| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ
কবিগুরুর নয়নতারায় বসবাস ........
আস্তিক-নাস্তিক মুলামুলির মাঝে লালন দর্শনের ঝাঁপি খুললাম। যদিও "কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ" ব্লগে রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানের ব্যাখান লিখব বলেই ঠিক করেছিলাম। সময় অভাবে হয়ে উঠেনি। লালন দিয়ে শুরু করলাম। রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আসছি শীঘ্রই।
লালনের একটি জনপ্রিয় গানের বিস্তারণ করলাম। কোনো অংশে দ্বিমত থাকলে মন্তব্যে জানাবেন .....
মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার (ভবে)
সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার
মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার
লালনের এ গানটি মূলতঃ মানবতা এবং মানুষের উচ্চ মর্যাদাকে কেন্দ্র করে রচিত। গানের প্রথম চরণ দুটিতে লালন বলেছেন বইপুস্তক পড়ে প্রাপ্ত জ্ঞানের চাইতে গুরু বা শিক্ষকের সংস্পর্শে থেকে অর্জিত জ্ঞানই আসল ও কার্যকরী জ্ঞান। যেকোনো “সাধন” বা প্রচেষ্টায় “সিদ্ধ” বা সফল হতে হলে গুরুর সাক্ষাতে বা সংস্পর্শে তা করতে হয়। বইপুস্তকে যে জ্ঞান থাকে তা কেবলই অক্ষরবদ্ধ শুস্ক জ্ঞানমাত্র। গুরুর সংস্পর্শ ছাড়া কেবলই অক্ষরবদ্ধ জ্ঞান শিার্থীর মনে রসকষহীন জ্ঞাতব্য বিষয় হিসেবে গৃহীত হয় বটে কিন্তু সেই জ্ঞানের কোনো আনন্দ বা প্রাণবন্ততা থাকে না। শিক্ষক বা গুরুর বচন-ভাষণ ও চেহারা দর্শন শিক্ষার্থীর জন্য আবশ্যক। সেই প্রকারের “মানুষ-গুরুতে” ভক্তি রাখলে গুরুর প্রাণের স্পর্শে শিক্ষার্থীর মনে প্রাণবন্ত জ্ঞানের সঞ্চার হয়। মলাটবদ্ধ কোনো বই বা কিতাব যেমন কোনো মানুষের গুরু হতে পারে না তেমনিভাব ধর্মীয় বইপুস্তক বা কিতাবাদী পড়ে কেউ কোনোদিন সত্যিকারের ধার্মিক বা আর্দশবান হতে পারে না। উপযুক্ত গুরু বা পথপ্রদর্শকের সংস্পশে থাকলেই কেবল সত্যিকারের ধার্মিক বা আদর্শবান হওয়া সম্ভব। যে কোনো কিতাব বা অক্ষরবদ্ধ জ্ঞানের সেই শক্তি নেই যে তা সরাসরি কোনো মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করতে পারে। তাই যে কোনো ধর্ম কিম্বা আদর্শবাদে দীক্ষতি হওয়ার ক্ষেত্রে সেই আদর্শবাদের প্রকাশ ঘটেছে যেই গুরুর মধ্যে তেমন কোনো গুরুর প্রতি অবিচল ভক্তি ও আস্থা রেখে তাকে অনুসরণ করলেই কেবল সাফল্য লাভ সম্ভব।
এখানেই শেষ নয়। বোদ্ধাদের মতে, লালনের এ গানের প্রথম চরণ দুটির গভীরতর অর্থ রয়েছে। এ গানের “মানুষ-গুরু” বলতে লালন কোনো ব্যক্তি মানুষকে নির্দেশ করেন নি। এখানে “মানুষ” বলতে তিনি চিরন্তন মানবের ভাবরূপটিকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের, সকল যুগের, সকল স্থানের মানুষের মধ্যে যে সাধারণ গুণাবলী রয়েছে সেইসব গুণাবলীর ভাবরূপটিকেই লালন তার এই গানে “মানুষ-গুরু” বলে আখ্যায়িত করেছেন। আরও স্পষ্ট করে বলা যায় যে, জগতে “মানুষ” নামক সত্ত্বাটি যেসব কারণে “মানুষ” হয়ে উঠেছে; যেসব কারণে মানুষ অন্যান্য পশু-প্রাণী থেকে আলাদা হয়ে উঠতে পেরেছে সেইসব মানবিক গুণাবলীর সমষ্টিকে লালন এখানে “মানুষ-গুরু” বলে উল্লেখ করেছেন। লালনের উল্লিখিত মানুষ গুরুর প্রতি অথাৎ “চিরন্তন-মনুষ্যভাব” রূপটির প্রতি যদি আমরা অবিচল শ্রদ্ধা রেখে দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করে চলতে পারি তবে আমরা আমাদের ব্যক্তিগত কিম্বা সমষ্টিগত যে কোনো প্রচেষ্টাতে “সিদ্ধ” বা সফল হবই।
নদী কিম্বা বিল বাঁওড় খাল
সর্বস্থলে একই এক জল।
নদী, পুকুর, হাওড়-বাওড়, খাল-বিল এ সবই জলের আধার বা ধারক। ধারকপাত্রর আকার যেমনই হোক না কেন “জল” কিন্তু সার্বজনীন। নদী, বিল, বাওড়, খাল- এরা দেখতে পরস্পর যতই ভিন্ন হোক না কেন এদের সকলেরই অভ্যন্তরে রয়েছে একই “জল”। অনুরূপভাবে এ পৃথিবীতে মানুষের কল্যাণে যত ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম আর মতবাদই প্রচার প্রসার লাভ করেছে সেগুলির প্রত্যেকটির বিষয়বস্তু একই। আর সেই বিষয়বস্তু হচ্ছে মানবকল্যাণ।পৃথিবীর শত শত ধর্ম, দর্শন, মতবাদের চেহারা একেকটির একেক রকম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা আপাতঃদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী বলে মনে হলেও সেগুলির প্রত্যেকটিই মানব কল্যাণের নামেই প্রচার করা হয়। অতএব, লালনের যুক্তি হচ্ছে- নদী, বিল, বাওড়, খাল ইত্যাদির ভিন্ন ভিন্ন আকারের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে বরং “জল” এর দিকে দৃষ্টি দেয়াই আমাদের উচিত। বিভিন্ন ধর্ম, দর্শন ও মতবাদের কাঠামোগত দিকটি নিয়ে আমরা বিবাদে লিপ্ত না হয়ে যদি সেই সবগুলির বিষযবস্তুর দিকে নজর দিই তবে আমরা সেগুলির প্রত্যেকটির মধ্যেই একই বাণী বা মেসেঝ পাব। আর সেই বাণী হচ্ছে মানবকল্যাণের বাণী। লালন বিভিন্ন ধর্মের বাণী বা মেসেঝ কে “জল” এর রূপকে বর্ণনা করেছেন। এভাবে লালনের এই গানে ধর্মে-ধর্মে বিবাদ বিসম্বাদ বর্জন করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। আমাদের উচিত হল, বিসম্বাদ ছেড়ে “মানুষ-গুরু” অর্থাৎ “চিরন্তন মনুষ্যভাবটিকে” সামনে রেখে ল্যপানে এগিয়ে যাওয়া। তাহলেই আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে মানবকল্যাণ সাধন করতে পারব। ধর্ম-দর্শন আর মতবাদ নিয়ে পরস্পর বিরোধ এড়াতে পারব। তাছাড়া ভিন্ন ভিন্ন ধর্মে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ঈশ্বরের উল্লেখ থাকলেও ঈশ্বর মূলতঃ একক এবং অখন্ড সত্ত্বা। “জল” এর মতই তিনি সরল, সহজ ও সর্বত্রগামী।
এক আমেরে সাঁই ফেরে সর্বঠাঁই
মানুষে মিশিয়া হয় বিধান তার
