| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু
লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।
কুর্মিটোলায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এয়ার ডিফেন্স কমান্ড সেন্টার। চব্বিশ ঘণ্টা সতর্ক থাকতে হয় এই আধুনিক কন্ট্রোল রুমে। রাত তখন ২টা ৪৭ মিনিট।
হঠাৎ করেই দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে সেন্টমার্টিনের আকাশসীমায় এমার্জেন্সি অ্যালার্ম বেজে উঠল। বিশাল থ্রিডি নজরদারি মনিটরে একটি অপরিচিত 'ব্লিপ' ফুটে উঠেছে।
"স্কোয়াড্রন লিডার রাজীব স্যার!" ডিউটি অফিসার চিৎকার করে উঠল। "সেন্টমার্টিন দ্বীপের ১০ মাইল পশ্চিমে আমাদের এয়ারস্পেসে একটা আন-আইডেন্টিফাইড অবজেক্ট ঢুকে পড়েছে! কোনো সিভিল বা মিলিটারি আইএফএফ কোড ম্যাচ করছে না!"
স্কোয়াড্রন লিডার রাজীব কফির কাপটা টেবিলে রেখে দ্রুত স্পেকট্রাম অ্যানালাইজার মনিটরের দিকে এগিয়ে এলেন। রাজীব বিমানবাহিনীর অন্যতম চৌকস পাইলট এবং বিএএফ ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার অ্যান্ড ইন্টারসেপ্টর স্কোয়াড্রনের প্রধান।
"গতি কত?" রাজীবের গলা থমথমে।
"স্যার, মাত্র ১৮০ থেকে ২০০ নট! অত্যন্ত কম উচ্চতায় উড়ছে—মাত্র চার হাজার ফুট উপরে। কোনো আধুনিক জেট ইঞ্জিনের রাডার ক্রস-সেকশন এটি নয়। মনে হচ্ছে কোনো পিস্টন-ইঞ্জিনের প্রোপেলার বিমান!"
"কোনো প্রাইভেট প্লেন বা স্মাগলার?" রাজীব চিন্তা করলেন। কিন্তু ঠিক তখনই বিমানটির রাডার ইকোতে অদ্ভুত একটা ডিস্তোরশন দেখা গেল। হারিয়ে যাওয়ার ঠিক আগে বিমানটি অত্যন্ত দুর্বল একটি অ্যানালগ ভিএইচএফ ফ্রিকোয়েন্সিতে মোরস কোড পাল্স ছেড়েছিল—'V-V-V... S-O-S... CLIPPER-1942'।
রাজীব জহুরুল হক এয়ারবেস থেকে দুটি ইন্টারসেপ্টর জেট স্ক্যাম্বল করার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু জেটগুলো সেন্টমার্টিনের আকাশে পৌঁছানোর আগেই, বঙ্গোপসাগরের ঘন কুয়াশার ভেতরে লাল বিন্দুটি হঠাৎ করেই রাডার থেকে চিরতরে গায়েব হয়ে গেল।
ঘটনাটিকে ইলেকট্রনিক কোনো গ্লিচ ভেবে উড়িয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু রাজীব শান্ত হয়ে বসে এয়ার সার্ভেইল্যান্স ডেটা বিশ্লেষণ করতে লাগলেন।
তিনি বুঝলেন, সাধারণ নথিতে এই ট্রেইল মিলবে না। রাজীব সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ করলেন ডিজিএফআই-এর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স আর্কাইভস এবং ঢাকায় অবস্থিত ব্রিটিশ হাই কমিশনের ডিফেন্স অ্যাটাশের সাথে। যুক্তরাজ্য সরকারের ডিজিটাল এয়ার-ক্র্যাশ ডিরেক্টরির বিশেষ অ্যাক্সেস পাওয়ার অনুমতি পেতে তিন ঘণ্টা ধরে কূটনৈতিক এবং ইন্টেলিজেন্স ক্লিয়ারেন্সের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হলো।
অবশেষে ইমার্জেন্সি প্রোটোকলে ডিক্ল্যাসিফাইড ফাইলটি রাজীবের টার্মিনালে আনলক হলো।
ঘটনা: ১৯৪২ সাল (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ)।
কক্সবাজারের চকরিয়ার এক দুর্গম পাহাড়ি বনের ভেতরে ব্রিটিশ এয়ারফোর্সের একটি গোপন এয়ারফিল্ড ছিল। তৎকালীন বার্মা ফ্রন্টে জাপানি সেনাদের ওপর নজরদারি চালানোর জন্য সেখান থেকে উড্ডয়ন করত 'হরিকেল স্কোয়াড্রন'।
