| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
১১ মার্চ ২০১১, বিশ্বকাপের ২৮ তম ম্যাচ শুরু হয়। বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ শক্তিশালী ইংল্যান্ড। সকাল থেকেই উত্তেজনায় ভুগছিলাম, শক্ত প্রতিপক্ষের বিপক্ষে বাংলাদেশের বিজয় এখন শুধুমাত্র কাকতালিয় বিষয় বলা চলে না। এর মধ্যে খেলার ভেন্যু আবার চট্টগ্রাম, যেখানে বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের পারফরম্যান্স আশাব্যঞ্জক। তাই মনের ভেতর কোথাও একটি আশা ছিল যে বাংলাদেশ হয়তো আজ জিতবে। প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ডের সংগ্রহ ২২৫/১০। অতি আগ্রহ নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংস দেখতে বসলাম। ওপেনারদের শক্ত ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ ভালোই করছে। কিছুক্ষন পরই শুরু হলো চিরচেনা বাংলাদেশের সেই ব্যাটিং – একের পর এক ব্যাটস্ম্যান আসছে এবং লম্বা কোন ইনিংস খেলার আগেই বিদায়। খেলা দেখছিলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টি.এস.সি তে। একটু আগেও যেটি জন সমুদ্র ছিল, হাজার হাজার পতাকা নিয়ে মানুষ গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছিল, সেই স্থাপন পরিনত হতে থাকলো স্তব্ধ শ্মশানে। বাংলাদেশ জিতলে সারা রাত আনন্দ করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু এক পর্যায়ে আর মনোবল ধরে রাখতে পারলাম না যখন স্কোরটি ১৬৯/৮ এবং ব্যাটিংয়ে শেষ স্বীকৃত ব্যাটস্ম্যান মাহমুদুল্লাহ এবং সদ্য ক্রিসে আসা বোলার শফিউল ইসলাম। রওনা দিলাম বাড়ির দিকে। আশে পাশে যাই দেখছি, তাই বিরক্ত লাগছে। মুহূর্তের মধ্যে যেন বিতৃষ্নায় ভরে গেলো মন টি। মনে হলো একটু বেশিই হয়তো আশা করেছিলাম। ছোট বেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি আমার আগ্রহ একটু বেশী, নিজেও খেলেছি ছোটখাটো কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ম্যাচ। মনের কোথায় যেন সাড়া দিচ্ছিলি, ম্যাচটি শেষ করে গেলে ভালো হতো না? পকেট থেকে মোবাইলটি বের করে রেডিওটা অন করলাম, বিশ মিনিটের মত পার হয়েছে, কিন্তু এখোনও কোন উইকেট পড়েনি। এর পর পরবর্তী আধা ঘন্টা যা হলো, সেটিকে ক্রিকেটের রুপকথাই বলা যায়। বোলার শফিউল তার পরিনত (!) ব্যাটিং নৈপূন্যে বাংলাদেশকে জয়ের কাছে নিয়ে যাচ্ছে। পথে যেতে যেতে দেখলাম, রিক্সাওয়ালা, রাস্তার ধারের চায়ের দোকানি, স্যুট পরা ভদ্রোলোক, শিশু-কিশোর,যুবক-বৃদ্ধ সবাই কোথাও না কোথাও উকি মেরে খেলা দেখছে, কেউ কেউ রেডিও কানে দিয়ে আছে। প্রতিটি রানের সাথে সাথে বাংলাদেশ যেন কেপে কেপে উঠছে। খেলা শেষের পর পরই আমার এক বন্ধু ফোন দিয়েছে ক্যাম্পাস থেকে, আমি ফোন রিসিভ করলাম ঠিকই, কিন্তু কোন কথা বলার মত অবস্থায় আমি আমি ছিলাম না সেদিন। আবেগে আমার গলা ধরে এসেছে, খুশিতে আমি কোন কথা বলতে পারছি না, রাস্তার মাঝে খোলা আকাশের নীচে সেদিন আমার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছিল। আমি লুকানোর কোন চেষ্টাই করিনি, কারন এ কান্না কোন লজ্জার না, এ কান্না ছিলো বিজয়েরর। আমার বিশ্বাস আমার সাথে সেদির গোটা বাংলাদেশের অনেকেই কেদেছিলো। বাংলাদেশের ক্রিকেট দল আমাদেরকে এমনই অনেক অনুভুতির ছোয়া দিয়েছে যা কখোনই ভোলার নয়। যাই হোক, শুরুর এই ঘটনাটিতে আমি আবার ফেরত আসবো।
