নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মঞ্জুর চৌধুরী

আমি ঝন্ঝা, আমি ঘূর্ণি, আমি পথ-সমূখে যাহা পাই যাই চূর্ণি’। আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ, আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ। আমি হাম্বার, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল, আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’ পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’ ফিং দিয়া দিই তিন দোল; আমি চপলা-চপল হিন্দোল। আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা, করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পান্জা, আমি উন্মাদ, আমি ঝন্ঝা! আমি মহামারী আমি ভীতি এ ধরিত্রীর; আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ন চির-অধীর! বল বীর - আমি চির উন্নত শির!

মঞ্জুর চৌধুরী › বিস্তারিত পোস্টঃ

মঞ্জুর চৌধুরীর ছোট গল্প "নীল দরজা"

২৭ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৩৩

"নীল দরজা" (ছোট গল্প)
মঞ্জুর চৌধুরী

বিয়ের চতুর্থ বছরে আদনান যখন প্রথম নীরার গায়ে হাত তুলে, নীরা রাগ বা ভয় পাওয়ার চেয়ে বিস্মিত হয়েছিল বেশি।

একদা বঙ্গদেশে প্রতিবেশীর ঝগড়া লাগলে গৃহকর্ত্রীরা নিজেদের গৃহকর্ম পাশে রেখে কান পেতে ঘটনার বিস্তারিত জানার চেষ্টা করতেন।
রেডিও টেলিভিশনের যুগে সেটাই ছিল বিনোদন।
যুগ পাল্টেছে। ইন্টারনেটের আগমনে পৃথিবী ছোট হয়ে গেছে। ঢাকায় বসে লোকে নিউইয়র্কের খবর একজন ব্রুকলিনবাসীর চাইতেও বেশি জানেন। আজকালকার শিক্ষিত ও রুচিশীল মায়েরা জানেন নিজেদের শিশুদের মানসিক বিকাশে সুস্থ পরিবেশের বিকল্প নেই। কিন্তু অতি ব্যস্ত আর ব্যয়বহুল শহুরে ফ্ল্যাট বাড়ি ছেড়ে নিজের মত করে নিরিবিলিতে একটি বাড়িতে থাকবেন, যার একটি ছিমছাম বাগান থাকবে, গেট বন্ধ থাকবে, বাউন্ডারি দেয়াল থাকবে, পাখির গান ছাড়া কোন শব্দ বাড়ির ভিতরে আসবেনা, এমন কল্পনা করাটাও কঠিন। ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকলে নানান ধরনের প্রতিবেশীর সাথে এডজাস্ট করেই থাকতে হয়।
এবং পৃথিবীর যেখানেই স্বামী স্ত্রীর সংসার হবে, সেখানে ঝগড়াঝাটি থাকবেই।
স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কটাই এমন যে সেই আদম হাওয়া যুগ থেকে শুরু করে আগামী হাজার খানেক বছর পরেও ঝগড়া বাঁধবেই।

তা কিছু কিছু পরিবার আছে, যারা রাতে প্রতিবেশী স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া শুরু হলে নিজের ফ্ল্যাটের টেলিভিশনের ভলিউম বাড়িয়ে দেয়। তিনতলার মিসেস হক যেমনটা করেন। পাঁচতলার রাশেদ সাহেব আবার একটু রুচিশীল মানুষ। প্রতিবেশীর ঝগড়া শুরু হলে তিনি রবীন্দ্রসংগীত ছেড়ে দেন। মজার ব্যাপার হলো, চারতলার 4B-তে যেদিন খুব বেশি ঝগড়া হয়, সেদিন রাশেদ সাহেবের প্লেলিস্টে প্রায়ই বাজে “তুমি রবে নীরবে…”
শুধু ছয়তলার আট বছরের হৃদয় টিভির ভলিউম বাড়ায় না। সে দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। সে জানে, 4B-র আন্টি যখন কাঁদেন, তখন তাদের বিল্ডিংয়ের লিফটটা নিজে নিজে ছাদে উঠে যায়। কথাটা কাউকে সে বলে না। জানে কেউ বিশ্বাস করবে না। বাচ্চারা খুব তাড়াতাড়ি শিখে যায়, বড়রা যেসব সত্য বিশ্বাস করতে চায় না, সেসব সত্য তাদের না বলাই ভালো।



