| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
কাজী মুস্তাফিজ
যদি লক্ষ্য থাকে অটুট বিশ্বাস হৃদয়ে, হবে হবেই দেখা, দেখা হবে বিজয়ে
সময়টা এসএসসি পাশের পর। সাংবাদিকতাকে ভাল লাগতে শুরু হলো। কারণ কী, তা জানি না। শুধু এটুকু বুঝি- সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা যেখানে যথেষ্ট সম্মান, শ্রদ্ধা আর খ্যাতি আছে। সমাজে আর দশটা পেশার তুলনায় সাংবাদিক পেশায় কর্মরতদের প্রভাবও অনেক বেশি। সর্বোপরী সমাজের উন্নয়নে কাজ করার সুযোগ হিসেবে অতুলনীয় একটি পেশা এটি। এলাকায় সাংবাদিকতা করেন, এমন কয়েকজনকে মাঝে মাঝে বলতাম- আমি সাংবাদিকতা করতে চাই।
সাংবাদিকতার উর্বর ভূমি ফেনী জেলার দাগনভূঁঞার প্রাণকেন্দ্রে আমার বাসা। সে কারণে উপজেলা শহরে সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হতো নিয়মিত। দুয়েকজন সাংবাদিক শুভার্থী ছিলেন। তাদের বলতাম, প্রথম সারির কোনো পত্রিকায় সুযোগ পেলে কাজ করব। ভাবটা আমার এমন ছিল- যেন আমি অনেক জানি। ছোটখাটো পত্রিকায় কাজ করব না। এমন কথার জবাবে এক সাংবাদিক বললেন- আগে স্থানীয় পত্রিকায় লেখার চর্চা শুরু করতে হবে। তারপর সেখানকার অভিজ্ঞতা দেখিয়ে বড় পত্রিকায় আবেদন করতে হবে। এভাবে আস্তে আস্তে এগুতে হবে। পরামর্শটা ভালো লাগল।
২০০৬ সালের শুরুর দিক। আমার এইচএসসি প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হলো মাত্র। তখন আমি দাগনভূঁঞা আজিজিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার ছাত্র। একদিন সকালে ক্লাসে গিয়ে দেখি শিক্ষকের টেবিলের ওপর একটি পত্রিকা পড়ে আছে। এটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষের নামে আসা সৌজন্য কপি। হাতে নিয়ে এপিঠ-ওপিঠ পড়লাম। একপর্যায়ে ‘সাংবাদিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি’ চোখে পড়ল। ‘সাপ্তাহিক দর্পণ’ নামের পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় লক্ষ্মীপুর থেকে। সম্পাদক চৌধুরী মহিউদ্দিন মনজুর। ‘সাংবাদিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি’ দেখে আমার লালিত ইচ্ছাটা জেগে ওঠে। বিজ্ঞপ্তিতে দেয়া নিয়ম মেনে ডাকযোগে আবেদন করলাম। দিনটি ছিল ৩০ মার্চ, ২০০৬। আবেদনের এক মাস পর (২ মে) আমার বাসায় ডাকযোগে একটি চিঠি আসে। খামের ওপর প্রেরকের ঠিকানায় ‘সাপ্তাহিক দর্পণ’ লেখা দেখে দারুণ কৌতূহলী হই। তাড়াতাড়ি খুলে পুরো চিঠি পড়লাম। আনন্দে ঝলমল করে ওঠে মন। দর্পণে কাজ করার আগ্রহের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে আমাকে সংবাদ লেখার জন্য বলা হলো চিঠিতে। পরীক্ষামূলক দুই মাস কাজ করতে হবে। কাজের ওপর ভিত্তি করে আমার পরিচয়পত্র দেয়া হবে। সপ্তাহের রোববার প্রকাশিত হয় দর্পণ। তাই ওই দিন বিকেলের মধ্যেই সংবাদ পাঠাতে হবে আমাকে।
