| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি, ভূমি ব্যবস্থা ও ভূমি জরিপ প্রসঙ্গে
প্রথম পর্ব
১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের আগে পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলার অংশ ছিল। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বতন্ত্র জেলার মর্যাদা লাভ করে। কালের প্রেক্ষাপটে এই পার্বত্য চট্টগ্রাম ভাগ হয়ে গঠিত হয় তিনটি প্রশাসনিক জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান। যদিও বিভিন্ন সময় কখনো ত্রিপুরা রাজার অধীন, কখনো আরাকান রাজার অধীন, কখনো মোগলদের অধীন এবং বঙ্গ প্রদেশের অংশ হিসেবে বৃটিশ শাসনাধীন ছিল। পৃথিবীতে জাতিগত বৈচিত্রে সৃষ্টি হয়েছে অনেক দেশ। আদি বাংলার অঙ্গভূমি পার্বত্য চট্টগ্রামে অতীতে এমন কোন জাতি ছিল না যে, এটি তাদের স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল হিসাবে রূপ নিতে পারবে। পার্বত্য এলাকায় অবস্থানরত বাঙ্গালীরা বহিরাগত হলে শান্তিচুক্তি পক্ষীয়দেরও বহিরাগত অভিধায় পড়তে হবে। ইতিহাস তার প্রমাণ দেবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাশাপাশি অবস্থিত ত্রিপুরা রাজ্য, আসাম ও তার উত্তরাঞ্চল, লুসাই বা মিজোরাম অঞ্চল এবং মায়ানমার বা বার্মা থেকে উপজাতীয়রা আদি বাংলার অঙ্গভূমি পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় ঢুকে পড়েছে। যা তাদের ভাষা নৃতাত্তিক গঠন প্রভৃতিরই স্বাক্ষর বহন করে থাকে।
ইতিহাসকে ভুলে কেউ সামনে অগ্রসর হতে পারে না। সুতরাং বাঙ্গালীদেরকে বহিরাগত বলে পাহাড়ি নেতাদের দাবী পূরণ করে পাহাড়ি-বাঙালী সম্পর্কে আদৌ কোন সমাধানে পৌঁছানো যাবে না। বাস্তবতার নিরিখে সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হতে হবে। পার্বত্য এলাকায় বিরাজমান সমস্যা একটি জাতীয় ইস্যু। এটিকে ছোট করে বা হেলাফেলা করে দেখার সুযোগ নেই। পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং এর সমাধানের প্রক্রিয়ার প্রতি সমগ্র জাতির দৃষ্টি নিবদ্ধ। এ সমস্যাটি দীর্ঘদিনের। পার্বত্য জনগণ ও রাষ্ট্রশক্তির মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা, সমস্যা সমাধানে পাহাড়ি নেতাদের ঔদ্ধ্যত্যপূর্ণ ব্যবহার, বাঙ্গালী বিদ্বেষী মনোভাব, সর্বোপরি পারস্পরিক আস্থার অভাব এবং সমতলভূমির সাথে পাহাড়ি জনগণের জীবন-জীবিকা, সামাজিক, অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সৃষ্ট ব্যবধানের পরিণতিই বর্তমান সংকটের কারণ।
ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, ৫৯০ হতে ১৩৪২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বর্তমান পার্বত্য ত্রিপুরা রাজ্যের রাজাগণ আটবার, আরাকান রাজ্যের রাজাগণ নয়বার এবং গৌড়ের মুসলিম সুলতানগণ ছয়বার এ এলাকার কর্তৃত্ব করেন। অবশেষে বর্তমান পার্বত্য ত্রিপুরা রাজ্যের রাজার শাসন ক্ষমতার আওতা হতে মুসলিম শাসক সুলতান ফকরুদ্দিন মোবারক শাহ্ চট্টগ্রামসহ এ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেন। মুসলিম শাসনের ধারাবাহিকতায় ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কর্তৃক বাংলার মসনদ দখল পরবর্তীকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের রাজস্ব ও প্রশাসনিক নির্বাহী ক্ষমতা ইংরেজ সরকারের হাতে ন্যস্ত হয়ে যায়।
আরাকানী উপজাতিদের আগমন সম্পর্কে ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জুন তারিখে আরাকানী রাজা কর্তৃক চট্টগ্রামের চীফের প্রতি লেখা একটি চিঠি হতে কিছু চমকপ্রদ ঐতিহাসিক তথ্য জানা যায়। আরাকান রাজ্য হতে পালিয়ে আসা কিছু উপজাতির নাম রাজা উল্লেখ করেছিলেন, যারা চট্টগ্রামের পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছিল এবং উভয় দেশের জনগণের উপরই অত্যাচার করতো। এই চিঠিতে পার্বত্য অঞ্চলে বর্তমানে বসবাসরত অন্ততঃ চারটি উপজাতির নাম উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন- মগ, চাকমা, ম্যারিং বা মুরং এবং লাইস (পাংখু, বনযোগী)। আরাকানী রাজা চেয়েছিলেন যে, এ সকল দস্যুদেরকে পার্বত্য এলাকার হতে বিতাড়িত করা উচিত যাতে ‘‘আমাদের বন্ধুত্ব নিষ্কলঙ্ক থাকে এবং পর্যটকদের ও ব্যবসায়ীদের জন্য রাস্তা নিরাপদ থাকে।’’
পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় তৎকালীন সময়ে যতগুলো অধিবাসী বসবাস করত, তার মধ্যে কুকিরা ছিল সবচেয়ে বর্বর ও নির্দয়। নরহত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি ছিল তাদের নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। যে যত বেশী নরহত্যা করতে পারত, সমাজে তার সম্মান ছিল ততবেশী। এ কুকি সম্প্রদায়ের লোকেরা কর্ণফুলী নদীর উত্তর পাড়ে বর্তমান রাঙ্গামাটি জেলায় বসবাস করত। তারা মোট ১০টি গোত্রে বাস করত। প্রতি গোত্রে একজন নেতা থাকত। এ নেতার ভরণ পোষনের দায়িত্ব ছিল গোত্রের সকলের উপর। তারা জুমচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করত। এই জুমচাষ করার জন্য ২/১ বছর একস্থানে থাকার পর পুনরায় নতুন জুমের স্থানে দল বেধে চলে যেত। জুমচাষের জমি নিয়ে প্রায় সময় তাদের মধ্যে বিবাদ হত এবং সকল রকম বিবাদের পরিণিতি ছিল শেষ পর্যন্ত হত্যা। এ হত্যাকান্ড একজনের উপরই সীমাবদ্ধ থাকত না। বরঞ্চ হত ব্যক্তির পরিবারের নারী বা শিশু কাকেও হত্যাকান্ড হতে বাদ দেয়া হত না। পিতার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করা সন্তানগণের নিকট ধর্মীয় বিধান হিসেবে পরিগণিত হত। সে কারনে প্রতিশোধ নেয়ার মত যোগ্য কাকেও জীবিত রাখা হত না। বৃটিশ শাসনামলে উপজাতীয় কুকীরা বৃটিশ প্রজাদের উপর প্রকাশ্যে অত্যাচার করে হত্যাযজ্ঞ চালায়। এ আক্রমণের ঘটনা এতই বড় ধরণের ছিল যে, সরকারের জন্য ইহা খুবই উদ্বিগ্নের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ঘটনার ফলেই পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা সৃষ্টি তরান্বিত হয়। অত্যাচারী উপজাতিদের আক্রমণের পরিণতিতে এবং উপজাতি আন্দোলন দমনের জন্য ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে বিভাগীয় কমিশনার পাহাড়ী উপজাতিদের জন্য একজন সুপারিনটেনডেন্ট নিযুক্ত করে পার্বত্য অঞ্চলকে রেগুলেশান জেলা চট্ট্র্রাম হতে পৃথক করার সুপারিশ করেন। সুপারিশের প্রেক্ষিতে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের ২২নং আইন দ্বারা ঐ বছরের ১লা আগস্ট তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে বৃহত্তর চট্টগ্রাম থেকে পৃথক করা হয় এবং একজন অফিসারকে পার্বত্য উপজাতিদের জন্য সুপারিনটেনডেন্ট পদে নিযুক্ত করা হয়। এভাবেই জেলার সিভিল, ক্রিমিনাল এবং রাজস্ব আদালত ও কর্মকর্তাদের অধিক্ষেত্র হতে পাহাড়ী ও বনাঞ্চলকে আলাদা করা হয়। একজন হিল সুপারিনটেনডেন্ট নিয়োগের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল তার অধিক্ষেত্রের মধ্যে অত্যাচারী উপজাতিদের প্রতিরোধ করা এবং নিরীহ উপজাতিদের রক্ষা করা। তার অধীনস্থ পাহাড়ী এলাকাকে তখন হতে পার্বত্য চট্টগ্রাম নামে অভিহিত করা হয়। ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার অফিসার ইন চার্জ এর পদবী সুপারিনটেনডেন্ট হতে পরিবর্তন করে জেলা প্রশাসক বা ডেপুটি কমিশনার করা হয় এবং সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলের রাজস্ব ও বিচার ব্যবস্থার যাবতীয় বিষয়ে তাকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা প্রদান করা হয়।চলবে...
তথ্যসূত্র:
১. পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০
২. পার্বত্য চট্টগ্রাম বাজার ফান্ড রুলস ১৯৩৭
৩. পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি- প্রথম খন্ড: মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, প্রথম প্রকাশ জুন ১৯৬৯
৪. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি-১৯৯৭
৫. খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯ (সংশোধিত ১৯৯৮)
৬. পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ১৯৯৮
৭. রাংগামাটি/খাগড়াছড়ি জেলা তথ্য বাতায়ন
৮. বাংলাদেশের নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠী: রামকান্ত সিংহ, জুন ২০০২
৯. বাংলাদেশের উপজাতিদের আইন: রামকান্ত সিংহ, প্রথম প্রকাশ ২০০৩
১০. ভূমি জরিপ ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, মোঃ আব্দুল কাদের মিয়া
১১. পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বরিোধ: প্রক্ষোপট ও শান্তির সম্ভাবনা- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সরোয়ার হোসনে, এইচডিএমসি,পিএসসি
১২. চাকমা রাজার গোপন ইতিহাস, সৈয়দ ইবনে রহমত
১৩. পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে করনীয়- মেজর ফারুক (অবঃ)
১৪. পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে -মেহেদী হাসান পলাশ
১৫. পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- মেহেদী হাসান পলাশ
১৬. বাংলাদশে জেলা গ্যাজেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ১৯৭৫
©somewhere in net ltd.