মিরপুরের কাজীপাড়ায় ‘শাপলা নিবাস’ নামে যে ছয়তলা বাড়িটা আছে, সেটার সঙ্গে শাপলার কোনো সম্পর্ক নেই।

বাড়িটার রং ময়লা হলুদ। গেটের পাশে দুটো ডাস্টবিন। বর্ষাকালে গ্যারেজে পানি ওঠে। আর ছাদের পানির ট্যাংক থেকে মাঝেমধ্যে এমন গন্ধ আসে, যেন সেখানে কোনো মরা কুকুর দীর্ঘদিন ফেলে রাখা হয়েছে।
বাড়িওয়ালা মতিন সাহেব অবশ্য বাড়িটা নিয়ে গর্বিত।
তিনি বলেন, “আমার বিল্ডিংয়ের পরিবেশ খুব ফ্যামিলি।”
ঢাকা শহরে ‘ফ্যামিলি পরিবেশ’ কথাটার অর্থ সাধারণত আপনি রাত এগারোটার পর বাসায় ফিরলে দারোয়ান আপনার দিকে এমনভাবে তাকাবে যেন আপনি আন্তর্জাতিক মাদকচক্রের সদস্য।
এই শাপলা নিবাসের চারতলায় থাকে নীরা আর আদনান। বিয়ের আট বছর হয়েছে। পরিচয়ের বারো। প্রেমের এগারো। সুখের হিসাবটা অবশ্য কেউ রাখেনি।
নীরার বয়স চৌত্রিশ। একটা বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কপিরাইটার পদে চাকরি করছে।
সে এমন সব বিজ্ঞাপনের লাইন লেখে “আপনার হাসিই আমাদের অনুপ্রেরণা।”
অথচ গত দুই বছর ধরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হাসিটাই ঠিকমতো চিনতে পারে না।
আদনান একসময় গিটার বাজাত। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তার গান শুনেই নীরা প্রথম প্রেমে পড়েছিল। ছেলেটার মাথাভর্তি এলোমেলো চুল ছিল, গলায় সস্তা স্কার্ফ, হাতে গিটার।
সে গাইত “তোমার জন্য একটা শহর চুরি করে আনব।”
নীরা হেসে বলেছিল, “ঢাকা চুরি করো না। এই শহরে প্রচুর ট্রাফিক আর দূষণ!”
সেই হাসি থেকেই শুরু। প্রেমের সময় আদনান নীরাকে চিঠি লিখত।
কাগজে লেখা চিঠি! এই যুগেও! একটা চিঠিতে লিখেছিল, "যেদিন আমাদের বাসা হবে, একটা ছোট বারান্দা থাকবে। তুমি সেখানে গাছ লাগাবে। আমি সকালে চা বানাব। আর আমরা কোনোদিন মনে রাগ রেখে ঘুমাব না।"
বাসা হয়েছিল। বারান্দাও হয়েছিল। গাছও হয়েছিল। চা বানানোর দায়িত্বটা অবশ্য নীরার ওপরই পড়েছিল। আর রাগ করে না ঘুমানোর প্রতিজ্ঞাটা তারা দুজনই খুব যত্ন করে ভেঙেছিল।