গানটির এ লাইন দুটিতে গভীর ঈশ্বরতত্ত্ব ও মানুষের সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়েছে। “আমের” বা “আমির” শব্দের অর্থ বাদশাহ বা অধিপতি। বাউলদের পরিভাষায় “সাঁই” একটি শ্রদ্ধাজ্ঞাপক শব্দ। “এক আমের সাঁই” বলতে ঈশ্বরের একচ্ছত্র আধিপত্যকে বুঝানো হয়েছে। ঈশ্বর হচ্ছেন জগতের একমাত্র, একচ্ছত্র বাদশাহ বা অধিপতি এবং তিনি সর্বত্র বিরাজ করেন। “ফেরে সর্বঠাঁই” অর্থ তিনি সবর্ত্র ঘুরে বেড়ান। “ফেরা” অর্থ যদিও ঘুরেফিরে বেড়ানো কিন্তু এখানে “ফেরে” বলতে ঘুরে বেড়ানো বুঝানো হয়নি। ঈশ্বরের ব্যাপারে “ফেরে” বলতে বুঝতে হবে যে তিনি একই সময়ে সবর্ত্র অবস্থান করেন। “ঠাঁই” অর্থ স্থান বা জায়গা। অতএব, সর্বঠাঁই অর্থ সব জায়গায়। সবমিলিয়ে লাইনটির অর্থ দাঁড়ায়, “জগতের একমাত্র, একচ্ছত্র ও সার্বভৌম অধিপতি ঈশ্বর একইসঙ্গে সর্বত্র বিরাজত থাকেন।”
মানুষে মিশিয়া হয় বিধান তার
ঈশ্বর সার্বভৌম ও নিরঙ্কুশ মতার অধিকারী হওয়ার ফলে তিনি স্বয়ং কোনো বিধান বা নিয়মের অধীন নন। পরম ঈশ্বরের জন্য কোনো বিধান বা আইন প্রযোজ্য নয়। কারণ পরম অবস্থায় তিনি “এক’ এবং “অখন্ড”। কাজেই সর্বব্যাপী, পরম ও অখন্ড কোনো সত্ত্বার পক্ষে কোনোরূপ বিধান বা আইন “মেনে চলা” বা “না মেনে চলা” উভয়ই সমান। কিন্তু পরম ঈশ্বর যখন মানবকূলের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করেন তখনই তার জন্য বিধান প্রযোজ্য হয়। কারণ মানবের মাঝে ঈশ্বরের প্রকাশিত রূপটি সীমিত রূপ। একজন ব্যক্তি-মানুষকে মানবকুলের আরও দশজন মানুষের সাথে মিলেমিশে চলতে হয়। ফলে মানবরূপে প্রকাশিত ঈশ্বরভাবটির ব্যাপারে “পরস্ব অপহরণ না করা” “স্বেচ্ছাচারী না হওয়া” ইত্যাদি নিয়ম বা বিধানের প্রয়োজন হয়। পরম ঈশ্বরের পক্ষে “পরস্ব অপহরণ করা” বা “চুরি করা” র কোনো প্রশ্ন নেই। কারণ সেক্ষেত্রে তার কোনো “পর/অপর” নেই। ঈশ্বরের পরম সত্ত্বার সমান অন্য কোনো দ্বিতীয় সত্বা না থাকায় তার জন্য “পরস্ব” বা “অপরের জিনিষ” অপহরণ বা চুরির প্রশ্নও নেই। আবার ঈশ্বরের পরম সত্ত্বার ক্ষেত্রে কোনো “স্বৈরাচারণের” প্রশ্নও নেই। কারণ জগতে যখন তিনি একাই একজন হিসেবে বিরাজ করেন তখন তিনি যেমনই “আচরণ” করুন না কেন তাতে তার “স্বৈরাচারী” হওয়া বা না হওয়ার প্রশ্ন নেই। কিম্বা বলা যায় পরম ঈশ্বরের বর্ণনা দেয়ার বেলায় “চুরি” “স্বৈরাচারী” এইসব শব্দ কোনো অর্থ বহন করে না। কিন্তু সেই পরম ঈশ্বর যখন নিজেকে মানবের মাঝে সীমিত আকারে প্রকাশ করেন তখন একজন ব্যক্তি মানুষ ইচ্ছা করলেই স্বয়ং ঈশ্বরের মত বা একচ্ছত্র অধিপতির মত যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে না। কারণ ব্যক্তি-মানুষ সর্বদাই তার নিজেরই মত অসংখ্য “অপর” বা দ্বিতীয় সত্ত্বাকে সঙ্গে নিয়ে বসবাস করে। ফলে সে যদি নিজেকে পরম ঈশ্বরের তুল্য ভেবে অন্যদেরকে নিজের পছন্দ-অপছন্দ অনুসারে চলতে বাধ্য করতে চায় অর্থাৎ “অপর” এর উপর “স্ব” এর আচরণকে চাপিয়ে দিতে চায় তখনই সে হয়ে উঠে “স্বৈরাচারী”। তাই জগতস্থিত ব্যক্তি মানুষকে বিধান মেনে চলতে হয় যাতে করে সে “পরস্ব অপহরণ না করে” “স্বৈরাচারী না হয়ে উঠে” ইত্যাদি। আরও পরিস্কার করে বলতে গেলে লালন এখানে “বিধান” বলতে ধর্মগ্রন্থকে বুঝিয়েছেন। ঈশ্বর নিজে কোনো ধর্মগ্রন্থ বা বিধি-বিধান মেনে চলেন না কিন্তু যখন তিনি মানবের মাঝে প্রকাশিতরূপে থাকেন তখন তাকে ধর্মগ্রন্থ মেনে চলতে হয়। যার যার ধর্ম সে সে মেনে চলবে।
