| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
-মুহাম্মদ কেফায়েতুল্লাহ
চেতন ফিরে পেয়ে নিজেকে আবিষ্কার করলাম আবদ্ধ কিছুর মধ্যে। চোখ মেলেই দেখি চারদিক অন্ধকার। আমার শরীরটা পড়ে আছে কোন এক সংকীর্ণ জায়গায়। নিচ থেকে বিচানাটা স্যাঁতস্যাঁতে আর কর্দ্দমাক্ত মনে হচ্ছে। এক অতি সুগন্ধিযুক্ত কিছুর গন্ধে খুবই অস্বস্তিকর লাগছে, সেই সাথে নাক, চোখ, মুখে কোন এক দ্রব্যের উপস্থিতি টের পাচ্ছি যেটার ফলে পুরো মুখমণ্ডল জালা পোড়া করছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দম বন্ধ হয়ে আসল।
নড়ে চড়ে উঠার চেষ্টা করেই বুঝতে পারলাম আমার হাত পা এবং পুরা শরীর কোন কাপড় দ্বারা বাঁধা রয়েছে। কেন এমন হচ্ছে। কোথায় আটকা পড়েছি আমি। কিছুই বুঝতে পারছিনা। আস্তে আস্তে বসতে গিয়ে উপর থেকে ধাক্কা খেয়েই বুঝলাম আমার মাথার ঠিক এক হাতের মধ্যেই শক্ত কোন চাল পাঁতানো হয়েছে। সর্বাঙ্গে বিদ্যুৎ চমকে উঠল যখন বুঝতে পারলাম অন্য কোথাও নয় আমি এমন জায়গায় আবদ্ধ হয়েছি যেখানে মৃত্যুর পর ছাড়া আসা হয়না। তাহলে কি আমি মরে গেছি? আমাকে কি কবরস্থ করা হয়েছে? গায়ে চিমটি কাটলাম। না তো আমি তো মরি নাই! কিন্তু তবুও আমি কেন কবরে শোয়া? না কি কবর জীবনের প্রথম ধাপ হিসেবেই আমাকে জাগ্রত করা হয়েছে! এই বুঝি মুনকার নাকির এসে জিজ্ঞাসা করবেন-মান রব্বুকা? ভয়ে আড়স্ত হয়ে পড়লাম। না... এ হতেই পারেনা। আমি তো সম্পূর্ণ জীবন্ত। আমার এখনো দুনিয়ার জিন্দেগী শেষই হয় নাই।
তাহলে কেন আমাকে অকালে আখেরাতের জিন্দেগী শুরু করতে হচ্ছে? হয়তো আমার স্বজনেরা মৃত ভেবেই আমাকে কবরস্থ করেছে। কিন্তু এখানে থাকলেতো আমি আসলেই মরে যাব, যা কেউ টেরই পাবে না। সুতরাং আমার হায়াতের পুরোটা পেতে হলে আমাকে অতি সচেতনতার সাথে এখান থেকে উদ্ধার হতে হবে। শুরু হলো নিজের জীবনের উদ্ধার অভিযান। অনেক কবর দেখেছি। কবরের নিয়ম মতে-আমার ডান দিকটা কিছুটা উপরে হবে এবং সমান্তরাল মাটির দেয়ালের সাথে বাঁশের সারট রয়েছে। আমি মাঝ বরাবর গিয়ে একটা সারটের (বাঁশের চেরা) মাঝ বরাবর মাটি খুড়ে হাতের আঙ্গুলগুলো প্রবেশ করালাম। যেখানে একটা গিরা (জোড়া) রয়েছে সেখানটায় শক্ত করে ধরে দু’হাত দিয়ে সজোরে টান দিলাম নিচের দিকে। অমনি মট মট করে বাঁশের চেরাটা ভেঙ্গে গেল। আমি দুই দিক থেকে টেনে টেনে চেরাটাকে সরিয়ে আনলাম। অক্সিজেনের অভাববোধ করছি। দম বন্ধ হয়ে আসছে। একটু দুর্বল হয়ে গেছি। সামান্য সময় অবসর নিলাম। তারপর আবার ঠিক আগের মতই আরেকটা বাঁশের চেরা খুলে ফেললাম। এবার একটু ফাঁকা হল। বাঁশের চেরাগুলো দিয়ে উপরে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মাটি নামিয়ে আনতে লাগলাম। অনেকক্ষণ চেষ্টার পর ছোট একটি গর্ত সৃষ্টি করলাম। যা দিয়ে আকাশ অনুভব করা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এখন সন্ধ্যা নেমেছে। ভেতরে সামান্য আলো পেয়েছি।
