নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

“Blogger | Law Student | Human Rights Activist”

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু

লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু › বিস্তারিত পোস্টঃ

অপারেশন ব্লু মার্লিন

০৬ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৭



ইনানী বিচের এক কোণে নির্জন কটেজে বসে ৪৪ বছর বয়সী রসায়নের প্রফেসর রেহান আশরাফ যখন তার ডায়েরির পাতায় মার্সিডিজ S-Class গাড়ির এসি সিস্টেমের ড্রয়িং করছিলেন, তখন তিনি জানতেন কাজটা সহজ হবে না। তার ছোট ভাইয়ের আত্মহত্যার প্রতিশোধ নেওয়াটা কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, কারণ তার প্রতিপক্ষ জাহিদ শিকদার নিছক কোনো স্থূল মাফিয়া নয়। জাহিদ অসম্ভব খুঁতখুঁতে এবং তার সাথে ছায়ার মতো থাকে কক্সবাজার ডিবির ঝানু ইন্সপেক্টর নিয়াজ মোর্শেদ, যে জাহিদের পে-রোলে চলে।

রেহান চার মাস ধরে জাহিদের রুটিন স্টাডি করেছেন। প্রতি শুক্রবার রাত ৯টায় জাহিদ ইনানীর রিসোর্ট থেকে মেরিন ড্রাইভ দিয়ে নিজে ড্রাইভ করে বের হয়। পেছনে থাকে বডিগার্ডের মাইক্রোবাস।

রেহানের অস্ত্র ল্যাবে তৈরি গন্ধহীন, অদৃশ্য গ্যাস মিশ্রণ—অ্যানহাইড্রাস অ্যামোনিয়া এবং উদ্বায়ী অর্গানোফসফেট যৌগ। এটি গাড়ির কেবিনে ঢুকলে ৩ সেকেন্ডে মানুষকে অবশ করে দেয়। ইনানী রোডের একটা নির্দিষ্ট পাহাড়ি বাঁকে, যেখানে রাতের বাতাসের গতি ও দিক তার মুখস্থ, সেখানে রেহান বসিয়েছেন কাস্টম-মেড রিমোট স্প্রেয়ার।

রেহান তার স্টপওয়াচ মেলালেন। সব হিসাব নিখুঁত। কিন্তু মানুষ নিখুঁত হলেও প্রকৃতি বা ভাগ্য সবসময় নিখুঁত থাকে না।

শুক্রবার রাত ৮:৫৮ মিনিট। অন্ধকার বাঁকের ঝোপের আড়ালে মৎস্যজীবীর বেশে বসে আছেন রেহান। দূর থেকে মার্সিডিজের হেডলাইট দেখা গেল।

গাড়িটি বাঁকে প্রবেশ করতেই রেহান রিমোটের বোতাম চাপলেন। নিউমেটিক স্প্রেয়ার থেকে নিঃশব্দে গ্যাস বের হয়ে মার্সিডিজের এয়ার ইনটেকে ঢুকে গেল। রেহান মনে মনে গুনলেন—১... ২... ৩...

কিন্তু মার্সিডিজটি থামল না!

রেহানের মেরুদণ্ড দিয়ে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। হিসাব কোথায় ভুল হলো? হঠাৎ তিনি খেয়াল করলেন, সমুদ্রের লোনা বাতাসের কারণে স্প্রেয়ারের নজলটিতে লবণের ক্রিস্টাল জমে প্রেসার কিছুটা কমে গিয়েছিল। ফলে গ্যাসের ঘনত্ব যতটুকু হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি।

জাহিদ শিকদার সম্পূর্ণ অচেতন হননি, তবে তার হাত-পা অবশ হয়ে আসছিল। তিনি কোনোমতে ব্রেক চাপলেন। গাড়িটি পাহাড়ের দেয়ালে মৃদু ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল। ঠিক তখনই পেছনের বডিগার্ডদের মাইক্রোবাসটি ব্রেক কষে থামল।

রেহানের প্ল্যান ছিল জাহিদ মারা যাওয়ার পর বডিগার্ডরা এসে তাকে উদ্ধার করবে এবং ততক্ষণে রেহান বাইক নিয়ে চকরিয়ার দিকে চলে যাবেন। কিন্তু এখন জাহিদ বেঁচে আছেন এবং গাড়ির ভেতরেই বডিগার্ডদের ফোন করার চেষ্টা করছেন।