১৯৪২ সালের ১লা অক্টোবর। রাত ৩টা ১৫ মিনিটে সেই গোপন এয়ারফিল্ড থেকে চারজন ক্রু ও এক গোপন ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে নিয়ে আকাশে উড়েছিল একটি 'ডগলাস সি-৪৭ স্কাইট্রেন' মেটেরিয়াল অ্যান্ড কমিউনিকেশন প্লেন। গন্তব্য ছিল বার্মার ম্যান্ডালে। বিমানটির কোড ছিল—'সি-৪৭ সাইলেন্ট নাইট'।
কিন্তু সেন্টমার্টিন দ্বীপ পার হওয়ার ঠিক পাঁচ মিনিট পরেই একটি রহস্যময় ঘন কালচে মেঘের কুয়াশার ভেতরে বিমানটি নিখোঁজ হয়ে যায়। ৮৪ বছর ধরে সরকারি খাতায় ওটাকে 'লস্ট ইন অ্যাকশন' বলে ফাইল বন্ধ রাখা হয়েছিল।
মিশনের ডিক্ল্যাসিফাইড বিবরণীতে দেখা গেল—বিমানে কোনো সোনা বা ধনসম্পদ ছিল না। ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল কিছু জিনিস: ব্রিটিশ রাজপরিবারের একটি সিলগালাকৃত চিঠি, অক্ষত 'এনিগমা' কোডবুক, জাপানি অবস্থানের কিছু অতি-গোপন স্ট্র্যাটেজিক ম্যাপ এবং সামান্য কিছু মেডেল ও কূটনৈতিক দলিল।
রাজীব আধুনিক রাডার ট্র্যাকিং প্রিন্টআউট আর ১৯৪২ সালের রয়্যাল এয়ারফোর্সের ফাইল পাশাপাশি রাখলেন। দুটো পয়েন্ট একেবারে ১০০% হুবহু এক!
রাজীবের নির্দেশে নৌবাহিনীর একটি হাই-টেক হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে ভেসেল সেন্টমার্টিন থেকে তিন মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান নিল। রাজীবের সাথে ছিলেন নৌবাহিনীর স্পেশাল ডাইভিং টিমের প্রধান কমান্ড্যান্ট সাকিব।
পানির ১৮০ ফুট গভীরে একটি বিশেষ ড্রোন নামানো হলো। ড্রোনের হাই-রেজোলিউশন সোনার স্ক্যানারে ফুটে উঠল একটি ডগলাস সি-৪৭ বিমানের কঙ্কাল। প্রবাল আর শেওলায় ঢেকে আছে চারপাশ, তবে ডানদিকের পাখায় রয়্যাল এয়ারফোর্সের প্রতীক এখনো অস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
"রাজীব, ড্রোন দিয়ে স্ক্যান করে দেখো," সাকিব মনিটর দেখাচ্ছিল। "বিমানের মূল ফিউসেলেজের ওপর নতুন একটা মেটালিক স্ট্রাকচার বসানো।"
ড্রোনের ক্যামেরা জুম করতেই রাজীবের প্রখর চোখ জিনিসটি চিনে ফেলল। ওটা কোনো সাধারণ বা সস্তা জিপিএস নয়। ওটা একটি অ্যাকোস্টিক ট্রান্সপন্ডার উইথ সোনার রিফ্লেক্টর —যা সাগরের তলদেশে নিখুঁত পিন-পয়েন্ট লোকেশন ট্র্যাক করার জন্য ব্যবহার করে গভীর সমুদ্রের পেশাদার ট্রেজার হান্টাররা।
"তাহলে রাডারের সেই ভূতুরে বিমান?" সাকিব প্রশ্ন করল।
"আজ রাতে কোনো প্রেতাত্মা উরেনি," রাজীব চটজলদি ল্যাপটপ অন করলেন। "অপরাধীরা একটি স্টিলথ টাইপের ছোট ড্রোন উড়িয়েছিল। আর সাথে ব্যবহার করেছিল ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম—'ফ্রিকোয়েন্সি স্পুফিং জ্যামার'। তারা কৃত্রিমভাবে বাতাসে এমন একটি রাডার সাইড-ব্যান্ড তৈরি করেছিল, যাতে আমাদের ফিল্ড রাডার ওটাকে ১৯৪২ সালের পিস্টন-ইঞ্জিন সি-৪৭ বলে ভুল চিহ্নিত করে।"
"উদ্দেশ্য?"
"ডাইভার্সন!" রাজীব উচ্চস্বরে বললেন। "ওরা জানত, এই অদ্ভুত সিগন্যাল দেখলে আমাদের বিমানবাহিনী আকাশে ড্রোন খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। আর সেই সুযোগে তারা নিচে থেকে ৮৪ বছরের পুরোনো ওই গোপন ক্লাসিফাইড উইং থেকে মূল কাস্কেটটা তুলে নিয়ে পালিয়ে যাবে!"
ঠিক তখনই সাগরের নিচে থাকা ড্রোনের ভিডিও ফিডে হঠাৎ প্রচণ্ড ঝাঁকুনি হলো!
