নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মিশু মিলন

মিশু মিলন

আমি বর্তমানে ইস্টিশন এবং সামহোয়্যার ইন ব্লগে লিখি। আমার সকল লেখা আমি এই দুটি ব্লগেই সংরক্ষণ করে রাখতে চাই। এই দুটি ব্লগের বাইরে অনলাইন পোর্টাল, লিটল ম্যাগাজিন এবং অন্য দু-একটি ব্লগে কিছু লেখা প্রকাশিত হলেও পরবর্তীতে কিছু কিছু লেখা আমি আবার সম্পাদনা করেছি। ফলে ইস্টিশন এবং সামহোয়্যার ইন ব্লগের লেখাই আমার চূড়ান্ত সম্পাদিত লেখা। এই দুটি ব্লগের বাইরে অন্যসব লেখা আমি প্রত্যাহার করছি। মিশু মিলন ঢাকা। ৯ এপ্রিল, ২০১৯।

মিশু মিলন › বিস্তারিত পোস্টঃ

গাওয়াল (উপন্যাস: পর্ব-কুড়ি)

২৪ শে আগস্ট, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:৫২

বৃহন্নলারা থানায় মামলা করেছে। নবিয়াল মেম্বার, ফারুক আর সুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেও পুলিশ ওদের নামে মামলা নেয়নি; মামলা নিয়েছে অজ্ঞাতনামা আসামীর নামে। তিনদিন পেরিয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করেনি পুলিশ। নবিয়াল মেম্বার আর তার চেলারা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অবশ্য নবিয়াল মেম্বার এখন আর মেম্বার নেই, সাবেক মেম্বার; তবু কথা বলার সময় মানুষ এখনো তার নামের পরে মেম্বার শব্দটি ব্যবহার করে, হয়তো অভ্যাসবশত। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সাতশো ভোটে হেরেছে সে। যদিও সর্বত্র তার দলের জয়জয়কার, এবারও তার রাজনৈতিক গুরু খন্দকার আকবর আলী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। তবু বিপুলভোটে নবিয়াল মেম্বার হেরেছে কয়েকটি কেন্দ্রে ভোট কারচুপি এবং গোলযোগ করা সত্ত্বেও; কারণ, তার এবং তার চেলা-চামুণ্ডাদের অত্যাচারে এলাকাবাসী অতিষ্ট। ফলে দল দেখে ভোট না দিয়ে ব্যক্তির কর্মকাণ্ড বিচার করে ভোট দিয়ে এলাকাবাসী হারিয়েছে নবিয়াল মেম্বারকে। অনেকের ধারণা, বৃহন্নলাদের হাতে বাজারের মধ্যে তার মার খাওয়ার ঘটনাটিও প্রভাব ফেলেছে ভোটে; কেননা নবিয়াল মেম্বারের বিরোধীপক্ষ ওই ঘটনাকে আরও ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছিল ভোটের প্রচারণার সময়।

অবশ্য ভোটে হেরে গেলেও আকবর চেয়ারম্যানের আশির্বাদপুষ্ট হওয়ায় এলাকায় নবিয়াল মেম্বারের প্রভাব কিছু কমেনি। কেননা তাদের দল ক্ষমতায়, তাদের দল থেকেই চেয়ারম্যান নির্বাচিত, থানা-পুলিশ সব তাদের হাতের ছায়াতলে। ফলে নির্বাচনে হেরে তৃণমূল পর্যায়ের রাজনীতির ‘মেম্বার’ নামক লোভনীয় পদটি থেকে বিচ্যুত হবার পর নবিয়াল মেম্বারের চেলারা কিছু মানুষের ওপর নির্যাতন এবং কিছু মানুষকে নানাভাবে হয়রানি করেছে। আর ডালিমের মৃত্যুর সঙ্গে বিরোধীপক্ষ নবিয়াল মেম্বারের যোগসূত্র খুঁজলেও তার চেলা-চামুণ্ডারা এলাকায় রটিয়ে দিয়েছে যে ডালিমকে ভূতে মেরেছে। কেউ বিশ্বাস করলো কী করলো না তার ধার ধারলো না তারা। তারা বলে বেড়াতে লাগলো, ডালিম রাত-বিরেতে শ্মশান-গোরস্থানে ঘুরে বেড়াতো। ওর উপর ভূতের নজর ছিল, সেই রাতে শ্মশানঘাটে বাগে পেয়ে মেরে ফেলছে।

