নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

.

মুহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া

জানতে চাই, জানাতে চাই এবং নিজের ধ্যান-ধারনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই।

মুহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া › বিস্তারিত পোস্টঃ

মায়ানমারে সুকির বিজয় এবং রোহিঙ্গা জাতির ভবিষ্যত ভাবনা

১২ ই নভেম্বর, ২০১৫ রাত ৩:১২

সুকির বিজয়ে রোহিঙ্গা জাতির মুক্তির আকাঙ্খা
দীর্ঘ ২৫ বছর পর এসে ২০১৫ সালে দেশের সবগুলো রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহনে অনুষ্ঠিত মায়ানমারের সাম্প্রতিক নির্বাচনে গনতন্ত্রপন্থী নেত্রী ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী অং সান সুকির বিশাল ব্যবধানে জয়ের পর মায়ানমার এবং সারাবিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। এর আগেও ১৯৯০ সালের নির্বাচনে গনতন্ত্রপন্থী সুকির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সামরিক জান্তা সুকিকে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। এবার মনে করা হচ্ছে জান্তা সরকার শান্তিপূর্ণ উপায়ে সুকিকে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। তবে শর্তসাপেক্ষে সংসদের ২৫ ভাগ আসনে তাদেরই প্রতিনিধি থাকবে। স্বদেশে নির্যাতিত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ব্যপারে সুকি এবং তার দলের অবস্থান খুব একটা স্পষ্ট না হলেও রোহিঙ্গাদের মধ্যে বড় একটি অংশ একমাত্র তাকেই বিভিন্ন সময় সমর্থন দিয়ে আসছে। তারা মনে করে সুকি নির্বাচিত হলে তাদের উপর কয়েক দশক ধরে চলা সামরিক জান্তা ও কিছু বৌদ্ধ উগ্রপন্থীদের অমানবিক জুলুম নির্যাতনের এবং জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত-দাঙ্গার অবসন ঘটবে এবং তাদের নাগরিক অধিকার ফিরে পাবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, শত শত বছর ধরে আরকানে বসবাস করে আসা রোহিঙ্গাদেরকে এবারের নির্বাচনে ভোট দিতে দেয়া হয়নি। তাই রোহিঙ্গাদের একটি অংশের মধ্যে আবার আগ্রহের চেয়ে আতঙ্কই বেশি কাজ করছে। ক্ষমতায় পরিবর্তন এলেও তাদের উপর অন্যায়, জুলুম নিপিড়ন কমবে এমনটি তারা মনে করছে না। এর কারন মায়ানমারের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অনেকেই এবং কিছু নব্য গণতন্ত্রপন্থী দল রোহিঙ্গাদের এখনও মায়ানমারের জনগণ হিসেবে স্বীকার করেন নারাজ। এক সময় স্বাধীন মিয়ানমারের পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্বকারী রোহিঙ্গারা যেন এখন নিজভূমে পরবাসী।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পরিচয়
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মূলত মায়ানমারের রাখাইন বা আরকান রাজ্যের একটি সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠী। এদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস রয়েছে। এদের সিংহভাগ বাস করে আরকান রাজ্যের বুথিডাং এবং মংডুতে। এছাড়া আকিয়াব, রেথেডাং, কিয়ক্টাও, মাম্ব্রা, পাত্তরকিল্লা এলাকায়ও এদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাস করে। এসব ভুখন্ডে তারা বংশ পরম্পরায় প্রায় কয়েকশ বছর ধরে বসবাস করে আসছে। মায়ানমারে এদের বর্তমান সংখ্যা নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোন তথ্য নেই। কেউ বলে ১০ লক্ষ, কারো কারো মতে এই সংখ্যা ২০ লক্ষাধিকও হতে পারে। এছাড়াও সারা বিশ্বে এবং বিভিন্ন দেশের শরনার্থী শিবিরে আরো প্রায় ২০-২৫ লক্ষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মূলত, চট্টগ্রামে আরকান শাসনামলে এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময়, যে সকল মানুষ কাজের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম থেকে আরকান রাজ্যে(রোহাং নামেও পরিচিত) বসতি স্থাপন করেছিল, তাদেরকেই পরবর্তীতে রোহিঙ্গা হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাই দেখা যায়, তাদের ভাষা ও চেহারার সাথে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা ও এ অঞ্চলের মানুষের চেহারার অনেক মিল রয়েছে। এ কারনে মায়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার তাদেরকে "বিদেশি বাঙ্গালী" হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: আরকান রাজ্যে বাঙ্গালিদের আগমন
১৫৮১ সাল থেকে ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত বাংলার চট্টগ্রাম সম্পূর্ণভাবে আরাকান রাজাদের অধীনে শাসিত হয়। সে সময়ে আরাকানে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে মুসলিম জনবসতি বাড়ে। আরকানের বৌদ্ধ রাজাগণ মুঘলদের মতোই জীবন যাপন করতো এবং বাংলার মুসলিম সুলতানদের রীতিনীতি অনুযায়ীই রাজ্য পরিচালনা করতো। তাই আরকানের রাজদরবারে বাংলা, ফার্সী এবং আরবি ভাষার হস্তলিপিকরদের মধ্যে অনেকেই ছিল বাঙ্গালী মুসলিম। কবি আলাওলের মতো জগদ্বিখ্যাত বাংলা কবিও আরকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্যের ব্যপক চর্চা করে। ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রাম মোগলদের হস্তগত হয়ে গেলেও এরা আরকান রাজ্যেই বসবাস করতে থাকে।

রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচারের ইতিহাস
১৭৮৫ সালে বার্মিজরা আরকান দখলের পর মুলত বাঙ্গালী মুসলিম তথা রোহিঙ্গাদের উপর রাখাইন বৌদ্ধদের অত্যাচারের ইতিহাস শুরু হয়। এর কারন ছিল মুলত সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত। এ সময় হাজার হাজার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এদের হত্যাযজ্ঞ ও নিপীড়ন থেকে মুক্তির আশায় নিকটবর্তী চট্টগ্রাম অঞ্চলে চলে আসে।

১৮২৪ সালে ব্রিটিশরা বার্মা দখলের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পূর্ব দখলকৃত বাংলাকে আরাকান পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিল। এর ফলে রোহিঙ্গা নির্যাতনকারী বার্মিজরা কার্যত অসহায় হয়ে পড়ে। এ সময় আরকান ও বাংলার মাঝে কোন সীমারেখা ছিল না এবং এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে যাওয়ার ব্যাপারে কোন বিধি-নিষেধও ছিল না। তাই ঊনিশ শতকে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঙ্গালী কাজের সন্ধানে আরকানে গিয়ে বসতি গড়েছিল। ব্রিটিশ শাসনামলেও বার্মিজরা দাঙ্গা-হাঙ্গামার মাধ্যমে এ সমস্ত বাঙ্গালীদের উপর প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করত। এর প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ প্রশাসন রোহিঙ্গা মুসলিম ও রাখাইন বৌদ্ধদের মধ্যকার দীর্ঘ শত্রুতার অবসানের জন্য ১৯৩৯ সালে একটি বিশেষ অনুসন্ধান কমিশন গঠন করে। কমিশন অনুসন্ধান শেষে আরকান ও বাংলার মাঝে সীমান্ত বন্ধ করার সুপারিশ করে, কিন্তু এর মধ্যে শুরু হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ। তাই ব্রিটিশরা এ দীর্ঘ শত্রুতা নিরসনে আর কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। হয়তোবা নিজেদের স্বার্থে তারা স্থানীয় জনগনের মধ্যে এ বিভাজন জিইয়ে রেখেছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, জাপানীরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনস্হ বার্মায় আক্রমণ করে। বার্মিজরা ছিল জাপানীদের মদদপুষ্ঠ। রোহিঙ্গারা যুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের সমর্থন করেছিল এবং জাপানী শক্তির বিরোধিতা করেছিল। ব্রিটিশদের সমর্থন করা সম্ভবত রোহিঙ্গাদের ঐতিহাসিক ভুল ছিল। মনে করা হয়, ধুরন্ধর ব্রিটিশ সরকার রোহিঙ্গাদেরকে আলাদা আরাকান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে তাদেরকে ব্যবহার করেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ শক্তি যুদ্ধে জাপানীদের কাছে পরাজিত হয়ে ক্ষমতা ছেড়ে চলে যায়। তাই এ সময় বৌদ্ধ রাখাইন এবং মুসলিম রোহিঙ্গাদের মধ্যকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সংঘর্ষ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পরে। জাপানীরাও হাজার হাজার রোহিঙ্গাদের নির্যাতন, ধর্ষণ এবং হত্যা করেছিল। এই সময়ে জাপানী এবং বার্মিজদের দ্বারা বারংবার গণহত্যার শিকার হয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে চলে আসে। ১৯৪৫ সালে বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে আমেরিকা কর্তৃক পারমানবিক বোমার আঘাতে জাপান সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে গেলে ব্রিটিশরা আবার আরাকান রাজ্যের উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। যতদূর জানা যায়, বৃটিশ আমলের শেষ দিকে হিন্দু-মুসলিম দ্বিজাতীতত্বের ভিত্তিতে ভারত পাকিস্তান ভাগ হওয়ার সময় রোহিঙ্গাদের একটি অংশ আরকানকে পাকিস্তানের সাথে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিল। কোনভাবে তা যদি সম্ভব হত, তাহলে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে, আরকান রাজ্য বর্তমান বাংলাদেশের অংশ হত। তবে তৎকালীন রাজনৈতিক ও অন্যান্য কারনে তাদের এ উদ্যোগ সফল হয়নি।

