| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু
লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।
হাতিয়ার লক্ষ্মদীয়া গ্রামে ৫ মে-র বিকেলটা ছিল অস্বাভাবিক গুমোট। মেঘের আড়ালে সূর্য লুকানোর আগেই খবর এল—৫৪ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া ছৈয়দ আহম্মদ ফিরে এসেছেন। বাড়ির উঠানে ৮৩ বছরের এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে। পরনে জীর্ণ বসন, চোখে এক ধরণের স্থির, নির্নিমেষ চাহনি। কিন্তু এই প্রত্যাবর্তন আনন্দের চেয়েও বেশি বয়ে আনল এক জমাটবদ্ধ কুয়াশা।
নূর হোসেন তার বাবার মুখ দেখেননি। ৫৫ বছর বয়সে বাবার দাবিদার এই বৃদ্ধকে দেখে তিনি যতটা না আবেগপ্রবণ হলেন, তার চেয়ে বেশি হলেন তটস্থ। প্রথম দিনরাতেই নূরের খটকা লাগল। মাঝরাতে তৃষ্ণা পাওয়ায় সে যখন রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিল, দেখল বাইরের উঠোনে একটা ছায়া নড়ছে।
জানলা দিয়ে উঁকি দিতেই নূরের রক্ত হিম হয়ে এল। বৃদ্ধ ছৈয়দ আহম্মদ উঠোনের পশ্চিম ধারের সেই পুরনো নারিকেল গাছটার গোড়ায় বসে আছেন। তিনি হাত দিয়ে মাটি খুঁড়ছেন—ঠিক যেভাবে কোনো পশুর নখ দিয়ে মাটি আঁচড়ায়। মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে তিনি ফিসফিস করে হিন্দিতে কিছু একটা বলছেন। নূর লক্ষ্য করল, বৃদ্ধের হাতের নখগুলো অস্বাভাবিক লম্বা এবং সেখানে মাটি নয়, যেন পুরনো কালচে রক্তের দাগ লেগে আছে। নূর ভয় পেয়ে পিছিয়ে এল। লোকটা কি সত্যিই তার বাবা, নাকি কোনো অশুভ উদ্দেশ্যে এই বাড়িতে ঢুকেছে?
পরদিন নূর সুযোগ বুঝে বৃদ্ধের সাথে আসা সেই পুরনো ঝোলা ব্যাগটা হাতড়াল। সেখানে সে একটা জীর্ণ, নোনা জলে ভেজা ডায়েরি খুঁজে পেল। ডায়েরির অনেকগুলো পৃষ্ঠা ছেঁড়া। কিন্তু যা অবশিষ্ট আছে, তা দেখে নূরের কপালে ঘাম জমতে শুরু করল।
ডায়েরির একটি পাতায় বড় বড় করে লেখা— "সবাই তো আর ফিরে আসে না।" তার নিচে একটা অদ্ভুত জ্যামিতিক নকশা বা সিম্বল আঁকা, যা দেখতে অনেকটা ত্রিভুজ আর ভাঙা নৌকার মতো। ডায়েরির শেষ পাতায় একটি বাক্য অসমাপ্ত রয়ে গেছে: "আমেনার লাল বাক্সটার ভেতর যা আছে, ওটা জানলে ওরা আমাকে..." এরপর আর কিছু নেই, শুধু কলমের কালির একটা বড় লেপটে যাওয়া দাগ।
নূর বুঝতে পারল, এই বৃদ্ধ যা বলছেন তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু গোপন করছেন। এই ডায়েরি কি আসলেও তার বাবার? নাকি অন্য কারও, যার পরিচয় এই বৃদ্ধ চুরি করেছেন?
