নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

অদ্ভুত ছেলেটি

মেহেদী আনোয়ার

জানিনা

মেহেদী আনোয়ার › বিস্তারিত পোস্টঃ

৭১ পরবর্তি বাংলাদেশ ( পর্ব ০৭ )

৩১ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:৫৬


মুক্তিযুদ্ধ শেষ, মুক্তিযোদ্ধারা ঘরে ফিরতে শুরু করেছে। তারা কেউ হারিয়েছে স্বজন, কারো কারো বসতভিটা ভস্মীভূত, সহযোদ্ধারা কেউ শহিদ, কেউবা পঙ্গু। কেউ গিয়েছিল কলেজের বই-খাতা ফেলে, কেউ গিয়েছিল তার জমিজমা, কৃষিকাজ ফেলে, শ্রমিক গিয়েছিল কারখানার কাজ ফেলে, উদ্দীপ্ত যুবক গিয়েছিল তার জীবন-জীবিকার চিন্তা ভুলে। এখন দেশ স্বাধীন, হাতে অস্ত্র। কী করবে তারা? ফিরে যাবে আগের কাজে? এই মুক্তিযোদ্ধাদের কীভাবে নতুন দেশ গড়ার কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে ভাবনা শুরু হয়।

তাজউদ্দীন আহমদ চেয়েছিলেন 'মুক্তিবাহিনী'র সবাইকে 'ন্যাশনাল মিলিশিয়াতে অন্তর্ভুক্ত করবেন। অবলুপ্ত ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল্স্ বা ইপিআরের সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত হবে জাতীয় মিলিশিয়া বাহিনী। তাদের দু'টি মুখ্য দায়িত্ব হবে সীমান্ত পাহারা দেয়া এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ বাহিনীকে সহায়তা করা। ইপিআরের বেশির ভাগ সদস্য সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বীরবিক্রমে লড়াই করেছেন।
মিলিশিয়া গঠনের যে পরিকল্পনা তাজউদ্দীনের মাথায় ছিল, তা একেবারে ভিন্ন। তিনি ভেবেছিলেন, তালিকাভুক্ত ও তালিকা বহির্ভূত সকল মুক্তিযোদ্ধা সারা দেশের নির্দিষ্ট ক্যাম্পে এসে নিজেদের নিবন্ধনশেষে অস্ত্র জমা দেবেন। পরে সেই অস্ত্র পুনর্বণ্টন করা হবে। এই মিলিশিয়াদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেয়া হবে। বিশাল আকারের সেনাবাহিনী গড়ে না তুলে সেনাবাহিনীকে “মিলিশিয়া বাহিনী'র সঙ্গে সমন্বিত করে দেয়া হবে।


১৯৭২-এর ২ জানুয়ারি তাজউদ্দীন আহমদকে চেয়ারম্যান করে ১১ সদস্যের একটি জাতীয় মিলিশিয়া বোর্ড গঠন করা হয়। মওলানা ভাসানী, মণি সিংহ এবং মোজাফ্ফর আহমেদ সেই বোর্ডের সদস্য ছিলেন। সরকার মিলিশিয়া বাহিনী গঠনের কাজও শুরু করে। ১০-১৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে এই বাহিনীতে নেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শনকারীদের সেনাবাহিনীতে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু জেনারেল ওসমানী এই সব মুক্তিযোদ্ধাকে দুর্বল প্রশিক্ষণের কারণে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করেন। ছাত্র-মুক্তিযোদ্ধাদের বৃহৎ অংশ আবার পড়াশোনায় ফিরে যায়। "নিয়মিত বাহিনীর বাইরে 'মুক্তিবাহিনী' হিসেবে ট্রেনিং দেয়া হয়েছিল ৮৪ হাজার জনকে; 'মুজিববাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল আরো ১০ হাজার। 


'৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পর '৭২-এর প্রথমদিকে ঢাকা স্টেডিয়ামে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠান-এর আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন এই অনুষ্ঠানসর্বস্ব সমর্পিত অস্ত্র গ্রহণ করেছিলেন অল্প কিছুসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে।
কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সেদিনের অস্ত্রে সমর্পণকারী মুক্তিযোদ্ধাসহ সারা দেশে বৃহদাংশ মুক্তিযোদ্ধা এবং আদৌ মুক্তিযোদ্ধা নয়, কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে একেবারেই সম্পর্কবিহীন অম্লধারী 'মুক্তিযোদ্ধা' নামধারী তরুণ-যুবকরা তাদেরহাতে এক থেকে একাধিক কিংবা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাগুলি জমা করে রেখেছিল। দলীয় ও গোষ্ঠীগত অন্তর্দ্বন্দ্ব অথবা পারিবারিক ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব এবং আধিপত্য আর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দীর্ঘস্থায়ী ভয়ঙ্কর তৎপরতা ও তাণ্ডবলীলায় সে সব আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র ও গোলাগুলির অপব্যবহার হয়েছিল।স্বাধীন দেশে মুজিব সরকার এই লোক দেখানো সমর্পিত যুদ্ধাস্ত্র গ্রহণ করে কতটা তৃপ্তি আর স্বস্তিবোধ করেছিল তার চেয়ে বড় কথা, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী এবং তাদের আশীর্বাদপুষ্ট লোকজন তাদের হাতে-ভাণ্ডারে মজুত সেই সব যুদ্ধারে গড়ে তুলেছিল বহুসংখ্যক 'প্রাইভেট বাহিনী'। '৭৫-এর ১৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত এসব 'প্রাইভেট বাহিনী'র তৎপরতা অব্যাহত ছিল।সেই সাথে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি এবং বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন গ্রুপ ও ব্যক্তিবিশেষের হাতেও ছিল এসব যুদ্ধাস্ত্রে। আর ছিল তাদের অপ্রতিহত তৎপরতা।

ইউনিয়ন, ন্যাপ, সিপিবির ট্রেনিং নেয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিল ১৯ হাজার। এদের প্রায় সবাইকে অস্ত্র দেয়া হয়েছিল। ভারতীয় বাহিনীর সূত্র অনুসারে, নিয়মিত বাহিনী বাদেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায় দেড় লাখ হাতিয়ার দেয়া হয়েছিল, যদিও তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যুদ্ধের সময় নিষ্ক্রিয়ই থাকে।প্রশিক্ষণের জন্য মুক্তিযোদ্ধা বাছাইয়ের শর্তকে, যেমন শারীরিক যোগ্যতা, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সংগ্রামী স্পৃহাকে শিথিলভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনীতির সুবিধার জন্য আওয়ামী লীগের নেতারা নিজ এলাকার ছেলেদের মুক্তিবাহিনীতে ঢোকানোর অতিরিক্ত আগ্রহ দেখাতেন। এই কারণেই মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের প্রাক্কালে এদের বড় অংশই লড়াই থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকে। তারা দুঃখজনকভাবে ব্যক্তিগত রেষারেষি নিষ্পত্তিতে, এমনকি সরাসরি লুটতরাজে অংশগ্রহণ করে।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর দায়িত্বে পরিচালিত মুক্তিবাহিনীর সামরিক প্রশিক্ষণের মেয়াদ ছিল চার সপ্তাহ। এই স্বল্প সময়ে মাত্র হাল্কা অস্ত্র ও বিস্ফোরক ব্যবহার শেখানো সম্ভব হতো। সামরিক প্রশিক্ষণ মে মাসের শেষদিকে আরম্ভ হয়।* বাছাই করা যুবকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। দেরাদুনে সিগন্যাল এবং আসাম ও নাগাল্যান্ডে কমান্ডো ট্রেনিং দেয়া হয়। নৌ ও বিমান সৈনিকদের জন্যও প্রশিক্ষণের পৃথক ব্যবস্থা ছিল। এ প্রসঙ্গে সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিক-উল-ইসলাম লিখেছেন, 'আমাদের সব প্রচেষ্টার লক্ষ্য ছিল গুণগত নয়, সংখ্যাগত দিক দিয়ে কি করে আরো বেশি লোক গড়ে তোলা যায়। প্রয়োজনীয় সকল প্রকার সামগ্রীর সরবরাহ এবং ট্রেনিংয়ের জন্য আমাদেরকে পুরোপুরি ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হতো।দেশের কৃষক-শ্রমিকের সন্তান, কিছু মধ্যবিত্ত পরিবারের যুবক এবং ইপিআর ও ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনারা সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীরা মাঠের সক্রিয় যুদ্ধে অংশ নেননি। সশস্ত্র সংগ্রামের বিন্দুমাত্র অভিজ্ঞতা না থাকলেও তারাই ‘স্বাধীনতার বীরপুরুষ' হিসেবে নিজেদের মহিমা প্রচার করেন।"