তারপর একটু খুশি হলাম এই ভেবে যে যতক্ষণ উদ্ধার হতে পারছিনা ততক্ষণ হয়তোবা আলো বাতাসের কারণে নিজের প্রাণটা বাঁচিয়ে রাখতে পারবো। আবার কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিলাম। একটু উত্তর দিকে সরে গেলাম। নিচে নেমে আসা মাটি গুলোকে পা দিয়ে ঠেলে দক্ষিণ দিকে স্তুপ করতে লাগলাম। কারণ মাটি সরাতে সরাতে আমার গর্তটি ভরাট হয়ে গেলে চেষ্টাটাই বৃথা হয়ে যাবে। কিছুটা অন্ধকার হয়ে আসছে। বুঝতে পারলাম ক্রমশ রাত বাড়ছে। হঠাৎ একটি চিন্তায় আবার গা শিউরে উঠল। আমার করা ছিদ্র দিয়ে যদি কোন বিষধর শাপ ভিতরে ঢুকে পড়ে! তাহলেওতো আমার শেষ রক্ষা হবেনা। সুতরাং রাত বাড়ার আগেই আরো একটি দুটি করে তিনটি বাঁশের ছেরা ভেঙ্গে ফেললাম। আমার দুই হাতের তালু বাঁশের ধারে কেটে গেল। ঝর ঝর করে রক্ত পড়ছে। ব্যথায় আর মাটিও খুঁড়তে পারছিনা। অত্যন্ত ক্লান্ত। সেই সাথে কর্পুরের গন্ধ আর জ্বলায় মুখ যেন পুড়ে যাচ্ছে। চোখ-নাক দিয়ে পানি ঝরছে। মুছার চেষ্টা করে দেখি আরো বেশী জ্বলে। কাফন দিয়ে হাত দুটো বেঁধে ফেললাম। এবার মাটি খুঁড়তে বেশী ব্যাথা করছেনা।
অনেকক্ষণ ধরে মাটি খুঁড়ে বড় একটি গর্ত তৈরি করেছি। চেষ্টা করছি উপরে উঠার জন্য। কিন্তু মাথা উঠাতে পারলেও বুক আটকে যাচ্ছে। আরো কিছুটা মাটি সরিয়ে যেই উপরে উঠার চেষ্টা করলাম অমনি কাঁটা জাতীয় কোন গাছের সাথে লেগে মাথা ও মুখমণ্ডলে মারাত্মক আঘাত পেয়ে সব ছরে গেছে। হাত দিয়েও দেখার সুযোগ নাই। কারণ উঠার জন্য হাত দুটো এবং পা’ দুটোতে ভর করে উপরের দিকে শরীরকে ধাক্কা দিতে হচ্ছে। করার কিছু নাই। আমাকে বাঁচতেই হবে। সুতরাং কাঁটার আঘাতকে সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই। দীর্ঘ সাধনার পর মাথা উঠিয়ে দুনিয়ার আলো বাতাসের দেখা মেলল। নিজেকে আবিস্কার করলাম প্রিয় জন্মভূমির অতি চেনা একটি জনপ্রিয় কবরস্থানে। যেখানে প্রভাবশালী লোকেদের ইতিপূর্বে সমাহিত করা হয়েছে। দ্বীপের কল্যাণে নিয়োজিত একটি সংস্থা কর্তৃক এ কবরস্থান নির্মাণ করা হয়েছে।
আমি এখনো আধা ডুবন্ত অবস্থায় আছি। আমার মাথার উপরে কাঁটাগুলো বোঝার মত চেপে আছে। আমি সেগুলোকে সহ আবার উঠার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখলাম এবার আমার পেটের মধ্যমাংশ উঠানো সম্ভব হচ্ছেনা। কিন্তু আর নামতেও ইচ্ছা করছেনা। সজোরে টান মারলাম শরীরকে। কোমরে প্রচন্ড ব্যাথায় কঁকিয়ে চিৎকার করে উঠলাম উ..হ মা....। হঠাৎ আমার জননী মায়ের কথা মনে উঠে গেল। আমার মা- মা কোথায়? মা তো আমার শোকে নিশ্চয় খুবই শোকাহত। ঘুম, খাওয়া ছেড়ে দিয়ে বিলাপ করছে যাদুরে...ও আমার ময়নারে...আমারে ছাড়িয়া তুই কেন গেলিরে...ও মার কলিজার টুকরা রে আমারে শোকের সাগরে কেন ভাসাইলিরে....বুকটা হঠাৎ ধরে উঠল। গলা ধরে নাক চোখ দিয়ে গরম হয়ে হাহাকার ভেসে উঠল। কান্নায় চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিনা। রাত অনেক হয়ে গেল। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। মনে হয় ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেছে। আমি আবার চেষ্টা করলাম। এক হেচকায় উঠে আসলাম উপরে। কিন্তু মনে হয় কোমর কেটে গেছে। চামড়া ছিঁড়ে গেছে। শুধু অসহনীয় ব্যাথ্যা অনুভব হচ্ছে। হাত দিয়ে অনুমান করলাম রক্ত বের হচ্ছে। কাফনটাকে ব্যান্ডেজ হিসেবে কাজে লাগালাম। শক্ত করে কোমরে বেঁধে নিলাম।
......................চলবে
©somewhere in net ltd.