নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

“Blogger | Law Student | Human Rights Activist”

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু

লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু › বিস্তারিত পোস্টঃ

সোনার ধানে নোনা জল

০২ রা মে, ২০২৬ দুপুর ১:১২



হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ শব্দে রেদোয়ানের ঘুম ভাঙল। না, কোনো স্বপ্ন নয়; মেঘের ডাক আর টিনের চালে বৃষ্টির উন্মত্ত তান্ডব। বিছানা ছেড়ে দরজায় এসে দাঁড়াতেই এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস আর বৃষ্টির ঝাপটা ওর মুখে আছড়ে পড়ল। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না, শুধু কানে আসছে হাওরের সেই পরিচিত গর্জন—যে গর্জন এখন এক খুনে মেজাজে রূপ নিয়েছে। "সব কি শেষ হয়ে যাবে?" বিড়বিড় করে নিজেকেই প্রশ্ন করল রেদোয়ান। ওর চোখের সামনে ভাসছে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সেই সোনালী ধান, যা কাল সকালেই কাটার কথা ছিল।

ইছাগড়ি গ্রামের মাওলানা আব্দুল আজিজের ছেলে রেদোয়ান আলী যখন লেখাপড়া শেষ করে চাকুরীর পেছনে না ছুটে কৃষি কাজে নামল, তখন গ্রামের অনেকেই বাঁকা চোখে তাকিয়েছিল। কিন্তু রেদোয়ানের জেদ ছিল অন্যরকম। অর্থের অভাবে আদরের ছোট বোনটাকে শৈশবেই পর করে দিতে হয়েছে—এই ক্ষত ওকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফেরে। নিজের ঘাম ঝরানো পরিশ্রমে ও একটা গরুর খামার আর মাইলের পর মাইল বিস্তৃত বোরো ধানের মাঠ তৈরি করেছে। কিন্তু প্রকৃতির রুদ্ররোষে আজ সেই স্বপ্নই সলিল সমাধির অপেক্ষায়।

সকাল দশটা বেজে গেলেও সূর্যের দেখা নেই। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা পাউবোর হিসাব অনুযায়ী গত চব্বিশ ঘণ্টায় জেলায় ১২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। রেদোয়ান যখন হাওরের কিনারায় পৌঁছাল, তখন ওর বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। দেখল, ওর নিচু জমির প্রায় সবটুকু ধান এখন ঘোলা জলের নিচে। ওড়না দিয়ে চোখ মুছে পাশে তাকাতেই দেখল স্বপন কাকা একা একা ধানের ভেজা স্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপছেন।

স্বপন কাকা হাহাকার করে উঠলেন, "রেদোয়ান রে! এক দিনের রোদে কি ধান শুকানো যায়? রোদের অভাবে মাড়াই করা ধানগুলো পচে কালো হয়ে যাচ্ছে। দেখ, এই নিচু এলাকার সব ধান এখন পানির নিচে।"

রেদোয়ান পানির দিকে তাকিয়ে দেখল, সরকারি হিসাবে হয়তো ১৫ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ধান তলিয়ে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু এই মাঠের দৃশ্য বলছে ধ্বংসলীলা তার চেয়েও বেশি। ও হাঁটু সমান কাদাজলে নেমে পড়ল। পাশ দিয়ে যাওয়া আরেক কৃষক চিৎকার করে বলল, "ফিরে চল রেদোয়ান! বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, এই অবস্থায় ধান কাটা মানে নিজের মরণ ডেকে আনা।"

রেদোয়ান কাস্তেটা শক্ত করে ধরে জবাব দিল, "মরার আগে অন্তত এক মুঠো ধান নিয়ে ফিরতে চাই কাকা। এই ধান শুধু ফসল না, আমার বোনের প্রতি দেওয়া ওয়াদা, আমার বাবার ইজ্জত!"

হাওর আজ যেন এক অসীম সমুদ্র। উজানের ঢলে সুরমা নদীর পানি সামান্য কমলেও হাওরের পানি কামড় দিয়ে আঁকড়ে ধরে আছে ফসলের মাঠকে। রেদোয়ানের সারা শরীর ঠান্ডায় নীল হয়ে আসছে। ও দেখল, ৫৯ শতাংশ ধান কাটার যে খাতা-কলমে হিসাব, তার আড়ালে পড়ে আছে কয়েক হাজার কৃষকের হাহাকার। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী যখন ভারী বৃষ্টি আর বন্যার পূর্বাভাস দিচ্ছিলেন, তখন রেদোয়ানের মনে হচ্ছিল প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটা ওর কলিজার ভেতর গেঁথে যাচ্ছে।

বিকেলে যখন বৃষ্টি একটু থামল, রেদোয়ান কাদামাখা অবস্থায় বাড়িতে ফিরল। ওর উঠোনে ভেজা ধানের ওপর বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ছে। মা ওর পাশে এসে নিঃশব্দে দাঁড়ালেন। রেদোয়ান নিচু স্বরে বলল, "মা, অন্তত আরও তিন-চার দিন টানা রোদ দরকার ছিল। এই আধাপচা ধান দিয়ে কি খামারের গরুর খাবারও জুটবে?"

রাত নামে সুনামগঞ্জের হাওর জুড়ে। বজ্রপাতের আলোয় মাঝেমধ্যে আকাশটা ফালা ফালা হয়ে যায়। ইছাগড়ি গ্রামের মসজিদে মাওলানা আব্দুল আজিজ হাত তোলেন মোনাজাতে। রেদোয়ান বারান্দায় বসে শোনে উত্তাল হাওরের শব্দ। ও জানে, কাল সকালে সূর্যের দেখা মিলুক বা না মিলুক, ওকে আবার ওই নোনা জলে নামতে হবে।

দিনশেষে প্রকৃতির অমোঘ সত্যটাই বড় হয়ে দাঁড়ালো—মানুষ তার ঘাম দিয়ে ইতিহাস লেখে, আর এক পশলা বৃষ্টি এসে সেই ইতিহাসের পাতা ভিজিয়ে দেয় একরাশ অনিশ্চয়তায়।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.