প্রথম চড়টা পড়েছিল বিয়ের চতুর্থ বছরে। খুব নাটকীয় কোনো কারণে নয়। মানুষের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলো আশ্চর্যজনকভাবে তুচ্ছ কারণে ঘটে।
একটা ফোনকল। রাত সাড়ে এগারোটা। নীরার অফিসের সহকর্মী সজীব ফোন করেছিল একটা প্রেজেন্টেশন নিয়ে।
আদনান জিজ্ঞেস করেছিল, “এত রাতে ফোন কেন?”
নীরা বলেছিল, “কাল পিচ আছে।”
“তোমাকেই কল করতে হবে কেন?”
“কারণ কপিটা আমি লিখেছি।”
“অফিসে আর মেয়ে নাই?”
নীরা হেসে ফেলেছিল।
ভুলটা ছিল সেখানে।
কিছু পুরুষ প্রশ্ন করলে উত্তর চায় না, চায় আত্মসমর্পণ।
চড়টা পড়ার পর দুজনেই কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ছিল।
আদনান নিজের হাতের দিকে তাকিয়েছিল।
যেন হাতটা তার নয়। তারপর কেঁদে ফেলেছিল।
নীরাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, “আমি কী করে ফেললাম!”
সেদিন নীরাই তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিল। অদ্ভুত ব্যাপার।
যে মানুষ আঘাত পায়, অনেক সময় তাকেই আঘাতকারীকে বোঝাতে হয়, "তুমি আসলে খারাপ মানুষ নও।"
আদনান সত্যিই কয়েক মাস খুব ভালো ছিল। ফুল এনেছে। রান্না করেছে।
একদিন অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল হাতে ফুচকা নিয়ে।
নীরা ভেবেছিল, ওটা ছিল ক্ষনিকের একটা ভুল। হিট অফ দা মোমেন্ট। মানুষ তো ভুল করেই।
দ্বিতীয়বার ধাক্কা।
তৃতীয়বার কবজি চেপে ধরা।
চতুর্থবার দেয়ালে ঠেলে দেওয়া।
তারপর আবার ক্ষমা। ফুল। কান্না। প্রেম। আবার ভয়।
তাদের সংসারটা একটা ঘড়ির মতো হয়ে গেল।
কাঁটাগুলো সময়মতন একই জায়গায় ঘুরে ঘুরে আসত।



অদ্ভুত ঘটনাটা শুরু হলো এক বৃহস্পতিবার রাতে।
সেদিন ঢাকা শহর বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছিল।
এমন বৃষ্টি, যাতে রিকশাওয়ালারা ভাড়া দ্বিগুণ করে, কবিরা কবিতার খাতা খুলে লিখতে বসে। প্রেমিকেরা স্বপ্ন দেখে প্রেমিকার হাত ধরে একদিন এই বৃষ্টিতে....।
নীরা অফিস থেকে ফিরেছিল রাত সাড়ে দশটায়।
আদনান ডাইনিং টেবিলে বসে ছিল। সামনে নীরার ল্যাপটপ।
“আমার ল্যাপটপ খুলেছ?”
“পাসওয়ার্ড জানি।”
“জানো বলে খুলবে?”
আদনান স্ক্রিন ঘুরিয়ে দিল।
সজীবের মেসেজ।
Great job today. You saved the pitch.
আদনান বলল, “এই লোকটা তোমাকে এত প্রশংসা করে কেন?”
নীরা ব্যাগ নামাল।
“কারণ আমি ভালো কাজ করি।”
“তোমার নিজের সম্পর্কে ধারণা বেশ উঁচু।”
“তোমারটা নিচু বলে আমারটাও নিচু রাখতে হবে?”
তারপর কয়েক সেকেন্ড। সেই পরিচিত কয়েক সেকেন্ড। নীরা এখন এই নীরবতাকে চেনে। ঝড় আসার আগে বাতাস যেমন থেমে যায়।
আদনান উঠে দাঁড়াল।
“তুমি আজকাল খুব কথা বলো।”
নীরা চোখে চোখ রেখে বলল, “আগেও বলতাম। তুমি আগে শুনতে।”
তারপর গ্লাসটা ছুড়ে মারল আদনান।
নীরার দিকে নয়। দেয়ালে। ঝনঝন শব্দে গ্লাস ভাঙল। নীরা চমকে উঠল।

আর ঠিক তখনই বারান্দার দরজাটা নীল হয়ে গেল। আগে সেটা ছিল সাদা অ্যালুমিনিয়ামের। এখন গাঢ় নীল। সমুদ্রের তলার মতো নীল।
নীরা প্রথমে ভাবল বিদ্যুৎ চলে গেছে। তারপর বুঝল বিদ্যুৎ আছে। আদনানও দেখেছে কি না বোঝা গেল না।
সে বেডরুমে চলে গেছে।
নীরা ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেল। হাত রাখল। দরজাটা ঠান্ডা। খুলল। ওপাশে বারান্দা নেই। একটা রাস্তা। বৃষ্টিভেজা ঢাকা। কিন্তু এই ঢাকা সে চেনে না। রাস্তার পাশে কৃষ্ণচূড়া।
আকাশে কোনো তারা নেই। দূরে একটা চায়ের দোকান।
সাইনবোর্ডে লেখা:
“জীবনে যা হারিয়েছেন, এখানে তা পাওয়া যায়।”