সংবাদ পাঠাতে শুরু করলাম। দিন যায়, সপ্তাহ যায়। আমার লেখা ছাপানো কোনো পত্রিকা পাই না। এরপর কাগজে-কলমে লেখা সংবাদ নিয়ে যেতাম পত্রিকা অফিসে। এখনকার মতো তখন উপজেলা শহরে ই-মেইল সুবিধা সহজলভ্য ছিল না। দাগনভূঁঞা থেকে চৌমুহনীতে পত্রিকার কার্যালয় প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ। বাসযোগে গিয়ে অফিসে পৌঁছাতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগত। পত্রিকার মেকআপ (পৃষ্ঠা সাজানো) চলছিল, এমন মুহূর্তে গিয়ে প্রায়ই হাজির হতাম সম্পাদকের কাছে। আমার সামনেই আমার লেখা সম্পাদনা করতেন পিতৃতুল্য পরম শ্রদ্ধেয় চৌধুরী মহিউদ্দিন মঞ্জুর। হাতে-কলমে শেখাতেন সাংবাদিকতার বিভিন্ন পরিভাষা।
শিরোনামের সঙ্গে সূচনার মিল থাকতে হবে; সূচনায় যা বলা হয়েছে, তার পুরোপুরি ব্যাখ্যা থাকতে হবে সংবাদের ভেতরে; সংবাদের বিষয়ের সঙ্গে কত বেশি মানুষের সংশ্লিষ্টতা, তার ওপর সংবাদের গুরুত্ব নির্ভর করে- এসব তিনি খুব ভালোভাবে আমাকে বোঝাতেন। আমার রিপোর্ট প্রকাশ হচ্ছে, এমনটা নিশ্চিত হয়েই পত্রিকার কার্যালয় থেকে দাগনভূঁঞায় ফিরতাম। কিন্তু সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও আমার লেখা ছাপানো পত্রিকা আমি হাতে পেতাম না। অথচ সম্পাদক বলতেন আমার লেখা নিয়মিত ছাপা হচ্ছে। পরে মনে হলো আমাকে উৎসাহ দেয়ার জন্য তিনি এসব বলতেন। আসলে ঠিকভাবে লিখতে পারি না বলে আমার লেখা হয়তো ছাপা হতো না। তারপরও লেখা পাঠানো বন্ধ করিনি। নিজের কোনো আয়-রোজগার না থাকলেও পরিবার থেকে টাকা-পয়সা ব্যবস্থা করে ডাকযোগে নিয়মিত সংবাদ পাঠাতাম। রোববার অর্থাৎ পত্রিকা প্রকাশের দিন কাছে চলে এলে অনেক সময় আগের দিন অফিসে গিয়ে হাতে-হাতে সংবাদ জমা দিয়ে আসতাম। এত কষ্ট করে লেখা পাঠানোর পরও জানতাম না তা ছাপা হলো কি না, কেননা পত্রিকা পেতাম না। মাঝে মাঝে খারাপ লাগত। অনেক রাগ হতো। খুব কষ্ট পেতাম।
প্রায় এক মাস পর (১ জুন) সাপ্তাহিক দর্পণ থেকে আরেকটি চিঠি পেলাম ডাকযোগে। তাতে পত্রিকার প্রতিবেদকদের (যারা নতুন) উদ্দেশ করে সম্পাদক লিখলেন- “আপনাদের প্রেরিত সংবাদ আমাদের একান্ত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বে¡ও পত্রিকায় প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না বা করা যাচ্ছে না, কারণ আপনারা সংবাদ লিখার পর নীচে স্বাক্ষর করেন না এবং তারিখ লিখেন না। তাছাড়া কিছু কিছু সংবাদদাতা সংবাদ লিখার ক্ষেত্রে অনেক তথ্য বাদ পড়ে যায়। তাই গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ হওয়া সত্তেও ছাপানো সম্ভব হচ্ছে না।” চিঠির পরের অংশে ফাইভ-ডব্লিও ওয়ান-এইচসহ সংবাদ লিখার কিছু মৌলিক বিষয় উল্লেখ করলেন। সেগুলো মেনে যথাযথ নিয়মে সংবাদ লেখার পরামর্শ দিলেন। এরপর নিয়ম-কানুন মেনে লিখছিলাম। একই বছরের ৭ জুলাই দাগনভূঁঞা উপজেলা সংবাদদাতা হিসেবে পরিচয়পত্র দেয়া হলো। ছাপানো লেখাসহ পত্রিকাও আমার হাতে আসা শুরু হলো।