নবিয়াল মেম্বারের চেলারা যতোই ভূতের দোহাই দিক, ডালিম যে মানুষের হাতে খুন হয়েছে একথা সচেতন মানুষ যেমন বিশ্বাস করে, তেমনি পুলিশও তা জানে। অবশ্য ভূতে মেরেছে একথা বিশ্বাস করার মানুষও একবারে কম নয়!

কয়েকদিন পর বাজারে পুলিশ এলো ডালিমের মৃত্যু রহস্য তদন্ত করতে। ডালিমের সাথে কার ভাব ছিল, কার গণ্ডগোল ছিল, তা জানতে চাইলো মানুষের কাছে। এরপর বাজার থেকে পুলিশ এলো নীলুর কাছে। নীলু শিমুল গাছের নিচে চেয়ার এবং মোড়া পেতে তাদেরকে বসতে দিলো। তিনজন পুলিশ। তাদের সাথে চৌকিদার আজিজ আর নবিয়াল মেম্বারের দুজন চেলা। নবিয়াল মেম্বারের চেলাদের দেখেই নীলু বুঝে গেছে, তার মিতের খুনের বিচার হবে না। যে দেশে অনেক বড় বড় মানুষের খুনের বিচার হয় না, সেই দেশে অঁজো-পাড়াগাঁয়ের একজন অখ্যাত বৃহন্নলার খুনের বিচার হবে! কয়েকদিন পরই আবার নতুন নতুন খুনের ফাইলের নিচে চাপা পড়ে যাবে তার মিতের খুনের ফাইল।

এসআই নীলুকে জিজ্ঞেস করলো, ‘নাম কী তোর?’

সেদিন শ্মশানে যে এসআই এসেছিল, সে নয়; আরেকজন। ভয়ংকর দৈত্যাকৃতির চেহারা। প্রায় ছয়ফুট লম্বা, মোটা শরীর, কুচকুচে কালো গায়ের রঙ, শ্মশ্রুমুণ্ডিত মুখ ও মুণ্ডিত মস্তক। হাতে বাড়াবাড়ি রকমের মোটা জাতের লোম, অস্বাভাবিক লোম কানেও। রক্তাভ চোখগুলো যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে মাংসল ঘের থেকে। কথা বলে ধমকের সুরে। তার চেহারা দেখে আর ড্রামের আওয়াজের মতো কণ্ঠস্বর শুনে আসামীর রক্তের স্বাভাবিক সঞ্চালন ব্যাহত হবার কথা!

ড্রামের আওয়াজ হলো, ‘নাম কী তোর?’
‘নীলু।’
‘নীলু কী? খা না মোল্লা?’
‘নীলু রুইদাস।’
‘রুইদাস! বাপের জন্মে শুনি নাই! জাইল্যা নাকি তোরা?’
‘না। রুইদাস ঋষি সম্প্রদায়ের পদবি।’
‘ঋষি সম্প্রদায় আবার কী? তন্ত্র-মন্ত্র জানিস নাকি তোরা?

নবিয়াল মেম্বারের একজন চেলা বললো, ‘স্যার মুচি, মুচি।’
‘মুচি! তাই ক! দুই আঙুলে মানুষ তুই, আবার এতো প্যাঁচাস ক্যান? একবারে মুচি কবার পারিস নে? নাকি মুচি কতি লজ্জা করে! বাড়ি কই তোর?’
‘ফরিদপুরের বোয়ালমারী।’
‘এ জাগা কতোদিন আছিস?’
‘ছয় বছর।’
‘কী করিস তুই?’
‘ভাস্কর্য বানাই।’
‘বাব্বা! তুই তো হেভি দামী লোক! ভাস্কর্য বানাস কী দিয়ে, কষ্টিপাথর?’
‘না। বাঁশ-কাঠ দিয়ে।’
‘ও তাই ক। কাঠমিস্ত্রি। তুই তো জবর প্যাঁচাস!’
‘আজ্ঞে কাঠমিস্ত্রি না। শিল্পী।’
‘হু..., আমার বালের শিল্পী!’

