নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মেহেদী

লিখতে ভালবাসি

মেহেদী৫২

বই পড়তে পছন্দ করি

মেহেদী৫২ › বিস্তারিত পোস্টঃ

বেয়াদবী: একটি আলেখ্য

২৩ শে ডিসেম্বর, ২০১১ দুপুর ২:৪০







‘বেয়াদবী’ শব্দটি আমাদের ভাষায় অতি পরিচিত একটি শব্দ। যত্রতত্র এর ব্যাবহার লক্ষ করা যায়। এর মূল ভাব বা অর্থ যাই হোক না কেন , আমাদের ভাষায় এবং সমাজে এমন একটি ভাব বা অর্থ ধারণ করেছে যেটি একমুখী; এনেকটা একমুখী বিক্রিয়ার মতন।একদিকেই শুধুমাত্র প্রবাহিত হতে পারে,বিপরীত দিকে কোনভাবেই ফিরে আসতে পারেনা। একমুখী বিক্রিয়াকে, অনেক সময় চাপ,তাপ এবং প্রভাবক ব্যাবহার করে দ্বিমুখী বিক্রিয়ায় রুপান্তরিত করা সম্ভব কিন্তু এটিকে কোনভাবেই নয়।পানির স্বাভাবিক গতিপথ যেমন নিচের দিকে, এটির সার্বজনীন গতিপথ তেমনি উপরের দিকে। অর্থাৎ ছোটরাই শুধু পারে বড়দের সাথে বেয়াদবী করতে, বড়রা কোনভাবেই না ছোটদের সাথে। বড়রা,ছোটদের সাথে যত অন্যায় আচরণ করুক না কেন,যত অসন্মানই দেখাক না কেন; অন্য কোন শব্দ দিয়ে সেটি প্রকাশ হবে কিন্তু বেয়াদবী শব্দটির ব্যাবহার কখনই করা হবেনা। আমাদের সমাজে মধ্যবিত্ত শ্রেণীটি যেহেতু সমাজের সকল প্রকার প্রথা, বন্ধন,নিয়ম-কানুন এবং সংস্কার,অন্য দুটি শ্রেণীর চেয়ে অনেক বেশী তাদের অন্তরে লালন করে এবং মেনে নেয়;সেহেতু আমার আলোচনাটি , মধ্যবিত্ত শ্রেণীটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।





এখন দেখা যাক; আমাদের ছোটদের কোন কোন কাজ বা আচরণকে বেয়াদবী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।প্রথমতঃ কেউ যদি বড়দের সম্মুখে ধূমপান করে বা ধূমপানরত অবস্থায় বড়দের কেউ তাদেরকে দেখে ফেলার পর সে ঐ স্থান থেকে সরে না পরে বা সিগারেটের বাকী অংশটুকু লুকিয়ে না ফেলে। দ্বিতীয়তঃ তাদের প্রতি বড়দের উপদেশ বাণী বর্ষিত হওয়ার সময়, যদি আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য কোন কথা বলার চেষ্টা করে। তৃতীয়তঃ কয়েকজন মিলে কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা, বা যুক্তি উপস্থাপনের সময়; ছোটদের কেউ যদি নিজেদের কোন বলিষ্ঠ যুক্তি উপস্থাপনের চেষ্টা করে বা বড়দের কোন খোড়া যুক্তি ধরিয়ে দিতে চায়। চতুর্থতঃ বড়দের কোন হুকুম বা আদেশকে,তাদের নিজেদের মতের বা চিন্তা ভাবনার সাথে না মেলার কারনে , যদি মেনে না চলে। পঞ্চমতঃ বড়দের সাথে কোথাও দেখা হলে , ছোটরা যদি সালাম না দেয় বা কুশল জিজ্ঞাসা না করে বা দেখামাত্র মাথা নামিয়ে না নেয়।



‘বেয়াদবী’ শব্দটির ব্যুতপত্তিগত অর্থ কি সেটি বোঝার জন্য ব্যাকরণে পন্ডিত হওয়ার দরকার পড়েনা। আদব শব্দটির পুর্বে ‘বে’ উপসর্গ যুক্ত হয়ে , বেয়াদব শব্দটি তৈরী হয়েছে এবং এর পর ‘ঈ’ প্রত্যয় যোগে হয়েছে ‘বেয়াদবী’। বেয়াদব শব্দের অর্থ সন্মান, এবং এর পূর্বে ‘বে’ উপসর্গ যোগে এটি না-বোধক বিশেষণে পরিণত হয়েছে এবং ঈ প্রত্যয় যোগে হয়েছে ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য।তারমানে কাউকে অসন্মান করার ক্রিয়াটির নাম ‘বেয়াদবী’।কে কত টুকু সন্মান পাবে সেটি নির্ভর করে ব্যক্তিটির সামাজিক অবস্থান, সমাজে, রাষ্ট্রে ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অবদানের উপর ।কিন্তু সমাজে, প্রত্যেকটি মানুষের অধিকার আছে ;একজন মানুষ হিসেবে যতটুকু সন্মান তার প্রাপ্য ততটুকু পাওয়া।মানুষ যদি তার প্রাপ্য সন্মানটুকু অপরের নিকট থেকে না পায়, তাহলে সমাজে চরম ভাবে চরম ভাবে বিশৃংখলা তৈরী হবেগতিশীলতা ব্যাহত হবে এবং মানুষ সভ্য সমাজ থেকে বর্বর বা পশু সমাজের দিকে ধাবিত হবে।







এখন দেখতে হবে; সাধারণ ভাবে,মানুষ হিসেবে প্রাপ্য সন্মানের পরিধি কতটুকু।বা কতটুকু পরিধির ভেতরে ঢুকে গেলে তাকে অসন্মান করা হয়।প্রথমতঃ কোন মানুষের একান্ত ব্যাক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করা ।দ্বিতীয়তঃ যেকোন বিষয়ে স্বাধীন মতামত ব্যাক্ত করার অধিকার দেওয়া। তৃতীয়তঃ তার নিজের ক্ষেত্রে তার নিজস্ব চিন্তা ভাবনা প্রসূত সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দেওয়া। চতুর্থতঃ কোন ধরনের সিদ্ধান্তকে তার উপর চাপিয়ে না দেওয়া। পঞ্চমতঃ কোন কথা বা ক্রিয়া দ্বারা তাকে শারিরীক বা মানসিক ভাবে আঘাত না করা।