নিরকারে জ্যোর্তিময় যে,
আকার সাকার হইল সে।
লালন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, নিরাকার পরম ঈশ্বরই জগতে নিজেকে আকারবিশিষ্ট “মানব” রূপে প্রকাশিত রেখেছেন। নিরাকার বা “পরম” অবস্থায় ঈশ্বর “জ্যোর্তিময়”। “জ্যোর্তিময়” বলতে বুঝনো হয়েছে এমন সত্ত্বাকে যার কোনো আকার, আয়তন, ভর নেই- এমনকি ছায়ামাত্রও নেই। কিন্তু সেই জ্যোর্তিময় পরম ঈশ্বরই আবার মানব আকারে নিজেকে প্রকাশ করেছেন সকল মানবের মাঝে। এখানে “আকার” ও “সাকার” শব্দদুটির ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। “আকার” হচ্ছে মানুষের দেহের সীমানা বা ফ্রেম । একজন ব্যক্তি মানুষ তার সমস্ত শরীর নিয়ে একটা নির্দিষ্ট স্থানজুড়ে অবস্থান করে থাকে। একজন মানুষের দেহের সেই সীমানাটুকুর নাম “আকার”। আর “সাকার” বলতে মানবদেহের ভর, স্পর্শযোগ্যতা, (অ)ভেদ্যতা ইত্যাদিকে একত্রে বুঝানো হয়েছে। “আকার” ও “সাকার” শব্দ দুটির মাঝে পার্থক্য আছে। উদাহরণস্বরূপ ছায়ার কথা বলা যায়। যে কোনো একটি ছায়াকে একটি নির্দিষ্ট স্থানজুড়ে দেখা যায় এবং তা আমাদের মনে একটি ফ্রেম এর ধারণা প্রদান করে। সে হিসেবে ছায়ার আকার আছে কিন্তু ছায়া “সাকার” নয়। ছায়ার ভর, আয়তন, স্পর্শযোগ্যতা, (অ)ভেদ্যতা নেই। লালন তার এই চরণদুটিতে পরম ঈশ্বরের সত্ত্বাগত অবস্থানের বিষয়টিকে দুইটি স্তরে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ পরম ঈশ্বর “সাকার” নন। তাঁর কোনো ভর, আয়তন, স্পর্শযোগ্যতা নেই এমনকি তাঁর কোনো “আকার” বা ফ্রেমও নেই। পরম অবস্থায় তিনি “জ্যোর্তিময়” কিন্তু সেই তিনিই আবার মানবের মাঝে আকারময়।
দিব্যজ্ঞানী হয়
তবে জানতে পায়
কলিযুগে হলেন মানুষ অবতার
এখানে বলা হয়েছে যে, যদি কোনো মানুষ “দিব্যজ্ঞান” বা “পরিচ্ছন্ন জ্ঞানের” অধিকারী হয়ে থাকে তবে সে বুঝতে পারবে যে, বর্তমান যুগে আর কোনো “অবতার” বা ধর্মপ্রবক্তার প্রয়োজন নেই। বর্তমান যুগে মানুষ নিজেই “অবতার” হয়ে উঠেছে। মানুষকে নীতিশিক্ষা দেয়ার জন্য যুগে যুগে অনেক “অবতার” বা আধ্যাত্মিক মহাপুরুষের আগমন ঘটেছিল। তাঁরা স্বর্গ থেকে বাণী নিয়ে এসেছিলেন মানুষের কল্যাণের জন্য। তাঁরা ছিলেন অবতার বা “অবতরণকারী”। তাঁরা স্বর্গ থেকে নেমে এসে মর্ত্যের মানুষকে নীতি শিক্ষা দিতেন। স্বর্গ থেকে অবতার এসে মাটিতে বসবাসকারী মানুষকে নীতিশিক্ষা দিবে এ প্রকৃয়াটি লালনের কাছে মোটেও স্বাভাবিক প্রকৃয়া বলে মনে হয়নি। তাই লালন বলছেন, মানুষের জন্য যদি কোনো ধর্মপ্রবক্তা মহাপুরুষের প্রয়োজন থেকেই থাকে তবে পূর্বে উল্লিখিত “মানুষ-গুরু”ই হতে পারে সেই “অবতার”। হিন্দু পরাণে “কলিযুগ” কে উল্লেখ করা হয়েছে অধর্মের ও বিশৃংখলার যুগ হিসেবে। আধুনিক যুগের বা কলিযুগের মানুষ অবতারকে অশ্রদ্ধা করবে বলে উল্লেখ রয়েছে পুরাণে। লালন এ মতের বিরুদ্ধে একটি অত্যন্ত প্রগতিবাদী মত প্রকাশ করেছেন। তার মতে, কলিযুগে অবতারকে অশ্রদ্ধা করা তো দূরের কথা কলিযুগে কোনো অবতারেরই প্রয়োজন হবে না। কারণ আধুনিক যুগে বা কলিযুগে “মানুষ” নিজেই “অবতার” হয়ে উঠেছে। এই গানের শুরুতে উল্লিখিত “চিরন্তন মনুষ্যভাবটি” ই কলিযুগের ধর্মপ্রবক্তা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বহু তর্কে দিন বয়ে যায়