নবিয়াল মেম্বারের চেলাদুটো হেসে উঠলো। নীলু চুপ করে অপমান সহ্য করলো। তার মুখের দিকে তাকিয়ে এসআই আবার প্রশ্ন করলো, ‘ডালিম তোর কাছে আসতো ক্যান?’
‘মিতে পাতাইছিলাম।’
‘মিতে না? ভাল। তোর কাছে আসে রাতে থাকতো?’
‘মাঝে মাঝে থাকতো।‘
‘তুই তো বিয়ে করিস নাই, না?’
‘না। বিয়ে করি নাই।’
‘এই জন্যেই একটা হিজড়ার সাথে মিতে পাতাইছিলি! তুই শালা, বাটুল হইলেও বহুত হারামী। ওর সাথে থাকা নিয়ে তোর কি কোনো ঝামেলা-টামেলা হইছিলো নাকি?’

এই লোকটাকে এখন গু’র পোকার মতো মনে হচ্ছে নীলুর, পাটক্ষেতের থিকথিকে দূর্গন্ধযুক্ত গু’র পোকা! তাকালেই ঘেন্নায় নাক-মুখ কুঁচকে যায়, ভেতরে বমির উদ্রেক হয়! থুতু ফেলতে ইচ্ছে করছে ওর মুখের উপর।

কিন্তু ভেতরের ঘৃণা ভেতরে রেখেই নীলু বললো, ‘আজ্ঞে না। মিতের সাথে আমার কোনোদিন কোনো ঝামেলা অয় নাই।’
‘সত্যি কথা ক।’
‘আমি মিথ্যে কথা কই নে।’
‘হুম! ডালিমের সাথে কার কার ঝামেলা ছিল তুই জানিস?’

নবিয়াল মেম্বারের চেলাদের তোয়াক্কা না করে নীলু বললো, ‘নাবিয়াল মেম্বারের সাথে মিতের ঝামেলা অইছিল।’
মাছি তাড়ানোর মতো করে এসআই বললো, ‘সে আমি জানি। এছাড়া আর কারো সাথে ঝামেলা ছিল নাকি তাই ক?’
‘না, আমার জানামতে আর কারো সাথে মিতের ঝামেলা ছিল না।’

পুলিশ আর বেশি কিছু জিজ্ঞাসা করেনি নীলুকে, কেবল তাকে কোথাও যেতে নিষেধ করেছে। কিন্তু নীলু বুঝে গেছে কোনোভাবেই তার মিতের হত্যার বিচার হবে না। নবিয়াল মেম্বার চেয়ারম্যানের ডানহাত। পুলিশ তাদের হাতের পুতুল। যেভাবেই হোক তারা ঘুরিয়ে দেবে মামলার পথ অথবা ঘুম পাড়িয়ে দেবে মামলাটিকে!

এর দু-দিন পরই চৌকিদারের সঙ্গে তিনজন পুলিশ এসে নীলুকে ধরে নিয়ে গেল থানায়। তার নামে ডালিম হত্যার মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে থানায় আটকে রাখলো, মারধর করে তার কাছ থেকে ডালিম হত্যার স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দী নিতে চাইলেও সে মিথ্যে স্বীকারোক্তি দিলো না। প্রচণ্ড মারধর করার পরও নীলুর কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দী আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে পুলিশ তাকে কোর্টে চালান করার সিদ্ধান্ত নিলো।

কিন্তু নীলুকে গ্রেফতারের সংবাদ সেদিনই এলাকায় ছড়িয়ে পড়লো এবং পরদিন কয়েকটি আঞ্চলিক সংবাদপত্রে বেশ গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হলো সংবাদটি। এই সংবাদ শোনামাত্র বৃহন্নলারা সংগঠিত হয়ে নীলুর মুক্তি এবং ডালিম হত্যার প্রকৃত আসামীকে গ্রেফতারের দাবীতে কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে থানা ঘেরাও করে প্রতিবাদ কর্মসূচী পালনের ডাক দিলো এবং এলাকার মানুষের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করে অনুরোধ জানালো এই প্রতিবাদ কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করার জন্য।