ভেবে দেখতে হবে,ছোটদের যে সমস্ত সক্রিয়তা বা অক্রিয়তাকে আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজে ‘বেয়াদবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, সেগুলো বেয়াদবী বা অসন্মান করার মধ্যে পড়ে কিনা।প্রথমেই আসে বড়দের সামনে ধূমপান করার বিষয়টি।ধূমপানের মধ্যে যদি চা-পান এর মত শুধু পান করার বিষয়টি বা পান খাওয়ার মত শুধু চিবানোর বিষয়টি থাকত এবং ধুম উদ্গীরনের বিষয়টি না থাকত ,তাহলে সম্ভবত এটিকে বেয়াদবীর মধ্যে ধরা হত না। কারন ধূম উদগীরনের মধ্যে একটি স্বাধীনতার ভাব বর্তমান আছে।বড়রা, ছোটদের কোন স্বাধীন ভাব বা কর্ম সহ্য করতে পারেনা বিধায় এটিকে বেয়াদবীর পর্যায়ভূক্ত করা হয়। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভাল, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ , কোনভাবেই নারী স্বাধীনতা সহ্য করতে পারেনা বিধায়, মেয়েদের ধূমপান করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ। কিন্তু চা-পান করা বা তামাক সহ পান খাওয়া নিষিদ্ধ নয়।







বড়রা মনে করে, যেহেতু তারা পৃথিবীতে আগে এসেছে সেহেতু তাদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান এবং যেকোন বিষয়ে তাদের ধারনা ছোটদের চেয়ে অনেক বেশী এবং পরিপক্ক। এর ফলে তারা জীবন , সমাজ , ধর্ম ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ছোটদের উপর যত্রযত্র উপদেশ বর্ষণ করে বা নিজেদের মধ্যে কোন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সময় দূরে সরিয়ে রাখে বা মুগ্ধ শ্রোতার কাতারে রাখতে চায়। তারা নিজেদের ভালো লাগা, মন্দ লাগা, আবেগ-অনুভুতি এবং মনগড়া সিদ্ধান্তকে ; জোর পূর্বক ছোটদের উপর চাপিয়ে দিতে চায়।তারা আরো চায় ছোটরা যেন তাদের সামনে গদগদ ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে ,তাদের চোখের দিকে না তাকায়, রাস্তায় দেখা হলে বিশাল একটা সালাম দেয়,আর তারা ,সাধারণ দৃষ্টিতে ধরা পড়েনা এমন ভাবে একটু মাথা দুলিয়ে,বিশাল একটা ভাব নিয়ে গটগট করে হেটে যেতে পারে। এসব কাজ তারা নির্দ্ধিধায়, খোশমেজাজে, ভয়শূন্য চিত্তে , সরল ভাবে করে যেতে পারে ; তাদের প্রতি সমাজের একটা শক্তিশালী পক্ষপাতিত্ত থাকার কারনে।





এখন যদি, একটা ফুটবল ম্যাচের কথা কল্পনা করি; যেখানে বড়রা ও ছোটরা মিলে খেলতে নেমেছে,সেখানে যদি ছোটদের কেউ বড়দের কারুনিকট থেকে বল কেড়ে নিতে নেয়, ঐ সময় যদি অসাবধানতাবশত পায়ের আঘাত লাগে বা বড়দের কেউ যদি বল নিয়ে যাওয়ার সময় ছোটদের নিকট বাধা প্রাপ্ত হয় তাহলে কি কেউ ,চোখ দুটি আগুনের হলকার ন্যায় করে, ব্যাঘ্র গর্জনে বলতে পারবে বেয়াদব; তোর সাহস তো কম নয় আমার সামনে থেকে বল কেড়ে নিস, আমার সামনে বাধা হয়ে দাড়াস , থাপড়িয়ে তোর দাত ফেলে দেব ।তাহলে কি বিষয়টা লোকজনের হাস্যরসের কারন হয়ে দাড়াবেনা? সেরকম, সমাজের ভেতরে ছোটদের প্রতি বড়দের আচরণ , বোধের এবং মানবিকতার দৃষ্টিকোন দিয়ে দেখলে আমরা কি প্রচুর পরিমানে হাসির খোরাক পাবনা? তাহলে আর কষ্ট করে দোকানে গিয়ে কৌতুকের , হাসির নাটকের বা সিনেমার ডিস্ক কেনার দরকার পরবেনা।







ছোটদের আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকার,আত্মসন্মান, ভাবনা-চিন্তা ,স্বাধীন মতপ্রকাশ,মনন, বোধ ও যুক্তিশীলতাকে বেয়াদবী আখ্যা দিয়ে, তাদেরকে দাবিয়ে রাখার অপচেষ্টার ফলে ,তারা নিজেরাও দেবে যাচ্ছে এবং সমাজের অগ্রগতিকে প্রতিহত করছে। ছোটদের সাথে কথা বলার সময় তাদের চিন্তা-ভাবনা করার বা যুক্তিশীলতার আশ্রয় নেয়ার প্রয়োজন পড়েনা, কারন তারা জানে বয়সের দোহাই দিয়ে তারা পার পেয়ে যেতে পারবে।আর ওদিকে ছোটরা মনে করে , তারা যতই চিন্তা-ভাবনা প্রসূত ও যুক্তি গ্রাহ্য কথা বলার ইচ্ছা পোষণ করুক না কেন ,বয়সে ছোট হওয়ার কারনে, তাকে হয়ত কোন কথাই বলতে দেয়া হবেনা। বা বলতে গেলে , সেটা যদি বড়দের মতামতের বিরুদ্ধে যায়,তাহলে তাকে ধমক দিয়ে , সবার সম্মুখে অপমানিত করে থামিয়ে দেয়া হবে।এদিক দিয়ে এভাবেই , আমাদের সমাজে চিন্তা-ভাবনার মানসিকতা ও যুক্তিবোধের প্রয়োগ ক্রমশ ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। ফলে সমাজও সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারছেনা, অন্ধ কানাগলিতে ঘুরে মরছে।









