| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
রম্য
.
বিয়েবাড়ি
.
আটা-ময়দার দাম কেন বেড়েছে তার ইতিহাস হয়ত বিয়েবাড়িতে গেলেই বোঝা যায়। চারিদিকে এত্ত সুন্দ্রি ঘুরঘুর করছে। কেউ আটা কেউবা সুজি, আরে ভাই একটু হইলেও তো বুঝি।
বন্ধুর বোনের বিয়ে। বরযাত্রী আসবে রাতে। এখন সকাল গড়িয়ে দুপুর। আত্মীয়স্বজন অনেকে এসে ভোজসভায় যোগ দিয়েছেন। আমরা ফ্রেন্ডরা সবাই যে যার মত হেল্প করে একসাথেই খেতে বসলাম। জীবনে যত অভিজ্ঞতা হয়েছে এর মধ্যে এটা ছিল অন্যরকম।
দুপুরে সবাই মিলে খেতে বসেই বিপত্তিটা বাঁধল। দেখি আমার পাশের চেয়ারে বসা সোহাগ পাশের টেবিলে তাকাচ্ছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। ঘটনা কি দেখার জন্যে তাকাতেই দেখতে পেলাম,
পাশের টেবিলে এক আংকেল তার ফ্যামিলিসহ বসেছেন। সাথে তেনার দুই-দুইজন গুণধর মেয়েও আছে।
হায়রে,
তখনই একটা ঘটনা ঘটে গেল। আন্টি জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালছিল। হঠাৎ জগ গেল উলটে,
তার এক মেয়ের পাশে সব লাফাতে লাফাতে চলে গেল। তার মেয়েও তড়াং করে ঝেপে উঠে পাশে চলে গেল।
তখন পর্যন্ত সবকিছুই ঠিক ছিল। এবার মেয়েটা একটু সরে বসল। কিন্তু ভাগ্য খারাপ হলে যা হয় আরকি। এবার মেয়েটা বসছে আমার ঠিক বিপরীত পার্শ্বে। একদিম সোজাসুজি। খেতে বসে তারা আগেও গল্প করছিল, আর এখনো করছে নো প্রব্লেম। কিন্তু কথা বলছে সাথে আমার দিকে তাকাচ্ছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। কি সাংঘাতিক অবস্থা।
কিছুক্ষণ পর দেখে মেয়ের সাথে বাবাও আমার দিকে তাকাচ্ছেন।
কিন্তু সেই তাকানোতে কেমন যেন একটা অপরাধী অপরাধী ভাব ছিল। এভাবে কেউ তাকিয়ে থাকলে কি করা উচিৎ আমি জানিনা। তাই চুপ্নকরে খাবার গিলছিলাম। কিন্তু খাবারের স্বাদ পাচ্ছিনা।
আর এদিকে তো বন্ধুরা হাসাহাসি করছে। তাদের ভাব দেখে মনে হচ্ছে , এখানে বিনে পয়সায় সার্কাস দেখানো হচ্ছে।
পাশ থেকে রিহান বলে উঠল আংকেল কিন্তু অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল।
.
খাওয়া শেষে বাইরে এলাম। দেখলাম আংকেল ও পিছে পিছে আসছেন। অবস্থা তো ভালো না। কি আর করা। সামনের দিকে জলদি হাটা শুরু করলাম। ঠিক যেমনটা ভেবেছিলাম তেমনটাই। আংকেলও আমার পিছু নিয়েছেন। একটি ফাঁকা জায়গাতে পৌছুতেই তিনি আমাকে ডাক দিলেন। "এই ছেলে এদিকে শুনে যাও।"
আমার মনের মধ্যে তখন ঢোল-তবলা সব বাজছিল। শুধু বুঝতে পারছিলাম হার্টবিট বাড়ছিল।
আমিও সাথে সাথে ঘুরে বললাম, "আংকেল আমাকে ডাকেছেন।"
বেঁচারা বোধহয় মনে মনে ক্ষেপে গেলেন। আমাকে কিছু একটা বলার চেষ্টা করতেই পেছনের দিকে একবার তাকিয়েই আমার দিকে দৌড়ে আসতে লাগলেন। তখন আমারেও আর পায় কে,
আমিও দৌড় আর সাথে মেয়ের বাপও দৌড়।
কে যেন বলেছিলো,
ভালো একটা জব থাকলে মেয়ের বাবা-মা, এমনকি বান্ধিবিও দৌড়ায়।
কিন্তু আমারতো পড়ালেখাই শেষ হলোনা।
আর এর মাঝেই দোড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেছে।
মনে মনে এটা ভেবে নিজেকে শান্তনা দিলাম।
আজ অবশ্য মেয়ের বাবা সেই কারণে দৌড়াচ্ছেনা। ঘটনা হচ্ছে অন্য কিছু।
লোকটা নিঃসন্দেহে ভালো দৌড়ায়।
সামনে আমি, আমার পেছনে আংকেল আর আংকেল এর পেছনে তিনটা কুকুর।
একটা খয়েরী , একটা কালো-সাদা, আরেকটা হলদে সাদা ।
কি ভয়ংকর তাদের চাহনি। দেখলেই হার্ট অটোমেটিক গায়েব হয়ে যাবে। এই টাইপ অবস্থা।
.
