| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি, ভূমি ব্যবস্থা ও ভূমি জরিপ প্রসঙ্গে
দ্বিতীয় পর্ব
বৃটিশ শাসন কালে উপজাতীয় কুকীদের দ্বারা ১৮৫৯, ১৮৬৬, ১৮৬৯, ১৮৮৮ ও ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে পার্বত্য চট্টগ্রামে লুন্ঠনের প্রমাণ পাওয়া যায় এবং বৃটিশ প্রজাদের উপর প্রকাশ্যে অত্যাচার করে হত্যাযজ্ঞ চালায়। এ আক্রমণের ঘটনা এতই বড় ধরণের ছিল যে, সরকারের জন্য ইহা খুবই উদ্বিগ্নের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ব্রিটিশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামকে শাসন ও রাজস্ব সংগ্রহের সুবিধার্থে ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দে ১লা সেপ্টেম্বর মং, চাকমা ও বোমাং নামে তিন সার্কেলে বিভক্ত করে। রাঙামাটির ১৬৫৮ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে চাকমা সার্কেল, বান্দরবানের ১৪৪৪ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে বোমাং সার্কেল এবং রামগড়ের ৬৫৩ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে মং সার্কেলে বিভক্ত করা হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ১৭৯৪ সালে ফ্রন্টিয়ার প্রটেকশন ফোর্স গঠন করে। ১৭৯৫ সালের ২৯ জুন এর নাম পরিবর্তন করে (বর্তমান খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় উপজেলায়) রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন করা হয়। কালের বিবর্তনে এই বাহিনী বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নাম ধারন করেছে, ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রন্টিয়ার গার্ডস, ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দে বেঙ্গল মিলিটারি পুলিশ, ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে ইস্টার্ণ ফ্রন্টিয়ার রাইফেল্স, ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল্স, ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ রাইফেল্স, সর্বশেষ ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি নামকরণ করা হয়। বার্মা ও ভারত থেকে বহিরাগত উপজাতিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে আসার স্রোত বন্ধ করা, পাহাড়ী বনদস্যুদের হাত থেকে নিরীহ বাঙালীদের রক্ষা করা এবং সীমান্তে নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য রামগড়ে এই বাহিনীর আতœপ্রকাশ ঘটে। তৎকালীন সময় থেকেই বহিরাগত উপজাতীয়দের উপদ্রব মারাত্নক আকার ধারণ করেছিল বিধায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে এই বাহিনী গঠন করতে বাধ্য হয়েছিল। বিজিবির কর্মপরিধি বাড়লেও উপজাতীয় জনস্রোত পার্বত্য চট্টগ্রামে অনুপ্রবেশ রোধ করতে পারেনি, ঠিক যেমনটা পারছেনা রোহিঙ্গা জনস্রোত রোধ করতে। বর্তমানে পরিস্থিতি এখন ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বভৌম রক্ষার দায়ীত্বে থাকা সেনাবাহিনীকে আজ পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উপজাতীয়দের চাপে প্রত্যাহার করতে হচ্ছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান স্বীকৃতের দাবীদার বিজিবিকে হতে হচ্ছে একের পর এক হামলার স্বীকার। পুলিশ নিয়ে চলছে নানা টালবাহানা। র্যাব নিয়ে চলছে অপপ্রচার, আন্দোলন। বসবাসরত স্থানীয় বাঙালী নিধনে নেয়া হচ্ছে মহা পরিকল্পনা।
বৃটিশ শাসন কালে পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতীয় কুকীদের প্রকাশ্যে অত্যাচার, হত্যাযজ্ঞ ও লুন্ঠনের কারনে তাদের পার্বত্য অঞ্চলে চলাচল বা বসবাসের নিয়ন্ত্রন এবং উপজাতি জনগোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা প্রদানের জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধিমালা ১৯০০ প্রনয়ন করতে বাধ্য হয়। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশান ১৯০০ এর ১৮ ধারা অনুযায়ী একই বছর পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধিমালা জারি হয়। এ বিধিমালার ৩৪ বিধি অনুযায়ী পার্বত্য জেলাগুলোতে ভূমি ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হচ্ছে। ৩৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী, যে কোনো ধরনের জমি বন্ধক, ক্রয়-বিক্রয়, পরিবর্তন এবং অধিগ্রহণ জেলা প্রশাসকের এখতিয়ার ভুক্ত। যার অর্থ হচ্ছে জেলা প্রশাসকই হচ্ছে জমির প্রকৃত মালিক। ম্যানুয়েল অনুযায়ী সার্কেল প্রধান এর অধীনস্থ হেডম্যান এবং কারবারিরা মৌজা এবং পাড়ায় রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত, যা সংগ্রহের পর সার্কেল প্রধান কর্তৃক জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রকৃতপক্ষে তিন সার্কেল প্রধান এবং তাদের অধীনস্থ হেডম্যান এবং কারবারিরা হচ্ছে রাজস্ব আদায়ের জন্য সরকারের নির্দিষ্ট প্রতিনিধি। ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক সার্কেল প্রধানদের ওপর কর্তৃত্ব করে থাকেন। ৫১ বিধিতে জেলা প্রশাসককে বিশেষ ক্ষমতা দেয়া হয়। এই বিধি অনুযায়ী, “অত্র জেলার বাসিন্দা নন এমন কোন ব্যক্তির উপস্থিতি জেলার সুশাসন এবং শান্তির জন্য ক্ষতিকর মর্মে জেলা প্রশাসক সন্তুষ্ট হইলে, এতদ্বিষয়ে লিখিত কারন উল্লেখ পূর্বক তিনি যদি, অত্র জেলার মধ্যে থাকেন তাহা হইলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জেলা ত্যাগ করিবার জন্য এবং জেলার বাহিরে থাকিলে অত্র জেলায় তাহার প্রবেশ নিষিদ্ধ করিয়া আদেশ জারী করিতে পারিবেন। এই বিধির অধীন প্রদত্ত কোন আদেশ অমান্য করিলে বা অবহেলা করিলে সেই ব্যাক্তি দুইবছর পর্যন্ত কারাদন্ডে বা জরিমানা দন্ডে বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন”।
পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধিমালা ১৯০০ কার্যকর করার মাধ্যমে তিন পার্বত্য জেলার সার্কেল প্রধানদের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সার্কেল চীফকে রাজস্ব আদায়ের এবং নিজ নিজ এলাকার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। সার্কেলগুলো নিয়ে জেলাকে তিনটি মহকুমায় (রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও রামগড়) বিভক্ত করা হয় এবং মহকুমা প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়। তাদেরকে সার্কেল চীফের কার্যাবলী তদারকী ও লিঁয়াজো করার দায়িত্ব দেয়া হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধিমালাকে একটা অন্যতম দলিল হিসেবে পাহাড়িরা গণ্য করে থাকে, যদিও ওই বিধিমালার বেশির ভাগ ধারা ছিল উপজাতীয়দের জন্য অবমাননাকর। বিধি অনুসারে গোটা পার্বত্য জেলার বিধাতা বনে যান জেলা প্রশাসক বা ডেপুটি কমিশনার। যিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে থেকে ইংরেজ কতৃক নিযুক্ত হবেন। সেখানে পার্বত্য অঞ্চলে জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া বাইরের কেউ সেখানে যেতে বা বসতি স্থাপন করতে পারবে না। কিন্তু কেন নিষিদ্ধ ছিল, তা উপজাতি অ্যাক্টিভিস্ট কিংবা সুশীল দরদীরা উল্ল্যেখ করেন না। এই বাক্যটি উপজাতি নেতারা খুব সচেতনভাবে এড়িয়ে যান।চলবে...
তথ্যসূত্র:
১. পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০
২. পার্বত্য চট্টগ্রাম বাজার ফান্ড রুলস ১৯৩৭
৩. পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি- প্রথম খন্ড: মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, প্রথম প্রকাশ জুন ১৯৬৯
৪. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি-১৯৯৭
৫. খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯ (সংশোধিত ১৯৯৮)
৬. পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ১৯৯৮
৭. রাংগামাটি/খাগড়াছড়ি জেলা তথ্য বাতায়ন
৮. বাংলাদেশের নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠী: রামকান্ত সিংহ, জুন ২০০২
৯. বাংলাদেশের উপজাতিদের আইন: রামকান্ত সিংহ, প্রথম প্রকাশ ২০০৩
১০. ভূমি জরিপ ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, মোঃ আব্দুল কাদের মিয়া
১১. পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বরিোধ: প্রক্ষোপট ও শান্তির সম্ভাবনা- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সরোয়ার হোসনে, এইচডিএমসি,পিএসসি
১২. চাকমা রাজার গোপন ইতিহাস, সৈয়দ ইবনে রহমত
১৩. পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে করনীয়- মেজর ফারুক (অবঃ)
১৪. পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে -মেহেদী হাসান পলাশ
১৫. পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- মেহেদী হাসান পলাশ
১৬. বাংলাদশে জেলা গ্যাজেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ১৯৭৫
©somewhere in net ltd.