মিয়ানমারের স্বাধীনতা লাভ
মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী সুকির পিতা অং-সানের নেতৃত্বে দীর্ঘসময় ধরে চলা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে এবং এর ফলে আরকান ও বাংলার মাঝে সীমান্ত চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীনের পর মিয়ানমার বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করে। স্বাধীনের মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা প্রথম দিকে ভালই ছিল। সে সময়ে পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে কয়েকজন উচ্চপদস্থ সরকারি দায়িত্বও পালন করেন।

স্বাধীনতা পরবর্তী রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনের নতুন অধ্যায়
মায়ানমারের স্বাধীনতার পরবর্তী সময় স্থানীয় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে কাসিম নামক এক ধুরন্ধর ব্যক্তি ব্রিটিশদের ফেলে যাওয়া অস্ত্র-সস্ত্র লুট করে ডাকাতি আরম্ভ করে এবং তার দলবল নিয়ে এ আরকান রাজ্যের কিছু গ্রামাঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে, আর নিজেকে "কাসিম রাজা" হিসেবে পরিচয় দেয়। সে সময় এ ডাকাত সর্দার এসব গ্রামে রোহিঙ্গাদের উপর ব্যাপক লুটতরাজ, হত্যা, ধর্ষন, অগ্নিসংযোগ চালাতে থাকে। তার অত্যাচারেও অতিষ্ঠিত হয়ে ঐ সময় অনেক রোহিঙ্গা এসব গ্রাম থেকে নিজেদের ভিটেবাড়ি ছেড়ে আরকানের শহরাঞ্চলে এবং চট্টগ্রামে পাড়ি জমায়। পরবর্তীতে মায়ানমার সরকার তাকে দমন করতে অভিযান পরিচালনা করে এবং তার বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। কাসিম রাজা কোনমতে পালিয়ে চট্টগ্রামে চলে আসে। যতদূর জানা যায়, কয়েক বছর পর জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারের ঊখিয়াতে সে খুন হয়। সুদীর্ঘকাল ধরে নির্যাতিত হয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর স্বজাতি কাসিম রাজার জুলুম-নিপীড়ন তাদের নির্যাতনের ইতিহাসকে আরো কলুষিত করে তোলে।