মাঝে মাঝে কথা বলার অনুমতি দেয়া হলেও , বড়দের চোখের দিকে তাকানোর অনুমতি দেয়া হয়না। তারা এই সামান্য বিষয়টাও বুঝতে পারেনা যে, কথা বলার সময় শুধু মুখের ভাষা নয় , চোখের ভাষাটাও অনেক বেশী জরুরি । কারন মানব শরীরে চোখ হচ্ছে সবচেয়ে জীবন্ত এবং প্রতিনিধিত্বশীল প্রত্যঙ্গ। এজন্য বক্তার ভাব ও ভাষা পুরোপুরি বোঝার জন্য তার চোখের দিকে তাকানোর প্রয়োজন হয়।





আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজে,প্রত্যেকটি কথা ও কাজে; ছোটদের বেয়াদব হিসেবে বেয়াদব হিসেবে আখ্যা দেয়া হলেও ঘটনার স্রোত কিন্তু বিপরীত দিকে। ছোটরা বেয়াদবী তো করেইনা বরঞ্চ নিরন্তর বেয়াদবীর শিকার হয়ে তাদের বিবেচনা শক্তি দিন দিন হারিয়ে ফেলছে। সহানুভূতিহীন সমাজের অকুন্ঠ সমর্থন পাওয়া বড়রাই সবচেয়ে বড় বেয়াদব। তারা প্রতিনিয়ত ছোটদের একান্ত ব্যাক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে, আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকার কেড়ে নিয়ে, আত্মসন্মানবোধে আঘাত করে , দিনকে দিন রাতকে রাত বেয়াদবী করে চলেছে।



এখন আমার নিজের কথা বলি। আমি, গুটিকতেক সংবেদনশীল মানুষ বাদে ; আমার পরিচিত সকল বয়স্ক ব্যাক্তিদের নিকট জীবনের কোন না কোন সময়ে পুরোদসতুর এবং প্রচনড বেয়াদব হিসেবে পরিগনিত হয়েছি।যাদেরকে আমি অনেক কাছের, অনেক ভাল, হৃদয়বান এবং উদার মানুষ মনে করেছি, তারা প্রায় প্রত্যেকে আমাকে বেয়াদব বলে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। প্রথমে আমাকে ধমক দিয়ে, চোখ গরম করে আমার ভাবনাকে স্তব্দ করে দিতে চেয়েছে, কিন্তু আমি সরে যাইনি বিধায় আমাকে পরিত্যাগ করে দূরে চলে গিয়েছে। কষ্ট পেয়েছি, বুকের ভেতর বেদনা মোচড় দিয়ে উঠেছে কিন্তু পরক্ষণেই তাদের আহাম্মকির কথা স্মরণ করে , প্রাণ খুলে হেসে নিয়েছি কিছুক্ষণ । অথচ ছোটরা এই প্রচন্ড বেয়াদব মানুষটির সাথে কোন বেয়াদবীতো করেনি , বরঞ্চ আমি ছোটদের নিকট থেকে যে পরিমান হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা, সন্মান, শ্রদ্ধা , স্নেহ, মায়া-মমতা পেয়েছি; এত মেলা-মেশা, এত সংগ দেওয়া,এত মত-বিরোধ হয়েছে যে , এ সঞ্চয়টুকু দিয়ে পাচ ছয়টি মানব জীবন হয়ত আমি কাটিয়ে দিতে পারব।



আর একটি অনভূতির কথা বলি, দুইটি মেয়ে আমার সাথে বড় ভাই –ছোট বোন সম্পর্ক পাতাতে চেয়েছিল , আমি তাদের মুখের উপর না করে দিয়েছি।তাতে তারা কতটুকু মনক্ষুন্ন হয়েছে আমি বুঝতে পেরেছি কিন্তু আমি কতটুকু মনক্ষুন্ন হয়েছি সেটি তারা হয়ত কোন দিন বুঝতে পারবেনা।আমি সকলের বন্ধু হতে চাই ; কারো ,চক্ষু গরম করা বড় ভাই বা বাধ্য অনুগত ছোট ভাই হতে মন সায় দেয় না।





আমাদের নিজেদের ভেতরে বোধের এবং মানবিকতার সঞ্চার করতে , সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে বেয়াদব হওয়া এবং বেয়াদবী করাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আজকে।

বেয়াদবী





‘বেয়াদবী’ শব্দটি আমাদের ভাষায় অতি পরিচিত একটি শব্দ। যত্রতত্র এর ব্যাবহার লক্ষ করা যায়। এর মূল ভাব বা অর্থ যাই হোক না কেন , আমাদের ভাষায় এবং সমাজে এমন একটি ভাব বা অর্থ ধারণ করেছে যেটি একমুখী; এনেকটা একমুখী বিক্রিয়ার মতন।একদিকেই শুধুমাত্র প্রবাহিত হতে পারে,বিপরীত দিকে কোনভাবেই ফিরে আসতে পারেনা। একমুখী বিক্রিয়াকে, অনেক সময় চাপ,তাপ এবং প্রভাবক ব্যাবহার করে দ্বিমুখী বিক্রিয়ায় রুপান্তরিত করা সম্ভব কিন্তু এটিকে কোনভাবেই নয়।পানির স্বাভাবিক গতিপথ যেমন নিচের দিকে, এটির সার্বজনীন গতিপথ তেমনি উপরের দিকে। অর্থাৎ ছোটরাই শুধু পারে বড়দের সাথে বেয়াদবী করতে, বড়রা কোনভাবেই না ছোটদের সাথে। বড়রা,ছোটদের সাথে যত অন্যায় আচরণ করুক না কেন,যত অসন্মানই দেখাক না কেন; অন্য কোন শব্দ দিয়ে সেটি প্রকাশ হবে কিন্তু বেয়াদবী শব্দটির ব্যাবহার কখনই করা হবেনা। আমাদের সমাজে মধ্যবিত্ত শ্রেণীটি যেহেতু সমাজের সকল প্রকার প্রথা, বন্ধন,নিয়ম-কানুন এবং সংস্কার,অন্য দুটি শ্রেণীর চেয়ে অনেক বেশী তাদের অন্তরে লালন করে এবং মেনে নেয়;সেহেতু আমার আলোচনাটি , মধ্যবিত্ত শ্রেণীটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।