বিশ্বাসে ধন নিকটে পায়।
ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের অনুসারীরা নিজেদের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে তর্ক করে অযথা সময় নষ্ট করে। ধর্ম নিয়ে অযথা বিতর্ক বাড়ালে তাতে কোনো লাভ নেই। ধর্ম নিয়ে বির্তক করে কেউ কোনোদিন আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ করতে পারে নি। তাই শুধু বিতর্কে কালক্ষেপন না করে ঈশ্বরে বিশ্বাস দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করে তুলতে পারলেই আমাদের লাভ আছে। মানুষের যা কিছু চির আকাঙ্খার বস্তু তা ঈশ্বরবিশ্বাসের মাঝেই নিহিত আছে। তর্ক বিতর্ক কিম্বা নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার মধ্যে কোনো সার্থকতা নেই। বরং সার্থকতা আছে ঈশ্বরে সহজ বিশ্বাস স্থাপনের মধ্যে।
সিরাজ সাঁই ডেকে বলে লালনকে
কূ-তর্কের দোকান সে করে না আর
লালনের অনেক গানে সিরাজ সাঁইয়ের উল্লেখ আছে। জানা যায়, সিরাজ সাঁইয়ের নিকটেই লালন শৈশবে পালিত হয়েছিলেন। এক হিসেবে লালন সিরাজ সাঁইকে তার গুরু মানতেন। লালন তাঁর গুরুর বরাত/রেফারেন্স দিয়ে জানাচ্ছেন যে, তার গুরু ধর্ম নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করার অভ্যাসটি বাদ দিয়েছেন এবং “বিশ্বাসে ধন নিকটে পাওয়ার” নীতি অবলম্বন করেছেন। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, ধর্ম নিয়ে তর্ক বিতর্কের আড্ডা বা আসরকে লালন “কূ-তর্কের দোকান” বলে উল্লেখ করেছেন। “দোকান” শব্দটির সাথে ক্রয়-বিক্রয় বা বৈষয়িক লাভালাভের বিষয়টি জড়িত আছে। অতএব, বোঝা যায় লালন এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন যে, যারাই ধর্ম নিয়ে বিতর্কের অবতারণা করে তারাই বৈষয়িক কিছু লাভালাভ বা ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যেই তা করে। তাই সত্যিকারের ধামিকের উচিত “কূ-তর্কের” দোকানে না যাওয়া। অর্থাৎ ধর্ম নিয়ে বিতর্ককারীদের দলে না থাকা। পরিশেষে বলা যায় লালনের এই জনপ্রিয় গানটিতে হৃদয়ঙ্গম করার মত বহুমাত্রিক ভাব ও গভীর দর্শন রয়েছে।
ভাল থাকবেন সবাই। শুভকামনা।
২|
২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ রাত ৯:১০
কসমিক- ট্রাভেলার বলেছেন:
পরবর্তী লালন মেলার তথ্য দিতে পারবেন কি ?
৩|
২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ বিকাল ৫:১২
প্যাপিলন বলেছেন: বিশ্লেষন ভাল লাগলো কবি গুরু
©somewhere in net ltd.
১|
২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ রাত ৮:৫১
পুংটা বলেছেন: এইসব কাদাছুড়াছুড়ির বাইরে... লালনরে একটু শান্তিতে থাকবার দেন।
বাঙালী মুসলমানরা আবার তারে নাস্তিক না কয়ে বসে।