নীলুকে কোর্টে চালানের আগেই রবিবার সকাল নয়টায় ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে থানা ঘেরাও করলো সংগঠিত বৃহন্নলা, সাংস্কৃতিক কর্মী, প্রগতিশীল নারী-পুরুষ, ছাত্র-শিক্ষক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সকলের একটাই দাবী, নিরপরাধ নীলুকে মুক্তি দিয়ে তিনদিনের মধ্যে ডালিমের প্রকৃত খুনিকে গ্রেফতার করতে হবে। প্রতিবাদী বক্তব্য আর স্লোগানে মুখরিত হলো থানারোড। দুটো টেলিভিশন এবং কয়েকটি সংবাদপত্রের সাংবাদিকরাও এসেছে সংবাদ সংগ্রহ করতে।

পুলিশ ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি যে ডালিমের মতো সাধারণ একজন বৃহন্নলা খুনের ঘটনায় তাদের এমন বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হবে, অন্য বৃহন্নলারা এতো মানুষকে সংগঠিত করবে আর ঘটনা টিপে দেখার জন্য সাংবাদিকও হাজির হবে। ফলে অবস্থা বেগতিক বুঝে এবং ব্যাপারটা আরও বড় আকার ধারণ করার আগেই থানার ওসি নেতৃত্বদানকারী কয়েকজন বৃহন্নলা, সাংস্কৃতিককর্মী এবং প্রগতিশীল মানুষকে থানার ভেতরে ডেকে নিলো। তাদের পিছু নিলো সাংবাদিকরাও। পরিস্থিতি বুঝে থানার ওসি তাদেরকে আশ্বাস দিলেন, আগামী সাত দিনের মধ্যে ডালিমের খুনিদের গ্রেফতার করা হবে আর নীলুকে কোর্টে চালান করা হবে না, ওর কাছ থেকে ডালিম সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য নিয়ে দু-একদিনের মধ্যেই ওকে ছেড়ে দেওয়া হবে। বৃহন্নলারা ওসির আশ্বাসে সাময়িক শান্ত হলো তবে তারা এটা জানাতে ভুললো না যে নীলুকে যেন শীঘ্রই ছেড়ে দেওয়া হয় আর আসল আসামীদের ধরতে যদি ফের গড়িমসি করা হয় তবে আরও বড় প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হবে।

নীলু পরদিনই থানা থেকে ছাড়া পেলেও ঘরে ফিরতে পারলো না, কিছুটা গোপনে পুলিশই তাকে ভর্তি করলো হাসপাতালে। শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনের ফলে তার জ্বর এসেছে। হাসপাতালে প্রথমদিন ভীষণ জ্বরের ঘোরে কেটেছে তার; কখনো ঘুমে, কখনো আধো জাগরণে কাটলেও কিছুই মনে নেই। হাসপাতালের নার্সরাই তার সেবা-শুশ্রূষা করেছে। দ্বিতীয় দিন সকালে জ্বর কিছুটা কমে দুপুরের পর থেকে আবার বেড়েছে। শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, নার্সদের সাহায্যে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাথরুমে যায়। পুলিশ নীলুর অসুস্থতার খবর গোপন রাখতে চাইলেও গোপন থাকেনি, সংবাদ পেয়ে বিকেলেই তাকে হাসপাতালে দেখতে এসেছে বৃহন্নলারা এবং আরও কয়েকজন, যারা প্রতিবাদ সমাবেশে নেতৃত্ব দিয়েছে।

অন্যরা চলে গেলেও নীলুকে দেখাশোনার জন্য ডালিমের বান্ধবী দীপালি থেকে গেছে হাসপাতালে। দীপালির সঙ্গে নীলুর পরিচয় অনেকদিনের। ডালিমের সঙ্গেই তার আস্তানায় গিয়েছিল দীপালি, থেকেছেও কয়েকবার। দুপুরে জ্বর বাড়ার পর একশো তিনের নিচে আর নামেনি। তিন-চারবার দীপালি তার মাথায় জল দিয়েছে, আর একটু পরপর ন্যাকড়া ভিজিয়ে দিয়েছে জলপট্টি। অনেকরাতে চেয়ারে বসে বেডে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে দীপালি।