এখন দেখা যাক; আমাদের ছোটদের কোন কোন কাজ বা আচরণকে বেয়াদবী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।প্রথমতঃ কেউ যদি বড়দের সম্মুখে ধূমপান করে বা ধূমপানরত অবস্থায় বড়দের কেউ তাদেরকে দেখে ফেলার পর সে ঐ স্থান থেকে সরে না পরে বা সিগারেটের বাকী অংশটুকু লুকিয়ে না ফেলে। দ্বিতীয়তঃ তাদের প্রতি বড়দের উপদেশ বাণী বর্ষিত হওয়ার সময়, যদি আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য কোন কথা বলার চেষ্টা করে। তৃতীয়তঃ কয়েকজন মিলে কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা, বা যুক্তি উপস্থাপনের সময়; ছোটদের কেউ যদি নিজেদের কোন বলিষ্ঠ যুক্তি উপস্থাপনের চেষ্টা করে বা বড়দের কোন খোড়া যুক্তি ধরিয়ে দিতে চায়। চতুর্থতঃ বড়দের কোন হুকুম বা আদেশকে,তাদের নিজেদের মতের বা চিন্তা ভাবনার সাথে না মেলার কারনে , যদি মেনে না চলে। পঞ্চমতঃ বড়দের সাথে কোথাও দেখা হলে , ছোটরা যদি সালাম না দেয় বা কুশল জিজ্ঞাসা না করে বা দেখামাত্র মাথা নামিয়ে না নেয়।



‘বেয়াদবী’ শব্দটির ব্যুতপত্তিগত অর্থ কি সেটি বোঝার জন্য ব্যাকরণে পন্ডিত হওয়ার দরকার পড়েনা। আদব শব্দটির পুর্বে ‘বে’ উপসর্গ যুক্ত হয়ে , বেয়াদব শব্দটি তৈরী হয়েছে এবং এর পর ‘ঈ’ প্রত্যয় যোগে হয়েছে ‘বেয়াদবী’। বেয়াদব শব্দের অর্থ সন্মান, এবং এর পূর্বে ‘বে’ উপসর্গ যোগে এটি না-বোধক বিশেষণে পরিণত হয়েছে এবং ঈ প্রত্যয় যোগে হয়েছে ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য।তারমানে কাউকে অসন্মান করার ক্রিয়াটির নাম ‘বেয়াদবী’।কে কত টুকু সন্মান পাবে সেটি নির্ভর করে ব্যক্তিটির সামাজিক অবস্থান, সমাজে, রাষ্ট্রে ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অবদানের উপর ।কিন্তু সমাজে, প্রত্যেকটি মানুষের অধিকার আছে ;একজন মানুষ হিসেবে যতটুকু সন্মান তার প্রাপ্য ততটুকু পাওয়া।মানুষ যদি তার প্রাপ্য সন্মানটুকু অপরের নিকট থেকে না পায়, তাহলে সমাজে চরম ভাবে চরম ভাবে বিশৃংখলা তৈরী হবেগতিশীলতা ব্যাহত হবে এবং মানুষ সভ্য সমাজ থেকে বর্বর বা পশু সমাজের দিকে ধাবিত হবে।







এখন দেখতে হবে; সাধারণ ভাবে,মানুষ হিসেবে প্রাপ্য সন্মানের পরিধি কতটুকু।বা কতটুকু পরিধির ভেতরে ঢুকে গেলে তাকে অসন্মান করা হয়।প্রথমতঃ কোন মানুষের একান্ত ব্যাক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করা ।দ্বিতীয়তঃ যেকোন বিষয়ে স্বাধীন মতামত ব্যাক্ত করার অধিকার দেওয়া। তৃতীয়তঃ তার নিজের ক্ষেত্রে তার নিজস্ব চিন্তা ভাবনা প্রসূত সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দেওয়া। চতুর্থতঃ কোন ধরনের সিদ্ধান্তকে তার উপর চাপিয়ে না দেওয়া। পঞ্চমতঃ কোন কথা বা ক্রিয়া দ্বারা তাকে শারিরীক বা মানসিক ভাবে আঘাত না করা।







ভেবে দেখতে হবে,ছোটদের যে সমস্ত সক্রিয়তা বা অক্রিয়তাকে আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজে ‘বেয়াদবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, সেগুলো বেয়াদবী বা অসন্মান করার মধ্যে পড়ে কিনা।প্রথমেই আসে বড়দের সামনে ধূমপান করার বিষয়টি।ধূমপানের মধ্যে যদি চা-পান এর মত শুধু পান করার বিষয়টি বা পান খাওয়ার মত শুধু চিবানোর বিষয়টি থাকত এবং ধুম উদ্গীরনের বিষয়টি না থাকত ,তাহলে সম্ভবত এটিকে বেয়াদবীর মধ্যে ধরা হত না। কারন ধূম উদগীরনের মধ্যে একটি স্বাধীনতার ভাব বর্তমান আছে।বড়রা, ছোটদের কোন স্বাধীন ভাব বা কর্ম সহ্য করতে পারেনা বিধায় এটিকে বেয়াদবীর পর্যায়ভূক্ত করা হয়। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভাল, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ , কোনভাবেই নারী স্বাধীনতা সহ্য করতে পারেনা বিধায়, মেয়েদের ধূমপান করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ। কিন্তু চা-পান করা বা তামাক সহ পান খাওয়া নিষিদ্ধ নয়।