অনেক দিন দৌড়াইনা। তার উপর আজ কুকুরের তাড়া খাওয়া । জীবনে একবারেই কুকুরের দৌড়ানি খেয়েছিলাম। তখন পায়ে কামড় খেতে খেতে বেঁচে গেছি।
কুকুরের সাথে দৌড়ে পেরে ওঠার কথা নয়। কিন্তু এই কুকুরগুলো কিছুক্ষণ দৌড়ানি দিয়েই থামছে। আবার দৌড়াচ্ছে। বুঝেন অবস্থা।
সামনে একটা ছোটো-খাটো গাছ দেখে মনের মাঝে আশার বাত্তি দপ করে জ্বলে উঠল। শেষ কবে গাছে উঠেছিলাম মনে নেই। তবে আজ উঠতেই হবে।
যেই ভাবা সেই কাজ। গাছের নিচে গিয়েই এক লাফে উঠতে গিয়েই ঝামেলায় পড়লাম। যতটা সোজা ভেবেছিলাম আসলে ততটা সোজা না। কোনোমতে উঠে পড়লাম। গাছের উপরের একটা ডাল ধরে উপরে উঠে গেলাম একদম উপরে। গাছের আর উপরে উঠা যাবেনা। আপাতত বিপদমুক্ত। আমারে দেইখা মেয়ের বাপও উপরে উইঠে গেছে । কিন্তু গাছ ছোটো হওয়ায় কোনোমতে কুকুরের নাগালমুক্ত।
তিনটা কুকুর এসে গাছের নিচে বসে পড়ল। আমি আর মেয়ের বাবা গাছেই আটকা পড়লাম।
মেয়ের বাবা এবার কথা শুরু করলেন।
.
-আসলে বাবা তোমার সাথে কথা বলতে এসে এরকম হবে কখনো ভাবিনি।
- (মনে মনে কইলাম, হু আমি ভেবেছি। আরও ভাবছিলাম পুকুরের মধ্যে ঝাপ দিব, কিন্তু হয়নি।)
একটু হেসে বললাম, কার ভাগ্যে কখন কি আছে কেউ জানেনা। কিন্তু কি কথা বলবেন বলে বলছিলেন?
- তখন খাবার টেবিল এ আমার মেয়ে আসলে তোমার দিকে ওভাবে তাকাচ্ছিল না।
ওর চোখে একটু প্রব্লেম। তাই এরকম হয়েছে। অন্য কিছু ভেবোনা। আমি এই কথাটা বলার জন্যেই এসেছিলাম
.
এত্ত সুন্দর একটা ভালোবাসার গল্পের অকাল মৃত্যুতে আমার মাথায় গাছের ডাল ভেঙে পড়ল। কোনোমতে নিজেকে সামলিয়ে বললাম, ইটজ ওকে আংকেল।
পকেটে হাত দিতে দেখি মোবাইল নেই। মনে পড়ল, মোবাইল আমার ফ্রেন্ড এর রুমে চার্জে লাগিয়েছি।
আংকেলের মোবাইল নাকি তার ছোট ছেলের কাছে। কি আর করা এই জনমানব শূন্য জায়গায় আস্তে আস্তে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। আর আমরা গাছে বসে আছি। আংকেল নাকি ভালো গান গাইতে পারেন। একবার শুনাতে বলতেই এই যে শুরু করেছে আর শেষ হয়নি। গান চলতেই আছে, একটা শেষ হচ্ছে তো আরেকটা চলছে।
কত্ত কষ্টের মধ্যে আছি বুঝাতে পারবনা। মাহফুজুর এর গান শুনালেও শুনতাম। কিন্তু আর শুনতে মন চাইছেনা। থামতে বলতেও পারছিনা। সাথে এখন শুরু হয়েছে মশার কামড়। গাছের নিচে কুকুরগুলো শুয়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে বিয়ে বাড়িতে যথেষ্ট খেয়েছে। আহা,
সবাই বিয়ে বাড়ি নিয়ে ব্যস্ত। আর আমরা গাছের উপর বইসা আছি ।
এরকম সন্ধ্যায় এরকম গান শোনার সময় কি করতে হয় তা আমার জানা নেই।
আপাতত শুধু শুনেই যাচ্ছি,
আর মাঝে মাঝে বাহ বাহ বলছি।
জীবন সুন্দর।
©somewhere in net ltd.