| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু
লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।

ঘরটি অন্ধকারাচ্ছন্ন। ক্ষণে ক্ষণে জানালার ওপাশ থেকে আসা দূরপথের সোডিয়াম বাতির একচিলতে আলো এসে পড়ছে ঘরের ভারী বাতাসের ওপর। ঘামের তীব্র গন্ধ আর উন্মুক্ত ত্বকের উত্তাপ ঘরের পরিবেশকে ভারী করে তুলেছে। বিছানায় একজন নারী ও পুরুষ নিবিড় শারীরিক মিলনে মগ্ন। অন্ধকার আর আবছা আলোর খেলায় তাদের চেহারা স্পষ্ট বোঝা যায় না; কেবল শোনা যাচ্ছে তাদের দ্রুত থেকে দ্রুততর হওয়া শ্বাস-প্রশ্বাসের ওঠানামা আর তীব্র যৌন শীৎকারের শব্দ।
উন্মাদনার এই চরম মুহূর্তে যুগলটি ঘূর্ণাক্ষরেও টের পায়নি যে, জানালার ভারী পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরের নিকষ আঁধারে একটি স্মার্টফোনের ক্যামেরা নীরবে নিভে আর জ্বলে উঠছে। খুব গোপনে, নিখুঁত অ্যাঙ্গেলে ধারন করা হচ্ছে তাদের প্রতিটি গোপন মুভমেন্ট। জানালার ওপাশে থাকা লোকটির মুখে এক চিলতে ক্রূর ও হিংস্র হাসির ঝিলিক। তার কাছে এই ভিডিওটি স্রেফ কোনো কামনার উপাদান নয়, এটি একটি নিখুঁত হাতিয়ার—যা দিয়ে ছিনিমিনি খেলা যাবে আরেকটা মানুষের জীবন নিয়ে।
পরের দৃশ্যটি একেবারেই ভিন্ন এবং নির্মম।
মানিকগঞ্জ নগরের বেগুনবাড়ী এলাকার স্লুইসগেটের পানিতে একটি বড় নীল রঙের চালের ড্রাম ভাসতে দেখে কৌতূহলী হয়ে উঠেছিল স্থানীয় কিছু পথচারী। ভেসে আসা সেই ড্রামটি থেকে বের হওয়া বিদঘুটে গন্ধে সন্দেহ দানা বাঁধে। খবর পেয়ে পুলিশ এসে ড্রামের ঢাকনা খুলতেই শিউরে ওঠে সবাই। চটের বস্তায় মোড়ানো, চটচটে রক্তে রঞ্জিত একটি মরদেহ। মাথা ও শরীরে ধারালো অস্ত্রের নির্মম কোপ, মুখে কাপড় গুঁজে দেওয়া।
লাশটির চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় প্রাথমিক অবস্থায় চেনার কোনো উপায় ছিল না। তবে ভাগ্যিস, নিহত ব্যক্তির প্যান্টের ভেতরের পকেটে পাওয়া গেল একটি ভেজা, আধা-নষ্ট টোকেন—‘মানিকগঞ্জ হিন্দু কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেড’।
ঘটনাটির ভয়াবহতা ও ক্লুলেস অবস্থা বিবেচনা করে ছায়াতদন্তে নামে পিবিআই-এর (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) স্পেশাল সেল। বরাবরের মতোই কেসটির হাল ধরেছে ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান এবং তার দল।
হোয়াইটবোর্ডে ড্রামের ছবি আর উদ্ধার হওয়া কুপিয়ে বিকৃত করা লাশের ছবি টাঙিয়ে আরিয়ান পায়চারি করছিল। পাশে বসে ডাটা অ্যানালাইসিস করছিল শাফিন।
"স্যার, নিহতের পরিচয় কনফার্ম হওয়া গেছে," শাফিন টোকেনের সুত্র ধরে বের করা নথি বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "উনার নাম সঞ্জয় ধর। বয়স ৫৪। স্টেডিয়াম এলাকায় পরিবার নিয়ে থাকতেন। পেশায় সোনার দোকানের কারিগর, তবে সাইড বিজনেসে ৪টি অটোরিকশার মালিক ছিলেন। খাগডহর এলাকার একটি গ্যারেজে গাড়িগুলো রাখা হতো।"
আরিয়ান বোর্ডের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, "লাশের আঘাতের ধরন আর মুখে কাপড় গোঁজার কৌশল স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—খুনটা প্রফেশনাল কোনো হিটম্যানের কাজ নয়। এটা চরম ক্ষোভ, ভয় এবং ব্যক্তিগত প্রতিশোধের ফসল। খুনি পরিচিত এবং খুব কাছের কেউ, যে নিরঞ্জনের প্রতি প্রচণ্ড বিষিয়ে উঠেছিল। শাফিন, সঞ্জয় এর অটোরিকশার গ্যারেজ আর তার সাম্প্রতিক আর্থিক লেনদেনের হিসেব বের করো।"
তদন্তের চাকা দ্রুত ঘুরতে শুরু করল। আরিয়ানের নির্দেশমতো টিম অনুসন্ধান চালিয়ে জানতে পারল, গ্যারেজের ম্যানেজার করিম নামের এক যুবকের সাথে সঞ্জয় এর ওঠাবসা ছিল বেশ গভীর। গলগণ্ডা এলাকায় একা একটা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকত করিম। করিমের পরিবার প্রায়ই গ্রামে থাকত, আর সেই সুযোগে নিজের যৌন লালসা মেটাতে করিম তার ভাড়া বাসায় গোপনে নানা নারীকে নিয়ে আসত।
তবে আরিয়ান কেবল তথ্যে আটকে থাকল না। সে নিজে গিয়ে হাজির হলো করিমের ছায়াঘেরা সেই ভাড়া বাসায়। ফরেনসিক গ্লাভস হাতে নিয়ে পুরো ঘর স্ক্যান করতে গিয়ে আরিয়ানের চোখ আটকে গেল জানালার গ্রিলের ভেতরের কোণের একটা সূক্ষ্ম স্ক্র্যাচ মার্কের ওপর।
"শাফিন," আরিয়ান জানালার বাইরে ইশারা করে বলল, "ঘরে যখন আলো কম থাকে, তখন বাইরের এই কোণ থেকে ভেতরের বিছানার দৃশ্য সবচেয়ে পরিষ্কার দেখা যায়। এখানে কেউ নিয়মিত দাঁড়িয়ে থাকত।"
শাফিনের চোখ ছানাবড়া, "তার মানে, করিমের গোপন অভিসারের খবর সঞ্জয় জানত?"