বড়রা মনে করে, যেহেতু তারা পৃথিবীতে আগে এসেছে সেহেতু তাদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান এবং যেকোন বিষয়ে তাদের ধারনা ছোটদের চেয়ে অনেক বেশী এবং পরিপক্ক। এর ফলে তারা জীবন , সমাজ , ধর্ম ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ছোটদের উপর যত্রযত্র উপদেশ বর্ষণ করে বা নিজেদের মধ্যে কোন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সময় দূরে সরিয়ে রাখে বা মুগ্ধ শ্রোতার কাতারে রাখতে চায়। তারা নিজেদের ভালো লাগা, মন্দ লাগা, আবেগ-অনুভুতি এবং মনগড়া সিদ্ধান্তকে ; জোর পূর্বক ছোটদের উপর চাপিয়ে দিতে চায়।তারা আরো চায় ছোটরা যেন তাদের সামনে গদগদ ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে ,তাদের চোখের দিকে না তাকায়, রাস্তায় দেখা হলে বিশাল একটা সালাম দেয়,আর তারা ,সাধারণ দৃষ্টিতে ধরা পড়েনা এমন ভাবে একটু মাথা দুলিয়ে,বিশাল একটা ভাব নিয়ে গটগট করে হেটে যেতে পারে। এসব কাজ তারা নির্দ্ধিধায়, খোশমেজাজে, ভয়শূন্য চিত্তে , সরল ভাবে করে যেতে পারে ; তাদের প্রতি সমাজের একটা শক্তিশালী পক্ষপাতিত্ত থাকার কারনে।





এখন যদি, একটা ফুটবল ম্যাচের কথা কল্পনা করি; যেখানে বড়রা ও ছোটরা মিলে খেলতে নেমেছে,সেখানে যদি ছোটদের কেউ বড়দের কারুনিকট থেকে বল কেড়ে নিতে নেয়, ঐ সময় যদি অসাবধানতাবশত পায়ের আঘাত লাগে বা বড়দের কেউ যদি বল নিয়ে যাওয়ার সময় ছোটদের নিকট বাধা প্রাপ্ত হয় তাহলে কি কেউ ,চোখ দুটি আগুনের হলকার ন্যায় করে, ব্যাঘ্র গর্জনে বলতে পারবে বেয়াদব; তোর সাহস তো কম নয় আমার সামনে থেকে বল কেড়ে নিস, আমার সামনে বাধা হয়ে দাড়াস , থাপড়িয়ে তোর দাত ফেলে দেব ।তাহলে কি বিষয়টা লোকজনের হাস্যরসের কারন হয়ে দাড়াবেনা? সেরকম, সমাজের ভেতরে ছোটদের প্রতি বড়দের আচরণ , বোধের এবং মানবিকতার দৃষ্টিকোন দিয়ে দেখলে আমরা কি প্রচুর পরিমানে হাসির খোরাক পাবনা? তাহলে আর কষ্ট করে দোকানে গিয়ে কৌতুকের , হাসির নাটকের বা সিনেমার ডিস্ক কেনার দরকার পরবেনা।







ছোটদের আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকার,আত্মসন্মান, ভাবনা-চিন্তা ,স্বাধীন মতপ্রকাশ,মনন, বোধ ও যুক্তিশীলতাকে বেয়াদবী আখ্যা দিয়ে, তাদেরকে দাবিয়ে রাখার অপচেষ্টার ফলে ,তারা নিজেরাও দেবে যাচ্ছে এবং সমাজের অগ্রগতিকে প্রতিহত করছে। ছোটদের সাথে কথা বলার সময় তাদের চিন্তা-ভাবনা করার বা যুক্তিশীলতার আশ্রয় নেয়ার প্রয়োজন পড়েনা, কারন তারা জানে বয়সের দোহাই দিয়ে তারা পার পেয়ে যেতে পারবে।আর ওদিকে ছোটরা মনে করে , তারা যতই চিন্তা-ভাবনা প্রসূত ও যুক্তি গ্রাহ্য কথা বলার ইচ্ছা পোষণ করুক না কেন ,বয়সে ছোট হওয়ার কারনে, তাকে হয়ত কোন কথাই বলতে দেয়া হবেনা। বা বলতে গেলে , সেটা যদি বড়দের মতামতের বিরুদ্ধে যায়,তাহলে তাকে ধমক দিয়ে , সবার সম্মুখে অপমানিত করে থামিয়ে দেয়া হবে।এদিক দিয়ে এভাবেই , আমাদের সমাজে চিন্তা-ভাবনার মানসিকতা ও যুক্তিবোধের প্রয়োগ ক্রমশ ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। ফলে সমাজও সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারছেনা, অন্ধ কানাগলিতে ঘুরে মরছে।









মাঝে মাঝে কথা বলার অনুমতি দেয়া হলেও , বড়দের চোখের দিকে তাকানোর অনুমতি দেয়া হয়না। তারা এই সামান্য বিষয়টাও বুঝতে পারেনা যে, কথা বলার সময় শুধু মুখের ভাষা নয় , চোখের ভাষাটাও অনেক বেশী জরুরি । কারন মানব শরীরে চোখ হচ্ছে সবচেয়ে জীবন্ত এবং প্রতিনিধিত্বশীল প্রত্যঙ্গ। এজন্য বক্তার ভাব ও ভাষা পুরোপুরি বোঝার জন্য তার চোখের দিকে তাকানোর প্রয়োজন হয়।





আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজে,প্রত্যেকটি কথা ও কাজে; ছোটদের বেয়াদব হিসেবে বেয়াদব হিসেবে আখ্যা দেয়া হলেও ঘটনার স্রোত কিন্তু বিপরীত দিকে। ছোটরা বেয়াদবী তো করেইনা বরঞ্চ নিরন্তর বেয়াদবীর শিকার হয়ে তাদের বিবেচনা শক্তি দিন দিন হারিয়ে ফেলছে। সহানুভূতিহীন সমাজের অকুন্ঠ সমর্থন পাওয়া বড়রাই সবচেয়ে বড় বেয়াদব। তারা প্রতিনিয়ত ছোটদের একান্ত ব্যাক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে, আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকার কেড়ে নিয়ে, আত্মসন্মানবোধে আঘাত করে , দিনকে দিন রাতকে রাত বেয়াদবী করে চলেছে।