দীপালির যখন ঘুম ভাঙলো তখন জানালার বাইরের নিমগাচের পাতায় হাসছে শীতের সকালের নরম রোদ্দুর। কিছুক্ষণ আগেই নীলুর ঘুম ভাঙলেও সে আর ডাকেনি দীপালিকে। জেগে উঠে নীলুর দিকে তাকিয়ে দীপালি বললো, ‘ওমা তুমার ঘুম ভাঙে গেছে! আমি তুমার বড় অলস বউগো নাগর!’

মৃদু হাসলো নীলু। নীলুর সঙ্গে বরাবরই এমন রসিকতা করে দীপালি। ডালিমের সঙ্গে স্টেশনে গেলে দীপালি প্রায়ই রসিকতা করে বলতো, ‘তুমি একলা একলা হাত পুড়াইয়ে বাঁধে খাওয়ার চেয়ে আমারে বিয়ে করে ঘরে আনো গো নাগর, আমি তুমারে রাঁধে খাওয়াবো, আরো কতো আদর-যত্ন করবো!’

ডালিম কপট ধমক দিতো দীপালিকে, ‘অই মাগি, আমার মিতের দিক নজর দিবিনে। মিতেরে আমি বিয়ে দেব লাল টুকটুকে এট্ট মিয়ার সাথে!’

নীলু তার সোজা পা দুটো ভাঁজ করতে যেতেই ব্যথায় ককিয়ে উঠলো। দীপালি বললো, ‘কী অলো?’
নীলু মুখ কুঁচকে বললো, ‘হাঁটুতে খুব ব্যথা, পাও ভাঁজ করবার পারতেছিনে।’
‘জোর কোরো না। উঠে বসে আস্তে আস্তে ভাঁজ করো। শুয়োরের বাচ্চা পুলিশগুলোর শরীলি দয়া-মায়া আছে নাহি!’

হারামী দৈত্যাকৃতির পুলিশটা যখন রুল দিয়ে নীলুর হাঁটুতে বারি দিচ্ছিল, তখন তার মাথার মধ্যে যেন ভূমিকম্প হচ্ছিল! মনে হয়েছিল আর বুঝি সে বাঁচবে না, ফেরা হবে না স্টেশনে, আর কখনোই দেখা হবে না রাঙাবউয়ের মায়ামুখ! এখন ব্যথা থাকলেও তার মনে হচ্ছে নতুন জীবন পেয়েছে সে!

দীপালি নীলুর কপালে হাত রেখে বললো, ‘জ্বর মনে অয় গেছে।’
‘হ, ভোরের দিক গাও ঘামে জ্বর ছাড়ছে।’
‘আস্তে আস্তে ওঠো, হাত-মুখ ধুয়ে আসে ওষুধ খাও।’

হাত-মুখ ধুয়ে এসে কম্বলটা গায়ে জড়িয়ে বেডে বসলো নীলু, কিন্তু সোজা হয়ে বসে থাকতে কষ্ট হওয়ায় বালিশটা দেয়ালে ঠেকিয়ে আধশোয়া হয়ে মাথাটা বালিশে রাখলো। শরীর ভীষণ দূর্বল আর মাথায় যেন পাথর চাপা দেওয়া। দীপালি গেছে হাসপাতালের সামনের হোটেলে, নিজে খেতে আর নীলুর জন্য খাবার আনতে। অন্যান্য বেডের রোগীরা কেউ উঠে পড়েছে, কেউবা এখনো ঘুমোচ্ছে। বালিশে মাথা ঠেকিয়ে নীলু একে একে খুঁটিয়ে দেখছে রোগী আর রোগীর সঙ্গে আসা মানুষেদের। নানান বয়সের রোগী, সঙ্গে আসা লোকেরাও তাই। কারো সাথে একজন, আবার কারো সাথে দু-তিনজন। এই মানুষেরা নিশ্চয় রোগীর মা, বোন, বৌদি, ভাই, সন্তান কিংবা বাবা; ভাবতে ভাবতে নীলুর বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হলো। একটু পরই রুটি আর সবজি নিয়ে ফিরলো দীপালি। খেয়ে ওষুধ খাওয়ার পরপরই পেটের মধ্যে মোচড় দেওয়ায় টয়লেটে গেল নীলু। অনেকক্ষণ পর ফিরে এসে আবার আগের মতো বালিশে মাথা ঠেকালো।