এরপর থেকে সংবাদের বিষয় নির্বাচন, গুরুত্ব এবং সত্যতা যাচাইসহ বিভিন্ন কলাকৌশল যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে আরো বেশি শেখার সুযোগ পেয়েছি দর্পণ সম্পাদক থেকে। তাকে আমি ‘আঙ্কেল’ বলে সম্বোধন করি। তিনিও আমাকে সন্তানের চেয়ে কম স্নেহ করেন না। আমাকে দেয়া তার পরিচয়পত্রের এক বছর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ২০০৭ সালের ৭ জুলাইয়ে। কিন্তু তিনি এখনো আমার পরিবারের খোঁজ-খবর নেন। এই লেখাটি যখন লিখছিলাম, তখনও মোবাইলফোনে তার সঙ্গে কথা হলো। জানালেন সাপ্তাহিক দর্পণ পত্রিকাটি এখন দৈনিক দর্পণ হিসেবে প্রকাশ হচ্ছে। শুনে ভালো লাগল।
দর্পণে থাকতেই সেখানকার অভিজ্ঞতা দেখিয়ে ফেনী থেকে নতুন প্রকাশিত স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি পত্রিকায় কাজের সুযোগ হয় আমার। কিছু দিন পর ২০০৮-এর শুরুর দিকে ফেনীর আরেক স্বনামধন্য সাংবাদিক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন সম্পাদিত সাপ্তাহিক আলোকিত ফেনী পত্রিকায় উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করি। তার তত্ত্বাবধানে অল্প সময় কাজ করার সুযোগ পেলেও তার আন্তরিকতা পেয়েছি অসাধারণ। পরিবারের সদস্যদের মতো তিনি সহকর্মীদের ভালোবাসেন। তার পত্রিকায় কাজ শুরুর অল্প সময় পরেই ঢাকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই।
মাঝে ২০০৭ সালের জুন থেকে ঢাকায় একটি আঞ্চলিক অনলাইন পত্রিকায় নিয়মিত রিপোর্ট পাঠাতাম। ওই পত্রিকার শীর্ষকর্তার পরামর্শেই ২০০৮ সালের জুনে ঢাকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। তখন আমার এইচএসসি পরীক্ষা শেষ। ঢাকায় এসে জীবনের সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা হয়েছে পত্রিকাটির ওই কর্তাব্যক্তি থেকে। কোনো ঊর্ধ্বতন কর্তার কাছে তার সহকর্মীর সাফল্যের চেষ্টা বা অগ্রগতি এতটা ঈর্ষার জন্ম দিতে পারে, তা বুঝতাম না, যদি তার সঙ্গে কাজ না করতাম। তার নামটি এখানে বলতে চাই না। তবে তার নীচুতার একটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে এ প্রসঙ্গ শেষ করব। বোঝাপড়া না হওয়ায় তার প্রতিষ্ঠান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ফলে তিনি আমার ফেসবুকের পাসওয়ার্ড চুরি করে তাতে অশ্লীল ভিডিও প্রচারে নেমেছিলেন। ২০১০ সালের অক্টোবর শেষে প্রতিষ্ঠানটি ত্যাগ করি। তবে এখনো তার বিভিন্ন নম্বর থেকে অপ্রয়োজনীয় ক্ষুদেবার্তা পেয়ে বিরক্ত হই।
যাই হোক, বিগত বছরের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নতুন বছরে নতুন উদ্যমে কাজ করার পরিকল্পনা নিলাম। আমার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। তখন কাছে পেলাম নোয়াখালীর খ্যাতিমান সাংবাদিক সাইফুল্যাহ কামরুলকে। ইটের শহরে পথহারা পথিকের মতো যখন আমার অবস্থা, তখন তিনি আমার হাত ধরে কাছে টানলেন। তার পরামর্শে ২০১১ সালের জানুয়ারীতে বার্তা২৪ ডটনেটে যোগ দিই। প্রতিষ্ঠানটিতে কাজের সুবাদে পরিচয় হয় পরম শ্রদ্ধেয় সম্পাদক সরদার ফরিদ আহমদের সঙ্গে। নিয়োগপত্র হাতে দিয়ে বললেন ‘দেখো, কয়েক দিন পর অন্য কোথাও (অন্য প্রতিষ্ঠানে) চলে যেয়ো না।’ আসলেই চলে যাইনি। বার্তা২৪-এ প্রায় দুই বছর পার করলাম। তাঁরই সম্পাদনায় ২০১২ সালের ডিসেম্বরে শুরু হলো অনলাইন পত্রিকা নতুন বার্তা ডটকম। শুরু থেকে এখনো আছি তার তত্ত্বাবধানে। কেউ আমাকে পেশাদার সাংবাদিকের উদাহরণ দিতে বললে আমি শুরুতেই সরদার ফরিদ আহমদের নাম বলব। ঢাকায় মূলধারার সাংবাদিকতায় তার হাত ধরেই আমার প্রবেশ। তার কাছ থেকে শিখেছি একটি সংবাদকে কীভাবে পাঠকের কাছে শতভাগ গ্রহণযোগ্য করে উপস্থাপন করতে হয়। অল্প জনবলের প্রতিষ্ঠানটিতে কাজের ক্ষেত্রে তার থেকে কাউকে অপ্রিয় চাপে পড়তে হয় না। সবাই যে যার তাগাদা নিয়ে কাজ করি আমরা। অন্য কোথাও থেকে ভালো প্রস্তাব পেয়েও নতুন বার্তা ছেড়ে না যাওয়ার উদাহরণও এখানে আছে। তার অন্যতম কারণ হলেন সম্পাদক সরদার ফরিদ।
কীভাবে একটি প্রতিবেদনকে খুব সহজ ভাষায় পাঠকের কাছে উপস্থাপন করা যায়, তা শিখেছি সম্পাদক সরদার ফরিদ ভাইয়ের কাছে। এও শিখেছি কীভাবে বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন উপস্থাপন করলে তা নির্দোষ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ক্ষতির কারণ হবে না। অসম্ভব কর্মপ্রিয় ও নির্ভেজাল হাস্যোজ্জ্বল মানুষটি যা শিখিয়েছেন এবং এখনো শেখাচ্ছেন, তার বর্ণনা দিয়ে শেষ করতে পারব না।
আমার সাংবাদিকতা পেশায় আসার পেছনে আরো কয়েকটি নাম না বললে লেখাটি অপূর্ণ রয়ে যাবে। শ্রদ্ধাভাজন সাংবাদিক এম এ কুদ্দুস, আবু তাহের আজাদ, এম এ তাহের পন্ডিত, সৈয়দ ইয়াছিন সুমন ও মিজানুর রহমানসহ দাগনভূঁঞায় কর্মরত সাংবাদিকদের যথেষ্ট আন্তরিকতা পেয়েছি। শুরুর দিকে তথ্য, পরামর্শ, বুদ্ধি ইত্যাদি দিয়ে একেকজন একেকভাবে সহযোগিতা করেছেন। সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
দাগনভূঁঞার জিরো পয়েন্ট দিয়ে চলাচলকারী গাড়িগুলোর হর্ণ এখনো আমার কানে বাজে। আতাতুর্ক স্কুল মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থানে সহকর্মীদের সঙ্গে কাটানো গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো ভুলিনি এখনো। ভোলা সম্ভবও নয়।
আমি বিশ্বাস করি, পিতৃতুল্য দুই শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি- চৌধুরী মহিউদ্দিন মনজুর এবং সরদার ফরিদ আহমদের শেখানো প্রতিটি শব্দ আমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রথমজন আমাকে সাংবাদিকতার স্বরলিপি শিখিয়েছেন। অন্যজন আমাকে ঢাকায় মূলধারার সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। প্রাণভরে আমি দোয়া করি, দুই মহান শিক্ষক অনেক দিন বেঁচে থাকুন। তাঁদের থেকে আরো বেশি কিছু শিখে অনেক দূর যেন এগুতে পারি। এর মাধ্যমে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য ভালো কিছু করতে পারলেই নিজেকে সার্থক মনে করব।
লেখক:
স্টাফ রিপোর্টার (ক্রাইম)
natunbarta.com
[email protected]
©somewhere in net ltd.
১|
১৯ শে আগস্ট, ২০১৪ সন্ধ্যা ৬:০৭
ইমতিয়াজ ১৩ বলেছেন: শুভ কামনা আপনার জন্য।