এখন আমার নিজের কথা বলি। আমি, গুটিকতেক সংবেদনশীল মানুষ বাদে ; আমার পরিচিত সকল বয়স্ক ব্যাক্তিদের নিকট জীবনের কোন না কোন সময়ে পুরোদসতুর এবং প্রচনড বেয়াদব হিসেবে পরিগনিত হয়েছি।যাদেরকে আমি অনেক কাছের, অনেক ভাল, হৃদয়বান এবং উদার মানুষ মনে করেছি, তারা প্রায় প্রত্যেকে আমাকে বেয়াদব বলে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। প্রথমে আমাকে ধমক দিয়ে, চোখ গরম করে আমার ভাবনাকে স্তব্দ করে দিতে চেয়েছে, কিন্তু আমি সরে যাইনি বিধায় আমাকে পরিত্যাগ করে দূরে চলে গিয়েছে। কষ্ট পেয়েছি, বুকের ভেতর বেদনা মোচড় দিয়ে উঠেছে কিন্তু পরক্ষণেই তাদের আহাম্মকির কথা স্মরণ করে , প্রাণ খুলে হেসে নিয়েছি কিছুক্ষণ । অথচ ছোটরা এই প্রচন্ড বেয়াদব মানুষটির সাথে কোন বেয়াদবীতো করেনি , বরঞ্চ আমি ছোটদের নিকট থেকে যে পরিমান হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা, সন্মান, শ্রদ্ধা , স্নেহ, মায়া-মমতা পেয়েছি; এত মেলা-মেশা, এত সংগ দেওয়া,এত মত-বিরোধ হয়েছে যে , এ সঞ্চয়টুকু দিয়ে পাচ ছয়টি মানব জীবন হয়ত আমি কাটিয়ে দিতে পারব।



আর একটি অনভূতির কথা বলি, দুইটি মেয়ে আমার সাথে বড় ভাই –ছোট বোন সম্পর্ক পাতাতে চেয়েছিল , আমি তাদের মুখের উপর না করে দিয়েছি।তাতে তারা কতটুকু মনক্ষুন্ন হয়েছে আমি বুঝতে পেরেছি কিন্তু আমি কতটুকু মনক্ষুন্ন হয়েছি সেটি তারা হয়ত কোন দিন বুঝতে পারবেনা।আমি সকলের বন্ধু হতে চাই ; কারো ,চক্ষু গরম করা বড় ভাই বা বাধ্য অনুগত ছোট ভাই হতে মন সায় দেয় না।





আমাদের নিজেদের ভেতরে বোধের এবং মানবিকতার সঞ্চার করতে , সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে বেয়াদব হওয়া এবং বেয়াদবী করাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আজকে।

বেয়াদবী





‘বেয়াদবী’ শব্দটি আমাদের ভাষায় অতি পরিচিত একটি শব্দ। যত্রতত্র এর ব্যাবহার লক্ষ করা যায়। এর মূল ভাব বা অর্থ যাই হোক না কেন , আমাদের ভাষায় এবং সমাজে এমন একটি ভাব বা অর্থ ধারণ করেছে যেটি একমুখী; এনেকটা একমুখী বিক্রিয়ার মতন।একদিকেই শুধুমাত্র প্রবাহিত হতে পারে,বিপরীত দিকে কোনভাবেই ফিরে আসতে পারেনা। একমুখী বিক্রিয়াকে, অনেক সময় চাপ,তাপ এবং প্রভাবক ব্যাবহার করে দ্বিমুখী বিক্রিয়ায় রুপান্তরিত করা সম্ভব কিন্তু এটিকে কোনভাবেই নয়।পানির স্বাভাবিক গতিপথ যেমন নিচের দিকে, এটির সার্বজনীন গতিপথ তেমনি উপরের দিকে। অর্থাৎ ছোটরাই শুধু পারে বড়দের সাথে বেয়াদবী করতে, বড়রা কোনভাবেই না ছোটদের সাথে। বড়রা,ছোটদের সাথে যত অন্যায় আচরণ করুক না কেন,যত অসন্মানই দেখাক না কেন; অন্য কোন শব্দ দিয়ে সেটি প্রকাশ হবে কিন্তু বেয়াদবী শব্দটির ব্যাবহার কখনই করা হবেনা। আমাদের সমাজে মধ্যবিত্ত শ্রেণীটি যেহেতু সমাজের সকল প্রকার প্রথা, বন্ধন,নিয়ম-কানুন এবং সংস্কার,অন্য দুটি শ্রেণীর চেয়ে অনেক বেশী তাদের অন্তরে লালন করে এবং মেনে নেয়;সেহেতু আমার আলোচনাটি , মধ্যবিত্ত শ্রেণীটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।





এখন দেখা যাক; আমাদের ছোটদের কোন কোন কাজ বা আচরণকে বেয়াদবী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।প্রথমতঃ কেউ যদি বড়দের সম্মুখে ধূমপান করে বা ধূমপানরত অবস্থায় বড়দের কেউ তাদেরকে দেখে ফেলার পর সে ঐ স্থান থেকে সরে না পরে বা সিগারেটের বাকী অংশটুকু লুকিয়ে না ফেলে। দ্বিতীয়তঃ তাদের প্রতি বড়দের উপদেশ বাণী বর্ষিত হওয়ার সময়, যদি আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য কোন কথা বলার চেষ্টা করে। তৃতীয়তঃ কয়েকজন মিলে কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা, বা যুক্তি উপস্থাপনের সময়; ছোটদের কেউ যদি নিজেদের কোন বলিষ্ঠ যুক্তি উপস্থাপনের চেষ্টা করে বা বড়দের কোন খোড়া যুক্তি ধরিয়ে দিতে চায়। চতুর্থতঃ বড়দের কোন হুকুম বা আদেশকে,তাদের নিজেদের মতের বা চিন্তা ভাবনার সাথে না মেলার কারনে , যদি মেনে না চলে। পঞ্চমতঃ বড়দের সাথে কোথাও দেখা হলে , ছোটরা যদি সালাম না দেয় বা কুশল জিজ্ঞাসা না করে বা দেখামাত্র মাথা নামিয়ে না নেয়।