হ্যান্সি ক্রোনিয়ে’র বহিস্কার দিয়ে ম্যাচ ফিক্সির যে তোল পাড় ক্রিকেট বিশ্বে গত দশকে শুরু হয়েছিলো, অনেক দিন স্তিমিত থাকার পর, সম্প্রতি ম্যাচ ফিক্সিং এর উন্নত ভারসন স্পট ফিক্সিং দিয়ে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগের ও বাংলাদেশের কিছু খেলোয়াড়দের নিয়ে সেটি পুনঃজাগরিত হয়েছে। আইসিসিএর দুর্নীতি দমন কমিশনের (আকসু) তদন্তের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক ও স্টার ক্রিক্রেটার আশরাফুলের জবানবন্দিতে বাংলাদেশের ক্রিকেটে ইতিহাসের সবথেকে খারাপ সময় পার করছে। আশরাফুল নিজে তার স্বীকারোক্তিতে নিজের কিছু অপরাধ স্বীকার করেছে যেটি প্রমান করতে আলাদা পূনাঙ্গ কোন রিপোর্টের প্রয়োজন নেই। এই স্বীকারোক্তির ফলে দেশের ক্রিকেটপ্রেমী জনগন আজ দুই ভাগে বিভক্ত। একটি ভাগ আশরাফুলের অপকর্মের জন্য তার কঠিনতম শাস্তি দাবি করছে, আর একটি দল আশরাফুলের এই স্বীকারোক্তির ফলে তাকে ক্ষমা করে দিতে বেশী আগ্রহী।
ব্যাক্তিগত কারনে আমি প্রথম দলটির পক্ষে। কাজেই আগেই আমি এই ঘটনার কিছু ভালো দিক এবং আশরাফুলকে কিছুটা ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে চাই।আশরাফুলে এই স্বীকারোক্তি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি বিরল ঘটনা। এদেশে দোষ করে স্বীকার করা গোষ্ঠীর সংখ্যা খুব কম। কারন অপরাধ স্বীকারের জন্য যে মূল্যবোধের প্রয়োজন, জাতিগতভাবে আমরা সেটি এখোনও গড়ে তুলতে পারিনি। এ স্বীকারোক্তি থেকে নবীন ক্রিকেটারদের এটিও শেখা উচিৎ যে সামান্য কিছু টাকার কারনে যে অসম্ভব মানষিক কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, সেটির তুলানায় ঘুষের টাকার পরিমান অতি নগন্য। আমি হলফ করে বলতে পারি যে বাংলাদেশের ক্রিড়াঙ্গনে আশরাফুল এক নয় যে কোন না কোন সময়ে স্পট ফিক্সিং এর সাথে জড়িত ছিলো। পরিস্থিতির কারনে তার বিষয়টি এখন আমাদের সবার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। শুধু ক্রিকেট বিশ্ব নয়, পুরো ক্রিড়াঙ্গনে এসব বুকিদের চত্রু অত্যন্ত শক্তিশালী। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, বা পরিস্থিতি সামাল দিতে জড়িয়ে পড়তে হয় বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনায়। সব সময়ই একটি স্পট ফিক্সিং এর মূল কারিগর থাকেন বুকিরা। পরিকল্পনা শেষ হলে তখন প্রস্তাব দেয়া হয় ক্রিকেটারদের। এই দুই চক্রের মধ্যে আরো একটি চক্র থাকে যাদের কথা কোন মিডিয়া, কোন আকসু বা কোন কর্তৃপক্ষ তুলে ধরেন না। কারন তারা “কর্তৃপক্ষেরই” অংশ। পুরো ফিক্সং এর পদ্ধতিতে তারা সরাসরিভাবে কখোনও যুক্ত হন না। তারা পুরো বিষয়টির ক্যাটালিস্ট হিসাবে কাজ করেন, যার বিনিময়ে পান বড় ধরনের একটি কমিশন। সবথেকে নিরাপদে থাকা এসব “কর্তৃপক্ষের অংশ” ধ্বংস করেন স্বপ্নেভরা নবীন খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার। যাই হোক, স্পট ফিক্সিংয়ে