রেহান বুঝতে পারলেন, আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বডিগার্ডরা জাহিদকে গাড়ি থেকে বের করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে তার চার মাসের সাধনা এবং ভাইয়ের মৃত্যু বৃথা যাবে। রেহানকে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে হলো। তিনি ব্যাকআপ প্ল্যানে গেলেন—যেটি তিনি কখনো ব্যবহার করতে চাননি।

তিনি ঝোপ থেকে বের হয়ে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে মার্সিডিজের পেছনের দিকে গেলেন। বডিগার্ডরা তখন গাড়ির লক খোলার চেষ্টা করছে। রেহান পকেট থেকে একটি ছোট কেমিক্যাল ক্যাপসুল বের করে গাড়ির এক্সহস্ট পাইপের ভেতরে ছুড়ে মারলেন। এটি ভেতরে গিয়ে ইঞ্জিনের উচ্চ তাপে গলে এক চরম বিষাক্ত ধোঁয়া তৈরি করল, যা ব্যাক-প্রেশার দিয়ে সরাসরি এসি লাইনে ঢুকে গেল। ৩ সেকেন্ডের মধ্যে জাহিদের শরীর সম্পূর্ণ নিথর হয়ে গেল।

কিন্তু এই অতিরিক্ত ৫ সেকেন্ড সময় নেওয়ার খেসারত রেহানকে দিতে হলো। বডিগার্ডদের একজন অন্ধকারে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে কারোর নেমে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেল।

"কে ওখানে? দাঁড়াও!" বলে বডিগার্ডটি অন্ধকারের দিকে লক্ষ্য করে দুটি গুলি ছুড়ল। একটি গুলি রেহানের বাঁ কাঁধ ঘেঁষে চলে গেল, তার টি-শার্টের কাপড় ছিঁড়ে রক্ত বের হতে লাগল। রেহান কোনোমতে বাইকে উঠে স্টার্ট দিলেন।

পরদিন সকালে পুরো কক্সবাজারে তোলপাড়। জাহিদ শিকদারের রহস্যময় মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু এবার আর গল্পটি সহজে শেষ হলো না।

তদন্তের দায়িত্বে এলেন ইন্সপেক্টর নিয়াজ মোর্শেদ। নিয়াজ জাহিদের মৃত্যুর চেয়েও বেশি চিন্তিত নিজের ক্যারিয়ার আর জাহিদের থেকে পাওয়া নিয়মিত টাকার সোর্স বন্ধ হওয়া নিয়ে। সে ঘটনাস্থল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। বডিগার্ডের জবানবন্দি থেকে সে জানল—কেউ একজন পাহাড়ের দিকে পালিয়েছিল।

পাহাড়ের ঢালে নিয়াজ পেয়ে গেল একটি অমূল্য ক্লু: টি-শার্টের ছেঁড়া অংশ, যাতে লেগে আছে টাটকা রক্ত, আর মাটিতে পড়ে থাকা একটি ছোট প্লাস্টিক ক্যাপসুলের ভাঙা অংশ।

নিয়াজ প্লাস্টিক ক্যাপসুলটি নিয়ে স্থানীয় ল্যাবে গেল। রিপোর্টে বের হলো—এটি সাধারণ কোনো প্লাস্টিক নয়, এটি একটি ল্যাবরেটরি-গ্রেড পলিমার, যা মূলত জটিল রাসায়নিক যৌগ সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়।

নিয়াজ চোখ সরু করল। "কোনো প্রফেশনাল কিলার বা মাফিয়া এভাবে কেমিক্যাল ব্যবহার করে না। এটা কোনো সাইন্টিস্ট বা কেমিস্টের কাজ।"

নিয়াজ কক্সবাজার এবং চকরিয়া এলাকার সমস্ত কেমিক্যাল সাপ্লাই দোকান এবং ল্যাবরেটরিগুলোতে খোঁজ নিতে শুরু করল। চকরিয়ার সেই পরিত্যক্ত গুদামের সন্ধান পেতে নিয়াজের মাত্র তিন দিন সময় লাগল। যখন নিয়াজ সেখানে পৌঁছাল, রেহান তখন তার ল্যাব গোছাচ্ছিলেন।

দরজায় নিয়াজকে দেখে ৪৪ বছর বয়সী নিভৃতচারী প্রফেসর বিন্দুমাত্র চমকালেন না। তিনি জানতেন, জাহিদ শিকদারের মতো মানুষের মৃত্যুর পর পুলিশ এত সহজে ফাইল বন্ধ করবে না।

"প্রফেসর রেহান আশরাফ?" নিয়াজ রিভলবারে হাত রেখে ঘরে ঢুকল। "আপনার কাঁধের ক্ষতটা কিসের?"