নীরা দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর আবার খুলল। নিজেদের বারান্দা।

তিনটা মৃত মানিপ্ল্যান্ট। একটা ভাঙা চেয়ার। সামনে পাশের বিল্ডিংয়ের দেয়াল।
নীরা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর খুব শান্তভাবে বলল, “আমার সম্ভবত ঘুম দরকার।”



পরদিন অফিসে গিয়ে সে ঘটনাটা বলল তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু মিথিলাকে।
মিথিলা প্রথমে তিন মিনিট চুপ করে থাকল।
তারপর বলল, “তুই কি কোনো ড্রাগ নিচ্ছিস?”
“না।”
“গাঁজা ধরেছিস? মদ, ফেনসিডিল, ইয়াবা?”
“না।”
“কাশির সিরাপ?”
“মিথিলা!”
“আমি সম্ভাবনাগুলো বাদ দিচ্ছি।”

নীরা কফিতে চুমুক দিল। মিথিলা এবার গম্ভীর হলো।
“আদনান আবার কিছু করেছে?”

নীরা চুপ। মিথিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“দেখ, কাল্পনিক ভূতের দরজা নিয়ে পরে কথা বলব। আগে জীবিত ভূতের ব্যাপারটা দেখি।”

নীরা হাসল। খুব সামান্য।
মিথিলা বলল, “তুই এখনও ওকে ভালোবাসিস?”
প্রশ্নটা সহজ। উত্তরটা নয়। নীরা জানালার বাইরে তাকাল। কারওয়ান বাজারের ওপর বিকেলের ধোঁয়াটে আলো।
“হ্যাঁ।”
“ভয়ও পাস?”
“হ্যাঁ।”
মিথিলা মাথা নাড়ল।
“একই মানুষকে ভালোবাসা আর ভয় পাওয়া, তোর ব্রেইনের প্রতি খুব অন্যায় করছিস! একারনেই তোর ব্রেন তোকে নিয়ে খেলেছে। উইশফুল থিংকিং বলা যায়।”
নীরা বলল, “ও সবসময় এমন ছিল না।”
মিথিলা বলল, “মানুষ কখনই বদলায় না। সুযোগ পায় না বলেই ভাল মানুষের ভাব নিয়ে বসে থাকে। সুযোগ পাওয়ার পরে কে কেমন আচরণ করে সেটার উপর নির্ভর করে কে ভাল বা কে মন্দ।”
তারপর একটু থেমে যোগ করল, “একটা সময়ে যে মানুষটাকে ভালোবেসেছিলি, সে বর্তমানে হারিয়ে গেছে। মাঝে মাঝেই অতীতের মানুষটার দেখা পাস। এখন তুই আমাকে বল, তুই কি সেই স্মৃতির মানুষটাকে ভালবেসে বর্তমানের বদমাইশটার সাথে সংসার করে যাবি? কতটা যৌক্তিক?"



নীল দরজা আবার এল পাঁচ দিন পর।
সেদিন আদনান নীরার ফোনটা কেড়ে নিয়ে দেয়ালে ছুড়ে মেরেছিল। স্ক্রিন ভেঙে গিয়েছিল।
আদনান বলেছিল, “সরি।”
নীরা কিছু বলেনি। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
এই সময়েই দরজাটা নীল হয়ে গেল। এবার নীরা ভয় পেল না। খুলল। ওপাশে সেই রাস্তা।
সে পা রাখল।
দরজার ওপাশে বৃষ্টি নেই।
চায়ের দোকানে একজন বৃদ্ধ বসে। সাদা পাঞ্জাবি। মাথায় চুল নেই। কিন্তু গোঁফ বিশাল। এত বড় আর পুরুষ্ট গোঁফ বর্তমান বাংলাদেশে কেউ রাখেনা।
বৃদ্ধ বললেন, “চা?”
“আমি কোথায়?”
“ঢাকায়।”
“এটা ঢাকা না।”
বৃদ্ধ বিরক্ত হলেন।
“ঢাকা একটা না, মা।”
“মানে?”
বৃদ্ধ নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। নীরা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল।
“আপনি কে?”
“চা বিক্রি করি।”
“সেটা দেখছি।”
“তাহলে জিজ্ঞেস করছেন কেন?”
নীরা বুঝল, অতিপ্রাকৃত জগতে চলে গেলেও ঢাকার দোকানদারদের আচার ব্যবহার খুব একটা বদলায়না।
বৃদ্ধ একটা কাপ এগিয়ে দিলেন।
“চিনি?”
“কম।”
বৃদ্ধ হেসে বললেন “জীবনে?”
নীরাও হেসে জবাব দিল, “না, চায়ে।”
বৃদ্ধ তারপর রাস্তার ওপারে আঙুল তুললেন।
সেখানে একটা বাড়ি। দরজা খোলা।
“যান।”
“কোথায়?”
“যেখানে আপনি কোনদিন যান নাই।”