জড়িত হয়ে যাওয়ার ঘটনা যেমন আছে, তেমনি বুকিদের ফিরিয়ে দেয়ার ঘটনাও বিরল নয়। বেশী দুরে নয়, আমাদের দেশেই এমন ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশের বোলার মাশরাফি বিসিসি কে জানিয়ে দেন আগে ভাগেই যে তার কাছে স্পট ফিক্সিং এর প্রস্তাব এসেছে। সেই অনুযায়ী একজনকে গ্রেফ্তার ও করা হয়। কাজেই পরিস্থিতি যাই থাকুক না কেন, মনের জোর থাকলে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করা অসম্ভব খুব একটা কঠিন না।
এবার বলবো আশরাফুলে ভবিষ্যত নিয়ে আমার ব্যাক্তিগত কিছু মন্তব্য। আজ যে আলোচনা হচ্ছে, সেটি কোন ব্যাক্তি আশরাফুলের নয়, আশরাফুল একটি নাম, যেটি নেতৃত্ব দেয় নাম না জানা সেই সব খেলোয়াড়দের যারা ক্রিড়াঙ্গনকে কলুষিত করার নগ্ন খেলায় মত্ত্ব। এ পর্যায়ে আমি লেখার প্রথম প্যারাটির কথা আর একবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। এখোনও বাংলাদেশের এই একটি ক্ষেত্রই আছে, যা আমাদের আনন্দ দেয়, যা আমাদের দুর্নীতি আর চুরির বানিজ্য থেকে দুরে সরিয়ে নিয়ে আসে। প্রতিটি হার জিতের সাথে ১৬ কোটি মানুষের আবেগ ওঠানামা করে। আর হঠাৎ করে যখন জানতে পারি এসব আবেগ আর ভালোবাসা অল্প কিছু টাকার জন্য কিছু ব্যাক্তি দালালদের সাথে কেনা বেচা করছে,তখন আবার ফিরে যেতে ইচ্ছা করে মানুষের সেই হিংস্র রুপটিতে। আমি কখোনই আমার আবেগ ও ভালোবাসার দালালদের কে ক্ষমা করতে পারবো না। তার অপরাধ স্বীকারোক্তির কারনে হয়তো আমি ব্যাক্তি আশরাফুলকে ক্ষমা করে দিতে পারি, কিন্তু আর একবার খেলার সুযোগ দিয়ে দ্বিতীয় বার আমার আবেগ এসব নরকীটের হাতে তুলে দেয়ার পক্ষপাতি নই।
যুক্তিবাদিদের জন্য আমার কিছু যুক্তি:
যে বা যারা জড়িত এ চক্রান্তের সাথে, আপনাদের সাথে একমত হয়ে আমি তাদের সবার সবোর্চ্চ শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। কিন্তু সাথে সাথে এটিও মনে রাখতে হবে, অন্য একজনের অপরাধ কখোনও নিজের অপরাধ খন্ডানোর কোন যুক্তি নয়। অনেকেই এ অপরাধ করেছে, কাজেই আমাকে একা কেন শাস্তি দেয়া হবে,এটি কোন যুক্তি নয়। অপরাধ সব সময়ই অপরাধ। অন্যের অপরাধের পরিমান দেখিয়ে এক অপরাধীকে বাচানোর চেষ্টা করবেন না, বরং যে সময়টুকু এ অপরাধীকে বাচানোর জন্য খরচ করছেন, ততটুকু সময় অন্য অপরাধীদের বিচার ও তদন্তের দাবি জানিয়ে ব্যয় করুন। আমাদের ক্রিড়াঙ্গন এখোনও রাজনৈতিক/ব্যবসায়ী অঙ্গনের মত ঘুনে ধরে যায় নি। যে অল্প কিছু অংশে পচন ধরেছে,সেটি শরীর থেকে কেটে বাদ দেয়াই ভালো। তা না হলে, ভবিষ্যতে খেলতে আসা তরুন প্রজন্ম যে ক্যান্সারে আক্রান্ত হবে সেটিতে কোন সন্দেহ নেই।
আশরাফুলের স্বীকারোক্তি বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎকে বাচানোর একটি পথ দেখিয়ে দিয়ে গেছে। আমার এখোনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে নামটি “আশরাফুল”। যে আশরাফুলের হাত ধরে বাংলাদেশের ক্রিকেট স্বপ্ন দেখা শিখেছে, সেই আশরাফুলের হাত ধরে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিবেন না। অপরাধীতে শাস্তি পেতে দিন, ভবিষ্যত প্রজন্মকে শিক্ষা নিতে দিন।
©somewhere in net ltd.