শেখ মুজিব দেশে ফিরেই মিলিশিয়া বাহিনীর জন্য তাজউদ্দীন যে পরিকল্পনা করেছিলেন তাতে পরিবর্তন আনেন। তিনি অস্ত্র পুনর্বণ্টন না করে প্রথমেইতাদের নিরস্ত্র করার পরিকল্পনা নেন। ১৭ জানুয়ারি তিনি ১০ দিনের মধ্যে নিজ নিজ এলাকার মহকুমা অফিসারের কাছে অস্ত্র সমর্পণের নির্দেশ দেন। তিনি আরো বলেন, এই ঘোষিত দশ দিন পরে কারো কাছে অস্ত্র পাওয়া গেলে তা বেআইনি অস্ত্র বলে বিবেচিত হবে। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের দক্ষতা, আগ্রহ আর মেধা অনুযায়ী তাদের প্রতিরক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দেশের উন্নয়ন ও জাতি গঠনমূলক অন্যান্য সংস্থায় চাকরি দেয়া হবে। মুক্তিযোদ্ধারা সন্দেহ করতে থাকে যে, চাকরি ও প্রশিক্ষণের লোভ দেখিয়ে সরকার তাদের অস্ত্রশস্ত্র হাত করতে চাইছে এবং এই অস্ত্রশস্ত্র হারালে মুক্তিযোদ্ধারা ‘ক্ষমতাহীন হয়ে যাবে। ২ মুক্তিযোদ্ধাদের এই আশঙ্কা স্বাভাবিক ছিল। কারণ ২৫ ডিসেম্বর তাজউদ্দীন ঘোষণা দিয়েছিলেন, মুক্তিবাহিনীকে নিরস্ত্র করার প্রশ্নই আসে না। কয়েক দিন বাদেই সম্পূর্ণ উল্টো এক নির্দেশ সংশ্লিষ্ট সকলকে বিভ্রান্ত আর সন্দেহপ্রবণ করে তোলাই স্বাভাবিক ছিল।

এ কারণেই মুক্তিযোদ্ধারা প্রকাশ্যেই অস্ত্র সমর্পণের বিরোধিতা করতে থাকে। ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় এক প্রকাশ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অস্ত্র সমর্পণের আয়োজন করা হয়। কিন্তু প্রকাশ্যেই মুক্তিযোদ্ধাদের বেশির ভাগ সদস্যই অস্ত্র সমর্পণ করতে অস্বীকার করে। খুব সামান্য অস্ত্র জমা পড়ে। আর যে সব অস্ত্র জমা পড়ে তার একটা বড় অংশ ছিল নষ্ট, অচল কিংবা ব্যবহারের অনুপযুক্ত। অস্ত্র সমর্পণের অনুষ্ঠানে আবদুল কাদের সিদ্দিকী বলেন, 'যে নেতার আদেশে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলাম, সে নেতার হাতেই তা ফিরিয়ে দিলাম।' মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শেখ মুজিব বলেন, 'আমি তোমাদের তিন বছর কিছু দিতে পারবো না। আরো তিন বছর যুদ্ধ চললে তোমরা যুদ্ধ করতে না? উত্তর: করতাম-করতাম।
মুজিব বললেন: তাহলে মনে করো যুদ্ধ চলছে, তিন বছর যুদ্ধ চলবে। সেই যুদ্ধ দেশ গড়ার যুদ্ধ। অস্ত্র হবে লাঙ্গল আর কোদাল।
১৯৭২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি মুক্তিবাহিনী' ও ২৭ ফেব্রুয়ারি ‘মুজিববাহিনী'সহ সকল বাহিনী বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। মুক্তিযোদ্ধারা সাকুল্যে যা পেয়েছিলেন তা হচ্ছে— সরকারি ও আধা সরকারি চাকরিতে কোটা ও প্রমোশন, কিছু প্রশ্নবিদ্ধ সামরিক খেতাব আর একটি ফাউন্ডেশন বা কল্যাণ ট্রাস্ট। এভাবে তাদের পরিচিতি এবং যে আশা ও উদ্দীপনা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল এবং তাদের মনে জাতি গঠনের যে আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিয়েছিল তা সমাহিত হয়ে যায়।

একটা অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত সংখ্যা কারো জানা ছিল না। চাকরিতে কোটা ও প্রমোশনের যেহেতু সুযোগ ছিল, তাই এক সময় পথে-ঘাটে‘মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট বিক্রি হতে থাকলো। অসংখ্য ভুয়া সার্টিফিকেট ও ইস্যু করা হলো।এদিকে অস্ত্র সমর্পণের পরিকল্পনা ঠিকমতো বাস্তবায়ন হলো না। এমনকি শেখ মুজিবের নিজের দলের লোকজনই অস্ত্র সমর্পণ করতে অস্বীকার করেন। তারা যুক্তি দেখান, ‘প্রতিপক্ষ' অস্ত্র সমর্পণ করার আগে নিজেদের অস্ত্র সমর্পণ করাটা নিরাপদ নয়। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ হতাশ হয়ে সমাজবিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়েন। কেউ কেউ ডাকাতি, ছিনতাইয়ে, কেউ কেউ সম্পত্তি আত্মসাৎ, খুন, হাইজ্যাক, অপহরণে লিপ্ত হয়ে পড়েন। পুলিশ ফাঁড়ি ও বাজার লুট, গাড়ি হাইজ্যাক, যুবতী নারী অপহরণ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.