প্রতিবাদ সমাবেশের উত্তাপ নীলু থানায় বন্দী থাকা অবস্থায়ই আঁচ করেছিল। কাল আর জ্বরের বেগে দীপালির সঙ্গে থানা-পুলিশ-প্রতিবাদ সমাবেশ নিয়ে কোনো কথা হয়নি। এখন বালিশে মাথা ঠেকিয়ে সেসবেরই বিস্তারিত শুনলো দীপালির মুখ থেকে, শুনতে শুনতে সেইসব অদেখা-অচেনা মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় চোখ ভিজে গেল তার। মিতেকে যে এতো মানুষ ভালবাসতো তা জানা ছিল না তার। কেবল চোখে পড়েছে কিছু অমানুষকে; যারা তার মিতেকে অপমান করেছে, নানাভাবে ঠকিয়েছে, ইতরভাষায় কথা বলেছে; মিতের সাথে অশালীন আচরণ করেছে। অসভ্যতার উচ্চকণ্ঠের ভিড়ে ভালবাসা কি তবে নীরবেই থাকে, জেগে ওঠে প্রয়োজনে? নীলুর মনে আশার সঞ্চার হলো, এতো মানুষের ভালবাসা বৃথা যেতে পারে না, অনিচ্ছা থাকলেও এবার নিশ্চয় পুলিশ নবিয়াল গংদের গ্রেফতার করতে বাধ্য হবে, বিচার হবে তার প্রাণপ্রিয় মিতের হত্যার।

জ্বর পুরোপুরি সেরে গেলেও নীলুকে আজকের দিনটাও হাসপাতালে থাকতে হলো শারীরিক দূর্বলতার কারণে। দীপালি চলে গেছে, সে-ই যেতে বলেছে। সেই কাল থেকে এক কাপড়ে ছিল স্নানহীন, রাতে ভালমতো ঘুমুতেও পারেনি। দীপালি অবশ্য একজন নার্সকে রাজি করিয়ে ফেলেছিল তার বাসা থেকে স্নান করে আসার জন্য, কিন্তু ওর কষ্টের কথা চিন্তা করে এই বলে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে পাঠিয়েছে যে, তার জ্বর তো এখন নেই, সামান্য দূর্বলতার কারণেই থাকা, রাতটা পার হলে সকালে সে-ও চলে যাবে নিজের আস্তানায়।

দীপালি বিকেলে যাবার আগে নীলুর রাত্রে আর সকালে খাবার জন্য পা-রুটি আর কলা কিনে দিয়ে গেছে, পাশের বেডের রোগীর আত্মীয়দেরকে অনুরোধ করে বারবার বলে গেছে তার দিকে খেয়াল রাখার জন্য, আবার তার হাতে জোর করে তিনশো টাকা গুঁজে দিয়ে গেছে কিছু প্রয়োজন হলে পাশের রোগীর আত্মীয়দের দিয়ে আনিয়ে নেবার জন্য; একথা স্মরণ করাতেও ভোলেনি যে সে যেন একটা ইজিবাইক রিজার্ভ যায়, যাতে দূর্বল শরীরে রাস্তায় দেরি না হয়!

এখন এই রাতেরবেলা অন্য রোগীদের আত্মীয়দেরকে দেখে সকালের মতো তার বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বের হচ্ছে না, বরং এদের দিকে তাকিয়ে ভাল লাগছে দীপালির কথা ভাবতে। দীর্ঘশ্বাস ফেললে যে দীপালিকে ছোট করা হয়!