‘বেয়াদবী’ শব্দটির ব্যুতপত্তিগত অর্থ কি সেটি বোঝার জন্য ব্যাকরণে পন্ডিত হওয়ার দরকার পড়েনা। আদব শব্দটির পুর্বে ‘বে’ উপসর্গ যুক্ত হয়ে , বেয়াদব শব্দটি তৈরী হয়েছে এবং এর পর ‘ঈ’ প্রত্যয় যোগে হয়েছে ‘বেয়াদবী’। বেয়াদব শব্দের অর্থ সন্মান, এবং এর পূর্বে ‘বে’ উপসর্গ যোগে এটি না-বোধক বিশেষণে পরিণত হয়েছে এবং ঈ প্রত্যয় যোগে হয়েছে ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য।তারমানে কাউকে অসন্মান করার ক্রিয়াটির নাম ‘বেয়াদবী’।কে কত টুকু সন্মান পাবে সেটি নির্ভর করে ব্যক্তিটির সামাজিক অবস্থান, সমাজে, রাষ্ট্রে ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অবদানের উপর ।কিন্তু সমাজে, প্রত্যেকটি মানুষের অধিকার আছে ;একজন মানুষ হিসেবে যতটুকু সন্মান তার প্রাপ্য ততটুকু পাওয়া।মানুষ যদি তার প্রাপ্য সন্মানটুকু অপরের নিকট থেকে না পায়, তাহলে সমাজে চরম ভাবে চরম ভাবে বিশৃংখলা তৈরী হবেগতিশীলতা ব্যাহত হবে এবং মানুষ সভ্য সমাজ থেকে বর্বর বা পশু সমাজের দিকে ধাবিত হবে।







এখন দেখতে হবে; সাধারণ ভাবে,মানুষ হিসেবে প্রাপ্য সন্মানের পরিধি কতটুকু।বা কতটুকু পরিধির ভেতরে ঢুকে গেলে তাকে অসন্মান করা হয়।প্রথমতঃ কোন মানুষের একান্ত ব্যাক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করা ।দ্বিতীয়তঃ যেকোন বিষয়ে স্বাধীন মতামত ব্যাক্ত করার অধিকার দেওয়া। তৃতীয়তঃ তার নিজের ক্ষেত্রে তার নিজস্ব চিন্তা ভাবনা প্রসূত সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দেওয়া। চতুর্থতঃ কোন ধরনের সিদ্ধান্তকে তার উপর চাপিয়ে না দেওয়া। পঞ্চমতঃ কোন কথা বা ক্রিয়া দ্বারা তাকে শারিরীক বা মানসিক ভাবে আঘাত না করা।







ভেবে দেখতে হবে,ছোটদের যে সমস্ত সক্রিয়তা বা অক্রিয়তাকে আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজে ‘বেয়াদবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, সেগুলো বেয়াদবী বা অসন্মান করার মধ্যে পড়ে কিনা।প্রথমেই আসে বড়দের সামনে ধূমপান করার বিষয়টি।ধূমপানের মধ্যে যদি চা-পান এর মত শুধু পান করার বিষয়টি বা পান খাওয়ার মত শুধু চিবানোর বিষয়টি থাকত এবং ধুম উদ্গীরনের বিষয়টি না থাকত ,তাহলে সম্ভবত এটিকে বেয়াদবীর মধ্যে ধরা হত না। কারন ধূম উদগীরনের মধ্যে একটি স্বাধীনতার ভাব বর্তমান আছে।বড়রা, ছোটদের কোন স্বাধীন ভাব বা কর্ম সহ্য করতে পারেনা বিধায় এটিকে বেয়াদবীর পর্যায়ভূক্ত করা হয়। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভাল, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ , কোনভাবেই নারী স্বাধীনতা সহ্য করতে পারেনা বিধায়, মেয়েদের ধূমপান করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ। কিন্তু চা-পান করা বা তামাক সহ পান খাওয়া নিষিদ্ধ নয়।







বড়রা মনে করে, যেহেতু তারা পৃথিবীতে আগে এসেছে সেহেতু তাদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান এবং যেকোন বিষয়ে তাদের ধারনা ছোটদের চেয়ে অনেক বেশী এবং পরিপক্ক। এর ফলে তারা জীবন , সমাজ , ধর্ম ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ছোটদের উপর যত্রযত্র উপদেশ বর্ষণ করে বা নিজেদের মধ্যে কোন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সময় দূরে সরিয়ে রাখে বা মুগ্ধ শ্রোতার কাতারে রাখতে চায়। তারা নিজেদের ভালো লাগা, মন্দ লাগা, আবেগ-অনুভুতি এবং মনগড়া সিদ্ধান্তকে ; জোর পূর্বক ছোটদের উপর চাপিয়ে দিতে চায়।তারা আরো চায় ছোটরা যেন তাদের সামনে গদগদ ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে ,তাদের চোখের দিকে না তাকায়, রাস্তায় দেখা হলে বিশাল একটা সালাম দেয়,আর তারা ,সাধারণ দৃষ্টিতে ধরা পড়েনা এমন ভাবে একটু মাথা দুলিয়ে,বিশাল একটা ভাব নিয়ে গটগট করে হেটে যেতে পারে। এসব কাজ তারা নির্দ্ধিধায়, খোশমেজাজে, ভয়শূন্য চিত্তে , সরল ভাবে করে যেতে পারে ; তাদের প্রতি সমাজের একটা শক্তিশালী পক্ষপাতিত্ত থাকার কারনে।





এখন যদি, একটা ফুটবল ম্যাচের কথা কল্পনা করি; যেখানে বড়রা ও ছোটরা মিলে খেলতে নেমেছে,সেখানে যদি ছোটদের কেউ বড়দের কারুনিকট থেকে বল কেড়ে নিতে নেয়, ঐ সময় যদি অসাবধানতাবশত পায়ের আঘাত লাগে বা বড়দের কেউ যদি বল নিয়ে যাওয়ার সময় ছোটদের নিকট বাধা প্রাপ্ত হয় তাহলে কি কেউ ,চোখ দুটি আগুনের হলকার ন্যায় করে, ব্যাঘ্র গর্জনে বলতে পারবে বেয়াদব; তোর সাহস তো কম নয় আমার সামনে থেকে বল কেড়ে নিস, আমার সামনে বাধা হয়ে দাড়াস , থাপড়িয়ে তোর দাত ফেলে দেব ।তাহলে কি বিষয়টা লোকজনের হাস্যরসের কারন হয়ে দাড়াবেনা? সেরকম, সমাজের ভেতরে ছোটদের প্রতি বড়দের আচরণ , বোধের এবং মানবিকতার দৃষ্টিকোন দিয়ে দেখলে আমরা কি প্রচুর পরিমানে হাসির খোরাক পাবনা? তাহলে আর কষ্ট করে দোকানে গিয়ে কৌতুকের , হাসির নাটকের বা সিনেমার ডিস্ক কেনার দরকার পরবেনা।







