতণ্ডা, প্রতিপক্ষ দোষারোপ এবং তাত্ত্বিক বিতর্কের মঞ্চে পরিণত হয়, তবে গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, স্বাস্থ্যখাতে উদ্বেগ বাড়ছে, শিশুদের টিকা কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, বেকারত্ব বাড়ছে- এসব বিষয়ে স্পষ্ট নীতি, সময়সীমা এবং জবাবদিহিতা কোথায়?
একটি সভ্য রাষ্ট্রে শিশু মৃত্যু, জনস্বাস্থ্য সংকট বা খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্ন কখনোই দলীয় বিষয় হতে পারে না। ক্ষমতায় কে আছে, বিরোধী দলে কে আছে—এসবের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অনেক সময় দেখা যায়, একই ঘটনা ভিন্ন সরকারের সময়ে ভিন্নভাবে বিচার করা হয়। এটি নৈতিক দ্বিচারিতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য ক্ষতিকর।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জনগণের আস্থা ক্ষয় হওয়া। মানুষ যখন দেখে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি একদিকে, বাস্তবতা অন্যদিকে; ভাষণে উন্নয়ন, জীবনে দুর্ভোগ- তখন তারা রাজনীতির ওপর বিশ্বাস হারায়। এই অবিশ্বাস কোনো সরকারের জন্যই শুভ নয়।
এখন সময় এসেছে রাজনৈতিক পরিপক্বতার। দোষারোপের রাজনীতি নয়, সমাধানের রাজনীতি দরকার। সত্য গোপন নয়, সত্য স্বীকারের সাহস দরকার। প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার মানসিকতা দরকার। এবং সবচেয়ে বেশি দরকার—জনগণকে শুধু ভোটার নয়, রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক হিসেবে সম্মান করা।
রাষ্ট্র টিকে থাকে প্রচারণায় নয়, কার্যকর শাসনে। জনগণকে আর স্লোগান নয়, ফলাফল দেখাতে হবে।
©somewhere in net ltd.