| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মহিউদ্দিন হায়দার
শব্দে আমার আশ্রয়, লেখায় আমার মুক্তি। এখানে আমি লিখি, ভেবে দেখি, আর খুঁজি মানুষের মনের গল্প।

একাত্তরের পরাজিত নরপশুদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে জ্যান্ত কবর দেওয়ার জন্য এই বাংলায় যিনি এককভাবে একটি মহীরুহ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। আর ঠিক একারণেই, একাত্তরের খুনি, ধর্ষক এবং তাদের আদর্শিক জারজ সন্তানদের চোখে চিরকালের এক আতঙ্কের নাম জাহানারা ইমাম। এই বাংলায় বসে, এই বাংলার অন্ন-জল গিলে, যারা একাত্তরের পাকি-প্রেম বুকে বয়ে বেড়ায়, তাদের বিষদাঁত ভাঙার লড়াইটা শহীদ জননীই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন।
ধর্মের লেবাসে কুৎসিত শকুনদের আস্ফালন:
নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে বিগত কয়েক দশক ধরে এই দেশের তথাকথিত 'তাফসির মাহফিল' কিংবা ধর্মের পবিত্র মঞ্চগুলোকে অপব্যবহার করেছে একাত্তরের কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীরা। বিশেষ করে ধর্মের লেবাসধারী কুখ্যাত খুনি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ওরফে 'দেইল্লা রাজাকার'—যার হাত একাত্তরে পিরোজপুরে নিরীহ বাঙালির রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল—সে মঞ্চে দাঁড়িয়ে পবিত্র ধর্মকে পুঁজি করে শহীদ জননীকে ‘জাহান্নামের ইমাম’ বলার ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল। শুধু তাই নয়, ক্যানসারের মতো মরণব্যাধিতে আক্রান্ত এই মহান নারীকে নিয়ে যে পৈশাচিক ও বিকৃত কটূক্তি সে করেছিল, তা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ধর্মোপদেশ ছিল না; এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের মূল ভিত্তির ওপর একাত্তরের পরাজিত হায়েনাদের যৌথ কামড়।
এই উগ্রবাদী চক্রের মূল লক্ষ্যই ছিল বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তার সমূলে বিনাশ করা। আর তাই তারা টার্গেট করেছিল ড. কুদরত-এ-খুদার মতো মহান বিজ্ঞানীকে, যাঁকে তারা বলত ‘গজবে খুদা’। তারা বিষোদ্গার করেছিল কবি শামসুর রাহমানের মতো অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাতিঘরদের বিরুদ্ধে। এই ধর্মান্ধ অপশক্তি ভালো করেই জানত, মুক্তচিন্তা বেঁচে থাকলে তাদের ধর্মের ব্যবসা এবং পাকিস্তানি এজেন্ডা এ দেশে টিকবে না।
আদালতের চাবুক:
এই কুৎসিত বক্তারা নিজেদের যতই 'আল্লামা' বা ধর্মীয় গুরু দাবি করুক না কেন, স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত এদের আসল পরিচয় সিলমোহর দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে। ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ে সাঈদীর একাত্তরের হত্যা, লুণ্ঠন ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের মতো বর্বর অপরাধের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। কোনো ধর্মীয় লেবাসই তাকে 'যুদ্ধাপরাধী' ও 'খুনি'র তকমা থেকে বাঁচাতে পারেনি।
গণআদালত:
রাজপথের থাপ্পড় ও চেতনার পুনর্জন্ম।
১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত 'গণআদালত' ছিল এই দেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী চপেটাঘাত। রাষ্ট্রযন্ত্রের রক্তচক্ষু, তৎকালীন বিএনপি সরকারের রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা এবং নানামুখী হুমকিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জাহানারা ইমাম একাত্তরের কসাই গোলাম আযমদের প্রতীকী বিচার করেছিলেন।
সেই ঐতিহাসিক প্রতিরোধ কেবল একটি দিনের ঘটনা ছিল না; তা ছিল প্রজন্মের পর প্রজন্মে বয়ে চলা প্রতিরোধের আগুন। তৎকালীন স্বৈরাচারী ও তোষণকারী সরকারগুলো যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে লাখো শহীদের রক্তে রাঙানো লাল-সবুজ পতাকা তুলে দিয়ে যে জাতীয় কলঙ্ক লেপন করেছিল, গণআদালত সেই কলঙ্ক মোচনের প্রথম বীজ বুনেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয় এবং শীর্ষ খুনিদের ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে বাংলাদেশ কিছুটা হলেও দায়মুক্ত হয়। আজকের তরুণ প্রজন্ম যে মাথা উঁচু করে মীরজাফরদের বিরুদ্ধে কথা বলে, তার মেরুদণ্ড তৈরি করে দিয়ে গেছেন খোদ জাহানারা ইমাম।