রেহান শান্ত গলায় বললেন, "কটেজের ভাঙা টিনে লেগে কেটে গেছে, ইন্সপেক্টর।"

"ইনানীর পাহাড়ে জাহিদ শিকদারের মার্সিডিজের পাশে যে পলিমার ক্যাপসুল পাওয়া গেছে, সেটার সাথে আপনার এই গুদামের কেমিক্যালের মিল আছে। আর ওই কাপড়ের রক্তের সাথে আপনার ডিএনএ ম্যাচ করতে আমার মাত্র ২৪ ঘণ্টা লাগবে।" নিয়াজ হাসল। "আপনি ভাবলেন এত বড় একটা খুন করে পার পেয়ে যাবেন?"

রেহান ডায়েরিটা টেবিলের ওপর রাখলেন। তার চোখে কোনো ভয় নেই, বরং সেই চিরচেনা ঠান্ডা চাহনী।

"আপনি ভুল করছেন ইন্সপেক্টর নিয়াজ," রেহান বললেন। "আমি পার পাওয়ার জন্য খুনটা করিনি। আমি জাস্টিসের জন্য করেছি। আর আমি জানি, আপনি জাহিদ শিকদারের অবৈধ সিন্ডিকেটের ৩০% পার্টনার ছিলেন।"

নিয়াজ স্তব্ধ হয়ে গেল। "কী আবোলতাবোল বকছেন!"

রেহান টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটি পেনড্রাইভ বের করলেন। "গত চার মাস ধরে আমি শুধু জাহিদের রুটিন স্টাডি করিনি, ইন্সপেক্টর। আমি তার সমস্ত কল রেকর্ড, ব্যাংকিং ট্রানজেকশন এবং আপনার সাথে তার কথোপকথনের অডিও ফাইলও জোগাড় করেছি। কেমিস্ট্রির পাশাপাশি ডেটা অ্যানালাইসিসও আমার বেশ পছন্দ।"

রেহান পেনড্রাইভটি নিয়াজের দিকে এগিয়ে দিলেন। "এই ড্রাইভে জাহিদের সাথে আপনার সমস্ত চুরির প্রমাণ আছে। জাহিদ মারা গেছে, তার ফাইল এখন বন্ধ। কিন্তু আপনি যদি এই ফাইল আবার খোলেন, তবে এই ডেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং আইজিপি কমপ্লেইন সেলে চলে যাবে। আমি আপনার রক্ত বা ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট ল্যাব থেকে গায়েব করার জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় দিচ্ছি।"

নিয়াজ মোর্শেদের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে লাগল। সে বুঝতে পারল, এই প্রফেসরের শান্ত চেহারার আড়ালে এক ভয়ংকর শতরঞ্জি খেলোয়াড় বসে আছে। সে প্রতিটি কাউন্টার-মুভ আগে থেকেই হিসাব করে রেখেছে।

নিয়াজ পেনড্রাইভটি পকেটে পুরল। "পোস্টমর্টেম রিপোর্টে হার্ট অ্যাটাকই লেখা থাকবে, প্রফেসর। তবে কক্সবাজারে আপনার আর না থাকাই ভালো।"

"আমি আজ রাতের বাসেই ঢাকা ফিরছি," রেহান চশমাটা ঠিক করতে করতে বললেন।

পরদিন সকালে ঢাকার বাসে বসে রেহান জানালার বাইরে তাকালেন। তিনি জানেন, তিনি জিতে গেছেন, কিন্তু এই জয়ের পর তার নিভৃত জীবন আর আগের মতো থাকবে না। নিয়াজ মোর্শেদ হয়তো সাময়িকভাবে দমে গেছে, কিন্তু সে আজীবন এই ব্ল্যাকমেইলের প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ খুঁজবে। প্রফেসর রেহান আশরাফকে এখন জীবনের প্রতিটি সেকেন্ডে, প্রতিটি পদক্ষেপে সতর্ক থাকতে হবে। যুদ্ধটা শেষ হয়নি, কেবল এর রূপ বদলে গেছে।

মন্তব্য ২ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ০৬ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:২৬

রাজীব নুর বলেছেন: সুন্দর লেখা।
রহস্য আছে। রোমাঞ্চ আছে। কিছুটা থ্রিলারও আছে।

০৬ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩২

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ আপনার সুন্দর মন্তব্যের জন্য।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.