ঘরের ভেতরে নীরা নিজেকেই দেখল। কিন্তু অন্য নীরা। এই নীরার চুল ছোট। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। হাসছে।
তার পাশে আদনান। বয়স হয়েছে। চুলে পাক। আদনান রান্নাঘরে ডিম ভাজছে।
নীরা দরজায় দাঁড়িয়ে শুনল অন্য নীরা বলছে, “লবণ দিতে ভুলো না।”
আদনান বলল, “আমি একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ। বারবার মনে করিয়ে দেয়ার দরকার নেই।”
“এই উত্তর থেকেই বুঝলাম ভুলে গিয়েছিল।”
দুজনেই হাসল। নীরার বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে গেল।
এটাই তো সে চেয়েছিল। এই মানুষটাই। এই সংসার।
আদনান হঠাৎ ঘুরে দরজার দিকে তাকাল। নীরাকে দেখতে পেল না।
বৃদ্ধ পেছন থেকে বললেন,
“এই জীবনটাও সম্ভব ছিল।”
নীরার চোখ ভিজে উঠল।
“তাহলে হলো না কেন?”
বৃদ্ধ কাঁধ ঝাঁকালেন।
“সব সম্ভব জীবন সত্যি হয় না।”
“আমি কী করলে এটা পেতাম?”
“আপনি?”
বৃদ্ধ হাসলেন।
“সব প্রশ্নে নিজেকে আসামি বানাবেন না।”
নীরা তার দিকে তাকাল।
বৃদ্ধ বললেন, “এই জীবনে আদনান প্রথমবার আপনাকে মারার পর চিকিৎসা নিয়েছিল। নিজের রাগের দায়িত্ব নিয়েছিল। বদলানোর কাজটা আপনাকে দেয়নি।”
নীরা অন্য আদনানের দিকে তাকাল।
লোকটা প্লেটে ডিম তুলে দিচ্ছে।
খুব সাধারণ দৃশ্য।
অথচ নীরার মনে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে অলৌকিক দৃশ্য সে দেখছে।
একজন মানুষ নিজের ভেতরের অন্ধকারের দায়িত্ব নিজে নিয়েছে।



বাসায় ফিরে নীরা দেখল মাত্র তিন মিনিট কেটেছে। আদনান ঘুমাচ্ছে। তার মুখটা শান্ত।
ঘুমন্ত মানুষদের দেখে বোঝার উপায় নেই তারা জেগে উঠে কাকে কষ্ট দেয়।
নীরা পাশে বসে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল।
একসময় এই মুখ দেখেই তার বুক ধকধক করত।
এখনও করে। শুধু কারণটা বদলে গেছে।
হঠাৎ আদনান চোখ খুলল।
“কী?”
“কিছু না।”
“এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?”
নীরা বলল, “ভাবছিলাম, মানুষ কি একই জীবনে দুইজন মানুষ হতে পারে?”
আদনান চোখ কুঁচকাল।
“রাত তিনটায় ফিলোসফি শুরু করো না।”
নীরা হেসে ফেলল। আদনানও হাসল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে নীরা বুঝল সমস্যাটা কোথায়। এই হাসিটাই তাকে আটকে রেখেছে। কারণ খারাপ সময়ের মাঝখানে আদনান এখনও মাঝেমধ্যে সেই পুরোনো ছেলেটা হয়ে যায়। গিটার হাতে। এলোমেলো চুল। যে বলেছিল একটা শহর চুরি করবে। নীরা বছরের পর বছর সেই ছেলেটার ফেরার অপেক্ষা করেছে।
কিন্তু মানুষকে তার সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত দিয়ে বিচার করলে পৃথিবীতে কোনো খারাপ মানুষই থাকবে না।



