নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

দিনের শেষ আলোকবিন্দু

দিনের শেষ আলোকবিন্দু › বিস্তারিত পোস্টঃ

~~~শেষ প্রহরের মেয়ে~~~

২৪ শে জানুয়ারি, ২০১৫ রাত ১:১৭


1
আমার মা যে কত ভালো মানুষ, সেটা বুঝেছিলাম আমার একমাত্র ফুফু ও ফুফা গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর। নীলিমাকে মা এমনিতেই অনেক আদর করতেন। সেদিন ফুফু-ফুফু মারা যাওয়ার পর নীলিমার সেকি কান্না! নীলিমা আমার ফুফুর একমাত্র মেয়ে ছিল। মাত্র ক্লাস সেভেনেই ওর বাবা-মা কে হারিয়ে যেন অথৈ সাগরে পড়ল মেয়েটা। সেই সাগর থেকে টেনে তুললেন আমার মা। ওর চোঁখের জলগুলো মুছে দিয়ে বলেছিলেন, তোকে আর আমি কাঁদতে দিবনা। আজ থেকে আমিই তোর মা।

সত্যিই সেদিনের পর থেকে নীলিমাকে কেউ কাঁদতে দেখেনি। সব সময় কেমন যেন একটা হাসি হাসি মুখ করে থাকতো মেয়েটা। কেউ না দেখলেও, আমি ঠিকই লুকিয়ে লুকিয়ে ওর কান্না দেখতাম। প্রতিদিন রাতে ছাদের এক কোনে দাড়িয়ে, আকাশের সবচেয়ে উজ্জল তারাটির দিকে তাকিয়ে থাকতো মেয়েটি। জোত্‍্স্নার আলোয় ওর গালে জমা হওয়া জলবিন্দু গুলো চিকচিক করতো। আমি নিরবে চলে আসতাম, কখনোই ওকে কিছু বলতাম না। ওর কান্না কেউ দেখেনি, আমিও না!

2
সেদিন নীলিমাই আমার সাহস জুগিয়েছিল। এরকম উসখো-খুসকো চুল, মোটা গ্লাসের চশমা পরা কোন ছেলের সাথে যে কোন মেয়ে প্রেম করবে, আমি কল্পনাও করতে পারিনি। নীলিমাদের ক্লাসের তৃণা নামের কিউট মেয়েটা যখন আমায়,"লাড্ডু ভাইয়া, লাড্ডু ভাইয়া" বলে ডাকত, আমার যে এত ভালো লাগতো, বলে বুঝাতে পারবনা! কিন্তু অন্য কেউ লাড্ডু বললেই আমি ক্ষেপে যেতাম। ভালো কথা, আমার নাম কিন্তু লাড্ডু না। আমার ভালো একটা নাম আছে, কিন্তু আমার ডাকনাম "লাভলু"। সেখান থেকে কিভাবে কিভাবে যেন লাড্ডু হয়ে গেল। এটা ব্যাকরনের কি নীতিতে হল, অনেক খুজেও বের করতে পারিনি। হয়তবা নিপাতনে সিদ্ধ নীতিতেই হবে! যে নীতিতেই হোকনা কেন, নামটার স্বার্থকতা বুঝেছিলাম তৃণা আমাকে লাড্ডু ভাইয়া ডাকার পর থেকে। তখন সারাদিন শুধু "লাড্ডু ভাইয়া, লাড্ডু ভাইয়া" ডাক শুনতে ইচ্ছে করতো!

অবশেষে আমার আর তৃণার প্রেমটা হয়ে গেল। নীলিমাই আমাদের দেখা করার ব্যবস্থা করে দিত। প্রেমিক হিসেবে যে আমি আস্ত একটা গাধা, সেটা নীলিমা আমায় চোঁখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। উসকো-খুসকো চুল, ইয়া মোটা একটা চশমা, ঢিলা-ঢালা টি-শার্ট এগুলো কি চলে? চেঞ্জ হতে হবে। কিন্তু গাধাকে লেখাপড়া শেখালে কি আর মানুষ হয়? আমিও পারলাম না। তৃণা নামের কিশোরী মেয়েটাও পারলনা মেনে নিতে। আস্তে আস্তে দূরে সরে গেল। হালফ্যাশনের ছেলে আবিরের সাথে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত। বুকের ভিতর কেমন যেন একটা চাপা কষ্ট অনুভব করতাম। তখনই বুঝতে শিখেছিলাম,"বুকের বামপাশটাতে জমাট বাধা চাপা কষ্টটাম নামই ভালোবাসা।"

3
তৃণাকে পুরোপুরি ভুলতে পারিনি, ব্যাথাটা তখনো কমেনি, এমনি এক সন্ধ্যায় আমার "মা" ও আমাকে একা রেখে চলে গেল না ফেরার দেশে। হঠাত্‍ করেই যেন পাথর হয়ে গেলাম। বাবা তো সেই কবেই চলে গেছে, এখন মা ও! সামনে আমার পরীক্ষা, কি করব কিছু ভেবে পাচ্ছিলাম না। ভেবেছিলাম সবকিছু বাদ দিয়ে আমিও মায়ের কাছে চলে যাব। চারিদিকে যখন অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখছিলাম না, তখন নীলিমা আমার মাথায় হাত রেখে বলল, "তুই কি তোর মায়ের স্বপ্নগুলো পুরন করতে পারবিনা? তুই ডাক্তার হয়ে আমাদের গ্রামের সবার ফ্রি চিকিত্‍সা করবি আর সবাই খুশি হয়ে তোকে দোয়া করবে! তোর মায়ের আশাগুলো তুই ভেঙে দিতে পারিসনা তুই। দেখনা, আমার মা-বাবা কেউই নেই, তাই বলে কি আমি তোর মত কাঁদি? কখনো দেখেছিস আমায় কাঁদতে?"