"শুধু জানত না, শাফিন," আরিয়ান ঠাণ্ডা মাথায় কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল, "ঘটনার রাতে যে ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছিল, তা দিয়ে করিমকে প্রতিনিয়ত ব্ল্যাকমেইল করছিল সঞ্জয়। করিমের নৈতিক দুর্বলতা ও সামাজিক লজ্জাকে জিম্মি করে ধাপে ধাপে প্রায় দুই লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল সে। কিন্তু শোষণেরও একটা সীমা থাকে। ব্ল্যাকমেইলার যখন তার শিকারকে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেয়, তখন ভীরু শিকারও হিংস্র পশুর মতো পাল্টা থাবা বসায়।"
ডিজিটাল ট্র্যাকিং আর কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) অ্যানালাইসিস করে শাফিন দ্রুত করিমের অবস্থান সনাক্ত করল। খুনের পর থেকে করিমের ফোন বন্ধ, তবে সে আত্মগোপনে গেছে রংপুরে, তার শ্যালকের বাসায়।
শনিবার গভীর রাত সাড়ে ১২টা। রংপুরের এক নিঃশব্দ গলির ভেতর পিবিআই-এর টিম ঘিরে ফেলল করিমের গোপন আস্তানা। কোনো প্রকার হট্টগোল ছাড়াই নিঃশব্দে ছাদের কোণের ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে আরিয়ানের দল।
বিছানা থেকে আঁতকে উঠে দাঁড়ায় করিম। তার চোখেমুখে তখন ধরা পড়ার তীব্র আতঙ্ক।
জিজ্ঞাসাবাদে আরিয়ানের শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে ভেঙে পড়ে করিম। স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বীকার করে সেই কালরাতের বীভৎস কাহিনী।
"গত ২১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সঞ্জয় আবার আমার ঘরে আসে, স্যার," করিম কাঁপতে কাঁপতে বলে, "ভিডিওটার কথা বলে আবার নতুন করে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করে। বলে, টাকা না দিলে ভিডিওটা আমার স্ত্রী, পরিবার আর গ্রামের মানুষের কাছে পাঠায় দেবে। আমি ওর পায়ে ধরে মিনতি করেছিলাম, কিন্তু লোকটার মনে দয়া ছিল না। মেজাজ সামলাতে পারিনি স্যার... ঘরে থাকা ভারী মশলা পেষার শিলটা দিয়ে ওর মাথায় সজোরে আঘাত করি। ও মাটিতে পড়ে গেলে চিৎকার বন্ধ করতে মুখে কাপড় গুঁজে দিই, তারপর বঁটি দিয়ে..."
করিমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পরদিন সকালে মানিকগঞ্জের সেই ভাড়া বাসা থেকে পিবিআই উদ্ধার করে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা শিল ও বঁটি। উদ্ধার করা হয় সেই নীল ড্রামটি সরানোর কাজে ব্যবহৃত ইজিবাইকটিকেও, যা দিয়ে করিম ‘বাসার মালামাল সরানোর’ নাম করে সঞ্জয়ের চটের বস্তাবন্দী লাশ স্লুইসগেটের পানিতে ফেলে এসেছিল।
রোববার সকালে পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে যখন পুলিশ সুপার পুরো তদন্তের বিস্তারিত তুলে ধরছিলেন, তখন আরিয়ান দূর থেকে আদালতের গাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়া করিমের দিকে তাকিয়ে ছিল।
শাফিন এগিয়ে এসে বলল, "ব্লেড দিয়ে অন্যের গোপন জীবন কেটে টাকা আয় করতে চেয়েছিল নিরঞ্জন, কিন্তু জানত না সেই ব্লেডেই একদিন নিজের গলা কাটবে।"
আরিয়ান ছাদের দিকে চোখ তুলে মৃদুস্বরে বলল, "মানুষের কামনার অন্ধকার ভিডিও ব্ল্যাকমেইলের অস্ত্র হতে পারে শাফিন, কিন্তু অপরাধ লুকিয়ে রাখার কোনো পর্দা আজও তৈরি হয়নি। অপরাধের সুতো যত সূক্ষ্মই হোক, আইনের চোখে তা ধরা পড়বেই।"
©somewhere in net ltd.