পরের শুক্রবার আদনান সত্যিই গিটার বের করল। অনেকদিন পর।
বলল, “চলো ছাদে যাই।”
নীরা অবাক।
“কেন?”
“তোমাকে একটা গান শোনাব।”
ছাদে বাতাস ছিল। ঢাকা শহরের হাজার জানালায় হাজার জীবন বাতি হয়ে জ্বলছিল। আদনান গাইল তাদের পুরোনো গান।
গান শেষ করে বলল,
“আমি জানি আমি খারাপ হয়ে গেছি।”
নীরা চুপ।
“কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
“জানি।”
“তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে?”
নীরা তার দিকে তাকাল। কী আশ্চর্য!
এতদিন এই প্রশ্নটাই সে নিজের কাছে করেছে।
আজ আদনান করছে।
“আমি জানি না।”
আদনানের মুখ বদলে গেল।
“মানে?”
“মানে জানি না।”
“কারও সঙ্গে কিছু চলছে?”
নীরা চোখ বন্ধ করল। এত দ্রুত একজন মানুষ ভালোবাসা থেকে সন্দেহে যেতে পারে!
কতক্ষন লেগেছে? চার সেকেন্ড? তিন?
আদনান তার হাত ধরল। খুব শক্ত করে।
“বল।”
“হাত ছাড়ো।”
“আগে বল।”
“আদনান, হাত ছাড়ো।”
“কে?”
নীরা শান্তভাবে বলল,
“তুমি।”
আদনান থমকে গেল।
“কী?”
“আমার আরেকজনের সঙ্গে সম্পর্ক চলছে।”
আদনানের চোখ লাল।
নীরা বলল, “তার নামও আদনান। বয়স তেইশ। গিটার বাজায়। আমাকে সম্মান করে। বারো বছর ধরে আমি সেই লোকটার সঙ্গে সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি।”
আদনানের হাত আলগা হয়ে গেল। নীরা নিচে চলে এল।



সেই রাতে নীল দরজা আবার এল। নীরা খুলল।
বৃদ্ধ অপেক্ষা করছিলেন।
“আজ কোথায় যাব?”
বৃদ্ধ চা ঢালতে ঢালতে বললেন,
“আজ কোথাও না।”
“কেন?”
“আপনার দরজা শেষ।”
নীরা ভয় পেল।
“মানে?”
“আপনি উত্তর পেয়ে গেছেন।”
“কী?”
বৃদ্ধ তাকালেন।
“দরজা কখন আসে খেয়াল করেছেন?”
নীরা মনে করার চেষ্টা করলো।
প্রথমবার এসেছিল গ্লাস ভাঙার পর।
দ্বিতীয়বার ফোন ভাঙার পর।
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
“দরজা অত্যাচারের সময় আসে না, মা।”
“তাহলে?”
“যখন আপনি নিজের কষ্টকে অস্বীকার করেন, তখন আসে।”
নীরার শরীর কেঁপে উঠল।
বৃদ্ধ বললেন, “মানুষের ভেতরে একটা দরজা থাকে। আমরা যখন বলি ‘কিছু হয়নি’, অথচ কিছু হয়েছে, দরজাটা একটু একটু করে নীল হয়।”
নীরা দীর্ঘক্ষণ চুপ।
“আপনি কে?”
বৃদ্ধ এবার উত্তর দিলেন না।
শুধু একটা পুরোনো আয়না এগিয়ে দিলেন।
নীরা আয়নায় তাকাল। আর চিৎকার করে উঠল।