সদ্য এস.এস.সি পাশ করা ছোট্ট মেয়েটি কেমন বড়দের মত কথা বলছে। যেন মা চলে গিয়েও নীলিমাকে রেখে গেছে আমায় শাসন করার জন্য। নীলিমাকে সেদিন খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলাম। সেদিনই প্রথম নীলিমার চোঁখে সবাই জল দেখেছিল!

আমার পরীক্ষার জন্য নীলিমা রয়ে গেল, এরপর ছোট কাকার বাড়িতে চলে যাবে। শুনেছি কাকা নাকি ওর বিয়ে ঠিক করে রেখেছেন! শুধু আমার পরীক্ষাটাই অপেক্ষা।
এই মেয়েটা মনেহয় খুব ভালো মা হবে। শাসন করার ভঙ্গিমাটা ওর অন্যরকম। সারাদিন মেয়েটা একা একা কাজ করতো, রানা করা, ঘর মোছা হতে সব। আমি সাহায্য করতে চাইলে চোঁখ রাঙ্গাত। পরীক্ষার কোন সমস্যা করা চলবেনা, সারাদিন পড়তে হবে। আমি রাত জেগে পড়তাম, নীলিমা পাশে বসে থাকতো, কখনো চা বানিয়ে দিত। ঘুমিয়ে যেতে বললেও ঘুমাতো না। আবার সকালে ঠিকই ওর হাতের ছোয়ায় আমার ঘুম ভাঙত। মাঝে মাঝে কাকা-কাকি আসতো, ওর কাজ দেখে প্রসংসা করতো। তখন ওকে এই বলে জ্বালাতাম, কযেকদিন পর শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে তো, তাই কাজ শিখে নিচ্ছে! তখন ওর সুন্দর মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে যেত। কাকা-কাকি হাসত আর নীলিমা আমায় তেড়ে আসত মারার জন্য।
দেখতে দেখতে আমার পরীক্ষা শেষ হয়ে এলো। হঠাত্‍ই একদিন নীলিমা বললো, আর মাত্র এক সপ্তাহ আছি তোর কি পছন্দ বল, তারপর আর তোকে রান্না করে খাওয়াবোনা, আর জ্বালাতেও পারবিনা আমাকে।
বুকের ভিতর কেমন যেন ব্যাথা অনুভব করলাম! সেই পুরোনো খুব চেনা ব্যাথাটা। নীলিমা কিছু না বলেই আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল, বুকের ব্যাথাটা হু হু করে বেড়ে গেল। সেদিন আর কেউ কারো কান্না থামানোর চেষ্টা করিনি, খুব কেঁদেছিলাম।

এরপরের সাতটা দিন নীলিমা আমার সাথে আর কথা বলেনি! এমনকি কাকার সাথে চলে যাওয়ার সময় "যাই" পর্যন্ত বলেনি। শুধু অর্র্ধসমাপ্ত একটা ডায়েরী দিয়ে গিয়েছে আমায়। ফেলে রেখেছিলাম সেভাবেই। তবে আজ সকাল থেকে পাগলের মত কয়েকবার পড়েছি।
ডায়েরীর শেষ লাইনটা ছিল,"মেয়েরা জীবনে কাউকে একবারই ভালোবাসে, আর একবারই ভুল করে। সেই ভুলটাই করবো। ভালো থাকিস লাড্ডু!!

ডায়েরীটা লিখে লিখে সমাপ্ত করছি। জানিনা লিখে শেষ করতে পারবো কিনা! ঘুমে চোঁখ ভেঙ্গে আসছে। গুনে গুনে মাত্র দুই পাতা ঘুমের ঔষধ খেয়েছি। ও ভালো কথা, সকালেই শুনেছি নীলিমা নাকি বিষ খেয়েছে, বাঁচবেনা মনে হয়!!!

মন্তব্য ৪ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (৪) মন্তব্য লিখুন

১| ২৪ শে জানুয়ারি, ২০১৫ রাত ১:৩০

হাসান মাহমুদ ১২৩৪ বলেছেন: অবেক্ত ভালোবাসা। ভাষা সাবলীল ছিল :)

২৪ শে জানুয়ারি, ২০১৫ সকাল ১০:৩৭

দিনের শেষ আলোকবিন্দু বলেছেন: ধন্যবাদ ভাইয়া। কেবল লিখার চেষ্টা করছি।
ইনশাআল্লাহ আরো ভালো লেখার চেষ্টা করবো।

২| ২৪ শে জানুয়ারি, ২০১৫ সকাল ৯:১১

নিলু বলেছেন: লিখে যান

২৪ শে জানুয়ারি, ২০১৫ সকাল ১০:৩৯

দিনের শেষ আলোকবিন্দু বলেছেন: ধন্যবাদ।
ইনশাআল্লাহ ভালো লেখার চেষ্টা করবো।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.