মুক্তিযুদ্ধের 'ভুয়া' সার্টিফিকেট ও আজকের ছদ্মবেশী ইঁদুর:
আজকে যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিংবা রাজনীতির অলিতে-গলিতে প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে, তারা মূলত ওই একাত্তরের খুনিদেরই আধুনিক সংস্করণ। এদের ধমনীতে বইছে সেই একই পাকি-প্রেমের বিষাক্ত রক্ত। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে সরাসরি একাত্তরের বিরোধিতা করার মুরোদ বা সাহস এদের নেই। কারণ, শহীদ জননীর সামাজিক আন্দোলনের ফলে এই মাটিতে রাজাকারি দর্শনের প্রকাশ্য স্থান চিরতরে সংকুচিত হয়ে গেছে।
ফলে, এই ইঁদুরগুলো এখন নতুন ছদ্মবেশ ধারণ করেছে। নিজেদের বাঁচানোর জন্য এরা এখন সস্তা ধোঁকাবাজির আশ্রয় নেয়। কেউ অবলীলায় দাবি করে বসে—"আমি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান," কেউ বলে "৭১-এ আমার বাবা শহীদ হয়েছে।" অথচ এদের নির্বাচনী হলফনামা কিংবা আইডি কার্ড ঘাঁটলে দেখা যায় এদের জন্মই হয়েছে ১৯৮২ সালে বা তার পরে! তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের ডিজিটাল হাতুড়ির নিচে এদের এই ভুয়া ও সস্তা দেশপ্রেমের মুখোশ মুহূর্তেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। টিকে থাকার জন্য এই যে একাত্তরের চেতনার ভুয়া সার্টিফিকেট বানানোর নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা—এটাই প্রমাণ করে যে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের আদর্শিক চাবুকের ভয় এদের হাড়ের মজ্জায় কতটা গভীরভাবে ঢুকে গেছে!
বিপরীত কুযুক্তি এবং তার দাঁতভাঙা জবাব:
এই আন্দোলনের বিরোধিতাকারীরা প্রায়শই কিছু খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করে, যা নিচে খণ্ডন করা হলো:
কুযুক্তি:
বলা হয়, জাহানারা ইমামের গণআদালত ছিল বেআইনি এবং এটি সমাজে বিভাজন তৈরি করেছে। এছাড়া সাঈদী বা অন্যান্য ধর্মীয় বক্তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ফাঁসানো হয়েছে এবং 'রাজাকারের বংশধর' ট্যাগ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মানবাধিকার হরণ করা হচ্ছে।
দাঁতভাঙা জবাব:
১.আইন বনাম জনআকাঙ্ক্ষা:
যখন রাষ্ট্র নিজেই খুনিদের ইনডেমনিটি বা আইনি সুরক্ষা দিয়ে পুনর্বাসন করে, তখন জনগণের তৈরি 'গণআদালত'ই হয়ে ওঠে সর্বোচ্চ বৈধ আদালত। এটি প্রচলিত আইন ভাঙার জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রকে তার মৌলিক দায়িত্ব মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য জনগণের নৈতিক আদালত ছিল।
২.ভিডিওর জ্যান্ত প্রমাণ:
সাঈদী গংদের প্রগতিশীলতাবিরোধী ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের হাজার হাজার অডিও-ভিডিও রেকর্ড আজও বাজারে ও ইন্টারনেটে ঘুরছে। এগুলো কোনো রাজনৈতিক দলের বানানো চিত্রনাট্য নয়; এগুলো তাদের নিজেদের ভেতরের নোংরামির জীবন্ত দলিল।
৩.মানবাধিকারের পরিহাস:
যারা একাত্তরে ৩০ লাখ মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক মানবাধিকার কেড়ে নিয়েছিল, লাখো মায়ের সম্ভ্রম লুট করেছিল, তাদের রাজনৈতিক বা আদর্শিক উত্তরাধিকারীদের মুখে মানবাধিকারের কথা মানায় না। অপরাধীর সন্তান হওয়া অপরাধ নয়, কিন্তু বাবার সেই গণহত্যার অপরাধকে যখন কেউ রাজনৈতিকভাবে ডিফেন্ড করে বা জাস্টিফাই করার চেষ্টা করে, তখন সে আর নির্দোষ থাকে না—সে নিজেও একজন অপরাধী এবং তাকে বয়কট করা প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব।
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম কোনো মৃত অতীত নন; তিনি এই বাংলার প্রতিটি অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল লড়াইয়ের জ্যান্ত হুংকার। একাত্তরের পরাজিত শক্তির ছদ্মবেশী বা প্রকাশ্য কোনো বংশধরই তাঁর তৈরি করা এই সামাজিক প্রতিরোধের দেয়াল ভাঙতে পারবে না। তারা যতই ছদ্মবেশ নিক, যতই ধর্মের নামে বিষ ছড়াক—ইতিহাসের চাকা ঘুরে গেছে। স্বাধীনতাবিরোধী উগ্রপন্থীদের জন্য জাহানারা ইমাম গতকালও আতঙ্ক ছিলেন, আজীবনই মহামারী হয়ে থাকবেন। এই মাটিতে রাজাকারি দর্শনের ঠাঁই আর কোনোদিন হবে না—এটাই শহীদ জননীর লড়াইয়ের চূড়ান্ত রায়।
©somewhere in net ltd.