১০

আয়নায় বৃদ্ধ নেই। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। বয়স আট-নয়। দুটি বেণি। স্কুল ড্রেস। নীরা মেয়েটাকে চেনে। ওটা সে নিজে।
তার পেছনে একটা ঘর। সেই পুরোনো মোহাম্মদপুরের বাসা। তার বাবা চিৎকার করছেন। মা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে। গালে আঙুলের দাগ।
ছোট্ট নীরা মায়ের আঁচল ধরে বলছে,
“আম্মু, আব্বু তোমাকে মারল কেন?”
মা হাসছেন। সেই অদ্ভুত হাসি।
যে হাসি দিয়ে নারীরা কখনও কখনও একটা পুরো যুদ্ধ লুকিয়ে রাখে।
মা বলছেন, “কিছু হয়নি মা।”
নীরার হাত থেকে আয়না পড়ে গেল।
বৃদ্ধ বললেন, “মনে পড়েছে?”
নীরা কাঁদছে।
“আমি তো ভুলে গিয়েছিলাম।”
“না।”
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
“শিশুরা কিছু ভোলে না। বড় হয়ে শুধু অন্য নাম দেয়।”
নীরা ফিসফিস করে বলল, “আপনি কে?”
বৃদ্ধ এবার মৃদু হাসলেন। তার বিশাল গোঁফটা মিলিয়ে যেতে লাগল।
মুখ বদলাল।
চোখ বদলাল।
নীরা নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।
লোকটা তার বাবা।
যিনি ছয় বছর আগে মারা গেছেন।
নীরা পেছনে সরে গেল।
“আব্বু?”
লোকটা কিছু বলল না।
শুধু তাকিয়ে রইল।
তার চোখে এমন একটা লজ্জা, যা জীবিত অবস্থায় কোনোদিন ছিল না।
নীরা বলল,
“তুমি?”
বাবা মাথা নিচু করলেন।
“মরে যাওয়ার একটা সুবিধা আছে রে মা।”
“কী?”
“মানুষ তখন নিজের মিথ্যাগুলো আর বিশ্বাস করতে পারে না।”
নীরা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“তুমি আম্মুকে ভালোবাসতে?”
“খুব।”
“তাহলে মারতে কেন?”
বাবা দীর্ঘক্ষণ চুপ। তারপর বললেন,
“কারণ "ভালোবাসা মানুষকে ভালো মানুষ বানায়" এই কথাটা সত্যি না।”
নীরা তাকিয়ে আছে।
“ভালো মানুষ হওয়ার কাজটা আলাদা।”
চারপাশের শহরটা ধীরে ধীরে মুছে যেতে লাগল।
নীরা চিৎকার করল,
“আব্বু!”
বাবা বললেন,
“তোর মা একটা ভুল করেছিল।”
“কী?”
“সে আমাকে ক্ষমা করতে করতে একসময় আমাকে বদলানোর প্রয়োজনটাই শেষ করে দিয়েছিল।”
“আমি কী করব?”
বাবা হাসলেন।
খুব বিষণ্ণ হাসি।
“আমার কাছে জিজ্ঞেস করিস না।”
“কেন?”
“আমি এই পরীক্ষায় ফেল করেছি।”

১১

পরদিন সকালে আদনান ঘুম থেকে উঠে দেখল নীরা স্যুটকেস গোছাচ্ছে।
সে কিছুক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে রইল।
“কোথায় যাচ্ছ?”
“মিথিলার বাসায়।”
“কতদিনের জন্য?”
“জানি না।”
আদনান বসে পড়ল।
তার মুখ ফ্যাকাশে।
“নীরা।”
“হুম।”
“আমি কি আরেকটা সুযোগ পাব?”
নীরা জামা ভাঁজ করতে করতে বলল,
“হয়তো।”
আদনান তাকাল।
নীরা বলল, “কিন্তু সুযোগটা আমাকে ফেরত পাওয়ার জন্য না।”
“তাহলে?”
“নিজেকে ফেরত পাওয়ার জন্য।”
আদনানের চোখে পানি।
“আমি তোমাকে ছাড়া পারব না।”
নীরা স্যুটকেস বন্ধ করল।
তারপর খুব নরম গলায় বলল,
“এই কথাটাই সমস্যা, আদনান।”
“কোনটা?”
“তোমার ভালো থাকার দায়িত্বও তুমি আমাকে দিয়ে রেখেছ।”
নীরা দরজার দিকে হাঁটল।
আদনান ডাকল, “নীরা।”
সে থামল।
“আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি।”
নীরা পেছনে তাকাল। হাসল।
“আমি জানি।”
তারপর বলল, “এখন দেখা যাক তুমি সেই ভালোবাসাটাকে জেতাতে পারো কিনা।”