ছোটদের আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকার,আত্মসন্মান, ভাবনা-চিন্তা ,স্বাধীন মতপ্রকাশ,মনন, বোধ ও যুক্তিশীলতাকে বেয়াদবী আখ্যা দিয়ে, তাদেরকে দাবিয়ে রাখার অপচেষ্টার ফলে ,তারা নিজেরাও দেবে যাচ্ছে এবং সমাজের অগ্রগতিকে প্রতিহত করছে। ছোটদের সাথে কথা বলার সময় তাদের চিন্তা-ভাবনা করার বা যুক্তিশীলতার আশ্রয় নেয়ার প্রয়োজন পড়েনা, কারন তারা জানে বয়সের দোহাই দিয়ে তারা পার পেয়ে যেতে পারবে।আর ওদিকে ছোটরা মনে করে , তারা যতই চিন্তা-ভাবনা প্রসূত ও যুক্তি গ্রাহ্য কথা বলার ইচ্ছা পোষণ করুক না কেন ,বয়সে ছোট হওয়ার কারনে, তাকে হয়ত কোন কথাই বলতে দেয়া হবেনা। বা বলতে গেলে , সেটা যদি বড়দের মতামতের বিরুদ্ধে যায়,তাহলে তাকে ধমক দিয়ে , সবার সম্মুখে অপমানিত করে থামিয়ে দেয়া হবে।এদিক দিয়ে এভাবেই , আমাদের সমাজে চিন্তা-ভাবনার মানসিকতা ও যুক্তিবোধের প্রয়োগ ক্রমশ ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। ফলে সমাজও সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারছেনা, অন্ধ কানাগলিতে ঘুরে মরছে।









মাঝে মাঝে কথা বলার অনুমতি দেয়া হলেও , বড়দের চোখের দিকে তাকানোর অনুমতি দেয়া হয়না। তারা এই সামান্য বিষয়টাও বুঝতে পারেনা যে, কথা বলার সময় শুধু মুখের ভাষা নয় , চোখের ভাষাটাও অনেক বেশী জরুরি । কারন মানব শরীরে চোখ হচ্ছে সবচেয়ে জীবন্ত এবং প্রতিনিধিত্বশীল প্রত্যঙ্গ। এজন্য বক্তার ভাব ও ভাষা পুরোপুরি বোঝার জন্য তার চোখের দিকে তাকানোর প্রয়োজন হয়।





আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজে,প্রত্যেকটি কথা ও কাজে; ছোটদের বেয়াদব হিসেবে বেয়াদব হিসেবে আখ্যা দেয়া হলেও ঘটনার স্রোত কিন্তু বিপরীত দিকে। ছোটরা বেয়াদবী তো করেইনা বরঞ্চ নিরন্তর বেয়াদবীর শিকার হয়ে তাদের বিবেচনা শক্তি দিন দিন হারিয়ে ফেলছে। সহানুভূতিহীন সমাজের অকুন্ঠ সমর্থন পাওয়া বড়রাই সবচেয়ে বড় বেয়াদব। তারা প্রতিনিয়ত ছোটদের একান্ত ব্যাক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে, আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকার কেড়ে নিয়ে, আত্মসন্মানবোধে আঘাত করে , দিনকে দিন রাতকে রাত বেয়াদবী করে চলেছে।



এখন আমার নিজের কথা বলি। আমি, গুটিকতেক সংবেদনশীল মানুষ বাদে ; আমার পরিচিত সকল বয়স্ক ব্যাক্তিদের নিকট জীবনের কোন না কোন সময়ে পুরোদসতুর এবং প্রচনড বেয়াদব হিসেবে পরিগনিত হয়েছি।যাদেরকে আমি অনেক কাছের, অনেক ভাল, হৃদয়বান এবং উদার মানুষ মনে করেছি, তারা প্রায় প্রত্যেকে আমাকে বেয়াদব বলে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। প্রথমে আমাকে ধমক দিয়ে, চোখ গরম করে আমার ভাবনাকে স্তব্দ করে দিতে চেয়েছে, কিন্তু আমি সরে যাইনি বিধায় আমাকে পরিত্যাগ করে দূরে চলে গিয়েছে। কষ্ট পেয়েছি, বুকের ভেতর বেদনা মোচড় দিয়ে উঠেছে কিন্তু পরক্ষণেই তাদের আহাম্মকির কথা স্মরণ করে , প্রাণ খুলে হেসে নিয়েছি কিছুক্ষণ । অথচ ছোটরা এই প্রচন্ড বেয়াদব মানুষটির সাথে কোন বেয়াদবীতো করেনি , বরঞ্চ আমি ছোটদের নিকট থেকে যে পরিমান হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা, সন্মান, শ্রদ্ধা , স্নেহ, মায়া-মমতা পেয়েছি; এত মেলা-মেশা, এত সংগ দেওয়া,এত মত-বিরোধ হয়েছে যে , এ সঞ্চয়টুকু দিয়ে পাচ ছয়টি মানব জীবন হয়ত আমি কাটিয়ে দিতে পারব।



আর একটি অনভূতির কথা বলি, দুইটি মেয়ে আমার সাথে বড় ভাই –ছোট বোন সম্পর্ক পাতাতে চেয়েছিল , আমি তাদের মুখের উপর না করে দিয়েছি।তাতে তারা কতটুকু মনক্ষুন্ন হয়েছে আমি বুঝতে পেরেছি কিন্তু আমি কতটুকু মনক্ষুন্ন হয়েছি সেটি তারা হয়ত কোন দিন বুঝতে পারবেনা।আমি সকলের বন্ধু হতে চাই ; কারো ,চক্ষু গরম করা বড় ভাই বা বাধ্য অনুগত ছোট ভাই হতে মন সায় দেয় না।





আমাদের নিজেদের ভেতরে বোধের এবং মানবিকতার সঞ্চার করতে , সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে বেয়াদব হওয়া এবং বেয়াদবী করাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আজকে।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.