জানা যায়, মায়ানমারের স্বাধীনতার পরেও বৌদ্ধ রাখাইনদের সাথে দীর্ঘদিনের শত্রুতার প্রেক্ষিতে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ আলাদা আরকান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যে আন্দোলন করে। কতিপয় রোহিঙ্গাদের এই ব্যর্থ আন্দোলনের ক্ষত এখনও সমস্ত সাধারন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। নতুন করে তাদেরকে আবার সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হতে থাকে। ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথকে রুদ্ধ করে বরং স্বৈরাচারী সরকার হিসেবে আবির্ভূত হয়। সামরিক অভ্যুত্থানের পর রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়। ব্রিটিশদের একটি মারাত্নক ভূল ছিল, তারা মিয়ানমারের ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকায় রোহিঙ্গাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেনি। এ ভুলের পেছনে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের হয়তোবা অন্য কোন দূরভিসন্ধিও ছিল। তবে এতে সামরিক জান্তা কর্তৃক রোহিঙ্গাদের বিদেশি হিসেবে পরিচয় দিতে সুবিধা হয়। তাছাড়া ভাষা, ধর্ম, গায়ের রঙ, চেহারা অমিল থাকার কারণেও সামরিক জান্তা তাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে।কয়েকশ বছর ধরে এই ভূখন্ডে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদেরকে ১৯৭০ সালের পর থেকে তাদেরকে সব ধরনের সরকারি চাকরি ও নাগরিক সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়। জেনারেল নে উইন তাদেরকে দমনের জন্য দুই দশকব্যাপী সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। উল্লেখযোগ্য একটি অভিযান ছিল "কিং ড্রাগন অপারেশন" যা ১৯৭৮ সালে পরিচালিত হয়। এর ফলে অনেক মুসলমান প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে আসে এবং শরনার্থী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বাংলাদেশ ছাড়াও উল্লেখযোগ্য সংখ্যার রোহিঙ্গারা পাকিস্তানের করাচীতে চলে যায়। ১৯৮২ সালে নতুনভাবে নাগরিকত্ব আইন করে রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব থেকে চিরতরে বঞ্চিত করা হয়।

রোহিঙ্গাদের বর্তমান দুর্ভোগের চিত্র
১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব বাতিলের ফলে রোহিঙ্গারা তাদের সমস্ত নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। তারা সরকারি অনুমতি ছাড়া দেশের ভিতরে বা বাহিরে ভ্রমণ করতে পারে না, জমির মালিক হতে পারে না এবং সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত আরোপ করা হয়। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ধর্ম পালনে বাঁধা দেয়া হয়। মুসলিম নাম বাদ দিয়ে বার্মিজ নাম রাখতে বাধ্য করা হয়। বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হয়। তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নেই। উচ্চশিক্ষা ও চিকিৎসার জন্যে হলেও রোহিঙ্গাদেরকে মায়ানমারের অন্য কোন শহরে যেতে অনুমতি দেয়া হয় না। তাই দেখা যায়, রোহিঙ্গাদের অনেকে চিকিৎসা নিতে যে কোন ভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে টেকনাফ, কক্সবাজার বা চট্টগ্রামে আসে। ছোট-বড় দাঙ্গার ফলে হত্যা-ধর্ষণ, লুটপাট-অগ্নিসংযোগ, সম্পত্তি-ঘরবাড়ি দখল হরহামেশাই ঘটে। ১৯৯১-১৯৯২ সালের দিকে ব্যাপক নিপীড়ন এবং এর ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ ২০১২ সালের ব্যাপক নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়ে হাজার হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে প্রবেশ করে। ২০১২ সালে বৌদ্ধ চরমপন্থীরা প্রচুর রোহিঙ্গা মুসলিমকে আগুনে পুড়িয়ে এবং জবাই করে হত্যা করেছিল এবং অন্তত ১ লক্ষ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছিল , যা ঐ সময়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে প্রচার হওয়ার পর সমস্ত বিশ্ববাসীর বিবেককে নাড়া দেয় এবং ব্যাপকভাবে এ গনহত্যার নিন্দা জানানো হয়।

মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের দশম শ্রেনীর পর আর উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেয় না, তাই পড়াশুনার ক্ষেত্রে অনেকে মাদ্রাসা শিক্ষাকেই বেছে নেয়। কারন, দশম শ্রেনীতে ভাল ফলাফল করলেও এরপর কলেজে ভর্তি হতে পাশ্ববর্তী শহরে যাওয়ার কোন অনুমতি নেই। হাতেগোনা দুই-একজনের চাকুরী হয় স্থানীয় জীবনমান উন্নয়নে নিয়োজিত কিছু আন্তর্জাতিক NGO সমুহের নিম্ন-মাঝারি কিছু পদে। এছাড়া আর অন্য কোন চাকুরীতে তাদের নেয়া হয় না। এতে তাদের অনেকেরই শিক্ষালাভের প্রতি অনীহা চলে আসে। তাই চাকুরী ও কাজের সন্ধানে বিগত কয়েক দশকে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিজেদের ভিটেবাড়ী বিক্রী করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলে যায়। মায়ানমারে যেহেতু এদের নাগরিকত্ব নেই, তাই অনেকে কোনভাবে বাংলাদেশে এসে অবৈধভাবে বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে বিশেষ করে মালয়শিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গমন করে। অসহায় রোহিঙ্গাদের অনেকে বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধভাবে সাগরপথে পাড়ি দিয়ে মালয়শিয়া, থাইল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করে। ভাগ্য সহায় হলে কোনমতে প্রানে বেঁচে যায়, নইলে লাশ হয়ে সাগরে ভাসে। সম্প্রতি থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় পাওয়া গেছে কিছু বিদেশ গমনেচ্ছু রোহিঙ্গাদের গণকবর, ধারনা করা হয় যারা মানব পাচারকারী দালালদের টাকা দিতে অস্বীকৃতি বা অপরাগতা প্রকাশ করেছে, তাদেরকে এখানে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। এসব ঘটনা বিশ্ব মিডিয়ায় বহুল আলোচিত হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে নিজেদের মধ্যেই এক শ্রেনীর আদমবেপাড়ী দালালচক্র তাদেরকে বিভিন্নভাবে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। স্বজাতি কর্তৃক অনেকে এভাবে প্রতিনিয়ত প্রতারিতও হচ্ছে। এ দালালচক্র বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সীর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদেরকে কোন রকমে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এই ধান্ধাবাজ চক্রের কাছে রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্ব ব্যবসায়ীক পন্য ব্যতীত আর কিছুই নয়। রোহিঙ্গাদের মধ্যে গুটিকয়েক কিছু ধান্ধাবাজ ব্যক্তি আদম পাচার, অবৈধ হুন্ডি ব্যবসা এবং টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মাদকদ্রব্য পাচারের মাধ্যমে বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক হয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে বিলাশবহুল জীবন-যাপন করছে। সামান্য কিছু ধান্ধাবাজ ব্যক্তির এসব অবৈধ কার্যকলাপের জন্যে আজ গোটা রোহিঙ্গা জাতিকে এর খেসারত দিতে হচ্ছে। অসহায় দুর্ভাগা রোহিঙ্গাদের জন্মই যেন আজন্ম পাপ।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সুকি কি কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নিবে ?
রোহিঙ্গারা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। যুগ যুগ ধরে চলে আসা জাতিগত সহিংসতায় রোহিঙ্গারা এখন রাষ্ট্রহীন হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন। মায়ানমারের বৌদ্ধ উগ্রপন্থীরা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে জাতিগতভাবে নির্মূল (Ethnic cleansing) করতে সম্ভাব্য সব ধরনেই প্রচেষ্টাই করে যাচ্ছে। অন্যান্য সকল দেশের তাই রোহিঙ্গা ইস্যুকে সাম্প্রদায়িতা ও জাতীয়তাবাদের উর্ধ্বে উঠে মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখা উচিত। সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশ থেকে মায়ানমার জান্তা সরকারকে বলা হলেও রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে তাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাছাড়া বিভিন্ন দেশে অবস্থিত রোহিঙ্গাদের সংগঠনের পক্ষ থেকেও প্রতিনিয়ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে নিজেদের জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা ও দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরা হচ্ছে। তাই মায়ানমার যদি দীর্ঘ কয়েক দশক পর সুকির নেতৃত্বে গনতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করতে পারে, তাহলে সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গারা নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শুরু করবে। দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে, রোহিঙ্গা নির্মূলে নেতৃত্বদানকারী বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরাও সুকির কট্টর সমর্থক। তাই শান্তিতে নোবেলপ্রাপ্ত সুকি এ দীর্ঘসময়ের জাতিগত দাঙ্গা নিরসন করে সমাজে শান্তি আনয়ন করতে ভবিষ্যতে কি পদক্ষেপ নিবেন, তাই দেখার বিষয়।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.