১২

ছয় মাস পর।
শাপলা নিবাসের 4B খালি।
মতিন সাহেব নতুন ভাড়াটে খুঁজছেন।
বিজ্ঞাপনে লিখেছেন, “অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ফ্যামিলি বাসা।”
ঢাকা শহরের বাড়িওয়ালাদের আশাবাদ অসীম।
আদনান এখন অন্য জায়গায় থাকে। থেরাপি নিচ্ছে। নীরা তার সঙ্গে মাঝে মাঝে কথা বলে।
তারা আবার একসঙ্গে হবে কি না, কেউ জানে না।
নীরাও না।
সব গল্পের শেষ বিয়ে বা বিচ্ছেদ দিয়ে হতে হবে, এই আইন কে করেছে?
নীরা এখন ধানমন্ডিতে একটা ছোট বাসায় থাকে।
বারান্দা আছে।
সেখানে এগারোটা গাছ।
দুটো প্রায় মরেই গিয়েছিল।
নীরা বাঁচিয়েছে।
মিথিলা বলেছে, “তোর সমস্যা কী জানিস? মানুষ আর গাছ, দুইটাই বাঁচানোর দায়িত্ব নিয়ে ঘুরিস।”
নীরা বলেছে, “গাছ অন্তত থেরাপিতে যেতে অস্বীকার করে না।”
এক সন্ধ্যায় বৃষ্টি হচ্ছিল।
নীরা বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল।
হঠাৎ তার ফোনে মেসেজ এল।
আদনান।
"আজ থেরাপিস্টকে প্রথমবার বললাম, আমি যা করেছি তার জন্য কোনো অজুহাত নেই।"
নীরা অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর লিখল, "Good."
আর কিছু না। ফোন নামিয়ে চায়ে চুমুক দিল।
ঠিক তখন পাশের বাসা থেকে একটা শব্দ এল।
ধাম!
তারপর একজন পুরুষের চিৎকার। একজন নারীর চাপা কান্না।
নীরা স্থির হয়ে গেল।
তার বারান্দার সাদা দরজাটা ধীরে ধীরে নীল হয়ে গেল।
নীরা উঠে দাঁড়াল।
কিন্তু এবার দরজাটা তার জন্য খোলেনি।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল পাশের বাসার একটি ছোট মেয়ে।
বয়স সাত কি আট।
দুটি বেণি।
মেয়েটা অবাক হয়ে নীরার দিকে তাকাল।
“আন্টি?”
নীরা কিছু বলতে পারল না।
মেয়েটা ফিসফিস করে বলল,
“আম্মু বলেছে কিছু হয়নি।”
নীরার বুকের ভেতর বহু বছর আগের একটা শিশু কেঁদে উঠল।
সে হাঁটু গেড়ে বসল।
নীল দরজার ওপাশ থেকে মেয়েটা জিজ্ঞেস করল,
“সত্যিই কি কিছু হয়নি?”
নীরা হাত বাড়িয়ে দিল।
তারপর সেই উত্তরটা দিল, যেটা তার মা কোনোদিন দিতে পারেননি। যেটা সে নিজেও আট বছর ধরে নিজেকে বলতে পারেনি।
“হয়েছে।”
মেয়েটা তার হাত ধরল।
ঠিক তখন ঢাকা শহরের কোথাও একটা লিফট নিজে নিজে ছাদের দিকে উঠতে শুরু করল।
তিনতলার মিসেস হক টেলিভিশনের রিমোট হাতে নিলেন।
পাঁচতলার রাশেদ সাহেব রবীন্দ্রসংগীত চালাতে গেলেন।
তারপর কী মনে করে থেমে গেলেন।
রিমোটটা টেবিলে রাখলেন।
দরজা খুললেন। তিনতলায় টিভির শব্দও কমে গেল।
আর একে একে শাপলা নিবাসের দরজাগুলো খুলতে শুরু করল।
একটা। দুটো। তিনটে।
ঢাকা শহর সেদিনও একই রকম ছিল।
জ্যাম ছিল। দূষণ ছিল। ভাড়া বেশি ছিল। মানুষ ব্যস্ত ছিল।
শুধু খুব অল্প সময়ের জন্য, কেউ টেলিভিশনের ভলিউম বাড়ায়নি।
আর সম্ভবত, কিছু কিছু জাদু ঠিক এভাবেই শুরু হয়।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.