দেরিতে ঘুম ভাঙায় হাসপাতাল থেকে বের হতেই অনেক বেলা হয়ে গেছে। বাজারে এসে সে যখন ইজিবাইক থেকে মদনের হোটেলের সামনে নামলো তখন প্রায় বারোটা বাজে। তাকে দেখামাত্র আগে মদন ছুটে এসে কুশল জিজ্ঞাসা করলো, পরিচিত আরো কেউ কেউ ছুটে এলো, কেউবা জড়িয়ে ধরলো। তাদের মুখেই সে জানতে পারলো যে পুলিশ প্রথমে ফারুককে ধরেছে, তারপর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ধরেছে আত্মীয়বাড়িতে পালিয়ে থাকা নবিয়াল মেম্বারকে। সুজন এবং অন্য দুই আসামী এখনো পলাতক। নবিয়াল মেম্বার এবং ফারুক দুজনই ডালিমকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে পুলিশের কাছে; নবিয়াল মেম্বারের নির্দেশেই ফারুক, সুজন এবং অন্য দুই আসামী রাতেরবেলা খুন করেছে ডালিমকে।

খুশিতে চোখে জল চলে এলো নীলুর; যাক, মিতের হত্যার বিচার এবার হবে। পুলিশ তার নামে মিথ্যে মামলা দিয়ে ফাঁসাতে চেয়েছিল তাকে, তার স্বীকারোক্তি নিতে না পেরে প্রচণ্ড মেরেছে, শরীরের নানা জায়গায় এখনো ব্যথা, সব যেন একমুহূর্তে ভুলে গেল সে! হৃদয়ের ব্যথার কাছে শরীরের ব্যথা কিছু নয়, ডালিমকে হারানো ব্যথা চিরকাল বইতে হবে তাকে, তবু ডালিমের খুনিরা যে গ্রেফতার হয়েছে এই খবরে যেন তার ব্যথার ভার কিছুটা হলেও কমলো।

খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মদনের হোটেলে ঢুকলো নীলু। ভীষণ ক্ষিদে পেয়েছে তার, মনে হচ্ছে যেন কতোকাল ভাত খায় না সে। মুখটাও কেমন বিস্বাদ হয়ে আছে, ঝাল খেতে ইচ্ছে করছে। বেঞ্চে বসে মদনের উদ্দেশে বললো, ‘মদনদা, কী কী ভর্তা আছে?’
‘আলু ভর্তা, টাকি ভর্তা আর কাঁচকলা ভর্তা।’
‘এট্টু বেশি করে শুকনো মরিচ দিয়ে মাখায়ে দাও।’

একটু পরই মদনের কর্মচারী বিকাশ ভাত আর তিন প্রকার ভর্তার প্লেট তার সামনে রেখে বললো, ‘আর কী দেব দাদা?’ তেলাপিয়া, পাঙ্গাস আর ছোট মাছের চচ্চড়ি আছে।’
‘ছোট মাছের চচ্চড়ি দে।’

তিন প্রকার ভর্তা, ছোট মাছের চচ্চড়ি, আধখানা লেবু আর ছয়টা কাঁচামরিচ সহযোগে পুরো প্লেট ভাত পেটে চালান করে একগ্লাস জল পান করার পর হারানো শক্তির অনেকটাই যেন ফিরে পেয়ে পেছনে ঠেলে দিলো দূর্বলতা। এখন স্নান করার জন্য শরীরটা চিড়বিড় করছে, গায়ের বিটকেলে গন্ধে নিজেরই অস্বস্তি হচ্ছে। কুসুম কুসুম গরম জলে স্নানটা সেরে নিতে পারলেই স্বস্তি।

হোটেল থেকে বেরিয়ে রেললাইন ধরে হাঁটতে লাগলো স্টেশনের দিকে। স্টেশনের দিকে তাকাতেই মনটা আনন্দে ভরে উঠলো তার! মাত্র চারদিন, অথচ মনে হচ্ছে যেন কতোদিন সে এখানে ছিল না! খানিকটা এগোতেই পাশের পায়ে চলা রাস্তা থেকে রেললাইনের ওপর উঠে এলো নবিয়াল মেম্বারের চেলা তারেক আর নাজির। তার পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে ভ্রূ নাচিয়ে নাজির বললো, ‘কিরে গুল্টু, খুঁড়ায়ে খুঁড়ায়ে হাঁটিস ক্যা, পুলিশ তোরে জব্বর চোদন দিছে, না!’