বিকেলে নূর সরাসরি বৃদ্ধের মুখোমুখি হলো। বৃদ্ধ তখন বারান্দায় বসে সূর্যাস্ত দেখছিলেন। নূর ডায়েরিটা বের করে তার সামনে ধরল।
“এই নকশাটার মানে কী? আর ডায়েরির শেষে আপনি কী লিখতে চেয়েছিলেন?” নূরের গলার স্বরে তখন কাঁপন।
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে মাথা ঘোরালেন। তার শান্ত চোখ দুটো হঠাৎ যেন সাপের মতো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। তিনি খুব নিচু স্বরে বললেন, “কিছু কথা নোনা জলের নিচে থাকাই ভালো নূর। তুই কি চাস ৫৪ বছরের সেই অন্ধকার আমি এই ঘরে নিয়ে আসি? আমি তো ফিরতে চাইনি, তোদের রক্তই আমাকে টেনে এনেছে।”
কথাটা বলে বৃদ্ধ নূরের কবজিটা খপ করে ধরলেন। তার হাতের মুঠো বরফের মতো ঠান্ডা এবং অমানুষিক শক্তিশালী। নূরের মনে হলো সে কোনো বৃদ্ধের সামনে নয়, বরং সাগরের কোনো এক অজেয় শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে দ্রুত হাত ছাড়িয়ে পিছিয়ে গেল। এই লোকটা বিপজ্জনক।
গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ আব্দুল বারেক মিয়া যখন দাবি করলেন তিনি ছৈয়দ আহম্মদের লাশ দাফন করেছিলেন, তখন রহস্য আরও ঘনীভূত হলো। নূর হোসেন বারেক মিয়াকে নিয়ে সেই পুরনো পরিত্যক্ত কবরস্থানে গেল।
বারেক মিয়া এক কোণায় আঙুল দিয়ে দেখালেন, “এখানেই দাফন করেছিলাম তাকে।”
কিন্তু কবরটা এখন ধসে গেছে। নূর যখন কুড়াল দিয়ে মাটি সরাতে শুরু করল, সে যা দেখল তাতে তার চিৎকার বেরিয়ে এল। কবরের ভেতর কোনো কঙ্কাল নেই, আছে শুধু কয়েকটা ভারি পাথর আর সেই ৫৪ বছর আগের কার্গো জাহাজের একটা জং ধরা মরচে পড়া অংশ।
তবে কি বারেক মিয়া সেদিন ভুল করেছিলেন? নাকি সেদিন কাউকে দাফনই করা হয়নি? নাকি যে ফিরে এসেছে, সে সেই মানুষটিই যার সলিল সমাধি হয়েছিল?
রহস্যের আসল জট পাকাল যখন নূরের চাচাতো ভাইয়েরা বৃদ্ধকে নিজেদের জিম্মায় নিয়ে নিল। তারা দাবি করল, বৃদ্ধই আসল ছৈয়দ আহম্মদ এবং তিনি জমিজমা সংক্রান্ত সব দলিল তাদের লিখে দেবেন। নূর বুঝতে পারল, বৃদ্ধের এই প্রত্যাবর্তন কোনো আধ্যাত্মিক স্বপ্ন নয়, বরং এক বিশাল জালিয়াতির অংশ হতে পারে। অথবা বৃদ্ধ নিজেই হয়তো চাচাতো ভাইদের ব্যবহার করে কোনো পুরনো প্রতিশোধ নিতে এসেছেন।
হাতিয়া থানার ওসির কাছে নূরের জিডি এবং এই বিচিত্র অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেওয়ার পর পুলিশ যখন তল্লাশি চালাতে এল, তখন বৃদ্ধ উধাও। শুধু তার ব্যাগটা পড়ে ছিল। ব্যাগের ভেতরে নূর খুঁজে পেল একটা ছোট্ট চিরকুট, সেখানে লেখা ছিল—
"রুপোর বালাটা আমি কবরে রেখে এসেছি, কিন্তু প্রাণটা তো রেখে আসতে পারিনি।"
হাতিয়ার লক্ষ্মদীয়া গ্রামে ছৈয়দ আহম্মদ এক অমীমাংসিত অধ্যায় হয়েই রয়ে গেলেন। তিনি কি আসলেও সেই নিখোঁজ শ্রমিক ছিলেন, নাকি এক ধুরন্ধর প্রতারক? অথবা এমন কেউ, যাকে সবাই মৃত ভেবেছিল কিন্তু সে আসলে ৫৪ বছর ধরে অন্ধকারের কোনো এক ডেরায় বেঁচে ছিল?
নূর হোসেন এখন মাঝরাতে উঠোনের সেই নারিকেল গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে মনে হয়, অন্ধকারের ভেতর থেকে কেউ একজন হিন্দিতে তাকে ডাকছে। সেই কণ্ঠস্বরে বাবার মমতা নেই, আছে শুধু সমুদ্রের সেই অতল শীতলতা।
কিছু সত্যের সন্ধান করার চেয়ে মৃত অবস্থায় থাকাই শ্রেয়—হাতিয়ার এই ঘটনাটি যেন সেই ধ্রুব সত্যকেই বারবার মনে করিয়ে দেয়।
সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি সংবাদের আলোকে লিখিত ফিকশন গল্প।
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো
সংবাদ শিরোনাম: ৫৪ বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিলেন জাহাজডুবিতে, যখন ফিরলেন বয়স ৮০ পেরিয়েছে
তারিখ: ১১/০৫/২০২৬ ইং
©somewhere in net ltd.