"কী হলো?" সাকিব চিৎকার করে উঠল।
স্ক্রিনে দেখা গেল, পানির গভীর অন্ধকারে একটি বিশালাকার কমার্শিয়াল ডাইভিং রোবট সাগরের তলদেশে বিমানে আটকে থাকা সেই সিক্রেট মেটাল বাক্সটি কেটে বের করে আনছে। আর তারা তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে নৌবাহিনীর আর ও ভি ড্রোনের ক্যামেরাটিতে ক্যাবল কাটার দিয়ে সজোড়ে আঘাত করেছে!
ড্রোন ফিড একলহমায় ব্ল্যাকআউট হয়ে গেল!
"ওরা মেটাল কাস্কেটটা নিয়ে ওপরে উঠছে! ওদের ডাইভিং বোটটা চার কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে!" সোনাবুলস ট্র্যাকার দেখে চিৎকার করল সোনার অপারেটর।
রাজীব এক সেকেন্ড সময় নষ্ট করলেন না। "সাকিব, সোয়াত আর নেভি সিল টিম নিয়ে মুভ করো! এখনই!"
ঘোর অমাবস্যার রাতে উত্তাল সমুদ্রে গর্জে উঠল নৌবাহিনীর দুটি হাই-স্পিড গানবোট।
সেন্টমার্টিনের প্রবাল প্রাচীরের আড়ালে নোঙর করে রাখা একটি কালো রঙের আধুনিক রিসার্চ ভেসেল তখন দ্রুত ইঞ্জিনের স্পিড বাড়াচ্ছিল। কিন্তু রাজীবদের গানবোট ততক্ষণে তাদের ঘেরাও করে ফেলেছে।
অপরাধী দলটি জলদস্যু বা সাধারণ কোনো চোর ছিল না—তারা ছিল আন্তর্জাতিক এক ব্ল্যাক-মার্কেট সিন্ডিকেটের সশস্ত্র সদস্য। তারা গানবোট লক্ষ্য করে আধুনিক অটোমেটিক ওয়েপন দিয়ে গুলি ছুড়তে শুরু করল।
সমুদ্রের বুক চিরে গুলির লড়াই শুরু হলো। কিন্তু রাজীবের পূর্ব-পরিকল্পনা ছিল আরও চতুর। তিনি আগেই আকাশ থেকে কোস্টগার্ডের হেলিকপ্টার ডেকে রেখেছিলেন। হেলিকপ্টারের সার্চলাইটের তীব্র আলো সরাসরি এসে পড়ল চোরদের জাহাজের ডেকে।
নৌবাহিনীর স্পেশাল সিডিএ টিমের ডাইভাররা জলযানটির পেছনে উঠে সরাসরি কেবিনে চড়াও হলো। সংক্ষিপ্ত কিন্তু মুখোমুখি এক কঠিন কমব্যাট ফাইটের পর জাহাজের ছদ্মবেশী ৬ জন আন্তর্জাতিক পাচারকারীকে নিস্তেজ করে মেঝেতে ফেলে দেওয়া হলো।
পরদিন সকালে কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে সুরক্ষিত অবস্থায় আনা হলো সেই ধাতব বাক্সটি।
যুক্তরাজ্য দূতাবাস এবং সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের যৌথ তদারকিতে বিশেষ কাস্কেটটি খোলা হলো। ভেতরে পাওয়া গেল ১৯৪২ সালের ঐতিহাসিক এনিগমা কোডবুক, কিছু বিরল ফোটোগ্রাফিক প্রুফ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের তৎকালীন অতি-গোপন সামরিক মানচিত্র। সংগ্রাহকদের কাছে এর ঐতিহাসিক মূল্য কোটি কোটি টাকা, কিন্তু সত্যের খাতিরে এর মূল্য ছিল অসীম।
পাহাড় ও সাগরের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাওয়া ইতিহাস আজ মুক্ত।
সংবাদ সম্মেলনে স্কোয়াড্রন লিডার রাজীব সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গম্ভীর মুখে বললেন—
"অপরাধীরা ভেবেছিল আধুনিক প্রযুক্তি এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিং দিয়ে আমাদের চোখে ধুলো দেবে। তারা ভেবেছিল ইতিহাসকে তারা নিজেদের স্বার্থে বিক্রি করে দেবে। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল—আকাশে কিংবা সমুদ্রের তলদেশে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং সত্য রক্ষার দায়িত্বে থাকা চোখগুলো কখনো ঘুমায় না।"
কক্সবাজারের সমুদ্রসীমার ওপর বিকেলের নরম রোদ এসে পড়েছে। ৮৪ বছর পর 'সি-৪৭ সাইলেন্ট নাইট'-এর সেই বৈমানিকদের আত্মা হয়তো আজ শান্ত হলো, আর আধুনিক বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ডায়েরিতে যুক্ত হলো আরেকটা সফল, নিখুঁত মিলিটারী ইনভেস্টিগেশনের অধ্যায়।
©somewhere in net ltd.