নাজিরের মুখের দিকে একনজর তাকানোর পর রেললাইনের ঘাসের ওপর দৃষ্টি রেখে চুপ করে রইলো নীলু।
আবার মুখ খুললো নাজির, ‘একেকজনের মুহি একেকরহমের কতা শুনি, আসল ঘটনাডা খোলাসা করে ক দেহি, অই খানকি হিজলাডারে তুই মারছিস নাকি ভূতে মারছে?’

‘মিতেরে যারা খুন করিছে তারা ধরা পড়িছে।’

তারেক ধমকালো, ‘চোপ খানকির ছাওয়াল। কারা খুন করিছে তুই দেকছিস, বুকাচুদা! নবিয়াল ভাই ছাড়া পালো বলে।’
‘আমার পথ ছাড়ো।’ বলে নিজেই ওদেরকে পাশ কাটিয়ে যেতে গেলে আবার সামনে দাঁড়ালো নাজির, ‘অই দাঁড়া, দাঁড়া...। তুই-ই মারিস, আর ভূতেই মারুক, আসল কতা অলো তোর ডার্লিং অই খানকি হিজলাডা মরছে। চু চু চুু...আহারে! এহন তুই ফকম-ফাইট খেলবি কার সাথে!’

শেষ কথাটা বলার সময় নাজির তার বাঁ হাতের তর্জনী আর মধ্যমা ফাঁক করে তার মধ্যে ডান হাতের তর্জনী ঢুকিয়ে অশ্লীল ইঙ্গিত করলো। মাথায় রক্ত উঠে গেল নীলুর। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। ডান হাত সজোরে চালালো নাজিরের বাম গালে। চড় খেয়ে নাজির হতবিহ্বল। সে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি নীলু তার গায়ে হাত দেওয়ার সাহস দেখাবে!

‘শালার বিটা, কুত্তার বাচ্চা গুল্টু!’

গালি দিয়ে হুঙ্কার ছেড়ে হিংস্র পশুর মতো নীলুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো নাজির। তারেকও হাত লাগালো। শক্তিতে ওদের সাথে নীলুর পারার কথা নয়। পারলোও না। ওদের এলো-পাথারি লাথি, কিল-ঘুষি খেয়ে রেললাইনের উপর পড়ে গেল সে। আরও কিছুক্ষণ এলো-পাথারি লাথি ছুড়ে, তাকে এলাকা ছাড়ার হুমকি আর গালি দিতে দিতে বাজারের দিকে চলে গেল ওরা। রেললাইনের উপর পড়ে রইলো নীলু।

নীলুর নাক দিয়ে, ঠোঁট কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। হাত-পা, শরীরের কয়েক জায়গা ছড়ে গেছে। দুঃস্বপ্নের মতো মুহূর্তের মধ্যে কী যেন হয়ে গেল। সবকিছু ওলোট-পালোট করে দিয়ে যেন একটি দূরন্ত গতির ট্রেন তার উপর দিয়ে চলে গেছে। চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে সে দেখতে পেল অনেক উপরে ডানা মেলে উড়ছে কিছু চিল অথবা শকুন। ডান হাতে এক মুঠো লম্বা ঘাসের ডগা শক্ত করে ধরে দেহ-মনে পীড়নের যাতনায় বোবা কান্নায় স্থির হয়ে রইলো। চোখের জোয়ারে চিল অথবা শকুনগুলো ক্রমশ ঝাপসা হয়ে এলো।

(চলবে)

গাওয়াল (উপন্যাস: পর্ব-এক)

মন্তব্য ২ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ২৭ শে আগস্ট, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:১১

রাজীব নুর বলেছেন: গাওয়াল এলোমেলোভাবে পড়েছি।

২৮ শে আগস্ট, ২০১৮ রাত ২:০৩

মিশু মিলন বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ। আশাকরি একসাথে বই আকারে পড়তে পারবেন।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.